

একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বরাজনীতিতে একক পরাশক্তির আধিপত্যের অবসান ঘটিয়ে বহুমুখী ক্ষমতা-বলয়ের উদয় হচ্ছে। এই নাটকীয় মেরূকরণের সবচেয়ে বড় এবং সাম্প্রতিকতম উদাহরণ হলো ২০২৬ সালের ৭ আগস্ট ইসলামের পবিত্রতম নগরী মক্কায় স্বাক্ষরিত যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি, যা আন্তর্জাতিক মহলে ‘মক্কা চুক্তি’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। সৌদি আরব, তুরস্ক এবং পাকিস্তান এই তিন প্রভাবশালী মুসলিম দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত সামরিক দলিলটি রাতারাতি বিশ্বরাজনীতির চেনা সমীকরণগুলোকে ওলটপালট করে দিয়েছে। এই চুক্তির মূল ভিত্তি গড়ে উঠেছে ন্যাটোর ৫ নম্বর অনুচ্ছেদের আদলে, যেখানে বলা হয়েছে, সদস্যদেশগুলোর যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা সবার ওপর হামলা হিসেবে গণ্য হবে। আপাতদৃষ্টিতে একে মুসলিম বিশ্বের একটি শক্তিশালী আত্মরক্ষামূলক অক্ষ মনে হলেও, এর গভীরে লুকিয়ে আছে এক জটিল ভূ-রাজনৈতিক দাবার চাল, যা দক্ষিণ এশিয়া, বিশেষ করে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং সামরিক মর্যাদাকে ঝুঁকির মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
এই জোটের মূল কাঠামোগত শক্তির দিকে তাকালে দেখা যায়, এর তিন অংশীদারের সামরিক ও অর্থনৈতিক পরিপূরকতা অত্যন্ত সুসংহত। সৌদি আরব যেখানে এই জোটের মূল অর্থায়নকারী হিসেবে তার বিশাল সার্বভৌম তহবিল ও জ্বালানি শক্তিকে কাজে লাগাচ্ছে, সেখানে তুরস্ক সরবরাহ করছে বায়রাকতার ড্রোনের মতো অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি। অন্যদিকে, অর্থনৈতিকভাবে ভঙ্গুর হলেও পাকিস্তান এই জোটে অবদান রাখছে তার সুপ্রশিক্ষিত সেনাবাহিনী এবং পারমাণবিক শক্তির মনস্তাত্ত্বিক ছাতা দিয়ে। যদিও মিসরের মতো বৃহৎ সামরিক শক্তিকে এই জোটে টানার চেষ্টা করা হয়েছিল, কিন্তু কায়রোর নীতিনির্ধারকরা ভারতের সঙ্গে তাদের গভীর বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং মধ্যপ্রাচ্যের প্রক্সি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি এড়াতে আপাতত এই জোট থেকে দূরত্ব বজায় রাখছেন। এই চুক্তির মূল উদ্দেশ্য হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং ইসরায়েলের আগ্রাসী নীতিকে প্রতিহত করার কথা বলা হলেও, পর্দার আড়ালের সমীকরণগুলো আরও অনেক বেশি বিস্তৃত এবং বিপজ্জনক। এই চুক্তির সবচেয়ে বড় মনস্তাত্ত্বিক ও সামরিক ফাঁদটি তৈরি হয়েছে এর সম্মিলিত প্রতিরক্ষার ধারার কারণে, যা দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে একটি বিপজ্জনক চেইন রিঅ্যাকশন বা ‘ডমিনো ইফেক্ট’ তৈরি করতে পারে। দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক শত্রুতার জেরে যদি ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে কোনো সামরিক সংঘাত বা যুদ্ধ বাধে, তবে এই চুক্তি অনুযায়ী তুরস্ক ও সৌদি আরব পাকিস্তানের পক্ষে ভারতের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে বাধ্য। ন্যাটোর অন্যতম প্রধান সদস্য তুরস্ক যখন পাকিস্তানের হয়ে এই যুদ্ধে জড়াবে, তখন এক নজিরবিহীন আন্তর্জাতিক সংকট তৈরি হবে। যুদ্ধের তীব্রতায় যদি ভারতের কোনো পাল্টা আঘাত তুরস্কের মূল ভূখণ্ডে এসে পড়ে, তবে আঙ্কারা ন্যাটোর যৌথ নিরাপত্তা চুক্তির সহায়তা চাইবে।
ন্যাটো যদি তখন তুরস্ককে রক্ষা করতে অস্বীকৃতি জানায়, তবে এই ঐতিহাসিক জোটটি তার বিশ্বাসযোগ্যতা হারাবে, যা বিশ্বব্যাপী আরও ছোট ছোট আঞ্চলিক এবং দ্বিপাক্ষিক সামরিক জোটের জন্ম দেবে। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে রাশিয়ার ব্যাপারে ভারতের নিরপেক্ষ থাকার নীতিতে ক্ষুব্ধ হয়ে আমেরিকা সুকৌশলে এই মক্কা অক্ষকে ভারতের ওপর একটি কৌশলগত চাপ বা ‘জিওপলিটিক্যাল লিভারেজ’ হিসেবে ব্যবহার করছে, যা বিশ্বব্যবস্থাকে এক চরম বিশৃঙ্খলার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিদ্যমান বিশ্বসংকটের মধ্যে বাংলাদেশের মতো একটি ভৌগোলিকভাবে সংবেদনশীল দেশের জন্য এই চুক্তির অংশীদার হওয়ার বিষয়টি গভীর ভাবনার। বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের একটি অংশ এই চুক্তির ফ্রেমওয়ার্কে যোগ দেওয়ার ব্যাপারে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি দেখাচ্ছেন, যা দেশের কৌশলগত অবস্থানকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। বাংলাদেশের তিন দিকের সীমান্তেই ভারতের অবস্থান। ঢাকা যদি মক্কা চুক্তির সামরিক বলয়ে প্রবেশ করে, তবে নয়াদিল্লি একে তাদের পূর্ব সীমান্তে একটি সরাসরি অস্তিত্বের হুমকি হিসেবে দেখবে। এর ফলে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের অবনতি ঘটতে পারে। ভারত নিরাপত্তার অজুহাতে শিলিগুড়ি করিডরে সামরিক সমাবেশ বাড়াতে পারে, সীমান্ত বাণিজ্য সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিতে পারে এবং নেপাল বা ভুটানের সঙ্গে বাংলাদেশের যে ট্রানজিট সুবিধা রয়েছে, তা চিরতরে বাতিল করে দিতে পারে।
এই সামরিক জোটের অংশ হলে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর দীর্ঘ চার দশক ধরে অর্জিত আন্তর্জাতিক মানমর্যাদা ও গৌরব চরমভাবে ক্ষুন্ন হবে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীতে সবচেয়ে বেশি সেনা পাঠিয়ে এবং সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে বিশ্বশান্তি রক্ষা করে ব্যাপক সুনাম কুড়িয়েছে। বাংলাদেশ যদি মক্কা চুক্তির মতো কোনো আঞ্চলিক বা রাজতান্ত্রিক নিরাপত্তা জোটে সরাসরি সেনা পাঠায়, তবে শান্তিরক্ষী হিসেবে আমাদের যে নিরপেক্ষ ভাবমূর্তি রয়েছে, তা ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। পাকিস্তান চরম অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে মূলত সৌদির নগদ আর্থিক সহায়তার বিনিময়ে তাদের দেশের ফ্রন্টলাইন সেনা সৌদিতে মোতায়েন করেছে, যাকে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা ভাড়াটে সামরিক কূটনীতি হিসেবে দেখেন। বাংলাদেশ যদি এই ফাঁদে পা দেয়, তবে আমাদের গৌরবময় সেনাবাহিনীকেও বিশ্বের দরবারে সমস্যায় পড়তে হতে পারে, যা হবে চরম অবমাননাকর। তাছাড়া, এই জোট যদি কোনো সময় সৌদি আরবের স্বার্থে ইরানের বিরুদ্ধে কিংবা তুরস্কের স্বার্থে ইসরায়েল বা আমেরিকাবিরোধী কোনো সরাসরি ব্লকে পরিণত হয়, তবে আমেরিকা ও পশ্চিমা বিশ্ব বাংলাদেশের ওপর সরাসরি অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে, যা আমাদের দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিকে হুমকিতে ফেলবে।
বাংলাদেশের মতো একটি উদীয়মান ও বাণিজ্য-নির্ভর অর্থনীতির জন্য এই জোটের কঠোর সামরিক বাধ্যবাধকতা থেকে দূরে থাকাই শ্রেয় বলে মনে করি। আমাদের রাজনীতিবিদ এবং নীতিনির্ধারকদের বুঝতে হবে, তৈরি পোশাকের পশ্চিমা বাজার এবং প্রতিবেশীদের সঙ্গে শান্তিময় সম্পর্ক হারালে দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা কঠিন প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। স্বাধীনতা ও মেহনতি মানুষের রক্তে কেনা সার্বভৌমত্বকে কোনো সুদূরপ্রসারী ঝুঁকিতে না ফেলে, সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ এবং অদৃশ্য থেকে নিজের অর্থনৈতিক লাইফলাইনগুলো সুরক্ষিত রাখাই হবে বিশ্বব্যবস্থার এই ওলটপালট পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের টিকে থাকার মূল চাবিকাঠি।
লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক ও কলাম লেখক