

যুক্তরাজ্যে ১৭ বছর নির্বাসিত জীবন কাটানোর পর গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তার নিরাপত্তা বিবেচনায় তৎকালীন সরকার লন্ডনে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ভিভিআইপি মর্যাদার ফ্লাইট (বিজি-২০২) পাঠায়। লন্ডনের হিথরো বিমানবন্দর থেকে ওই বিমানে করেই তিনি বাংলাদেশে ফেরেন।
তবে তাকে বহনকারী এই ফ্লাইটটি যাত্রার আগে ও পরে একাধিক গুরুতর কারিগরি ত্রুটির মুখে পড়ে। বিমানের কর্মকর্তারা বলছেন, সময়মতো এসব ত্রুটি ধরা না পড়লে তারেক রহমানসহ সফরসঙ্গীদের জীবন বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়তে পারত।
ওই ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। এই কমিটি গত ২৫ ফেব্রুয়ারি তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। বিমানের এমডির কাছে দাখিল করা ১৭ পৃষ্ঠার ওই প্রতিবেদনে গুরুতর পদ্ধতিগত ত্রুটি, দায়িত্বে অবহেলা এবং প্রায় ২৬ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতির বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে।
তিনবার জেনারেটর বদল, পরে জানা যায় মূল সমস্যা অন্যত্র : তদন্তে জানা গেছে, উড়োজাহাজটিতে ধারাবাহিক ত্রুটি দেখা দেওয়ার পর বিমানের প্রকৌশল বিভাগ তিন দফায় তিনটি ভিএফএসজি (ভেরিয়েবল ফ্রিকোয়েন্সি স্টার্টার জেনারেটর) প্রতিস্থাপন করে। এতে প্রায় ২৩ কোটি টাকা ব্যয় হয়। কিন্তু পরে দেখা যায়, সমস্যার মূল কারণ জেনারেটর নয়; বরং জ্বালানি তেলের রঙ ত্রুটিযুক্ত হওয়ায় ওই কারিগরি সমস্যা তৈরি হয়েছিল। কমিটির মতে, ত্রুটির প্রকৃত কারণ নির্ণয় না করেই বারবার জেনারেটর প্রতিস্থাপন করা হয়েছিল।
ঘটনার সূত্রপাত ৯ ডিসেম্বর : প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৯ ডিসেম্বর একটি নির্ধারিত ফ্লাইট চলাকালে ইঞ্জিন চালুর পর উড়োজাহাজটির বাম পাশের জেনারেটর হঠাৎ বিকল হয়ে যায়। পুনরায় চালু করার চেষ্টা ব্যর্থ হলে নিরাপত্তার স্বার্থে সেটি বিচ্ছিন্ন রাখা হয় এবং বিমানটি ফিরে আসে।
পরদিন ঢাকায় জেনারেটর প্রতিস্থাপন করা হয়। কিন্তু প্রতিস্থাপনের পরও একই ধরনের সতর্কবার্তা দেখা দেয়। তদন্ত কমিটির ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিস্থাপনের পুরো প্রক্রিয়া অস্বাভাবিক দ্রুত সম্পন্ন করা হয়েছিল এবং পূর্ণাঙ্গ কার্যকারিতা পরীক্ষার যথাযথ নথিও সংরক্ষণ করা হয়নি। এতে প্রক্রিয়াগত অনুসরণ নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই বছরের ডিসেম্বর মাসে উড়োজাহাজটির বাম ইঞ্জিনের জেনারেটর যন্ত্র পরপর তিনবার সংযোগ বিচ্ছিন্ন ও প্রতিস্থাপন করা হয়। নিয়ম অনুযায়ী এত অল্প সময়ের মধ্যে একই যন্ত্রে একাধিক ত্রুটি দেখা দিলে সেটিকে পুনরাবৃত্তিমূলক ত্রুটি হিসেবে ঘোষণা করে বিশেষ পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণের আওতায় আনার বাধ্যবাধকতা থাকলেও সংশ্লিষ্ট দপ্তর তা করেনি। পুরো ঘটনায় প্রায় ২৬ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
অল্প সময়ে বারবার ত্রুটি : ১৪ ডিসেম্বর আবারও উড্ডয়নের সময় একই ধরনের ত্রুটি ধরা পড়ে। অবতরণের পর জেনারেটরটি আবার বিচ্ছিন্ন রাখা হয়। ১৭ ডিসেম্বর দ্বিতীয়বার নতুন জেনারেটর বসানো হয়। কিন্তু প্রতিস্থাপনের পর পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থায় ‘লো অয়েল প্রেসার’ বা কম তেলচাপের সতর্কবার্তা দেখা দিলেও তার বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার লিখিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তদন্ত কমিটির মতে, এমন সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে বিমানকে আবার যাত্রী পরিবহনের জন্য ছাড়পত্র দেওয়া প্রযুক্তিগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত।
২১ ডিসেম্বর আরেকটি ফ্লাইট চলাকালে একই ব্যবস্থায় নতুন ত্রুটি ধরা পড়ে। পরে বিস্তারিত পরীক্ষায় জ্বালানি ও তেল তাপবিনিময় যন্ত্রে ত্রুটি শনাক্ত হয়। সেটি প্রতিস্থাপনের পাশাপাশি জেনারেটরটিও তৃতীয়বার বদলানো হয়।
তদন্ত কমিটির মতে, এত অল্প সময়ে একই যন্ত্র তিনবার প্রতিস্থাপন হওয়া গভীর কোনো অন্তর্নিহিত সমস্যার ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু তখনও মূল কারণ অনুসন্ধানে যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
নথিপত্র পর্যালোচনায় তদন্ত কমিটি দেখতে পায়, ত্রুটি নথিভুক্তকরণে বিলম্ব হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রণ কক্ষ ও নির্ভরযোগ্যতা পর্যবেক্ষণ দলের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি ছিল। পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থায় সীমিত সংখ্যক ফ্লাইটের তথ্য সংরক্ষিত থাকায় পূর্ণাঙ্গ ত্রুটির ইতিহাস বিশ্লেষণ সম্ভব হয়নি। প্রতিস্থাপিত যন্ত্রাংশের কারখানা পর্যায়ের পরীক্ষার প্রতিবেদনও সময়মতো সংগ্রহ করা হয়নি, ফলে প্রকৃত অভ্যন্তরীণ ত্রুটি নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
দুই প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে অভিযোগ : তদন্ত প্রতিবেদনে বিমানের দুই প্রকৌশলী হীরালাল এবং মো. সাইফুজ্জামান খানের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। সংশোধন ও পরিষেবায় ফেরত দেওয়ার সিদ্ধান্তে তারা যথেষ্ট সতর্কতা ও যাচাই-বাছাই করেননি বলে কমিটি মত দিয়েছে।
বিশেষ করে কম তেলচাপের সতর্কবার্তার পরও বিমানকে ফ্লাইটের জন্য ছাড়পত্র দেওয়াকে গুরুতর সিদ্ধান্তগত ত্রুটি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে দায় নির্ধারণ ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়েছে।
রক্ষণাবেক্ষণে অনিয়মের অভিযোগ : তদন্তে আরও উঠে এসেছে, ৯ ও ১৭ ডিসেম্বরের রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রমে একাধিক অনিয়ম ছিল। ১০ ডিসেম্বরের কাজ মাত্র দুই থেকে আড়াই ঘণ্টার মধ্যে শেষ হয়েছে বলে নথিতে উল্লেখ থাকলেও বোয়িং ৭৮৭-৯ বিমানের জন্য নির্ধারিত সময়ের তুলনায় তা অস্বাভাবিকভাবে কম।
ত্রুটি নির্ণয় বা কার্যকারিতা পরীক্ষার বিস্তারিত লগ ও জনবল রেকর্ড দেখাতে না পারাকে গুরুতর অনিয়ম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
সমন্বয়ের ঘাটতি ও তথ্য সংরক্ষণে সমস্যা : প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি ছিল। ১৫ দিনের মধ্যে একই ত্রুটি তিনবার দেখা দিলেও সেটিকে পুনরাবৃত্তিমূলক ত্রুটি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি। বিমানের সিস্টেম সাধারণত শেষ ২৭টি ফ্লাইটের তথ্য সংরক্ষণ করে। কিন্তু তদন্ত শুরুর সময় পর্যাপ্ত তথ্য পাওয়া যায়নি। এতে গুরুত্বপূর্ণ যান্ত্রিক তথ্য সময়মতো সংগ্রহ বা সংরক্ষণ করা হয়নি বলে ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
আকাশে ত্রুটি, বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা : ২১ ডিসেম্বর লন্ডন থেকে সিলেটগামী বিজি-২০২ ফ্লাইট আকাশে থাকার সময় আবারও ভিএফএসজি বিকল হয়ে যায়। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এমন ত্রুটির কারণে অগ্নিকাণ্ড বা গিয়ারবক্সের বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা ছিল।
প্রকৌশল বিভাগের ভুল-ত্রুটি নির্ণয়ের কারণে এমন একটি বিমান ভিভিআইপি ফ্লাইটে ব্যবহৃত হওয়ায় সর্বোচ্চ পর্যায়ের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়েছিল বলে প্রতিবেদনে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
আর্থিক ক্ষতি ও ব্যবস্থাপনা ব্যর্থতা : বারবার যন্ত্রাংশ প্রতিস্থাপন, অন্য বিমান থেকে যন্ত্রাংশ খুলে আনা, অতিরিক্ত জনবল নিয়োগ এবং পরিবহন ব্যয়ের কারণে মোট প্রায় ২৬ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
তদন্ত কমিটির মতে, এটি কেবল একটি যন্ত্রাংশ প্রতিস্থাপনের ঘটনা নয়; বরং এটি একটি সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ব্যর্থতার প্রতিফলন।
ভবিষ্যতের জন্য সুপারিশ : এ ধরনের ঘটনা এড়াতে তদন্ত কমিটি কয়েকটি সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে- পুনরাবৃত্তিমূলক ত্রুটি শনাক্তে তাৎক্ষণিক সতর্কতা ব্যবস্থা চালু করা, গুণগত মান নিশ্চিতকরণ প্রক্রিয়া জোরদার করা, প্রতিস্থাপিত যন্ত্রাংশের বিস্তারিত পরীক্ষার প্রতিবেদন বাধ্যতামূলক করা, আধুনিক সমন্বিত রক্ষণাবেক্ষণ তথ্যব্যবস্থা চালু করা, মানবিক ফ্যাক্টর পর্যবেক্ষণ কাঠামো শক্তিশালী করা।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য : এ বিষয়ে বিমানের ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড মেটেরিয়াল ম্যানেজমেন্ট বিভাগের পরিচালক এয়ার কমোডর মো. মনজুর-ই-আলম বলেন, তদন্ত প্রতিবেদনে যেসব সুপারিশ করা হয়েছে সেগুলো অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তদন্ত কমিটির মতে, সময়মতো সঠিক বিশ্লেষণ, কার্যকর সমন্বয় এবং কঠোর তদারকি থাকলে একই ত্রুটি বারবার ঘটত না এবং এত বড় আর্থিক ক্ষতির মুখেও পড়তে হতো না। এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা এবং আস্থা পুনরুদ্ধার করা।