

অন্তর্ভুক্তিমূলক সাংস্কৃতিক কর্মসূচি আয়োজন, ক্যাম্পাসের সাংস্কৃতিক অংশীজনের অংশগ্রহণ নিশ্চিতে অপারগতা, জাতীয় সংস্কৃতিকে ধারণ ও উপস্থাপনে বর্তমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভূমিকা বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ডাকসু আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলোতে সব মতের, পথের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের অন্তর্ভুক্ত না করতে পারাটাই তাদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা বলে সংশ্লিষ্ট মহলের অভিযোগ। তবে ডাকসুর দাবি, এগুলো নিছকই ‘রাজনৈতিক’ অভিযোগ।
এ পর্যন্ত ৭০-৮০টি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ডাকসু আয়োজন করেছে বলে দাবি সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদের। এগুলোর মধ্যে ইশারা ভাষা দিবস, পুঁথি পাঠের আসর, ফিলিস্তিনের উদ্দেশ্যে কবিতা পাঠের আসর, ফেলানীর মৃত্যুবার্ষিকীতে আধিপত্যবাদবিরোধী কবিতা ও গানের আসর, কুয়াশার গান শীর্ষক বৃহৎ কনসার্ট, নবাব সলিমুল্লাহর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে কাওয়ালি, শরৎ উৎসব, আদি নববর্ষ, হালখাতা ও বায়োস্কোপ প্রদর্শন, রমজান মাসে সিরাত সন্ধ্যা উল্লেখযোগ্য।
ডাকসুর গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক সংসদের বিতর্ক ও অন্যান্য সাহিত্য কার্যক্রমের দায়িত্বে থাকবেন, সাহিত্য প্রতিযোগিতার আয়োজন করবেন এবং নির্বাহী কমিটির সম্মতিক্রমে বছরে এক বা একাধিকবার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করবেন।
২০১৯ সালে ডাকসুর সাংস্কৃতিক সম্পাদক আসিফ তালুকদারের নেতৃত্বে টিএসসিভিত্তিক সাংস্কৃতিক সংগঠনসমূহ এবং সাংস্কৃতিক বিভাগগুলো যেমন থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ, নৃত্যকলা, সংগীত, সংস্কৃত, উর্দু, বাংলা, পালি এবং চারুকলার বিভাগগুলোর সমন্বয়ে একটি উপকমিটি থাকলেও বর্তমান ডাকসুর এ ধরনের কোনো কিছু দেখা যায়নি। ফলে অন্তর্ভুক্তিমূলক কোনো কর্মসূচি দেওয়াও তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি।
মাটি ও মানুষের সংস্কৃতি ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালি, জারি-সারি, পল্লিগীতি ছাড়া একটি ব্যান্ড কনসার্টের আয়োজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল তাদের উন্মুক্ত সংস্কৃতি চর্চায় উদ্বুদ্ধকরণের প্রচেষ্টা।
ডাকসুর সাংস্কৃতিক সম্পাদক ক্যাম্পাসে বিভিন্ন জাতীয় সমস্যা ও রাজনৈতিক ইস্যুতে ব্যাপক সরব থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ক্ষতিগ্রস্ত, স্বাধীনতা সংগ্রাম ভাস্কর্য সংস্কারে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব পড়ে এমন কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখা যায়নি।
সম্প্রতি মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদ জাতীয় সংগীত গাইতে গিয়ে ভুল করেছেন; এমনকি বাংলা ১২ মাসের নামও সঠিকভাবে বলতে পারেননি। সংস্কৃতিকর্মীদের অভিযোগ, তিনি এগুলো ইচ্ছা করেই করেছেন যাতে এ সংস্কৃতিগুলোকে হেয় প্রতিপন্ন করা যায়।
টিএসসিকেন্দ্রিক সংগঠন জয়ধ্বনি সাংস্কৃতিক সংগঠনের সদ্য সাবেক সভাপতি আনোয়ার হোসাইন বলেন, ‘সব অংশীজনকে অন্তর্ভুক্ত করতে না পারাটা এই ডাকসুর সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। মূলত তাদের নিজস্ব মতাদর্শকেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড চালানোর কারণে জাতীয়ভাবে এ অঙ্গনের মানুষ তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। টিএসসির কোনো সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে তাদের কোনো যোগাযোগ নেই। তাদের আয়োজিত প্রোগ্রামে শুধু শিবিরের নেতাকর্মীরাই উপস্থিত থাকে; সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য মুক্ত চর্চাকেন্দ্রিক তেমন কোনো প্রোগ্রামের আয়োজন তারা করতে পারেনি। তারা মূল ধারা থেকে এতটাই বিচ্ছিন্ন যে, পুঁথি পাঠের আসর বসিয়ে পেশাদার শিল্পীদের না এনে তথাকথিত শিল্পী ছাত্রশক্তি নেতা সাইফুল্লাহকে এনে মাটির সংস্কৃতি পুঁথিপাঠকে বিকৃত ও অপমানিত করেছে।’
তিনি বলেন, ‘ক্যাম্পাসের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মানুষের সঙ্গে মুসাদ্দিকের মেলামেশা নেই। ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীরা তাকে মবস্টার নামে চেনে। জাতীয় সংগীত অবমাননা, বাংলা মাসের নাম নিয়ে হাসি-তামাশা এবং মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ভাস্কর্যগুলো নিয়ে কোনো কার্যক্রম না থাকা তাদের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী অবস্থানেরই বহিঃপ্রকাশ। আসলে তারা গুপ্ত রাজনীতি করে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতারণা করছে।’
ঢাকা ইউনিভার্সিটি মাইম অ্যাকশনের সভাপতি ফেরদৌস সিদ্দিক সাইমন বলেন, ‘ডাকসু সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে ঐক্যবদ্ধ করার পরিবর্তে বিচ্ছিন্নতার সৃষ্টি করেছে। সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে সমন্বয়হীনতা ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হওয়ায় ক্যাম্পাসের সাংস্কৃতিক চর্চা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’
ঢাকা ইউনিভার্সিটি কালচারাল সোসাইটির সভাপতি আতিকুর রহমান তোহা বলেন, ‘ডাকসু কালচারাল সেক্টরে কাজ করার চেয়ে পলিটিক্যাল পারপাসকে প্রায়োরিটি দিচ্ছে। আমাদের যে নিজস্ব বাঙালি সংস্কৃতি সেটাকে তারা ভারতীয় সংস্কৃতি হিসেবে প্রমাণ করার একটা প্রয়াস দেখায়। এগুলো করতে গিয়ে তারা ধর্মকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। ফলে তাদের কাজের সুযোগ কমে যায়। এই বিতর্কের বাইরে গিয়ে নিজেদের কৃষ্টি, ঐতিহ্য, সংস্কৃতিকে কানেক্ট করে তারা যদি কিছু একটা করে যেতে পারে তাহলে তাদের একটা সফলতা থাকবে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টারদা সূর্য সেন হল ছাত্রদলের সদস্য সচিব আবিদুর রহমান মিশু বলেন, ‘ডাকসুর গঠনতন্ত্রে যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য রয়েছে সেখানে (ঘ) তে বলা হয়েছে, শিক্ষার্থীদের মাঝে সংস্কৃতির বিকাশ ঘটানোর জন্য ডাকসু হলগুলোতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করবে। বাস্তবে ডাকসুর উদ্যোগে হল পর্যায়ে নাটক, সংগীত, সাহিত্য, চারুকলা, চলচ্চিত্র, লোকসংস্কৃতি এসবের কোনো প্রকার আয়োজন হয়নি। কারণ ডানপন্থি কট্টর একটি গোষ্ঠী এখন ডাকসুর নেতৃত্বে রয়েছে। তারা সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা ও বিকাশে বিশ্বাস রাখবে না এটাই স্বাভাবিক। তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ হচ্ছে বিগত ইন্টেরিম সময়ে বাউলদের ওপর হামলা ও নিপীড়নের সময়টিতে ডাকসুর নীরব ভূমিকা। সাংস্কৃতিক বিকাশ নয়, সাংস্কৃতিক বিভিন্ন এলিমেন্টকে ধ্বংস করাই এই ডাকসু লক্ষ্য হিসেবে বেছে নিয়েছে।’
জাতীয় ছাত্রশক্তি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি ও ২৬-এর ডাকসু নির্বাচনে এজিএস পদপ্রার্থী তাহমিদ আল মুদ্দাসসির চৌধুরী কালবেলাকে বলেন, ‘ডাকসু কর্তৃক একটা কনসার্ট আয়োজন ছাড়া তেমন কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আমার চোখে পড়েনি। নববর্ষ-আনন্দ শোভাযাত্রার মতো জাতীয় সাংস্কৃতিক উৎসবে ডাকসুর তেমন কোনো অংশগ্রহণ পাওয়া যায়নি। টিএসসিভিত্তিক সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর অনেকটিই এখনো লীগের প্রভাব রয়েছে। অনেক সংগঠনের মডারেটর এখনো লীগপন্থি শিক্ষকরাই হচ্ছেন। ডাকসুর কাজ ছিল এই অঙ্গনে সংস্কার আনা। যেহেতু লীগের ফ্যাসিজমের ভিত্তি এই সাংস্কৃতিক অঙ্গন, তাই বিপ্লব-পরবর্তী ডাকসু হিসেবে বিকল্প সাংস্কৃতিক ধারা তৈরি করার প্রয়োজন ছিল যা করতে তারা ব্যর্থ হয়েছে।’
এসব অভিযোগের বিষয়ে মুসাদ্দিক আলী বলেন, ‘ডাকসু আয়োজিত অনেক প্রোগ্রামে টিএসসির সংগঠনগুলোর ছেলেমেয়েরা অংশগ্রহণ করেছে; জয়ধ্বনি সাংস্কৃতিক সংগঠন আমাদের একাধিক প্রোগ্রামে পারফর্ম করেছে।’
তিনি বলেন, ‘উপকমিটি করার কোনো পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি। আমরা প্রায়ই ডজনখানেক কম্পিটিশন আয়োজন করেছি। আমি দায়িত্বে আসার পরে মাজারে-বাউল গানে হামলা এ রকম তেমন কোনো ঘটনা আমার সামনে পড়ে নাই। এর আগে বিভিন্ন মব ভায়োলেন্সের বিরুদ্ধে মিছিল পর্যন্ত করেছে ডাকসু। আমরা দফায় দফায় আগের এবং বর্তমান উপাচার্যকে স্মারকলিপি দিয়েছি, যাতে ভাস্কর্যগুলো সংস্কার হয়। প্রতিবাদ এর আসরে মজুমদার নামে শিল্পকলার এক শিল্পীকে আনা হয়েছিল; স্টুডেন্ট হিসেবে পারফরম্যান্স করেছিল সাইফুল্লাহ।’
ডাকসুর সাবেক জিএস মুশতাক হোসেন বলেন, ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে তাদের যুক্ত করলেই তারা মূলধারার সংস্কৃতিতে ফিরে আসবে। আগে তো তারা শহীদ মিনারে ফুল দিত না, এখন তো দিচ্ছে।’
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ডাকসু এজিএস ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র শিবিরের সভাপতি মুহা. মহিউদ্দিন খান কালবেলাকে বলেন, ‘ডাকসুকে সংস্কৃতিবিরোধী হিসেবে দেখানোর চেষ্টাটাই রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক নয়। ডাকসুর সাহিত্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক বেশ কিছু প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও কাজ করেছে এবং করে যাচ্ছে। তার সাংস্কৃতিক আয়োজনগুলো যথেষ্ট ইনক্লুসিভ ছিল এবং অধিকাংশ আয়োজনই এই অঞ্চলের মানুষের আবহমানকালের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে জড়িত। নবান্ন উৎসব বা শরৎ উৎসবের মতো আয়োজনও যদি রাজনৈতিক বিরোধিতাকারীরা এদেশের সংস্কৃতির অংশ মনে না করতে পারে, তাহলে তাদের উদ্দেশ্য শুধুই রাজনৈতিক তা বলতেই হবে।’