

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নারীর সাহসী অংশগ্রহণ তাদের অগ্রযাত্রা নিয়ে বিপুল প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এই প্রত্যাশা অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে খুব দ্রুতই হোঁচট খেয়েছে। খুন, ধর্ষণ ও পারিবারিক সহিংসতার মতো নারী নির্যাতন পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। উপরন্তু, গত প্রায় দেড় বছরে অনলাইন ও অফলাইনে নারীর চলাফেরা, পোশাক ও খেলাধুলাসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে বিরূপ মন্তব্য এবং বেশ কিছু নেতিবাচক ঘটনা ভয়ের পরিবেশ তৈরি করেছে। এর মধ্যে কর্মক্ষেত্রে নারীর পোশাক নিয়ে একটি দাপ্তরিক নির্দেশনা বিতর্কের জন্ম দেয়। কর্মজীবী নারীদের কর্মঘণ্টা কমিয়ে তাদের ঘরবন্দি করার রাজনীতি নিয়েও বিতর্ক দেখা গেছে। এমনকি নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনকে ‘ব্যাশ্যা কমিশন’ বলাসহ জনসমাবেশে প্রকাশ্যে অশালীন বক্তব্যও এসেছে। এমন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় কোনো উদ্যোগও দেখা যায়নি। উল্টো চাপের মুখে নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের সুপারিশ ফাইলবন্দি করে রাখা হয়েছে। ফলে রাষ্ট্র সংস্কারের বড় কর্মযজ্ঞ জুলাই সনদেও উপেক্ষিত থেকেছে নারী। এসব ঘটনাকে নারীর স্বাধীনতা সংকুচিত হয়ে আসার বার্তা বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ বাস্তবতার মধ্যেই আজ মঙ্গলবার থেকে দেশে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ।
এবারের আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষের প্রতিপাদ্য হচ্ছেÑ ‘ইউনিট টু অ্যান্ড ডিজিটাল ভায়োলেন্স অল উইমেন অ্যান্ড গার্লস’ অর্থাৎ ‘সব নারী ও তরুণীর প্রতি ডিজিটাল সহিংসতা বন্ধে ঐক্যবদ্ধ হই’। এ উপলক্ষে আজ ২৫ নভেম্বর সকাল ৯টায় বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে কর্মসূচির উদ্বোধন হবে। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন নারী ও শিশুবিষয়ক উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ। এ ছাড়া বেসরকারি সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকেও থাকছে আলোচনাসভা ও র্যালিসহ বিভিন্ন কর্মসূচি।
নারীর প্রতি সহিংসতা কমেনি : আইন ও সালিশ কেন্দ্রের জরিপে নারীর
প্রতি সহিংসতার চিত্র উঠে এসেছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবরÑএই দশ মাসে সারাদেশে ধর্ষণ, গণধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা, আত্মহত্যা ও ধর্ষণচেষ্টা মিলিয়ে মোট ৬৫০টি ঘটনা নথিভুক্ত করেছে আসক। নারী ও শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৪৮৯টি। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার ৩৯৯ জন ও গণধর্ষণের শিকার ৮৩ জন। এসবের মধ্যে ৬ বছরের নিচে ৬৪ জন, ৭-১২ বছরের ১২৭ জন, ১৩-১৮ বছরের ১৩৩ জন, ১৯-২৪ বছরের ২৭ জন, ২৫-৩০ বছরের ১৬ জন, ৩০ বছরের ২১ জন ধর্ষণের শিকার হন। এ ছাড়া ধর্ষণের শিকার হলেও বয়সের তথ্য উল্লেখ নেই ২৬২ জনের।
এর বাইরে ধর্ষণের পর ৩১ জন নারী ও শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। ধর্ষণের পর অসহনীয় মানসিক চাপ ও সামাজিক নির্যাতনের কারণে ৬ জন আত্মহত্যা করেছেন। ধর্ষণচেষ্টার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে ১৯৭টি। এ ছাড়া ধর্ষণচেষ্টার পর হত্যা করা হয়েছে ছয়জনকে। ধর্ষণচেষ্টায় আহত হয়েছেন বহুজন। ধর্ষণ, গণধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা, আত্মহত্যা ও ধর্ষণচেষ্টাসহ মোট ৬৫০টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে মামলা হয়েছে ৫৪১টি ঘটনায়। মামলা হয়েছে কিনা-এ তথ্য নেই ১০১টি ঘটনার।
উদ্বেগজনক চিত্র প্রকাশ করেছে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। সংস্থাটির মতে, এই দশ মাসে দেশে নারীর প্রতি সহিংসতা ও গৃহ সহিংসতার মোট ৫০৩টি ঘটনা ঘটেছে। এর স্বামীর হাতে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ২৬ জন নারীর। স্বামীর পরিবারের নির্যাতনের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে ৪১টি। স্বামীর হাতে খুন হন ৫৮ জন। একই সময়ে স্বামীর পরিবারের সদস্যদের হাতে খুন হয়েছেন ১৩ জন, নিজ পরিবারের হাতে খুন ১৩ নারী। নিজ পরিবারের অত্যাচারের শিকার হয়েছেন ৪৭ জন নারী। গৃহ সহিংসতা, সামাজিক-মানসিক চাপ ও নির্যাতনের ফলে ২৮ নারী আত্মহত্যা করেছেন।
কর্মসময় ৫ ঘণ্টা করার প্রস্তাব নিয়ে বিতর্ক : জামায়াত ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান গত ২৩ নভেম্বর দেওয়া এক বক্তব্যে দেশের নারীদের জন্য কর্মক্ষেত্রে দৈনিক পাঁচ ঘণ্টা ডিউটি বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, কর্মক্ষেত্রে নারীদের জন্য পাঁচ ঘণ্টা কর্মঘণ্টা নির্ধারণ করলে পরিবার, সমাজ ও মূল্যবোধ সুরক্ষিত থাকবে। আমাদের নীতি হলোÑ নারীকে সম্মান, পরিবারকে শক্তিশালী করা।
এই বক্তব্যে দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। জামায়াতের আমিরের এ বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছিলেন, কর্মঘণ্টা কমিয়ে তাদের পেশাদার জীবনে বাধা তৈরি করা সমাধান হতে পারে না। এটি যথেষ্ট অবাস্তব প্রস্তাব। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়েশা খাতুন বলেন, নারীকে ‘দুর্বল’ ধরে নীতিনির্ধারণ করা এক ধরনের কাঠামোগত বৈষম্য। নারী মুক্তি কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক তন্বী রহমান বলেন, এই বক্তব্য বাংলাদেশের নারীর অগ্রগতির অর্জনকে অস্বীকার করে। অথচ নারীরা ব্যাংক, আইটি, স্বাস্থ্য, আর্মি, শিক্ষা ক্ষেত্রে সমান দক্ষতা দেখাচ্ছে।
নারীর পোশাক নিয়ে নির্দেশনা : পোশাক নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছিল। পুরুষরা জিন্স বা গ্যাবার্ডিন কাপড়ের প্যান্ট পরা এবং নারীদের ছোট হাতা ও লেগিংস বা চাপা প্যান্ট না পরতে এই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। তাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিলÑ এই নির্দেশনা মানা না হলে শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ তোলা হবে। তবে সার্কুলার আকারে জারি করার আগেই তা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে বিতর্কে মুখে নির্দেশনাটি প্রত্যাহার করা হয়।
উদ্বেগ কমছে না : এমন একটি পরিস্থিতিতে চলতি বছর আবারও পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ। নারী নির্যাতন প্রতিরোধে এত আয়োজন থাকলেও উদ্বেগের শেষ নেই নারীদের অধিকারকর্মী ও মানবাধিকারকর্মীদের।
নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ নারী নির্যাতন প্রতিরোধ ও শিশুর নিরাপত্তা বিষয়ে বলেন, নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা রোধে আমাদের সামাজিক দায়িত্ব সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সরকার ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে একযোগে কাজ করতে হবে যেন প্রতিটি নারী ও শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়। তিনি আরও বলেন, নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষের মতো কর্মসূচি আমাদের সচেতনতা বৃদ্ধি করে এবং সমাজে নারীর মর্যাদা ও অধিকার রক্ষায় সহায়ক ভূমিকা রাখে।
বিশেষজ্ঞ বক্তব্য : বেসরকারি সংস্থা ‘নিজেরা করি’র সমন্বয়কারী খুশী কবির আমাদের সময়কে বলেন, ‘জাতিসংঘের তথ্য বলছেÑ পৃথিবীতে প্রতি তিন নারীর মধ্যে একজন তাঁর জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে সহিংসতার শিকার হন।’ তিনি বলেন, আমাদের দেশের পরিস্থিতি কিছু ক্ষেত্রে আরও জটিল। কারণ সমাজের বিভিন্ন স্তরেÑপরিবারে, সামাজিক পরিবেশে, নারীর প্রতি নানা ধরনের সহিংসতাকে অনেক সময় সাধারণ বা গ্রহণযোগ্য হিসেবে দেখা হয়। ফলে নির্যাতনের ঘটনা ঘটে, আবার অনেক ক্ষেত্রে সেগুলো রিপোর্টও হয় না। পত্রিকা, সোশ্যাল মিডিয়া এবং মাঠের অভিজ্ঞতাÑ সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রাম হোক বা শহরÑ নারীর প্রতি সহিংসতা বেড়েছে। এর একটি বড় কারণ হলোÑ আগে সমাজে একটি অনানুষ্ঠানিক সামাজিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাও ছিল, একটি জবাবদিহির প্রক্রিয়া ছিল। এখন সমাজ বদলেছে, কিন্তু তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিক্রিয়া এবং কার্যকারিতা বাড়েনি।
গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির সাধারণ সম্পাদক শ্রমিক অধিকার আন্দোলনের নেত্রী মোশরেফা মিশু আমাদের সময়কে বলেন, কর্মক্ষেত্রে নারী নির্যাতনের বিষয়ে এত বছরেও তেমন উন্নতি হয়নি। বিশেষ করে গার্মেন্ট সেক্টরে যৌন হয়রানি, অবমাননাকর আচরণ এবং সামাজিক মর্যাদাহীনতা এখনও বড় সমস্যা। তিনি বলেন, নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র, মালিকপক্ষ এবং সমাজÑ সবাইকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। শুধু দিবস পালন করে হবে না; কাঠামোগত পরিবর্তন প্রয়োজন।