বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬, ১২:৫৫ অপরাহ্ন

আসছে না নতুন বিনিয়োগ

বিডি ডেইলি অনলাইন ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৭ জুন, ২০২৬
  • ৪ বার

একদিকে বিশ্বজুড়ে অস্থিতিশীলতা, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি; অন্যদিকে দেশের ভেতরেও নানারকম সংকট আর জটিলতায় দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প খাতে এক ধরনের স্থবিরতা বিরাজ করছে। অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে বিনিয়োগের বিকল্প নেই। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেশে নতুন বিনিয়োগের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ফলে ব্যবসায়ীরা একদিকে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, অন্যদিকে বাজারের অনিশ্চয়তা ও অর্থায়ন সংকটের কারণে পড়েছেন মহাবিপাকে। নতুন বিনিয়োগ না আসায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না, শিল্প সম্প্রসারণ থমকে গেছে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও চাপের মুখে পড়েছে। এদিকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ব্যক্তি-স্বার্থ হাসিলে কিংবা অসৎ উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে রাজনৈতিক হত্যা মামলা দিয়ে অনেক ব্যবসায়ীকে ফাঁসানো হয়েছে।

এ ছাড়া গড়পড়তায় মামলা, হামলা, মোটা অঙ্কের চাঁদাদাবি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে। এসব কারণে অনেক ব্যবসায়ী দেশের বাইরে চলে গেছেন। আবার যারা বিদেশে অবস্থান করছিলেন, তারাও দেশে আসতে পারছেন না। তাদের অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে নয়তো রুগ্ন প্রতিষ্ঠানে পরিণত হচ্ছে। এতে অনেক শ্রমিক বেকার হয়ে পড়ছেন। অন্যদিকে নতুন উদ্যোক্তারাও নানা কারণে ব্যবসায় সুবিধা করতে পারছেন না।

ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, দেশের বিনিয়োগ পরিবেশ এখনও কাক্সিক্ষত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। রাজনৈতিক ও নীতিগত অনিশ্চয়তা, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, উচ্চ সুদের হার এবং ডলার সংকটে তাদের আস্থা কমে গেছে। দেশি উদ্যোক্তারা নতুন প্রকল্প হাতে নেওয়ার ক্ষেত্রে দ্বিধা-দ্বন্দ্বে রয়েছেন। উপরন্তু বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি অপেক্ষার নীতি অনুসরণ করছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি আগের তুলনায় কমেছে। ব্যাংকগুলোতে তারল্য সংকট এবং খেলাপি ঋণের চাপের কারণে নতুন ঋণ বিতরণে সতর্কতা বেড়েছে। ফলে অনেক উদ্যোক্তা প্রয়োজনীয় অর্থায়ন পাচ্ছেন না। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাত সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠান উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। কিছু প্রতিষ্ঠান নতুন বিনিয়োগ পরিকল্পনা স্থগিত রেখেছে।

অন্যদিকে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার সংকটও বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। শিল্পকারখানার কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি আমদানিতে নানা জটিলতার কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। উদ্যোক্তারা আরও বলছেন, এলসি খোলা ও ডলার সংগ্রহে দীর্ঘসূত্রতার কারণে ব্যবসার খরচ বেড়ে যাচ্ছে। এতে নতুন শিল্প স্থাপনের আগ্রহ কমে যাচ্ছে।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের অনিশ্চয়তাও বিনিয়োগের পথে বড় বাধা হয়ে দেখা দিয়েছে। শিল্প মালিকরা বলছেন, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত না হলে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ প্রত্যাশা করা কঠিন। অনেক শিল্পাঞ্চলে এখনও গ্যাস সংকট রয়েছে। ফলে নতুন কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ প্রত্যাশিত সাফল্য পাচ্ছে না। যদিও সরকার বিভিন্ন প্রণোদনা ও নীতিগত সুবিধা ঘোষণা করেছে, তবে বাস্তবায়নের ধীরগতি এবং প্রশাসনিক জটিলতা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করছে। ব্যবসা শুরু করতে দীর্ঘ সময়, অনুমোদন প্রক্রিয়ার জটিলতা এবং বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়হীনতা বিনিয়োগ পরিবেশকে প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় দুর্বল করে তুলেছে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা আবাসিক মিশনের সাবেক প্রধান, বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন আমাদের সময়কে বলেন, বিনিয়োগ স্থবিরতা দীর্ঘমেয়াদে দেশের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিনিয়োগ কমে গেলে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান দুটিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হলে তরুণদের জন্য চাকরির সুযোগ সংকুচিত হবে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য দ্রুত কিছু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। প্রথমত, নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার এবং ঋণের সুদের হার সহনীয় পর্যায়ে আনতে হবে। তৃতীয়ত, বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে এনে আমদানি কার্যক্রম সহজ করতে হবে। পাশাপাশি অবকাঠামো উন্নয়ন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং ব্যবসা পরিচালনার প্রক্রিয়া সহজীকরণে গুরুত্ব দিতে হবে।

তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহবুব হাসান খান বাবু আমাদের সময়কে বলেন, দেশে ব্যবসা-বাণিজ্যের অবস্থা তেমন ভালো না। বিনিয়োগ কম। নতুন উদ্যোক্তাও তেমন আসছেন না। এক্ষেত্রে পুরনো অভিজ্ঞ নিরপরাধ ব্যবসায়ীদের হয়রানি না করে তাদের জন্য ব্যবসার পরিবেশ তৈরি করা দরকার। পুরনোরা ব্যবসায় হাল ধরলে পরিবেশ কিছুটা ভালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি নিরপরাধ ব্যবসায়ীদের মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া উচিত। এ ছাড়া নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য সুযোগ সুবিধা করে দেওয়া উচিত।

নিট পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ব্যবসার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হলে নিরপরাধ ব্যবসায়ীদের মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার পাশাপাশি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে তাদের কাজের সুযোগ দেওয়া দরকার। তিনি বলেন, দেশে অনেক অভিজ্ঞ ব্যবসায়ী রয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে অহেতুক মামলা দেওয়া হয়েছে। যারা অপরাধ করেছে, তাদের আইনের আওতায় এনে বিচারের ব্যবস্থা করলে আমাদের কোনো কথা নেই। কিন্তু যারা অপরাধের সঙ্গে জড়িত নন, তাদের মুক্তি দেওয়া উচিত। তাহলে এসব ব্যবসায়ী দেশের জন্য অবদান রাখতে পারবেন।

খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারলে দেশি ও বিদেশি উভয় ক্ষেত্রেই বিনিয়োগ বাড়বে। এতে নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠিত হবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং অর্থনীতিতে গতি ফিরে আসবে। অন্যথায় বিনিয়োগের বর্তমান স্থবিরতা দীর্ঘায়িত হলে ব্যবসায়ীদের সংকট আরও গভীর হবে এবং সামগ্রিক অর্থনীতি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ ব্যবসায়ীরা নানা সংকটের কারণে ব্যবসায় ফিরে দাঁড়াতে পারছেন না, অন্যদিকে নতুন উদ্যোক্তারা পর্যাপ্ত সহায়তা ও অনুকূল পরিবেশের অভাবে নতুন উদ্যোগ শুরু করতে হিমশিম খাচ্ছেন। ফলে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও শিল্প সম্প্রসারণের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অর্থনৈতিক অস্থিরতা, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার, ডলার সংকট এবং উৎপাদন ব্যয়ের লাগামহীন বৃদ্ধি ব্যবসা পরিচালনাকে কঠিন করে তুলেছে। করোনা মহামারী, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা এবং পরবর্তী সময়ের বিভিন্ন সংকটের কারণে অনেক পুরনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ক্ষতির মুখে পড়ে। এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকেই এখনও সেই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারেনি। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা সবচেয়ে বেশি সংকটে রয়েছেন। ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে গিয়ে অনেকে মূলধন হারিয়েছেন। ব্যাংক ঋণের কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে কেউ কেউ খেলাপির তালিকায় চলে গেছেন। ফলে নতুন করে ঋণ পাওয়ার সুযোগও সীমিত হয়ে পড়েছে। এতে দীর্ঘদিনের ব্যবসায়ীরা পর্যন্ত ব্যবসা সম্প্রসারণ দূরের কথা, আগের অবস্থানে ফিরতে সংগ্রাম করছেন।

অন্যদিকে নতুন উদ্যোক্তাদের জন্যও পরিস্থিতি খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। উচ্চ সুদের ঋণ, জামানত সংকট, প্রশাসনিক জটিলতা এবং বাজারের অনিশ্চয়তা নতুন বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করছে। তরুণদের অনেকেরই নতুন ব্যবসায়িক ধারণা থাকলেও পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাবে তারা উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে পারছেন না। স্টার্টআপ ও উদ্ভাবনী উদ্যোগগুলোর জন্য অর্থায়নের সুযোগ এখনও সীমিত বলে অভিযোগ রয়েছে।

ব্যাংকিং খাতের সংকটও ব্যবসার জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। খেলাপি ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি এবং তারল্য সংকটের কারণে ব্যাংকগুলো নতুন ঋণ বিতরণে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। ফলে প্রকৃত উদ্যোক্তারাও সহজে ঋণ পাচ্ছেন না। অর্থায়নের সহজলভ্যতা না বাড়লে উদ্যোক্তা তৈরির প্রক্রিয়া আরও দুর্বল হয়ে পড়বে।

এদিকে বিদেশি বিনিয়োগ প্রত্যাশিত হারে না বাড়ায় স্থানীয় বিনিয়োগের ওপর চাপ বেড়েছে। কিন্তু অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ পরিবেশ এখনও পুরোপুরি অনুকূলে নয়। নীতিগত স্থিতিশীলতা, দ্রুত সেবা প্রদান এবং ব্যবসা পরিচালনার সহজ পরিবেশ নিশ্চিত করা না গেলে নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি বাধাগ্রস্ত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর দাবি, পুরনো উদ্যোক্তাদের পুনরুদ্ধারে বিশেষ প্রণোদনা এবং পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা চালু করতে হবে। একই সঙ্গে তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য স্বল্পসুদে ঋণ, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা বাড়াতে হবে। ব্যবসা শুরু ও পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রশাসনিক জটিলতা কমানো এবং একক সেবার ব্যবস্থা চালুর দাবিও জানিয়েছেন তারা।

সংশ্লিষ্টদের মতে, পুরনো ব্যবসায়ীদের ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ এবং নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা গেলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। অন্যথায় ব্যবসা খাতের বর্তমান স্থবিরতা দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। এ থেকে আশু উত্তরণে দ্রুত ও কার্যকর নীতিগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। তবেই দেশের অর্থনীতিতে প্রাণের সঞ্চার হবে।

নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2019 bangladeshdailyonline.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com