বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬, ০৮:২২ অপরাহ্ন

পরিচয়ের খোঁজে আদালতে ক্লাউডিয়া চৌধুরী

বিডি ডেইলি অনলাইন ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৭ জুন, ২০২৬
  • ৯ বার

শৈশব থেকে যাদের মা-বাবা হিসেবে জেনে বড় হয়েছেন, একদিন হঠাৎ জানতে পারলেন তারা তার জৈবিক বাবা-মা নন। এরপর বদলে যায় জন্মনিবন্ধন, শিক্ষাগত সনদসহ বিভিন্ন সরকারি নথিতে থাকা অভিভাবকের পরিচয়।

অভিযোগ রয়েছে, পরবর্তীতে তাকে বাড়ি থেকেও বের করে দেওয়া হয়। দীর্ঘদিন ধরে নিজের প্রকৃত পরিচয়ের সন্ধানে থাকা ক্লাউডিয়া চৌধুরী এবার আইনের দ্বারস্থ হয়েছেন।

বুধবার (১৭ জুন) রাজশাহীর বিজ্ঞ আদালতে ক্লাউডিয়া চৌধুরী নিজেই বাদী হয়ে চিকিৎসক ডা. শিপ্রা চৌধুরী এবং তার সহযোগী হিসেবে উল্লিখিত মো. নাজমুলের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। মামলায় প্রতারণা, জালিয়াতি, মিথ্যা তথ্য প্রদান, অবৈধভাবে পরিচয় পরিবর্তন, জোরপূর্বক হলফনামা করানো, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং জন্মনিবন্ধনসংক্রান্ত আইনের বিভিন্ন ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।

বাদীপক্ষের আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট ও জেলা ও দায়রা জজ আদালতের অ্যাডভোকেট মো. হযরত আলী সাংবাদিকদের জানান, আদালত অভিযোগটি আমলে নিয়ে প্রাথমিকভাবে সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং ঘটনার বিস্তারিত তদন্তের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)-কে নির্দেশ দিয়েছেন।

মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, ক্লাউডিয়াকে শিশুকালে অজ্ঞাত স্থান থেকে নিয়ে এসে ডা. শিপ্রা চৌধুরী নিজের সন্তান হিসেবে পরিচয় দিয়ে লালন-পালন করেন। তবে এক্ষেত্রে প্রচলিত আইন অনুযায়ী আদালতের মাধ্যমে অভিভাবকত্ব গ্রহণ কিংবা সমাজসেবা অধিদপ্তরের অনুমোদন নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

বাদীপক্ষের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে ক্লাউডিয়ার জন্মনিবন্ধন, টিকা কার্ড, নাগরিকত্ব সনদ, স্কুলের নথিপত্র, এসএসসি পরীক্ষার রেজিস্ট্রেশন ও প্রবেশপত্রসহ বিভিন্ন সরকারি ও শিক্ষাগত নথিতে ডা. ওবায়দুর রহমান চৌধুরী ও ডা. শিপ্রা চৌধুরীকে তার বাবা-মা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।

কিন্তু ২০২৩ সালে হঠাৎ জন্মনিবন্ধনে বাবা-মায়ের নাম পরিবর্তন করে মো. বাবুল ও মোসা. টগরী বেগমের নাম যুক্ত করা হয়। ক্লাউডিয়ার দাবি, তিনি এসব ব্যক্তিকে কখনো দেখেননি কিংবা চিনতেন না।

মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের জুন মাসে ক্লাউডিয়াকে জোরপূর্বক আদালতে নিয়ে গিয়ে একটি হলফনামায় স্বাক্ষর করানো হয়। পরদিন তাকে জানানো হয়, তিনি পরিবারের জৈবিক সন্তান নন। এরপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের মাধ্যমে তাকে এক কাপড়ে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

এছাড়া তার পাসপোর্টসহ প্রয়োজনীয় নথিপত্র ফেরত দেওয়া হয়নি বলেও দাবি করা হয়েছে। পরিচয় সংক্রান্ত জটিলতার কারণে জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি, কলেজে ভর্তি এবং অন্যান্য সরকারি সেবা গ্রহণে নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি তার শিক্ষাজীবনের একটি বছরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি করেছেন বাদী।

মামলায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ২০০৮ সালে জন্মনিবন্ধন করার সময় ক্লাউডিয়ার নাম, জন্মতারিখ ও বাবা-মায়ের পরিচয় সম্পর্কে মিথ্যা তথ্য দেওয়া হয়েছিল। পরে ২০২৩ সালে আবার নতুন তথ্য সংযোজন করে জন্মনিবন্ধন সংশোধন করা হয়।

বাদীপক্ষের দাবি, শুধু জন্মনিবন্ধন নয়, শিক্ষাবোর্ডের নথি, এসএসসি রেজিস্ট্রেশন ও প্রবেশপত্রেও একইভাবে পরিবর্তন আনা হয়েছে। এসব পরিবর্তন তার অগোচরে এবং সম্মতি ছাড়া করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

আইনজীবী হযরত আলী বলেন, মিথ্যা তথ্যের ভিত্তিতে ক্লাউডিয়ার পাসপোর্টও তৈরি করা হয়েছিল। অভিযোগগুলো প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ধারাগুলোর আওতায় আসামিদের বিরুদ্ধে গুরুতর শাস্তির বিধান রয়েছে।

সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে আইনজীবী জানান, নিজের প্রকৃত জন্মপরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য না থাকায় ক্লাউডিয়া চরম মানসিক সংকটের মধ্যে রয়েছেন।

তার ভাষায়, একজন মানুষ যখন জানে না তার প্রকৃত বাবা-মা কে, তার পরিচয় কী, তখন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হওয়াটাই স্বাভাবিক। ক্লাউডিয়া বর্তমানে পরিচয় সংকট, অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে জীবনযাপন করছেন।

বাদীপক্ষের দাবি, নিরাপত্তা ও সামাজিক সুরক্ষার বিষয় বিবেচনায় সম্প্রতি ইসলামী শরীয়াহ মোতাবেক ক্লাউডিয়ার বিয়ে সম্পন্ন করা হয়েছে।

মামলায় বর্তমানে দুইজনকে আসামি করা হলেও তদন্তের মাধ্যমে অন্য কোনো ব্যক্তি, কর্মকর্তা বা প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলে জানিয়েছেন বাদীপক্ষের আইনজীবী।

আদালতের নির্দেশে পিবিআই এখন অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই ও প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহের কাজ শুরু করবে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর মামলার পরবর্তী কার্যক্রম নির্ধারণ হবে।

অভিযোগের বিষয়ে ডা. শিপ্রা চৌধুরীর বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ার পর তিনি ফোন কেটে দেন বলে জানা গেছে। এর আগে বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমের প্রশ্নের জবাব দিতেও তিনি অনাগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন।

একটি মামলার গণ্ডি পেরিয়ে ঘটনাটি এখন পরিচয়, মানবাধিকার এবং আইনি স্বচ্ছতার প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে। আদালতের তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের অপেক্ষায় রয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2019 bangladeshdailyonline.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com