

যুগ যুগ ধরে নারীদের সাফল্যের পথ কখনই মসৃণ ছিল না। পরিবার, সমাজ এবং কর্মক্ষেত্রে নানামুখী প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে তবেই তাদের নিজেদের জায়গা করে নিতে হয়েছে। যখন প্রশ্ন আসে উদ্যোক্তা হওয়া, টেক বিলিয়নিয়ার হওয়া কিংবা বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় কোনো করপোরেট প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দেওয়ার, তখন নারীদের জন্য চ্যালেঞ্জটা বহুগুণ বেড়ে যায়; কিন্তু পৃথিবীতে এমন অনেক নারী আছেন, যারা সব বাধা, দারিদ্র্য, লিঙ্গবৈষম্য ও প্রত্যাখ্যানকে পেছনে ফেলে পৌঁছে গেছেন সাফল্যের চূড়ান্ত শিখরে। তাদের জীবনের গল্প শুধু নারীদের জন্যই নয়, বরং স্বপ্নবাজ যে কোনো মানুষের জন্যই এক বিশাল অনুপ্রেরণা। শূন্য থেকে শুরু করে নিজ নিজ ক্ষেত্রে শীর্ষ পর্যায়ে পৌঁছানো এমন ১০ অদম্য নারীর গল্প নিয়ে লিখেছেন শামস বিম্বাস
অপরা উইনফ্রে
মিডিয়া মোগল
অপরা উইনফ্রের নাম শোনেননি, এমন মানুষ পৃথিবীতে খুব কমই আছে। কিন্তু তার এই আকাশছোঁয়া সাফল্যের পেছনের গল্পটা ছিল চরম দারিদ্র্য আর মানসিক ও শারীরিক যন্ত্রণায় ভরা। মিসিসিপির এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে এক অবিবাহিত কিশোরী মায়ের গর্ভে জন্ম নেন অপরা। ছোটবেলা কেটেছে চরম অভাব-অনটনের মধ্য দিয়ে। এমনকি কখনও কখনও তাকে আলুর বস্তা দিয়ে বানানো পোশাকও পরতে হয়েছে। শুধু দারিদ্র্যই নয়, মাত্র ৯ বছর বয়স থেকে তিনি তার আত্মীয়দের দ্বারা শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হন। চৌদ্দ বছর বয়সে তিনি গর্ভবতী হয়ে পড়েন, কিন্তু তার সন্তান জন্মের পরপরই মারা যায়। এতসব ভয়ংকর ট্রমা পেরিয়েও অপরা দমে যাননি। তিনি পড়াশোনায় মনোযোগ দেন এবং রেডিওতে কাজ করার সুযোগ পান। পরবর্তীতে তিনি টেলিভিশনে সংবাদ পাঠিকা হিসেবে কাজ শুরু করেন, কিন্তু ‘টেলিভিশনের জন্য উপযুক্ত নন’ এই অজুহাতে তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়। এই প্রত্যাখ্যানই তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তিনি শুরু করেন দিনের বেলার টক শো ‘দ্য অপরা উইনফ্রে শো’, যা ২৫ বছর ধরে সম্প্রচারিত হয়ে ইতিহাস রচনা করে। বর্তমানে তিনি কেবল একজন মিডিয়া মোগলই নন, বরং নিজস্ব টেলিভিশন নেটওয়ার্ক ‘ওন’ (OWN)-এর প্রতিষ্ঠাতাও। তার মোট সম্পদের পরিমাণ আড়াই বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি। জীবনের কঠিনতম সংগ্রামকে শক্তিতে রূপান্তর করে অপরা আজ বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী ও শীর্ষ ধনী নারীদের একজন।
জেকে রাউলিং
বিশ্ববিখ্যাত লেখিকা
বিশ্ববিখ্যাত জাদুকর ‘হ্যারি পটার’-এর স্রষ্টা জেকে রাউলিংয়ের জীবনের গল্পটি যেন তার লেখা উপন্যাসের চেয়েও বেশি জাদুকরী ও অনুপ্রেরণাদায়ক। একটা সময় ছিল যখন তিনি নিজেকে বিশ্বের সবচেয়ে ব্যর্থ মানুষ বলে মনে করতেন। বিবাহবিচ্ছেদের পর একটি ছোট শিশু নিয়ে চরম অর্থকষ্টে দিন কাটছিল তার। সে সময় তার কোনো চাকরি ছিল না, নির্ভর করতে হতো সরকারি সমাজকল্যাণ ভাতার ওপর। চরম হতাশা আর বিষণ্নতা তাকে গ্রাস করেছিল, এমনকি আত্মহত্যার চিন্তাও তার মাথায় এসেছিল।
কিন্তু এই অন্ধকার সময়ে তার একমাত্র বেঁচে থাকার অবলম্বন ছিল লেখালেখি। এডিনবার্গ শহরের বিভিন্ন ক্যাফেতে বসে, মেয়ে জেসিকাকে পাশে ঘুম পাড়িয়ে তিনি হ্যারি পটার সিরিজের প্রথম বইটি লেখেন। কিন্তু সংগ্রাম সেখানেই শেষ হয়নি। বইটি প্রকাশের জন্য তিনি ১২টি প্রকাশনা সংস্থার কাছে যান এবং প্রতিটি জায়গা থেকে নির্দয়ভাবে প্রত্যাখ্যাত হন। অবশেষে ব্লুমসবারি নামের একটি ছোট প্রকাশনা সংস্থা বইটি ছাপাতে রাজি হয়, আর বাকিটা ইতিহাস। হ্যারি পটার সিরিজ শুধু বইয়ের জগতেই নয়, সিনেমা ও মার্চেন্ডাইজিংয়ের জগতেও এক অভূতপূর্ব বিপ্লব নিয়ে আসে। জেকে রাউলিং বিশ্বের প্রথম লেখক হিসেবে শুধু বই লিখে বিলিয়নিয়ার হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। চরম দারিদ্র্য আর হতাশা থেকে উঠে এসে তিনি প্রমাণ করেছেন যে, মেধা আর অধ্যবসায় থাকলে কোনো বাধাই মানুষকে আটকে রাখতে পারে না।
সারাহ ব্লেকলি
প্রতিষ্ঠাতা, স্প্যাংকস
সারাহ ব্লেকলির জীবন প্রমাণ করে যে, প্রত্যাখ্যানই হতে পারে সাফল্যের সবচেয়ে বড় সিঁড়ি। ছোটবেলায় তার স্বপ্ন ছিল আইনজীবী হওয়ার। কিন্তু ল স্কুল অ্যাডমিশন টেস্টে (LSAT) পরপর দুবার অকৃতকার্য হওয়ার পর তার সেই স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। এরপর জীবিকার তাগিদে তিনি ফ্লোরিডার তীব্র গরমে বাড়ি বাড়ি ঘুরে ফ্যাক্স মেশিন বিক্রি করা শুরু করেন। এই চাকরিতে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দেওয়ার মতো অপমান ও প্রত্যাখ্যান সহ্য করতে হতো তাকে। দীর্ঘ সাত বছর তিনি এই অকৃতজ্ঞ কাজ করেছেন। কিন্তু তার মাথার ভেতর সব সময় নতুন কিছু করার তাড়না কাজ করত। একদিন পার্টিতে যাওয়ার সময় নিজের পোশাক ঠিকমতো পরার জন্য তিনি একটি প্যান্টিহোজের পায়ের অংশ কেটে ফেলেন। আর সেখান থেকেই জন্ম নেয় বিশ্ববিখ্যাত আন্ডারগার্মেন্টস ব্র্যান্ড ‘স্প্যাংকস’ (Spanx)-এর আইডিয়া। তার জমানো মাত্র ৫,০০০ ডলার সম্বল করে তিনি শুরু করেন তার সংগ্রাম। দিনের পর দিন বিভিন্ন হোসিয়ারি মিলে ঘুরেছেন, কিন্তু সব পুরুষ মালিক তার এই আইডিয়া নিয়ে হাসাহাসি করে তাকে ফিরিয়ে দিয়েছেন। অবশেষে এক মিল মালিক রাজি হন, কারণ তার কন্যারা আইডিয়াটি পছন্দ করেছিল। টাকা বাঁচানোর জন্য সারাহ নিজের পেটেন্টের খসড়াও নিজেই তৈরি করেছিলেন। কোনো ব্যবসায়িক ডিগ্রি বা আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই, শুধু নিজের মেধা, অধ্যবসায় ও বাড়ি বাড়ি ঘুরে সেলস করার অভিজ্ঞতার জোরে তিনি স্প্যাংকসকে একটি বিলিয়ন ডলারের কোম্পানিতে পরিণত করেন। ২০১২ সালে তিনি বিশ্বের সর্বকনিষ্ঠ সেলফ-মেইড নারী বিলিয়নিয়ার হওয়ার গৌরব অর্জন করেছিলেন।
ঝৌ কুনফেই
প্রতিষ্ঠাতা, লেন্স টেকনোলজি
চীনের এক প্রত্যন্ত দরিদ্র গ্রামে জন্ম নেওয়া ঝৌ কুনফেইয়ের গল্পটি রূপকথাকেও হার মানায়। তার শৈশব ছিল চরম দুঃখ-কষ্টে ঘেরা। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে তিনি তার মাকে হারান এবং তার বাবা ছিলেন আংশিক দৃষ্টিহীন ও দুর্ঘটনায় আঙুল হারানো একজন মানুষ। বেঁচে থাকার তাগিদে ছোটবেলাতেই তাকে শূকর ও হাঁস পালনের মতো কাজ করতে হয়েছে। পরিবারের অভাব মেটাতে মাত্র ১৬ বছর বয়সে স্কুল ছেড়ে দিয়ে তিনি একটি ঘড়ির কাচ তৈরির কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করেন। সেখানে দিনে ১৫-১৬ ঘণ্টা হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে তিনি পেতেন সামান্য কিছু পয়সা। কিন্তু ঝৌ ছিলেন অত্যন্ত উচ্চাকাক্সক্ষী। মাত্র ২২ বছর বয়সে, নিজের জমানো ৩,০০০ ডলার নিয়ে তিনি নিজেই একটি ছোট ঘড়ির কাচ তৈরির কারখানা খোলেন। শুরুটা মোটেও সহজ ছিল না। এমনও সময় এসেছে যখন কাঁচামালের দাম মেটাতে না পেরে তাকে নিজের বাড়ি বিক্রি করে দিতে হয়েছিল, এমনকি চরম হতাশায় তিনি একবার আত্মহত্যার কথাও ভেবেছিলেন। কিন্তু তিনি হাল ছাড়েননি। ২০০০ সালের দিকে যখন মোবাইল ফোনের যুগ শুরু হচ্ছে, তখন তিনি তার জীবনের সবচেয়ে বড় সুযোগটি কাজে লাগান। মটোরোলা এবং পরবর্তীতে অ্যাপলের মতো টেক জায়ান্টদের জন্য টাচস্ক্রিন গ্লাস তৈরির মাধ্যমে তার প্রতিষ্ঠান ‘লেন্স টেকনোলজি’ (Lens Technology) বিশ্ববাজারে একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করে। কারখানার এক সাধারণ শ্রমিক থেকে নিজের পরিশ্রমে তিনি আজ বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ধনী নারী এবং টেক বিলিয়নিয়ার।
ইন্দ্রা নুয়ি
প্রাক্তন সিইও, পেপসিকো
করপোরেট বিশ্বে নারীদের শীর্ষ পদে পৌঁছানোর অন্যতম সফল উদাহরণ হলেন ইন্দ্রা নুয়ি, যিনি পেপসিকোর (PepsiCo) প্রাক্তন সিইও হিসেবে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। ভারতের চেন্নাইয়ের এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া ইন্দ্রার স্বপ্ন ছিল বড় কিছু করার। সেই স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে তিনি আমেরিকার ইয়েল স্কুল অব ম্যানেজমেন্টে ভর্তি হন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে তার শুরুর দিকের জীবন মোটেও সহজ ছিল না।
পড়াশোনার খরচ চালানোর জন্য তাকে রাতের শিফটে একটি ডরমিটরিতে রিসেপশনিস্ট হিসেবে কাজ করতে হতো। এমনও সময় গেছে যখন চাকরির ইন্টারভিউ দেওয়ার জন্য একটি ভালো বিজনেস স্যুট কেনার মতো সামর্থ্য তার ছিল না। বাধ্য হয়ে তিনি শাড়ি পরেই ইন্টারভিউ দিতে গিয়েছিলেন। তবে তার মেধা, কঠোর পরিশ্রম এবং দূরদর্শী চিন্তাভাবনা তাকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করেছিল। ১৯৯৪ সালে তিনি পেপসিকোতে যোগ দেন এবং ধাপে ধাপে নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠানটির সিইও পদে আসীন হন। তার নেতৃত্বে পেপসিকো শুধু আর্থিকভাবেই লাভবান হয়নি, বরং স্বাস্থ্যকর খাবার ও পানীয়ের দিকেও জোর দেয়। তিনি ১২ বছর এই বিশাল বহুজাতিক কোম্পানির নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং বারবার ফোর্বসের বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর নারীদের তালিকায় নিজের জায়গা করে নিয়েছেন। একজন সাধারণ অভিবাসী নারী হয়ে আমেরিকার অন্যতম শীর্ষ কোম্পানির প্রধান হওয়াটা এক অকল্পনীয় সংগ্রাম এবং আত্মবিশ্বাসের ফসল।
মেরি বারা
সিইও, জেনারেল মোটরস
অটোমোবাইল বা ভারী গাড়ি নির্মাণের মতো একটি সম্পূর্ণ পুরুষতান্ত্রিক শিল্পে একজন নারীর শীর্ষ পদে পৌঁছানোর ঘটনা ইতিহাসে বিরল। আর এই অসাধ্য সাধন করেছেন মেরি বারা, যিনি বর্তমানে বিখ্যাত মার্কিন গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান জেনারেল মোটরস-এর (GM) সিইও। মেরির রক্তেই যেন মিশে ছিল গাড়ি। তার বাবা ৩৯ বছর ধরে জেনারেল মোটরসের একটি কারখানায় ডাই-মেকার হিসেবে কাজ করেছেন। মেরি মাত্র ১৮ বছর বয়সে কলেজে পড়ার খরচ জোগাতে ওই একই কারখানায় একজন ‘কো-অপ্ট স্টুডেন্ট’ বা শিক্ষানবিশ হিসেবে যোগ দেন। তার কাজ ছিল কারখানার ফেন্ডার প্যানেলগুলো পরীক্ষা করা। সেই সাধারণ শিক্ষানবিশ থেকে শুরু করে দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি কোম্পানির মানবসম্পদ, সাপ্লাই চেইন এবং গ্লোবাল প্রোডাক্ট ডেভেলপমেন্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিভাগগুলো অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করেন। নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করে অবশেষে ২০১৪ সালে তিনি জেনারেল মোটরসের সিইও হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং বিশ্বের প্রথম নারী হিসেবে কোনো প্রধান গ্লোবাল অটোমেকারের নেতৃত্ব দেওয়ার ইতিহাস গড়েন। সিইও হওয়ার মাত্র কয়েক মাসের মাথায় কোম্পানিটি ইগনিশন সুইচের এক ভয়ংকর ত্রুটির কারণে বিশাল সংকটে পড়ে এবং শত শত মামলার সম্মুখীন হয়। কিন্তু মেরি অত্যন্ত সাহসিকতা, সততা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে এই সংকট মোকাবিলা করেন। বর্তমানে তার নেতৃত্বেই জেনারেল মোটরস বৈদ্যুতিক গাড়ি (EV) নির্মাণের দিকে যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। কারখানার ফ্লোর থেকে শুরু করে বোর্ডরুমের শীর্ষে পৌঁছানোর এই যাত্রা তার অসীম অধ্যবসায়ের প্রমাণ।
হুইটনি উলফ হার্ড
প্রতিষ্ঠাতা, বাম্বল
হুইটনি উলফ হার্ডের গল্পটি হলো চরম বিষাক্ত পরিবেশ এবং ভয়ংকর ট্রমা থেকে উঠে এসে নিজের সাম্রাজ্য গড়ার গল্প। ‘টিন্ডার’ (Tinder) নামক জনপ্রিয় ডেটিং অ্যাপের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তিনি। কিন্তু সেখানে তিনি চরম লিঙ্গবৈষম্য এবং যৌন হয়রানির শিকার হন। ২০১৪ সালে বাধ্য হয়ে তিনি কোম্পানি ছাড়েন এবং টিন্ডারের বিরুদ্ধে মামলা করেন। এই ঘটনার পর তাকে অনলাইনে তীব্র সাইবার বুলিং, কদর্য আক্রমণ এবং এমনকি হত্যার হুমকিও দেওয়া হয়। মাত্র ২৪ বছর বয়সে হুইটনি চরম বিষণ্নতায় ভুগেছিলেন; তার মনে হয়েছিল ক্যারিয়ার হয়তো এখানেই শেষ।
কিন্তু সেই অন্ধকার গহ্বর থেকে তিনি নিজেকে টেনে তোলেন অবিশ্বাস্য শক্তিতে। তিনি ঠিক করেন এমন একটি প্ল্যাটফর্ম বানাবেন, যেখানে নারীরা সুরক্ষিত থাকবে এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নারীদের হাতেই থাকবে। এই জেদ থেকেই জন্ম নেয় ‘বাম্বল’ (Bumble)—এমন এক ডেটিং অ্যাপ যেখানে কেবল নারীরাই প্রথম কথোপকথন শুরু করতে পারে। তার এই অভিনব আইডিয়া নারীদের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায় এবং সমাজতাত্ত্বিক পরিবর্তন নিয়ে আসে। সমস্ত সমালোচনা আর অপবাদকে পেছনে ফেলে হুইটনি তার কোম্পানিকে সফলতার চূড়ায় নিয়ে যান। ২০২১ সালে বাম্বলকে স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত করে, তখন মাত্র ৩১ বছর বয়সে করে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ নারী হিসেবে কোনো প্রতিষ্ঠানকে জনসমক্ষে (Public) নিয়ে আসার রেকর্ড গড়েন। মাত্র ৩১ বছর বয়সে হুইটনি বিশ্বের সর্বকনিষ্ঠ সেল্ফ-মেইড নারী বিলিয়নিয়ারে পরিণত হন। প্রত্যাখ্যান ও হয়রানির জবাব তিনি দিয়েছেন নিজের অভূতপূর্ব সাফল্য দিয়ে।
ফাল্গুনী নায়ার
প্রতিষ্ঠাতা, নাইকা
বয়স যে সাফল্যের পথে কোনো বাধাই নয়, তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলেন ফাল্গুনী নায়ার। ভারতের বিখ্যাত ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক কোটাক মাহিন্দ্রায় প্রায় দুই দশক ধরে অত্যন্ত সফলভাবে কাজ করেছেন তিনি। ব্যাংকটির ম্যানেজিং ডিরেক্টর হিসেবে তার জীবন ছিল সম্পূর্ণ সুরক্ষিত, বিলাসবহুল ও স্বাচ্ছন্দ্যময়। কিন্তু ৫০ বছর বয়সে পৌঁছে, যখন অধিকাংশ মানুষ নিরাপদ অবসরের পরিকল্পনা করে, তখন ফাল্গুনী সিদ্ধান্ত নেন নিজের ভেতরের উদ্যোক্তাকে জাগিয়ে তোলার। নিশ্চিত আয়ের চাকরি ছেড়ে দিয়ে তিনি সম্পূর্ণ নতুন এক খাতে পা রাখেন, যার কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা তার ছিল না।
২০১২ সালে তিনি প্রসাধনসামগ্রী ও বিউটি প্রোডাক্টের ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম ‘নাইকা’ (Nykaa) প্রতিষ্ঠা করেন। শুরুতে অনেকেই তার এই সিদ্ধান্তকে ‘পাগলামি’ বলে আখ্যা দিয়েছিল। কারণ তখন ভারতের বাজারে অনলাইন বিউটি প্রোডাক্ট কেনার কোনো চল ছিল না এবং প্রযুক্তিভিত্তিক ব্যবসায়ের জন্য তার বয়সটিকেও অনেকে নেতিবাচক চোখে দেখেছিল। কিন্তু ফাল্গুনী জানতেন তিনি কী করছেন। তিনি শুধু প্রোডাক্ট বিক্রি করেননি, বরং কাস্টমারদের বিশ্বাস অর্জন করেছিলেন। তার দূরদর্শী নেতৃত্ব ও নিখুঁত ব্যবসায়িক কৌশলের কারণে নাইকা ভারতের বাজারে এক বিশাল বিপ্লব নিয়ে আসে। ২০২১ সালে কোম্পানিটি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হলে এটি বিশাল সাফল্য লাভ করে। আর সেই সঙ্গে ফাল্গুনী নায়ার হয়ে ওঠেন ভারতের অন্যতম শীর্ষ ধনী সেলফ-মেইড নারী বিলিয়নিয়ার। তার গল্প আমাদের শেখায়Ñ নতুন কোনো স্বপ্ন দেখার বা শুরু করার জন্য কোনো বয়সই খুব বেশি দেরি নয়।
কিরণ মজুমদার-শ
প্রতিষ্ঠাতা, বায়োকন
ভারতের বায়োটেকনোলজি শিল্পের পথপ্রদর্শক কিরণ মজুমদার-শ’র উদ্যোক্তা হওয়ার গল্পটি প্রবল সামাজিক বাধা ও লিঙ্গবৈষম্য পেরিয়ে সাফল্যের চূড়ায় ওঠার এক অনন্য কাহিনি। ১৯৭০-এর দশকে তিনি যখন অস্ট্রেলিয়া থেকে মাস্টার ব্রুয়ার (মদ প্রস্তুতকারক) হিসেবে পড়াশোনা শেষ করে ভারতে ফেরেন, তখন তিনি ভেবেছিলেন সহজেই নিজের যোগ্যতার মাপকাঠিতে কাজ পেয়ে যাবেন। কিন্তু তাকে বারবার প্রত্যাখ্যান করা হয়, কারণ সে সময় এই পেশায় নারীদের কাজ করাকে সমাজ মেনে নিতে প্রস্তুত ছিল না।
হতাশ না হয়ে তিনি মাত্র ১০ হাজার রুপি মূলধন নিয়ে ১৯৭৮ সালে বেঙ্গালুরুর একটি ভাড়া বাড়ির গ্যারেজে ‘বায়োকন’ (Biocon) প্রতিষ্ঠা করেন। শুরুতে তার সংগ্রাম ছিল বর্ণনাতীত। একজন নারী হওয়ায় কোনো ব্যাংক তাকে ঋণ দিতে চাইত না। এমনকি কোনো যোগ্য কর্মী তার অধীনে কাজ করতেও রাজি ছিলেন না। কিন্তু কিরণ হাল ছাড়েননি। তিনি এনজাইম তৈরি করে বিদেশে রপ্তানি শুরু করেন এবং ধীরে ধীরে বায়োকনকে একটি বহুজাতিক বায়োফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিতে রূপান্তর করেন। আজ বায়োকন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ইনসুলিন প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান এবং ক্যানসারের মতো জটিল রোগের সাশ্রয়ী মূল্যের ওষুধ তৈরি করছে। কিরণ মজুমদার-শ আজ ভারতের অন্যতম শীর্ষ ধনী সেলফ-মেইড নারী বিলিয়নিয়ার। নারী হয়ে জন্মানোর কারণে যে সমাজ তাকে একদিন প্রত্যাখ্যান করেছিল, সেই সমাজই আজ তাকে অনুসরণ করে।
উরসুলা বার্নস
প্রাক্তন সিইও, জেরক্স
উরসুলা বার্নসের গল্পটি আমেরিকার স্বপ্ন বা ‘আমেরিকান ড্রিম’-এর এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। নিউইয়র্কের ম্যানহাটানের এক নিম্ন আয়ের হাউজিং প্রজেক্টে (বস্তিসদৃশ এলাকা) তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা। তাকে বড় করেছেন তার মা, যিনি সন্তানদের পড়াশোনার খরচ জোগাতে দিনরাত অন্যের কাপড় ইস্ত্রি করার কাজ করতেন। মা তাকে সব সময় বলতেন, ‘তুমি কোথায় জন্মেছ সেটা তোমার পরিচয় নয়, তুমি কী হতে চাও সেটাই তোমার আসল পরিচয়।’
মায়ের এ কথা উরসুলার জীবনে মন্ত্রের মতো কাজ করেছে। চরম দারিদ্র্যের বাধা পেরিয়ে তিনি মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে মাস্টার ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৮০ সালে তিনি জেরক্স (Xerox) করপোরেশনে একজন সাধারণ সামার ইন্টার্ন হিসেবে যোগ দেন। নিজের মেধা, জটিল সমস্যা সমাধানের দক্ষতা এবং অকপট স্বভাবের কারণে তিনি ধীরে ধীরে কোম্পানির শীর্ষ পর্যায়ে পৌঁছতে শুরু করেন। ২০০৯ সালে তিনি জেরক্সের সিইও হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর মাধ্যমে তিনি ইতিহাস রচনা করেন, কারণ তিনিই প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী যিনি ফরচুন ৫০০ (Fortune 500) ভুক্ত কোনো বিশাল মার্কিন করপোরেশনের সিইও পদে আসীন হন। বস্তির জীবন থেকে উঠে এসে গ্লোবাল টেকনোলজি কোম্পানির নেতৃত্ব দেওয়া উরসুলা প্রমাণ করেছেন যে, কঠোর পরিশ্রম ও শিক্ষার মাধ্যমে যেকোনো পটভূমি থেকে এসেও বিশ্বের শীর্ষ পর্যায়ে পৌঁছানো সম্ভব।