

৩৫তম নিউইয়র্ক আন্তর্জাতিক বইমেলার তৃতীয় দিনেও রোববার (২৪ মে) বৃষ্টি উপেক্ষা করে মানুষের ঢল নেমেছিলো। বিরূপ প্রকৃতি উপেক্ষা করে বইপ্রেমীরা মেলায় যোগ দেন এবং বিভিন্ন অনুষ্ঠান উপভোগ করেন। সকাল থেকেই বইপ্রেমী, লেখক, প্রকাশক, শিল্পী ও দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে মেলার প্রাঙ্গণ। দিন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দর্শকের সংখ্যা বাড়তে থাকে বইমেলার প্রতিটি স্টল, আলোচনার টেবিল, মূলমঞ্চ এবং মেলার বাইরের আড্ডার পরিসর। তবে বইমেলায় বই কেনার চেয়ে অনুষ্ঠান আর আড্ডায় আগ্রহ বেশী পরিলক্ষিত হয়। দিন রাতে মূল মঞ্চে ‘মুক্তধারা-জেএফএস’ পুরষ্কার ঘোষণা করেন বইমেলা কমিটির অন্যতম উপদেষ্টা ও পুরষ্কারের প্রবর্তক বিশিষ্ট ব্যবসায়ী গোলাম ফারুক ভূইয়া। বাংলা সাহিত্যে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এবার অর্থাৎ ২০২৬ সালের পুরষ্কার পেয়েছেন যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী বিশিষ্ট ঔপন্যাসিক, গবেষক ও বিশ্বব্যাংকের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট লেখক ড. আবদুন নূর। ২০১৬ সাল থেকে এই পুরষ্কার প্রদান করা হচ্ছে। তার নাম ঘোষণার পর ড. আব্দুন নূর সম্পর্কে বক্তব্য রাখেন সাংবাদিক রোকেয়া হায়দার। মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে প্রবর্তিত এই সাহিত্য পুরস্কার প্রবাসে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যচর্চার অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হয়।
একই অনুষ্ঠানে প্রদান করা হয় ‘চিত্তরঞ্জন সাহা শ্রেষ্ঠ প্রকাশনা পুরস্কার-২০২৬’। খবর ইউএনএ’র।
বইমেলার তৃতীয় দিনে রোববার মেলাপ্রাঙ্গণে সারাক্ষণ ব্যস্ত দেখা গেছে জনপ্রিয় কথা সাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন ও সাদাত হোসাইন, কবি সুবোধ সরকার, ফারুক মঈনউদ্দীন, মেলার আহ্বায়ক ড. নজরুল ইসলাম, মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ডা. জিয়াউদ্দিন আহমেদ, ডা. ফাতেমা আহমেদ, গোলাম ফারুক ভূঁইয়া, ড. ওবায়দুল্লাহ মামুন এবং মুক্তধারার কর্ণধার বিশ্বজিৎ সাহাকে। রোববার ছুটির দিন আর সোমবার সরকারী ছুটির দিন থাকায় যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য থেকে আগত দর্শনার্থীরা নিউইয়র্কের এই ঐতিহ্যবাহী বইমেলার পরিবেশ উপভোগ করেন। কেউ বই কিনেছেন, কেউ প্রিয় লেখকের সঙ্গে ছবি তুলেছেন, আবার কেউ সাহিত্য আড্ডায় মেতেছেন।
রোববার সকাল থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত জামাইকা পারফর্মিং আর্টস সেন্টারের বিভিন্ন মঞ্চে সাহিত্য, সংস্কৃতি, শিশু-কিশোর বিষয়ক নানা আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়। দিনটির শুরুতে বইয়ের স্টল উদ্বোধন করেন জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক সাদাত হোসাইন, কবি সুবোধ সরকার, ফারুক মঈনউদ্দীন, নজরুল ইসলাম ও ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদ। এরপর অনুষ্ঠিত হয় নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, স্বরচিত কবিতা পাঠ ও আবৃত্তি অনুষ্ঠান।
দুপুরে ‘শব্দ ও ছন্দের আড্ডা’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে লেখক, পাঠক ও প্রকাশকদের অংশগ্রহণে প্রাণবন্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে কবি ও লেখকদের মধ্যে অংশ নেন শামস আল মমীন, জাফর আহমদ রাশেদ, হুমায়ূন কবীর ঢালী, মোস্তফা সারওয়ার, আশরাফ কায়সার, রাজু আলাউদ্দিন, তানভীর তারেক, কণা রেজাসহ অনেকে। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন ফারুক আহমদ।
দিনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল শিশু-কিশোর-যুবদের চিত্রাংকন ও বাংলা লিখন প্রতিযোগিতা। এতে শতাধিক শিশু-কিশোর-কিশোরী অংশ নেয়। বিভিন্ন বয়সভিত্তিক বিভাগে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা, শহীদ মিনার ও জাতীয় স্মৃতিসৌধ বিষয়ক চিত্রাংকন অনুষ্ঠিত হয়। পাশাপাশি বাংলা বর্ণমালা, ‘একুশের গান’-এর প্রথম ছয় লাইন এবং বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত লিখন প্রতিযোগিতাও আয়োজন করা হয়। ফলে বইমেলা প্রাঙ্গণ শিশুদের রঙতুলি, বাংলা ভাষা ও সৃজনশীলতায় হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত। এই পর্ব পরিচালনা করেন শাহানা বেগম, সুপ্রিয়া দে চৌধুরী, পূজিতা দাশ, ফারজানা রাকিবা, জাকির হোসেন, রাশিদা আক্তার এবং সুমাইয়া চৌধুরী। প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া শিশুদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন শিল্পপতি গোলাম ফারুক ভূঁইয়া এবং সাপ্তাহিক প্রথম আলো’র সম্পাদক ইব্রাহীম চৌধুরী খোকন।
বিকেলে অনুষ্ঠিত ‘কবিতার আঙিনায়’ শীর্ষক স্বরচিত কবিতা পাঠ অনুষ্ঠানে অংশ নেন শামস আল মমীন, হোসাইন কবির, বেনজির শিকদার, জেবুন্নেছা জ্যোৎস্না, মো. আলী বাবুল, শারমিন রেজা ইভা, লায়লা ফারজানা, সৈয়দ মামুনুর রশীদ প্রমুখ। একইসঙ্গে অনুষ্ঠিত হয় সোহানা নাজনীনের প্রাণবন্ত উপস্থাপনায় অনুষ্ঠিত হয় ‘নতুন বই নিয়ে লেখকদের কথা’ শীর্ষক বিশেষ পর্ব। নতুন প্রকাশিত বই নিয়ে আলোচনা করেন সাঈদ তারেক, ইব্রাহীম চৌধুরী খোকন, কাওসার পারভীন চৌধুরী, লায়লা ফারজানা, এইচ বি রিতা, বিমল সরকার, রেজিয়া নাজমী প্রমুখ। এ পর্বের তত্ত্বাবধানে ছিলেন লেখক আব্দুল্লাহ জাহিদ।
এছাড়াও বন্যা মির্জার উপস্থাপনায় ‘বাংলা সাহিত্যে সমকালীনতা’ শীর্ষক বিষয় ভিত্তিক আলোচনায় অংশ নেন জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন, শিশু সাহিত্যিক ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ফরিদুর রেজা সাগর সহ ফারুক মঈনউদ্দীন ও মেজবাহ উদ্দিন আহমদ। বাংলা সাহিত্য, প্রবাসী সংস্কৃতি এবং নতুন প্রজন্মের সাহিত্যচর্চা নিয়ে তাদের আলোচনা দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি করে।
সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত ‘৩৫ বছরে বইমেলার সার্থকতা ও অর্জন’ শীর্ষক আলোচনায় অংশ নেন অধ্যাপক ডা. জিয়াউদ্দিন আহমেদ, নজরুল ইসলাম ও বিশ্বজিত সাহা। এই পর্বে নিউইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলার দীর্ঘ যাত্রা, প্রবাসে বাংলা সংস্কৃতির বিকাশ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়। একই অনুষ্ঠানে পরিবেশিত হয় বইমেলার গান-‘নিউইয়র্ক বইমেলা প্রাণের মেলা’। অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন ড. ওবায়দুল্লাহ মামুন।
এরপর অনুষ্ঠিত হয় সাংস্কৃতিক আয়োজন ‘হৃদয়ে রবীন্দ্রনাথ ও চেতনায় নজরুল’। আল্পনা গুহ ও সুমিত্রা সেনের পরিকল্পনায় আয়োজিত এ পরিবেশনায় শিশু-কিশোর শিল্পীদের নৃত্য ও সংগীত দর্শকদের মুগ্ধ করে। পরে ‘গানে মিলে প্রাণের সন্ধান শীর্ষক সঙ্গীতানুষ্ঠানে পরিবেশনা করে আবহমান বাংলা।
রাতের অন্যতম আয়োজন ছিল ‘মুক্তধারা স্মারক বক্তৃতা ২০২৬’। এতে বক্তৃতা প্রদান করেন জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন। বাংলা ভাষা, সাহিত্য, প্রবাসী সংস্কৃতি ও নতুন প্রজন্মের পরিচয় সংকট নিয়ে তাঁর আবেগঘন বক্তব্য দর্শকদের গভীরভাবে আলোড়িত করে। এছাড়াও কবি জীবনানন্দ দাশের জীবন ও সাহিত্য নিয়ে আলোচনা, কবি নজরুলের ১২৭তম জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বিশেষ শ্রদ্ধাঞ্জলি অনুষ্ঠান এবং একক রবীন্দ্রসঙ্গীত পরিবেশনাও দর্শক-শ্রোতাদের মুগ্ধ করে।
মূল মঞ্চে ‘মুক্তধারা-জিএফবি সাহিত্য পুরস্কার’ প্রদান অনুষ্ঠানে পুরস্কারের প্রবর্তক গোলাম ফারুক ভূঁইয়া বিজয়ীর নাম ঘোষণা করেন। তিনি জানান, ২০১৭ সালে শামসুজ্জামান খান থেকে শুরু করে ধারাবাহিকভাবে এ পুরস্কার পেয়েছেন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, দিলারা হাশেম, সেলিনা হোসেন, সমরেশ মজুমদার, গোলাম মুরশিদ, আসাদ চৌধুরী, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, পবিত্র সরকার এবং ২০২৬ সালে ড. আব্দুন নূর। পুরস্কারের অংশ হিসেবে ড. আব্দুন নূরকে নগদ ৩ হাজার ইউএস ডলার, সম্মাননা ক্রেস্ট ও বিশেষ স্মারক প্রদান করা হয়।
প্রতিক্রিয়ায় ড. আব্দুন নূর বলেন, বাংলাদেশে থাকতেই আমি সাহিত্যচর্চা শুরু করি। অনেক সময় নিজের মানুষের কাছ থেকে স্বীকৃতি পাওয়া কঠিন হয়। আজকের এই সম্মান আমাকে গভীরভাবে আপ্লুত করেছে। তিনি মুক্তধারা ফাউন্ডেশন ও আয়োজকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।
এর আগে একই মঞ্চে সঙ্গীত পরিবেশন করেন ডি চৌধুরী অসিত, দেবদাস চৌধুরী, তুলিকা ঘোষ চৌধুরী, দিপায়ন চৌধুরী ও শ্রেয়া চৌধুরী।
বইমেলার টুকিটাকি:
জনপ্রিয় লেখক সাদাত হোসাইন: বাংলাদেশের জনপ্রিয় লেখক সাদাত হোসাইনের জনপ্রিয়তা বইমেলার তৃতীয় দিনেও লক্ষ্য করা গেছে। তাকে দেখা গেছে ভক্তদের জন্য একের পর এক বইয়ে অটোগ্রাফ দিতে। তরুণ পাঠকদের অনেকেই প্রিয় লেখকদের সঙ্গে ছবি তুলে স্মরণীয় মুহূর্ত ধরে রাখেন। বিশেষ করে মুক্তধারা স্টলে তিনি অধিকাংশ সময় কাটান।
রংবেরং-এর বাহারী পোষাকে আড্ডা: বইমেলার তৃতীয় দিন রোববার ছিলো সাপ্তাহিক ছুটি আর সোমবার ছিলো ফেডারেল ছুটির দিন ‘মেমোরিয়াল ডে’। ফলে রোববার জমে উঠে মেলা প্রাঙ্গন। তবে বইমেলায় আগতদের মধ্যে বই কেনার চেয়ে অনুষ্ঠান আর আড্ডায় আগ্রহ বেশী পরিলক্ষিত হয়। রংবেরং-এর বাহারী পোষাকে আড্ডায় মেতে ওঠা অনেকের আড্ডা, হৈচৈ-ফান দৃষ্টি কাড়ে অনেকেরই।
ডা. রওনক আফরোজ-এর মন্তব্য: ডা. রওনক আফরোজ সোমবার (২৫ মে) তার ফেসবকি পেইেজে লিখেছেনÑ নিউইয়র্কে চলছে মুক্তধারা আয়োজিত আন্তর্জাতিক বইমেলা। ‘গতকাল রোববার, ২৪ মে) প্লেন থেকে নেমে ছুটতে ছুটতে (উবারে) স্বরচিত কবিতাপাঠের আসরে অংশগ্রহণ করতে পেরেছিলাম। ভাগ্যিস অনুষ্ঠান একটু দেরিতে শুরু হয়েছিল। এমন আসরে পাঠরত অবস্থায় সেল্ফি তোলা যায় না বলে আমার কবিতাপাঠের কোনো ছবি নাই। যাহোক, যে কবিতাগুলো শুনেছি- প্রতিটি খুব ভালো লেগেছে।
এরপর বৃষ্টির সুগন্ধ মেখে মেখে স্টলগুলোতে ঘোরাঘুরি, পরিচিতদের সাথে কুশল বিনিময়, আলাপচারিতা এবং বাঙালী’র চিরকালীন চা-সিঙারা ভক্ষণ।
তিন বছর পরে এই মেলায় আসার সুযোগ হয়েছে। সব মিলিয়ে চারঘন্টা দ্রুত কেটে গেল। অল্পেই বিস্তর। শেষটা ছিল সুপার।
একটা সময় ঠাকুরগাঁয়ের এক উপজেলায় আমি মেডিকেল অফিসার ছিলাম। সেখানকার প্রত্যন্ত গ্রামের একটি পরিবারে আমার যাওয়া-আসা ছিল। সেই পরিবারের একটি ছেলে (ভদ্রলোক) নিউইয়র্কে সপরিবারে বসবাস করেন। জানা গেল আমরা একই বছর আমেরিকায় মাইগ্রেট করেছি।
তিরিশ বছর পরে তাঁর সাথে এখানে দেখা হওয়াটা বোনাস। অনেক স্মৃতি তোলপাড় করা গল্প হলো। তিনি কষ্ট করে গাড়িতে আমাকে আমার ঠিকানায় নামিয়ে দিলেন।
নটে গাছটি এখনও মুড়ায়নি। আজ মেলার শেষ দিন। তারপরে মুড়াবে হয়তো।’
