শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬, ১০:২৯ পূর্বাহ্ন

অস্থির বিশ্ব ও বাংলাদেশের আসন্ন বাজেট

বিডি ডেইলি অনলাইন ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ১০ মে, ২০২৬
  • ২৪ বার

ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সময়ের সমাপ্তি ঘটিয়ে নতুন গণতান্ত্রিক সরকার বহুতর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের প্রতিজ্ঞা নিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের দিকে এগোচ্ছে; অন্যদিকে বিশ্ব অর্থনীতি দীর্ঘদিনের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধ, ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, জ্বালানিসংকট, বাণিজ্যিক সুরক্ষাবাদ, মূল্যস্ফীতি এবং ডলারনির্ভর বৈশ্বিক অর্থব্যবস্থার চাপÑ সব মিলিয়ে ছোট ও আমদানিনির্ভর অর্থনীতিগুলোর জন্য সময়টি অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়।

অনেকেই বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক দুর্বলতাকে কেবল অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনা বা নীতিগত সীমাবদ্ধতার ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। বাস্তবে অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা অবশ্যই রয়েছে; তবে এটিও সত্য যে, গত কয়েক বছরে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর এমন চাপ সৃষ্টি করেছে, যা কোনো উন্নয়নশীল দেশের পক্ষেই সহজে সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। ফলে আগামী বাজেট কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব হবে না; এটি হবে এক অস্থির বিশ্বের ভেতর বাংলাদেশের টিকে থাকার কৌশলপত্র।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিকে প্রথম বড় ধাক্কাটি দেয়। যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই খাদ্যশস্য, সার, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। বাংলাদেশ যেহেতু জ্বালানি ও শিল্পের কাঁচামালের বড় অংশের জন্য আমদানিনির্ভর, তাই আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিটি মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি দেশের বাজারে এসে পড়ে। এর ফল হিসেবে বেড়েছে উৎপাদন ব্যয়, বেড়েছে খাদ্যমূল্য, চাপ তৈরি হয়েছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর।

এরই মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল-ইরান উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালি ঘিরে অস্থিরতা নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের জ্বালানি সরবরাহ এই পথ দিয়ে পরিচালিত হয়। সেখানে সামান্য সংঘাতও আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়িয়ে দিতে পারে। তেলের দাম বাড়া মানে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ উৎপাদনে অতিরিক্ত চাপ এবং পরিবহন খরচ বৃদ্ধির মাধ্যমে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি আরও তীব্র হয়ে ওঠা। একটি আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক সংকেত।

বিশ্বরাজনীতিতে আরেকটি বড় পরিবর্তন হচ্ছে পশ্চিমা দেশগুলোতে ডানপন্থি ও সুরক্ষাবাদী রাজনীতির উত্থান। যুক্তরাজ্যের সাম্প্রতিক আঞ্চলিক নির্বাচনগুলোতে চরম ডানপন্থি শক্তির উত্থান এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অভিবাসনবিরোধী রাজনীতির বিস্তার বিশ্বায়নের পুরনো কাঠামোকে দুর্বল করে দিতে পারে। এর প্রভাব বাংলাদেশের মতো রপ্তানিনির্ভর দেশের ওপর পড়া স্বাভাবিক। কারণ বিশ্ববাজারে যদি সুরক্ষাবাদ বাড়ে, তাহলে তৈরি পোশাকসহ বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাতগুলো নতুন চাপের মুখে পড়তে পারে।

বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি বিষয় হচ্ছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিবর্তন। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির বিজয় শুধু একটি আঞ্চলিক রাজনৈতিক ঘটনা নয়; এর প্রভাব বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক, সীমান্তনীতি, বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক অর্থনীতির ওপরও পড়তে পারে। বিজেপির রাজনীতিতে জাতীয়তাবাদী অবস্থান ও সীমান্ত ইস্যুর ওপর জোর দেওয়ার প্রবণতা রয়েছে। ফলে সীমান্ত বাণিজ্য, পণ্য পরিবহন, এমনকি পানি ও অভিবাসনসংক্রান্ত আলোচনাও নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হতে পারে।

বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যের একটি বড় অংশ পশ্চিমবঙ্গকে কেন্দ্র করেই পরিচালিত হয়। স্থলবন্দর, ট্রানজিট, পরিবহন ও আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থায় পশ্চিমবঙ্গের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। রাজনৈতিক অবস্থানের পরিবর্তন যদি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের উষ্ণতায় প্রভাব ফেলে, তাহলে তার অর্থনৈতিক অভিঘাতও বাংলাদেশকে বহন করতে হবে। বিশেষ করে রপ্তানি, আমদানি ও সীমান্ত বাণিজ্যে অতিরিক্ত প্রশাসনিক কড়াকড়ি তৈরি হলে তা বাংলাদেশের ব্যবসায়িক ব্যয় বাড়িয়ে দিতে পারে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক নীতিও বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। ডলার শক্তিশালী হওয়া, আন্তর্জাতিক ঋণের সুদ বৃদ্ধি এবং বাণিজ্যিক চুক্তিতে কৌশলগত চাপÑ এসব কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতি ক্রমেই চাপে পড়ছে। বাংলাদেশকে এখন শুধু অর্থনৈতিক নয়, কূটনৈতিকভাবেও অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এগোতে হবে। কারণ বর্তমান বিশ্বে অর্থনীতি ও ভূরাজনীতি আলাদা কোনো বিষয় নয়; বরং তারা একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।

এই বাস্তবতায় আগামী বাজেটের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বাস্তববাদিতা। বড় বড় উন্নয়ন পরিকল্পনা বা উচ্চ প্রবৃদ্ধির আশাবাদী ঘোষণার চেয়ে এখন বেশি প্রয়োজন অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখা। এমন বাজেট প্রয়োজন, যা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা করবে, উৎপাদন বাড়াবে এবং বৈদেশিক চাপ মোকাবিলার সক্ষমতা তৈরি করবে। আসন্ন বাজেটে বাংলাদেশকে নিম্নলিখিত বিষয়গুলোতে অগ্রাধিকার দিতে হবে :

প্রথমত, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। বিশ্ববাজারের অস্থিরতার সময়ে যেসব দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার দিকে মনোযোগ দিয়েছে, তারা তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাংলাদেশকেও কৃষি, খাদ্য সংরক্ষণ ও কৃষিভিত্তিক শিল্পে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এখন সময়ের দাবি। শুধু তৈরি পোশাক খাতের ওপর নির্ভর করে দীর্ঘ মেয়াদে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখা কঠিন হবে। ওষুধ, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, জাহাজ নির্মাণ ও চামড়াশিল্পের মতো খাতগুলোকে নতুন করে গুরুত্ব দিতে হবে। ওষুধশিল্প আমাদের রপ্তানি খাতের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় শিল্প। সুতরাং খাতসংশ্লিষ্ট উৎপাদক ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুসারে শিল্প স্থাপন ও উৎপাদন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সব ধরনের বাধা দূর করে তাদের উৎসাহিত করতে হবে। প্রয়োজনে ক্যাশ সাবসিডির পরিমাণ বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত, আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কূটনীতি জোরদার করতে হবে। দক্ষিণ এশিয়ায় রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই। বিশেষ করে ভারত, নেপাল, ভুটান ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজারগুলোর সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার করা প্রয়োজন। চতুর্থত, অপচয় ও বিলাসী ব্যয় কমিয়ে উৎপাদনমুখী খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় বাহুল্যপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্পের চেয়ে কর্মসংস্থান ও উৎপাদন বাড়ায়Ñ এমন খাতে বিনিয়োগ অধিক জরুরি। এখানে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে বুঝতে হবেÑ বাংলাদেশ এখন এমন এক বিশ্বে অবস্থান করছে, যেখানে যুদ্ধ শুধু সীমান্তে হয় না; জ্বালানি, ডলার, শুল্ক, বাণিজ্য ও কূটনীতির মাধ্যমেও সংঘাত পরিচালিত হয়। এই বাস্তবতায় অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে কেবল রাজনৈতিক স্লোগান নয়, প্রয়োজন দূরদর্শী পরিকল্পনা, দক্ষ অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা এবং শক্তিশালী কূটনৈতিক ভারসাম্য। আগামী বাজেট তাই কেবল সরকারের আর্থিক পরিকল্পনা নয়; এটি হবে বৈশ্বিক অস্থিরতার মুখে বাংলাদেশের টিকে থাকার পরীক্ষা। সংকটের সময়ই রাষ্ট্রের প্রজ্ঞা ও নেতৃত্বের প্রকৃত মূল্যায়ন হয়। বাংলাদেশ যদি বাস্তবতাকে স্বীকার করে সঠিক অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে পারে, তাহলে এই অস্থির সময়ও ভবিষ্যতের নতুন সম্ভাবনার পথ খুলে দিতে পারে।

এ অবস্থায় আগামী বাজেটে সরকারের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হবে জনস্বস্তি ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা। কেবল রাজস্ব বাড়ানোর লক্ষ্য নয়, বরং কোন খাতকে উৎসাহ দেওয়া হবে এবং কোন খাতের অপ্রয়োজনীয় ভোগ কমানো হবেÑ সেদিকেও নজর দিতে হবে।

প্রথমত, কৃষি, খাদ্য উৎপাদন, খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি ও রপ্তানিমুখী নতুন শিল্প খাতে করছাড় বা কর হ্রাসের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কারণ বৈশ্বিক অস্থিরতার এই সময়ে খাদ্য ও উৎপাদন নিরাপত্তাই সবচেয়ে বড় শক্তি। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ ও কর সুবিধা বাড়ানো জরুরি। দেশের কর্মসংস্থানের বড় অংশই এই খাত সৃষ্টি করে।

দ্বিতীয়ত, নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য, ভোজ্যতেল, কৃষিযন্ত্র, সার, শিল্পের কাঁচামাল এবং গণপরিবহনের সঙ্গে সম্পর্কিত আমদানিতে শুল্ক ও কর যৌক্তিক পর্যায়ে কমিয়ে আনার চিন্তা করা যেতে পারে। এতে বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা হলেও কমতে পারে। বর্তমানে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় সংকট হলো জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি; ফলে বাজেটের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত জনগণের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা করা।

অন্যদিকে বিলাসী ও অপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের ওপর কর বাড়ানো যেতে পারে। উচ্চমূল্যের ব্যক্তিগত গাড়ি, বিলাসপণ্য, অতিরিক্ত বিদ্যুৎ খরচকারী সামগ্রী, বিদেশি প্রসাধনী ও অপ্রয়োজনীয় আমদানির ওপর অধিক শুল্ক আরোপ করলে একদিকে যেমন বৈদেশিক মুদ্রার চাপ কমবে, অন্যদিকে রাষ্ট্রের রাজস্বও বাড়বে।

অপ্রয়োজনীয় পণ্যের একটি উদাহরণ হতে পারে বিদেশি ফল। বাংলাদেশের শহরে, বন্দরে, এমনকি নিভৃত গ্রামেও বিদেশ থেকে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময়ে আমদানিকৃত ফল পাওয়া যায়। অনেকের মুখেই শোনা যায় যে, সম্ভাব্য পচন থেকে বাঁচানোর জন্যে এসব ফলে প্রচুর পরিমাণে ফরমালিন ব্যবহার করা হয়, যা একান্তই বিষতুল্য। এই বিবেচনায় বিদেশি ফল আমদানি বন্ধ করে দেওয়া উচিত বা উচ্চহারে কর আরোপ করা উচিত। একই সঙ্গে কালো টাকা অর্জন, সম্পদপাচার ও অপ্রদর্শিত সম্পদের বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন। ইতোমধ্যে পাচারকৃত সম্পদ ফিরিয়ে আনার বিষয়েও জোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত।

সবশেষে করব্যবস্থাকে আরও ন্যায়ভিত্তিক ও কার্যকর করা জরুরি। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই জনসংখ্যার একটি বড় অংশ করের বাইরে থেকে যাচ্ছে, অথচ সীমিতসংখ্যক নিয়মিত করদাতার ওপর চাপ বাড়ছে। করজাল সম্প্রসারণ, ডিজিটাল নজরদারি বৃদ্ধি এবং দুর্নীতি কমানো ছাড়া টেকসই রাজস্বব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব নয়।

অস্থির বৈশ্বিক বাস্তবতায় আগামী বাজেট তাই শুধু অর্থ মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক হিসাব নয়; এটি হবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সহনশীলতা, দূরদর্শিতা ও জাতীয় অগ্রাধিকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাপত্র।

মাহফুজুর রহমান : সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক

মতামত লেখকের নিজস্ব

নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2019 bangladeshdailyonline.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com