

সাধারণত পুরুষ ব্রাহ্মণদেরই সনাতনধর্মাবলম্বীদের পূজায় পুরোহিতের দায়িত্বে দেখা যায়। দীর্ঘদিনের এ ধারণা বা প্রথা ভেঙে দিয়েছেন দুই তরুণী। তাঁরা হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তমা অধিকারী ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাদৃতা ভৌমিক। তমা ছিলেন ঢাবির মনোবিজ্ঞান আর সমাদৃতা জবির ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী। তমা ২০২০ সালে সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের সরস্বতীপূজায় পুরোহিতের দায়িত্বে ছিলেন আর সমাদৃতা ২০২৪ সাল থেকে টানা তিনবার ক্যাম্পাসে সরস্বতীপূজায় পৌরহিত্য করেন। বাংলাদেশে নারীদের পুরোহিতের দায়িত্বে দেখা না গেলেও পাশের দেশ ভারতের কলকাতায় দেখা যায়। গত বছর কলকাতায় দুর্গাপূজায় পুরোহিতের দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে চার নারী পুরোহিতের সংগঠন শুভমন্তকে। যার নেতৃত্বে ছিলেন কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতের অধ্যাপক নন্দিনী ভৌমিক। তাঁর তিন সহযোদ্ধা ছিলেন রুমা, পৌলমী, সেমন্তী। তাঁরা দুর্গাপূজা ছাড়াও অন্নপ্রাশন, বিয়ে, শ্রাদ্ধের মতো ধর্মীয় অনুষ্ঠানে পুরোহিতের দায়িত্বে থাকেন। পূজায় পুরোহিতের দায়িত্ব পালন করার কারণ জানতে চাইলে সমাদৃতা ভৌমিক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘পুরুষতান্ত্রিক সমাজের কারণে পৌরহিত্য করাকে পুথিগত করে রাখা হয়েছে। নারীরা পূজায় সবকিছু করতে পারেন শুধু পুরোহিতের দায়িত্বে থাকতে পারেন না! পুরুষতান্ত্রিক সমাজের এ শিকল ভেঙে বেরিয়ে এসে নারীদের পৌরহিত্য করার ধারণা ছড়িয়ে দিয়েছি আমি।’ তিনি বলেন, ‘আমি ব্রাহ্মণ পরিবারের মেয়ে এবং জেঠুর কাছ থেকে পৌরহিত্য করা শিখেছি। পাশের দেশে নারীদের পৌরহিত্য করতে দেখেছি। সামাজিক কারণে বাংলাদেশে নারীরা সে রকমভাবে কেউ পৌরহিত্য করেন না। ঢাবিতে একবার সরস্বতীপূজায় পুরোহিতের দায়িত্ব পালন করেন এক নারী শিক্ষার্থী। অনেক সমালোচনাও হয়েছিল তখন। তার পরও ২০২৪ সালে জবির পূজা কমিটির সঙ্গে কথা বলে পুরোহিতের দায়িত্ব পালন করি। সেখান থেকেই জনসম্মুখে বড় পরিসরে আমার পৌরহিত্য করার যাত্রা হয়।’ সমাদৃতা আরও বলেন, ‘পূজায় পুরোহিতের দায়িত্ব পালন করায় পরিবারের লোকজন, শিক্ষক, বন্ধুবান্ধবী সবাই সমর্থন করেছেন। তবে সোশ্যাল মিডিয়ায় বিশেষ করে ফেসবুকে অনেকে কটাক্ষও করেছেন। আমি সেগুলো এড়িছে গেছি। আবার অনেক মেয়ে পৌরহিত্য করা শিখতে চেয়েছেন। আশা করি নারী পুরোহিতের বিষয়টা এ সমাজ স্বাভাবিকভাবেই গ্রহণ করবে।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগের অধ্যাপক ড. চন্দনা রানী বিশ্বাস বলেন, ‘পৌরহিত্য করতে মন সত্য, সুন্দর হতে হয়। মানুষের মঙ্গল কামনা যদি লক্ষ্য হয়, তাহলে শৃঙ্খলা ভেঙেও পৌরহিত্য করা যায়। তবে বেদে পইতা ধারণের কথা বলা আছে। এ ছাড়া নারীরা পৌরহিত্য করতে পারবেন না এমন কোথাও লেখা নেই। নারীরা যে বিদুষী ছিলেন না এমন নয়। পুরুষশাসিত সমাজে নারীদের কোণঠাসা করে রাখা হয়েছিল এবং এখনো রাখা হচ্ছে। তাই এখনো পুরুষ ব্রাহ্মণরাই পৌরহিত্য করেন বা পুরোহিতের দায়িত্বে থাকেন।’ তিনি বলেন, ‘নারীরা আগে পৌরহিত্য করতে পারেননি বলে এখন পারবেন না, এমন নয়। যদি শাস্ত্র এবং আত্মিক জ্ঞান থাকে তাহলে পুরুষ বা নারী যে-কেউ পৌরহিত্য করতে পারবেন। সমাদৃতা, তমারা পূজা পরিচালনা করছে একে আমি সাধুবাদ জানাই। আমার গ্রামের বাড়ি খুলনাতেও ছোট ভাইয়ের স্ত্রী ২০১৩ সাল থেকে ঘরোয়া পরিবেশে সরস্বতীপূজায় পৌরহিত্য করছে। এটা নিয়ে কারও অভিযোগ আমি শুনিনি। আশা করছি ভবিষ্যতে এমন নারীর সংখ্যা আরও বাড়রে।’