বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৬:৩৮ অপরাহ্ন

হত্যার অনুমোদন দেন তাপস, জিম্মি করান শেখ সেলিম-বিডিআর কমিশনের প্রতিবেদন

বিডি ডেইলি অনলাইন ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৭ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ১০১ বার

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় বিডিআর সদর দপ্তরে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের অনুমোদন দেন। তার অনুমোদন পাওয়ার পরই বিদ্রোহী বিডিআর সদস্যরা পিলখানার ভেতর সেনাবাহিনীর অফিসারদের হত্যা মিশন বাস্তবায়ন করেন। অন্যদিকে সেনা অফিসারদের জিম্মি করতে প্রধানমন্ত্রীর গ্রিন সিগন্যাল পাওয়ার কথা বিদ্রোহী বিডিআর সদস্যদের জানান সাবেক মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম মেম্বার শেখ ফজলুল করিম সেলিম। বিডিআর বিদ্রোহ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনার ১৬ বছর পর অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশনের দাখিল করা তদন্ত প্রতিবেদনে এসব তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। গত ৩০ নভেম্বর প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে এই প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়।

কমিশনের রিপোর্টে শেখ ফজলে নূর তাপসের বিরুদ্ধে ১৪টি অভিযোগ এনে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। অন্যদিকে শেখ ফজলুল করিম সেলিমের বিরুদ্ধে ৭টি অভিযোগ এনে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে।

তাপসের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের মধ্যে রয়েছে- ষড়যন্ত্রকারী; হত্যার অনুমোদন; হত্যা, লাশ গুম, নারী ও শিশু নির্যাতন, আলামত ধ্বংস, অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুট, ব্যক্তিগত সম্পদ লুট এবং অপরাধীদের পলায়নে সহায়তাকারী; ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নে সমন্বয় করা; হত্যাকারীদের সমর্থনে মিছিল সংগঠন করা; তদন্ত ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা; হত্যাযজ্ঞ চলাকালে বহিরাগতদের অনুপ্রবেশ এবং পলায়নে সহায়তা; ইন্ধনদাতা; কমিশনে সাক্ষ্য না দিয়ে তদন্ত কাজে অসহযোগিতা; হত্যাকাণ্ডসহ সংঘটিত অপরাপর অপরাধ প্রতিরোধে সামরিক অভিযানে বাধা; সত্য গোপন করা; সামরিক অফিসার অপহরণ; সাক্ষীদের নির্যাতন এবং কর্তৃপক্ষের কাছে বিদ্রোহের তথ্য গোপন। শেখ সেলিমের বিরুদ্ধে আনা ৭ অভিযোগ হলোÑ

ষড়যন্ত্রকারী; হত্যার সবুজ সংকেত প্রদান; সত্য গোপন করা; ইন্ধনদাতা; কর্তৃপক্ষের কাছে বিদ্রোহের তথ্য গোপন; কমিশনে সাক্ষ্য না দিয়ে তদন্ত কাজে অসহযোগিতা এবং হত্যাকারীদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা সমর্থন করা।

কমিশনের প্রতিবেদনে তাপস সম্পর্কে বলা হয়েছে, ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস ২০০৮-এর নির্বাচনের আগে থেকেই ষড়যন্ত্র করেছেন। হত্যাকারীদের একটি দল তার সঙ্গে প্রায়ই তার চেম্বারে দেখা করে বিভিন্ন আলাপ-আলোচনা করে। বিদ্রোহীদের দ্বারা অফিসার হত্যার ব্যাপারে তার অনুমোদন ছিল। ঘটনার দিন জাহাঙ্গীর কবির নানক ও মির্জা আজম যখন বিডিআর সৈনিকদের সঙ্গে রাজনৈতিক সমাধানের প্রহসনের জন্য যায়, তখন বিডিআরের সৈনিকরা ব্যারিস্টার তাপসকে খুঁজছিল। সুবেদার গোফরান মল্লিকের কথায় উঠে এসেছে যে ব্যারিস্টার তাপসকে বিডিআরের ডিজি করার জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুনের প্রস্তাব ছিল। ব্যারিস্টার তাপস বিডিআর সৈনিকদের পরিকল্পনা সম্বন্ধে সম্পূর্ণভাবে অবগত হলেও এ বিষয়ে বিডিআরের ডিজিকে কোনো কিছুই জানানো হয়নি বলে প্রতীয়মান। ঘটনার দিন হত্যাকারীরা যমুনায় গিয়ে বৈঠক করে বের হওয়ার পর যে সংবাদ সম্মেলন হয়, সেখানে ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস হত্যাকারীদের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা তোরাব আলীকে নির্দেশ দেন এলাকার মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে পিলখানার চারদিকের ৩ কিমি এলাকা খালি করে দিতে। এই সুযোগে হত্যাকারীরা পালিয়ে যেতে সমর্থ হয়। সিপাহি মুহিত ও সিপাহি সাজ্জাদের ভাষ্যমতে, তাপস ক্যাপ্টেন তানভীর হায়দার নূরকে ২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানা হতে বের করে নিয়ে যান। তিনি র‌্যাবের টিএফআই সেলে উপস্থিত হয়ে তদন্ত প্রভাবিত করার চেষ্টা করছেন বলেও সাক্ষ্য পাওয়া গেছে।

শেখ ফজলুল করিম সেলিম সম্পর্কে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৯ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি একাধিক বিডিআর সদস্য শেখ সেলিমের সঙ্গে তার বাসায় সাক্ষাৎ করে। তিনি সেনা অফিসারদের জিম্মি করার জন্য বিডিআর সদস্যদের উপদেশ দেন এবং পরবর্তী করণীয় তারা করবেন বলে জানান। তিনি আরও বলেন যে, প্রধানমন্ত্রীর নিকট থেকে গ্রিন সিগন্যাল পেলে তাদেরকে জানাবেন। ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ তারিখে তিনি সিপাহি মইনুদ্দিনকে টেলিফোন করে জানান যে, প্রধানমন্ত্রীর নিকট থেকে গ্রিন সিগন্যাল পাওয়া গেছে।

গত বছর ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতার পালাবদলের আগেই দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান তারা। বিডিআর কমিশন ফজলে নূর তাপস ও শেখ সেলিমকে কমিশনে সাক্ষ্য দিতে বিজ্ঞপ্তি জারি করেছিল। কিন্তু জাহাঙ্গীর কবির নানক ও মির্জা আজম ইমেইলে সাক্ষ্য দেন। কিন্তু শেখ সেলিম ও তাপস সাক্ষ্য দেননি।

২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি বিডিআর বিদ্রোহ ও হত্যাকাণ্ডের পর সরকার ২০০৯ সালের ২ মার্চ সাবেক সচিব আনিস-উস-জামান খানকে সভাপতি করে ১১ সদস্যের একটি জাতীয় তদন্ত কমিটি গঠন করে। আনিস-উস-জামান খানের জাতীয় কমিটির সদস্য ছিলেন তৎকালীন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ হাসান নাসির (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত)। তিনি গতকাল আমাদের সময়কে বলেন, ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস ছিলেন পিলখানা হত্যাযজ্ঞের মাস্টারমাইন্ড। শেখ সেলিম, ফজলে নূর তাপসসহ শেখ পরিবারের কেউ আমাদের কমিশনে জবানবন্দি দেননি। শেখ হাসিনার নির্দেশ ছিল তারা যেন কোনো জবানবন্দি না দেন। তিনি আরও বলেন, তাপসই সেনা অভিযানে বাধা দেন এবং সেনাবাহিনীকে আবাহনী মাঠের দিকে সরে যেতে বলেন।

বিভিন্ন সাক্ষীর জবানবন্দির সূত্র দিয়ে বিডিআর কমিশনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, শেখ ফজলে নূর তাপস ফোনে নির্দেশ দিয়েছিলেন একটি ছেলেকে মিছিল সংগঠিত করে বিডিআর সদর দপ্তরে প্রবেশ করতে। ফোন কলটি ডিজিএফআই রেকর্ড করেছিল। পরবর্তী সময়ে হাজারীবাগের একটি বাসা থেকে ছেলেটিকে ধরা হয়। বয়স আনুমানিক ২১-২২ বছর, পাতলা গড়নের, নাম সম্ভবত জুয়েল। মেজর মনির তাকে ধরেন। লে. কর্নেল মোয়াজ্জেম নির্দেশ দিয়েছিলেন তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য টিএফআই সেলে নিতে, কিন্তু লে. কর্নেল সালেহর নির্দেশে মেজর মনির তাকে র‌্যাবের কাছে হস্তান্তর করেন।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ছেলেটি স্বীকার করে যে তাপসের নির্দেশেই সে মিছিল নিয়ে ভেতরে ঢুকেছিল। প্রথমে তার সঙ্গে বেশি লোক না থাকলেও বের হওয়ার সময় অনেক লোক ছিল। জুয়েল জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছিল যে মিছিলে যুবলীগের লোকজন অংশ নিয়েছিল। এ তথ্য মেজর মনির লে. কর্নেল সালেহকে জানান। পরে কর্নেল আলমাস রাইসুল গনি একটি ওভারঅল রিপোর্ট তৈরি করেন যেখানে ফ্যাক্ট, ইনসিডেন্ট ও ফাইন্ডিংস আকারে সবকিছু উল্লেখ করা হয়। সেই লেখাটি সরকারের পক্ষে ছিল না এবং মেজর মনির মনে করেন যে এ রিপোর্ট দেওয়ার পর কর্নেল আলমাস রাইসুল গনির অবস্থান দুর্বল হয়ে যায়।

বিডিআর কমিশনের প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, পিলখানায় হত্যাকাণ্ডের বহু আগে থেকেই ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন, শেখ সেলিম, জাহাঙ্গীর কবির নানক ও মির্জা আজম হত্যাকাণ্ডের ষড়যন্ত্রে যুক্ত ছিলেন। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা তোরাব আলী ষড়যন্ত্রকারী এবং এসব আওয়ামী লীগ নেতার মধ্যে যোগসূত্র হিসেবে কাজ করেন।

বিডিআর হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এককভাবে রাজনৈতিক সমাধানের জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তবে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় উপস্থিত থেকে এ সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেন। এই সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে আওয়ামী লীগের তৎকালীন নেতারা যথা সাহারা খাতুন, জাহাঙ্গীর কবির নানক, মির্জা আজম, মাহবুব আরা গিনি, ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস, ওয়েরাসাত হোসেন বেলাল এবং আরও অনেকে রাজনৈতিক সমাধানের নাটক করে সামরিক অভিযান পরিচালনাকে বাধাগ্রস্ত করেছেন।

ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস, জাহাঙ্গীর কবির নানক ও মির্জা আজমের নিয়ন্ত্রণে থেকে কিছু অ্যাম্বুলেন্স ২৫ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যার দিকে একাধিকবার পিলখানায় প্রবেশ করে এবং আহত ব্যক্তিদের ছদ্মবেশে সন্দেহভাজন হত্যাকারীদের নিয়ে বের হয়ে যায় বলে কমিশনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2019 bangladeshdailyonline.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com