

আগামী ১২ মার্চ, বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন বসছে। এর আগেই সংসদের স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার এবং সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন চূড়ান্ত করতে চাচ্ছে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি। যদিও প্রথম অধিবেশনেই সংরক্ষিত নারী আসন চূড়ান্ত করতে হবে এমন বাধ্যবাধকতা নেই।
বিএনপির একাধিক সূত্র জানায়, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার পদে অভিজ্ঞ ও রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য মুখ নির্বাচন করার চেষ্টা আছে দলে। দলের ভেতরে কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতার নাম আলোচনায় রয়েছে। স্পিকার পদে পাঁচ কিংবা তার চেয়ে বেশিবার সংসদ সদস্য হয়েছেন– এমন নেতাদের মধ্য থেকে গ্রহণযোগ্য কাউকে বেছে নেওয়া হবে। কারণ, সংসদীয় কার্যক্রম পরিচালনায় অভিজ্ঞতা দরকার। পাশাপাশি সুন্দর সংসদীয় পরিবেশ সৃষ্টির জন্য গ্রহণযোগ্যতাও জরুরি।
জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান সমকালকে বলেন, অতীত অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে দুঃসময়ে যারা রাজপথে সক্রিয় ছিল, তাদের মধ্য থেকে যোগ্যদের মূল্যায়ন করবে দল।
তবে এখনই রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে তোড়জোড় করবে না বিএনপি। সংসদ শুরুর পর পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
স্পিকার পদে আলোচনায় চার নেতা
বিএনপির বেশ কয়েকজন নেতা সমকালকে বলেন, স্পিকার পদে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদের নাম রয়েছে। তিনি বর্তমানে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী। মেজর হাফিজ ভোলা-৩ আসনের ছয়বারের সংসদ সদস্য।
তবে একাধিক বিএনপি নেতা বলেন, এই দুজনের একজন মন্ত্রী, আরেকজন বয়সের ভারে ন্যুব্জ। ফলে তাদের বাইরে ছয়বারের এমপি ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা জয়নুল আবদিন ফারুকের নাম সামনে আনছেন তারা। তিনি নবম জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। সংসদীয় কার্যক্রমে তাঁর অভিজ্ঞতা আছে। পাশাপাশি সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জয়নুল আবেদীনের নামও দলের ভেতরে আলোচনায় আছে।
১২ মার্চ অধিবেশনের শুরুতে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করতে হবে। সরকারি দলের পক্ষ থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, জুলাই জাতীয় সনদের প্রতি সম্মান জানিয়ে ডেপুটি স্পিকার পদে বিরোধী দলকে দেওয়া হবে। এ জন্য প্রধান বিরোধী দল জামায়াতকে নাম প্রস্তাব করতে বলা হয়েছে। জামায়াত থেকে একজন ডেপুটি স্পিকার দেওয়া হলে বিএনপির তরফ থেকেও একজন বিকল্প ডেপুটি স্পিকার করার পরিকল্পনা আছে বলে দলীয় সূত্র জানায়। দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটির বৈঠকে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার পদে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে।
প্রসঙ্গত, জুলাই সনদে বলা হয়েছে, সংবিধানে এমন বিধান যুক্ত করা হবে, যাতে বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হন। বিএনপি সনদের এই প্রস্তাবে নোট অব ডিসেন্ট ছাড়া একমত হয়েছিল। পাশাপাশি দলটির নির্বাচনী ইশতেহারে বলা হয়েছে, সংসদের নিম্ন ও উচ্চকক্ষে ডেপুটি স্পিকারের পদ হবে দুটি। একটি নেওয়া হবে বিরোধী দল থেকে। তবে এসব করতে হলে আগে সংবিধান সংশোধন করতে হবে।
সংরক্ষিত আসনের জন্য নারী নেত্রীরা তৎপর
সংসদে প্রাপ্ত আসনের বিপরীতে ৩৫টি সংরক্ষিত নারী আসন পাবে বিএনপি। নির্বাচন কমিশনের তপশিল অনুযায়ী দলীয় মনোনয়নপত্র বিতরণ করা হবে। বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা বলছেন, দলের দুঃসময়ে মাঠে সক্রিয় ছিল এবং যোগ্যতা আছে– এমন নারীদের মূল্যায়ন করবে দল। এর মধ্যে ২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী কক্সবাজার-১ আসনে হাসিনা আহমদ ও সিরাজগঞ্জ-২ আসনে রুমানা আহমেদকে অভিজ্ঞতার কারণে সামনে আনার পরিকল্পনা আছে। কিন্তু সেখানে ‘এক পরিবার এক প্রার্থী’ নীতি বাস্তবায়ন তাদের জন্য বাধা হতে পারে। নবম জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্যদের কয়েকজনও আলোচনায় আছেন। তারা হলেন– বিএনপির স্বনির্ভরবিষয়ক সহসম্পাদক নিলোফার চৌধুরী মনি, বিএনপির মানবাধিকারবিষয়ক সহসম্পাদক সৈয়দা আসিফা আশরাফী পাপিয়া, স্বনির্ভরবিষয়ক সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য শিরীন সুলতানা, মিডিয়া সেলের সদস্য শাম্মী আক্তার, প্রশিক্ষণবিষয়ক সম্পাদক রাশেদা বেগম হীরা ও নির্বাহী কমিটির সদস্য রেহানা আক্তার রানু।
বিএনপির স্বনির্ভরবিষয়ক সহসম্পাদক নিলোফার চৌধুরী মনি বলেন, ‘যোগ্যদের অবশ্যই মূল্যায়ন হবে বলে আমি মনে করি, আর এটিই হওয়া উচিত। কারণ সবাই পরিশ্রমের সুফল পেতে চায়।’
অষ্টম জাতীয় সংসদের সাবেক সংসদ সদস্য ও মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক সুলতানা আহমেদ এবং ইয়াসমিন আরা হকের নামও আলোচনায় আছে। স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. মঈন খানের মেয়ে মাহরীন খানের নামও শোনা যাচ্ছে। আমেরিকার ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি) থেকে পিএইচডি করেছেন তিনি। ‘এক পরিবার এক প্রার্থী’ নীতি তাঁর জন্যও বাধা।
এ ছাড়া প্রয়াত ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের স্ত্রী হাসনা জসীম উদ্দীন মওদুদ, স্বেচ্ছাসেবক দলের প্রয়াত সভাপতি শফিউল বারী বাবুর স্ত্রী বীথিকা বিনতে হোসাইন, প্রয়াত মহাসচিব আবদুস সালাম তালুকদারের একমাত্র মেয়ে ব্যারিস্টার সালিমা বেগম আরুণি, বিএনপির সাবেক হুইপ সৈয়দ ওয়াহিদুল আলমের মেয়ে ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরীর মেয়ে সামিরা তানজিনা চৌধুরী এবং সাবেক এমপি মকবুল হোসেনের মেয়ে সৈয়দা আদিবা হোসেনের নামও শোনা যাচ্ছে।
জানতে চাইলে বিএনপির সহশিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক হেলেন জেরিন খান বলেন, ‘একজন মাঠের কর্মীকে অবমূল্যায়ন করে যদি পারিবারিক পরিচয়ে কাউকে মূল্যায়ন করা হয়, তাহলে মাঠের কর্মীদের মধ্যে হতাশা কাজ করে। দেখা যাবে, কেউ মাঠে কাজ করতে চাইবে না।’
ছাত্রদল থেকে উঠে আসা নেত্রীরাও আলোচনায়
ছাত্রদল থেকে উঠে আসা নেত্রীদের মধ্যে আলোচনায় আছেন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক (বরিশাল) বিলকিস আকতার জাহান শিরিন, ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি প্রয়াত নাসির উদ্দিন পিন্টুর বোন এবং ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি, বিএনপির সহআন্তর্জাতিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট ফাহিমা নাসরিন মুন্নি, ময়মনসিংহ উত্তর জেলা মহিলা দলের সভাপতি তানজিন চৌধুরী লিলি, ঢাকা দক্ষিণ বিএনপির সাবেক সদস্য অ্যাডভোকেট আরিফা সুলতানা রুমা, মহিলা দলের সহস্বনির্ভরবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট আসমা আজিজ, সাবেক সহসভাপতি সুলতানা জেসমিন (জুঁই), দপ্তর সম্পাদক শাহিনুর নার্গিস, মহিলা দলের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সদস্য সচিব নাসিমা আক্তার (কেয়া), সহআইনবিষয়ক সম্পাদক তামান্না খান আইরিন, সাবেক সাধারণ সম্পাদিকা শামসুন্নাহার ভূঁইয়া, টাঙ্গাইল মহিলা দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রাহেলা জাকির, ফটিকছড়ির গুম হওয়া বিএনপি নেতা শহিদুল আলম সিরাজ চেয়ারম্যানের সহধর্মিণী সুলতানা পারভীন, বগুড়া জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম সম্পাদক নিহার সুলতানা তিথি প্রমুখ।
ঢাকা মহানগর বিএনপির সদস্য আরিফা সুলতানা রুমা বলেন, ‘আমাদের ওপর জেলজুলুম গেছে। আমরা আমাদের সহযোদ্ধা ভাইদের হারিয়েছি। তাদের গুম, খুন হতে দেখেছি। আমরা যে বিভীষিকাময় দিনের সাক্ষী, অনেকে তা দেখেনি। অতিথি পাখিরা কখনও জানবে না রাজপথে আমরা প্রতিটি দিন কীভাবে পার করেছি।’
সাংস্কৃতিক কর্মী
এর বাইরে বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা কণ্ঠশিল্পী বেবী নাজনীন, কণ্ঠশিল্পী রিজিয়া পারভিনের মতো তারকাদের নামও আলোচনার তালিকায় আছে বলে জানা গেছে।
গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা ধরে রাখতে হলে নারীদের যথাযথ মূল্যায়নের পরামর্শ দিয়েছেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী। তিনি বলেন, মাঠের কর্মীদের মূল্যায়ন না করলে দল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আর গণতন্ত্র আনতে হলে নারীর কী চিন্তা, নারী কী চায়– সেটি নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আনতে হলে তাদের মধ্য থেকে যোগ্যদের নির্বাচন করতে হবে।