

রাজধানীর পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে জ্বালানি সংকটের কারণে। বিদ্যুৎনির্ভর পাম্প ও শোধনাগার চালু রাখতে জ্বালানির ঘাটতি দেখা দিলে সরাসরি ব্যাহত হতে পারে ঢাকা ওয়াসার দৈনন্দিন কার্যক্রমÑ এমন আশঙ্কা জোরালো হচ্ছে সংশ্লিষ্ট মহলে। শুষ্ক মৌসুমে যখন পানির চাহিদা স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায়, ঠিক তখনই সম্ভাব্য বাড়তি লোডশেডিং পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। এতে উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
বর্তমানে ঢাকা ওয়াসা প্রতিদিন প্রায় ২৮৯ কোটি লিটার পানি উৎপাদনের সক্ষমতা ধরে রেখেছে, যেখানে দৈনিক চাহিদা প্রায় ১৯৩ কোটি লিটার। এ বিশাল সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখতে ১ হাজারের বেশি পাম্প নিরবচ্ছিন্নভাবে চালু রাখা জরুরি, যা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে বিদ্যুতের ওপর। কিন্তু জ্বালানি সংকটের কারণে লোডশেডিং বাড়লে এসব পাম্প চালু রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। বিশেষ করে গভীর নলকূপনির্ভর উত্তোলন ব্যবস্থায় বিদ্যুৎ বিঘ্নিত হলেই তাৎক্ষণিকভাবে সরবরাহ কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি নিচ্ছে ওয়াসা। পাম্প সচল রাখতে পর্যাপ্ত জ্বালানির নিশ্চয়তা চেয়ে ইতোমধ্যে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। বড় বড় পানি শোধনাগারÑ বিশেষ করে সায়েদাবাদ প্ল্যান্টে আগের তুলনায় বেশিদিন জ্বালানি মজুদের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি জরুরি সেবা হিসেবে পানি সরবরাহ সচল রাখতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিসংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় জোরদার করা হয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রাখা নির্ভর করবে জ্বালানি সরবরাহ ও লোডশেডিংয়ের মাত্রার ওপর। সংকট গভীর হলে নির্দিষ্ট এলাকায় সরবরাহে বিঘ্ন দেখা দিতে পারে, এমনকি বিকল্প হিসেবে পানির গাড়ির ওপর নির্ভর করতে হতে পারে। তাই সম্ভাব্য চাপ সামাল দিতে নাগরিকদেরও সচেতন ও সাশ্রয়ী পানি ব্যবহারের ওপর জোর দিচ্ছে ওয়াসা।
ঢাকা মহানগরী ও নারায়ণগঞ্জ শহরে ১১টি ভৌগোলিক জোনের মাধ্যমে পানি সরবরাহ করে ওয়াসা। প্রতিদিন প্রায় ২৮৯ কোটি লিটার পানি উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে ঢাকা ওয়াসার। দৈনিক পানির চাহিদা রয়েছে ১৯৩ কোটি লিটার। স্ট্যান্ডবাইসহ মোট ১ হাজার ২৬১টি পাম্প রয়েছে; যার মধ্যে চালু পাম্পের সংখ্যা ১২২৩টি। লোডশেডিং বেশি হলে পাম্পগুলো চালু রাখা ওয়াসার জন্য দুরূহ হয়ে যাবে।
ঢাকা ওয়াসা সংশ্লিষ্টরা জানায়, ঢাকা ওয়াসা রাজধানীর প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ মানুষের চাহিদা পূরণ করে আসছে। ৯৬০টি গভীর নলকূপ থেকে পানি উত্তোলন করা হয়। পাশাপাশি চাঁদনীঘাট, সায়েদাবাদ, পদ্মা, সাভারের ভাকুর্তা-তেঁতুলঝোড়া ও মেঘনা পানি শোধনাগার থেকে পানি সরবরাহ করছে।
ঢাকা ওয়াসা সরবরাহ করা পানির প্রায় ৬৫ থেকে ৮২ শতাংশ উত্তোলন করা হয় ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে। আর ভূপৃষ্ঠের বা নদীর পানি ট্রিটেমেন্ট করে (পরিশোধন করে) সরবরাহ করা হয় ১৮ থেকে ৩৫ শতাংশ। চাহিদার পুরোটা পাইপলাইনের মাধ্যমে বাসাবাড়ি, অফিস- আদালতে সরবরাহ করা হয়। পুরো প্রক্রিয়াটা নির্ভর করে বিদ্যুতের ওপর। বিদ্যুৎ সরবরাহ ঠিক থাকলে পানি উত্তোলন ও সরবরাহে তেমন সমস্যা হয় না। তবে পানির স্তর নেমে যাওয়ায় প্রতিবছরই শুষ্ক মৌসুমে বাড়তি চাপে পড়তে হয় ওয়াসার।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওয়াসার এক কর্মকর্তা জানান, জ¦ালানির যে সংকট দেখা যাচ্ছে, তাতে শিগগিরই একটা অস্বস্তিকর পরিবেশের সৃষ্টি হতে পারে। একদিক দিয়ে গরমের সময় পানির চাহিদা বেড়ে যায়, অন্যদিকে জ¦ালানি সংকটের লোডশেডিং বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই সময়ে এমনিতেই লোডশেডিং একটু বেশি থাকে। তবে অন্য বছরের তুলনায় এবার লোডশেডিং আরও বেড়ে যাবে। এজন্য ঠিকমতো পাম্প চালু রাখা কঠিন হয়ে যাবে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে পানি সরবরাহে।
সংকটের শঙ্কা মাথায় রেখেই আগাম প্রস্তুতি নিচ্ছে ঢাকা ওয়াসা। এ বিষয়ে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আমিনুল ইসলাম আমাদের সময়কে বলেন, সংকট হতে পারে, সেজন্য আমরা এখন থেকেই প্রস্তুতি নিচ্ছি। ওয়াসা যেন জরুরি সেবার আওতায় থাকে তার জন্য সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলছি। আমাদের সবচেয়ে বড় পানি শোধনাগার সায়েদাবাদ ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টে আগে ৮ দিনের জ¦ালানি মজুদ রাখা হতো। এবার একটু বাড়তি সতর্কতা হিসাবে অন্তত ১০ দিনের জ¦ালানি যেন মজুদ রাখা যায় তার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। দুই-এক দিনের মধ্যে একটা কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা হবে।
পানি অত্যাবশকীয়। পানি সরবরাহ না হলে সবাই সংকটে পড়বে। এজন্য এটার সরবরাহ কীভাবে ঠিক রাখা যায় তার জন্য সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলাদাভাবে আলাপ করা হচ্ছে বলে জানান ব্যবস্থাপনা পরিচালক।
সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতি মাথায় রেখে গ্রাহকদের মানসিকভাবে প্রস্তুতি থাকতে হবে। কোনোভাবেই আতঙ্কিত হওয়া যাবে না। সংকট হলেও পানি ব্যবহারে সচেতনতা দরকার। কোথাও বেশি সংকট দেখা দিলে ওয়াসা তাদের নির্ধারিত পানির গাড়ির মাধ্যমে সরবরাহ করার প্রস্তুতিও রেখেছে।