শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬, ১০:২৮ পূর্বাহ্ন

বৈশ্বিক নেতৃত্বে টালমাটাল যুক্তরাষ্ট্র

সাইমন টিসডল
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৩ মে, ২০২৬
  • ৩৬ বার

নিয়ন্ত্রণহীন এক ধ্বংসযন্ত্রের মতো ডোনাল্ড ট্রাম্প এদিক-সেদিক দুলতে দুলতে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে ভেঙেচুরে দিচ্ছেন, অথচ এর পরিণতি নিয়ে তার খুব একটা ভাবনা নেই। সুসংগঠিত কৌশল, কার্যকর পরিকল্পনা কিংবা স্থির লক্ষ্য ছাড়াই তিনি একের পর এক অস্থির অঞ্চল, যুদ্ধক্ষেত্র ও জটিল ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে হঠাৎ হস্তক্ষেপ করছেন। পেছনে রেখে যাচ্ছেন দুর্ভোগ, বিভ্রান্তি ও ধ্বংসস্তূপ। এরপর তিনি সাধারণত ভুয়া বিজয়ের দাবি করেন, ক্ষতি সামলানোর দায়িত্ব অন্যদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেন এবং নতুন কোনো সংকট খুঁজতে শুরু করেন।

এ সপ্তাহে ট্রাম্প আরেকটি জটিল আন্তর্জাতিক সংকটে প্রবেশ করতে যাচ্ছেন। চীন ও তাইওয়ানকে ঘিরে দীর্ঘদিনের উত্তেজনার মধ্যে তিনি বেইজিং সফরে যাচ্ছেন প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দুই দিনের বৈঠকে অংশ নিতে। ইউক্রেন, গাজা, ন্যাটো, গ্রিনল্যান্ড, আর এখন ইরান ও লেবানন ইস্যুতে ধারাবাহিক নীতিগত ব্যর্থতার পর ট্রাম্প দেশে দেখানোর মতো একটি কূটনৈতিক সাফল্য খুঁজছেন। কিন্তু বাণিজ্য চুক্তির আশার চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে তার নতুন যুদ্ধের সংকট। যদি আবার বড় ধরনের সংঘাত শুরু হয়, তাহলে ইরানকে অস্ত্র না দেওয়ার প্রতিশ্রুতি তিনি শির কাছে চান। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি খোলা রাখতে চীনের সহায়তাও তার প্রয়োজন। এই বৈঠকে যাওয়ার আগে ট্রাম্পের দুর্বল অবস্থান নিয়ে নানা জল্পনা তৈরি হয়েছে। অনেকে মনে করছেন, তাইওয়ানের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন কমানোই হতে পারে শি জিনপিংয়ের মূল শর্ত। শি জানেন, ইরান যুদ্ধ মার্কিন ভোটারদের মধ্যে খুবই অজনপ্রিয়। বৈশ্বিক জ্বালানি, খাদ্য ও ওষুধের দাম বাড়ার জন্য ট্রাম্পকে দায়ী করা হচ্ছে। ইউরোপীয় মিত্ররা তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেনি, রাশিয়া বাড়তি তেলের দামে লাভবান হচ্ছে, আর সবচেয়ে বেশি ভুগছে দরিদ্র দেশগুলো। সামরিক ক্ষেত্রেও ট্রাম্প সফল নন, তার অগোছালো ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ সেটাই দেখিয়েছে। তিনি নিজের তৈরি জটিল পরিস্থিতি থেকে বের হতে মরিয়া।

শি জিনপিং ট্রাম্পকে কীভাবে দেখছেন সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। চীনের জন্য ট্রাম্প যেন এক অপ্রত্যাশিত উপহার। তার কারণে যুক্তরাষ্ট্রকে এখন অনেক দেশ আক্রমণাত্মক, অবিশ্বস্ত এবং বিশ্বাসঘাতকতাপূর্ণ শক্তি হিসেবে দেখছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমছে, আর চীন নিজেকে বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার নতুন রক্ষক হিসেবে তুলে ধরতে পারছে। ইরান সংকটের কারণে যুক্তরাষ্ট্র এশিয়া থেকে সামরিক মনোযোগ সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে এখন তাদের দুটি বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন রয়েছে। ফলে তাইওয়ান ও আঞ্চলিক মিত্রদের রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতা কমছে।

তবে এই যুদ্ধ চীনের জন্যও ঝুঁকি তৈরি করেছে। জ্বালানির দাম, বৈশ্বিক বাণিজ্য ও রপ্তানির ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে, এমন সময় যখন চীনের অর্থনীতি আগেই চাপে রয়েছে। গত বছর ইরানের প্রায় ৮০ শতাংশ তেল চীন কিনেছিল, যার একটি বড় অংশ এখন মার্কিন নৌবাহিনীর বাধার মুখে। যদিও চীন মজুত ব্যবহার, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও ব্রাজিল এবং রাশিয়া থেকে বেশি তেল কিনে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে, তবুও বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল আমদানিকারক দেশ হিসেবে হরমুজ প্রণালির নিরাপদ চলাচল তাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

চীন দুই পক্ষকেই আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে আসার আহ্বান জানাচ্ছে। গত সপ্তাহে তারা ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে সরাসরি বৈঠক করেছে এবং পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীদেরও সমর্থন দিচ্ছে। ২০২৩ সালে সৌদি আরব ও ইরানের সম্পর্ক পুনর্গঠনে চীনের ভূমিকার পর এবারও উপসাগরীয় দেশগুলো বেইজিংয়ের ওপর ভরসা করছে। তারা মনে করছে, ইরানের ওপর চীনের যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে। ২০২১ সালে দুদেশ ‘সমন্বিত কৌশলগত অংশীদারত্ব’ গড়ে তোলে। শি জিনপিং ট্রাম্পকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানাতেও ভয় পাচ্ছেন না। সম্প্রতি তিনি সতর্ক করে বলেছেন, বিশ্বকে আবার ‘জঙ্গলের আইনের’ দিকে ঠেলে দেওয়া উচিত নয়। তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক আইনকে সুবিধামতো ব্যবহার করা এবং সুবিধা না হলে তা উপেক্ষা করা গ্রহণযোগ্য নয়।

ওয়াশিংটনে কেউ কেউ আশা করছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী হামলা চীনকে ভীত করবে এবং তাইওয়ান ও দক্ষিণ চীন সাগরে তাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা কমাবে। কিন্তু সেই যুক্তি তখনই শক্তিশালী হতো, যদি যুদ্ধ সফল হতো। বাস্তবে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতাই প্রকাশ করেছেন। একই সঙ্গে তার কৌশলগত দুর্বলতাও সামনে এসেছে।

শি জিনপিং হয়তো শান্তিপূর্ণ সমাধান চান, কিন্তু তার প্রধান লক্ষ্য ট্রাম্পকে মধ্যপ্রাচ্যের সংকট থেকে উদ্ধার করা নয়। আর তিনি চাইলে ইরানকে গোপনে সামরিক সহায়তা বাড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সংকট আরও দীর্ঘায়িত করতে পারেন, যেমনটি তিনি ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার ক্ষেত্রে করেছেন।

ট্রাম্পও মনে হয় এই ঝুঁকির বিষয়টি বুঝতে পারছেন। গত মাসে তিনি শি জিনপিংকে চিঠি লিখে তেহরানকে অস্ত্র সরবরাহ না করার অনুরোধ জানিয়েছেন এবং বলেছেন, চীন নাকি তাকে আশ্বস্ত করেছে যে, তারা তা করবে না। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক রক্ষণশীল গবেষণা প্রতিষ্ঠান ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিস দাবি করেছে, চীন এরই মধ্যে ইরানকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির উপযোগী রাসায়নিক উপাদান, মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও চলাচল সম্পর্কিত স্যাটেলাইট তথ্য এবং নিষেধাজ্ঞা এড়ানো ও অর্থ পাচারে সহায়তা দিচ্ছে। যদি ট্রাম্প আবার হামলা শুরু করেন অথবা বেইজিং বৈঠকে শি জিনপিংকে সন্তুষ্ট করতে ব্যর্থ হন, তাহলে ইরানের প্রতি আরও প্রকাশ্য সামরিক সহায়তাও বাড়তে পারে। নিজেকে সবসময় ‘সব তাস হাতে থাকা’ নেতা হিসেবে উপস্থাপন করতে ভালোবাসেন ট্রাম্প। কিন্তু শি জিনপিংয়ের সঙ্গে আলোচনায় বসলে তিনি বুঝতে পারেন, তার হাতেই হয়তো তাস কম। এটি ট্রাম্প তৈরি করা ভূরাজনৈতিক বিশৃঙ্খলারই একটি স্পষ্ট উদাহরণ। তার নিজের ২০২৬ সালের জাতীয় প্রতিরক্ষা কৌশলেও বলা হয়েছে, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনকে ঠেকানোই যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান অগ্রাধিকার। অথচ মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে অতিরিক্ত আসক্তি ও পক্ষপাতের কারণে ট্রাম্প সেই অবস্থানকে দুর্বল করে ফেলেছেন। তার অদক্ষতার খেসারত এখন অন্যদের দিতে হতে পারে। এ কারণেই তাইওয়ান, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ফিলিপাইনের মতো মার্কিন মিত্ররা উদ্বিগ্ন।

শি জিনপিংয়ের প্রধান আন্তর্জাতিক অগ্রাধিকার মধ্যপ্রাচ্য নয়। তার মূল লক্ষ্য হলো চীনের সঙ্গে কার্যত স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক তাইওয়ানের একীকরণ। এটি তার ব্যক্তিগত রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের বড় অংশ, যা বাস্তবায়নে প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগের হুমকিও তিনি দিয়েছেন। পেন্টাগনের পরিকল্পনাকারীরা মনে করছেন, চীনের দ্রুত বিস্তৃত সামরিক শক্তি আগামী বছরই তাইওয়ানে হামলার জন্য প্রস্তুত হতে পারে। তাইওয়ানের সামরিক বাহিনী সংখ্যায় অনেক পিছিয়ে। একই সঙ্গে দেশটির রাজনৈতিক দলগুলোও প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানো এবং বেইজিংয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়া নিয়ে বিভক্ত। যুক্তরাষ্ট্র বলছে, তাইওয়ান ইস্যুতে বর্তমান অবস্থান বদলায়নি। কিন্তু ট্রাম্পকে নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে। তিনি প্রায়ই পরস্পরবিরোধী ও উদ্বেগজনক মন্তব্য করেন। সম্প্রতি শি জিনপিংয়ের সম্ভাব্য পদক্ষেপ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, তাইওয়ানে হামলা করা ‘তার সিদ্ধান্ত’। এ মন্তব্যে মনে হয়েছে, বিষয়টি নিয়ে তিনি খুব বেশি উদ্বিগ্ন নন। যদিও পরে তিনি বলেন, চীন হামলা করলে তিনি ‘খুব অসন্তুষ্ট’ হবেন।

এখন মূল প্রশ্ন হলো, দুর্বল ও কৌশলে পিছিয়ে পড়া ট্রাম্প কি ইরান ইস্যুতে চীনের সহায়তা এবং বিরল খনিজ ও কৃষিপণ্য নিয়ে সুবিধাজনক চুক্তির বিনিময়ে তাইওয়ানের প্রতি মার্কিন সমর্থন কমিয়ে দেবেন? একই ধরনের প্রশ্ন উঠছে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের প্রতি তার প্রতিশ্রুতি নিয়েও। বর্তমানে বেইজিং ও টোকিওর মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছে, যার একটি বড় কারণ তাইওয়ান। পাশাপাশি উত্তর কোরিয়াকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে চীনকে রাজি করানোর সক্ষমতাও প্রশ্নের মুখে। কারণ, উত্তর কোরিয়া ইরানের মতো নয়, তাদের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে। অর্থাৎ, ট্রাম্প কি আবারও আন্তর্জাতিক মঞ্চে একটি ভুয়া বিজয়ের দাবি করবেন, অথচ একই সঙ্গে মার্কিন মিত্রদের স্বার্থ বিসর্জন দেবেন, গণতন্ত্রবিরোধী এক শাসকের কাছে নতি স্বীকার করবেন এবং তাইওয়ানকে ঘিরে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধ ঠেকাতে বহু দশকের কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে ঝুঁকির মুখে ফেলবেন? এ সপ্তাহের ঘটনাগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের একক বৈশ্বিক আধিপত্যের যুগ হয়তো শেষের পথে। আর ট্রাম্পের ধারাবাহিক ভুল ও অদক্ষতা চীনকে আরও শক্ত অবস্থানে নিয়ে যাচ্ছে।

লেখক: দ্য গার্ডিয়ানের পররাষ্ট্রবিষয়ক বিশ্লেষক। গার্ডিয়ানে প্রকাশিত নিবন্ধটি ভাষান্তর করেছেন তহমিনা মিলি

নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2019 bangladeshdailyonline.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com