রবিবার, ০২ অগাস্ট ২০২৬, ০৭:৪৭ অপরাহ্ন

নিরুদ্দেশ হওয়ার আগেই ফেরাতে হবে শিক্ষার্থীদের

গওহার নঈম ওয়ারা
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ২ আগস্ট, ২০২৬
  • ৪ বার

আমাদের দেশে স্কুল-কলেজের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া মানেই বিশাল অর্জন। কিন্তু পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর দুটি খবর প্রায় নিয়মিত ফিরে আসে। একটি আত্মহত্যার, অন্যটি নিরুদ্দেশ হওয়ার। আত্মহত্যার ঘটনা আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়। কিন্তু ঘর ছেড়ে চলে যাওয়া শিক্ষার্থীদের নিয়ে আলোচনা খুব কমই হয়। অথচ দুই ঘটনার শিকড় প্রায় একই– ভয়, অপমান, সামাজিক প্রত্যাশার চাপ এবং ব্যর্থতাকে মেনে নিতে না পারার সংস্কৃতি।

কয়েক বছর আগের ঘটনা। ক্লাস এইটের ফলে খুশিতে আটখানা হয়ে বাবুল ঠিক করে, সেদিনই নানাবাড়ি রওনা হবে। পাশের বাড়ির সহপাঠী খোকন শিকদারও রওনা হয় বন্ধুর সঙ্গে। মিরসরাইয়ের করেরহাট থেকে সীতাকুণ্ড গিয়ে দিন কয়েক কাটিয়ে বাবুল যেতে চায় খালার বাড়ি কাপ্তাই। খোকন চলে সঙ্গে সঙ্গে। কয়েক দিন পর বাবুল ফিরে আসে। কিন্তু খোকন আর কোনোদিন ফেরেনি। কেননা, সে ফেল করেছিল। তার ভয়– বাড়ি ফিরলেই মার খাবে। নাইনে উঠতে না পরলে তাকে গ্যারেজে দিয়ে দেবে। আজীবনের জন্য নিখোঁজ হয়ে গেল খোকন। এদিকে সেই বাবুল এখন শরীফ আমিন (ছদ্মনাম)। একটি সংস্থার নির্বাহী পরিচালক। অনেক জেলায় তাঁর কাজ।

মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক, এমনকি ক্লাস ফাইনাল পরীক্ষার ফল প্রকাশের আগে-পরে অনেক শিক্ষার্থী নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। ঘর পালানোর তালিকায় শুধু ছেলে শিক্ষার্থী নয়; মেয়ে শিক্ষার্থীও থাকে।

শরীফ আমিনের সহকর্মী জানালেন, এসএসসি পরীক্ষার পর তাঁর দুই সহপাঠী বান্ধবী বাড়ি ছেড়েছিল বিয়ের চাপ এড়াতে। ঢাকায় গিয়ে গার্মেন্টে চাকরি নেবে। তবে লাকসাম স্টেশনেই নিরুদ্দেশ যাত্রা শেষ হয় দুজনের। পুলিশ তাদের হেফাজতে নিয়ে নেয়। এমন কপাল সবার হয় না। কোনো কোনো শিক্ষার্থী আর নিরুদ্দেশ জীবন থেকে ফিরতেই পারে না। আমরা তাদের শেষ সময়ের কথা জানতেও পারি না।

২০২২ সালে গাজীপুরের যে এসএসসি পরীক্ষার্থীর ফল ও পরীক্ষা-সংক্রান্ত মানসিক চাপের মধ্যে নিখোঁজ হওয়ার সংবাদ প্রকাশিত  হয়েছিল, তাকে আর খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল কিনা আমরা জানি না। চলতি বছর নোয়াখালী (চাটখিল) পরীক্ষা দিতে যাওয়ার পর যে এসএসসি পরীক্ষার্থী নিখোঁজ হয়; তার কোনো খবরও আমরা আর পাইনি। এ বছর মেয়ে শিক্ষার্থীদের নিরুদ্দেশ যাত্রার বেশ কিছু খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে– ক. ঠাকুরগাঁওয়ের চার স্কুলছাত্রী সিলেটে উদ্ধার (জুলাই ২০২৬); খ. সন্দ্বীপের স্কুলছাত্রী কুমিল্লায় উদ্ধার (জুলাই ২০২৬); গ. বকশীগঞ্জের দুই স্কুলছাত্রী ঢাকায় উদ্ধার (জুন ২০২৬)।

নিরুদ্দেশের পথে পা বাড়ানো অনেকেই জীবন্ত উদ্ধার হয় না। যেমন মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইরের ছাত্রী স্কুলের একটি ঘটনায় লোকলজ্জা ও পারিবারিক চাপের ভয়ে বাড়িতে মোবাইল ফোন রেখে নিখোঁজ হয়েছিল। ছয় দিন পর (২১ জুন ২০২৬) জেলার জামির্ত্তা ইউনিয়নের চন্দননগর এলাকার একটি কবরস্থান-সংলগ্ন ঝোপের ভেতর থেকে তার অর্ধগলিত মরদেহ এবং স্কুলব্যাগ উদ্ধার করে পুলিশ।

এসএসসি, এইচএসসি  বা ক্লাস পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর শিক্ষার্থী নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাগুলোর কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যানও নেই। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো, শিক্ষা বোর্ড বা বাংলাদেশ পুলিশ– কোনো সংস্থাই ‘ফল প্রকাশের পর নিখোঁজ শিক্ষার্থী’ নামে পৃথক তথ্য প্রকাশ করে না। তাই  নিশ্চিত করে তাদের সংখ্যা বলা সম্ভব নয় । তবে সংবাদপত্রের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রায় প্রতিবছর পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর বিভিন্ন জেলা থেকে সংবাদ আসে– অকৃতকার্য বা আশানুরূপ ফল না পাওয়া শিক্ষার্থী বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে। আত্মহত্যা বা আত্মহত্যার চেষ্টার ঘটনাও ঘটে। কেউ পালিয়ে গিয়ে বিয়ে-শাদিও করে ফেলে। আবার কেউ কয়েক দিনের মধ্যে উদ্ধার হয়।

ঘটনাগুলো সাধারণত ফল-পরবর্তী কয়েক দিনের মধ্যে ঘটে। ক্ষেত্রবিশেষ শিক্ষার্থী পরে পরিবারের কাছে ফিরে আসে বা উদ্ধার হয়। অধিকাংশ সংবাদ জেলা প্রতিনিধিভিত্তিক হওয়ায় পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থী ফিরে এসেছে কিনা, সেই ফলোআপ প্রকাশিত হয় না। পুলিশ, শিক্ষা বোর্ড বা শিক্ষা মন্ত্রণালয় এ ধরনের ঘটনার আলাদা পরিসংখ্যান প্রকাশ করে না।

এই সংকট প্রতিরোধ সম্ভব আমাদের সচেতনতা দিয়ে। এ জন্য ফল প্রকাশের আগে থেকেই পরিবারকে ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল থাকতে হবে। ফল যা-ই হোক; শিক্ষার্থীকে নিরাপদ পরিবেশে কথা বলার সুযোগ দিতে হবে। কোনো শিক্ষার্থী হঠাৎ নিখোঁজ হলে দ্রুত থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) এবং আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতদের সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত। স্কুল-কলেজে ফল-পরবর্তী কাউন্সেলিং ও মানসিক সহায়তার ব্যবস্থা রাখা জরুরি। এ ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যমেরও দায়িত্ব রয়েছে। ফলকে উৎসব বা বিপর্যয়ের দুই মেরুতে না দাঁড় করিয়ে দ্বিতীয় সুযোগ, বিকল্প শিক্ষা, কারিগরি দক্ষতা এবং ব্যর্থতা অতিক্রম করে সফল হওয়ার গল্প আরও বেশি বেশি তুলে ধরা প্রয়োজন। মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ, একটি পরীক্ষার ফল কোনো শিক্ষার্থীর জীবন, মেধা বা ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে না। অনেক শিক্ষার্থী প্রথমে প্রত্যাশিত ফল না পেলেও পরবর্তী সময়ে শিক্ষা, কর্মজীবন বা অন্য ক্ষেত্রে সফল হয়।

যেদিন একটি শিশু নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করবে– ফল যেমনই হোক, তার জন্য ঘরের দরজা খোলা থাকবে; সেদিন হয়তো ফল প্রকাশের পর নিরুদ্দেশ হওয়ার ঘটনা কমতে শুরু করবে। কারণ একটি শিশু শুধু ফেল করার কারণে ঘর ছাড়ে না। সে ঘর ছাড়ে তখনই, যখন মনে করে, তার জন্য ঘরে আর কোনো জায়গা অবশিষ্ট নেই।

গওহার নঈম ওয়ারা: লেখক, গবেষক

নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2019 bangladeshdailyonline.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com