

ফৌজদারি মামলায় গ্রেপ্তার ও সাময়িক বরখাস্ত হওয়ার প্রায় ১৫ বছর পর চাকরিতে পুনর্বহাল হয়েছেন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) উপপরিচালক এমএম শাব্বির হাসান। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে আদালতে বেকসুর খালাস পাওয়ার পর তার বিরুদ্ধে করা বিভাগীয় মামলার অভিযোগ থেকেও অব্যাহতি দিয়েছে কমিশন। একই সঙ্গে চাকরিতে পুনর্বহালের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পৃথক আরেকটি মামলায় আদালতে খালাস পাওয়ার পর দুদকের ডাটা এন্ট্রি/কন্ট্রোল অপারেটর মো. আবু ইউসুফ শাহকেও চাকরিতে পুনর্বহাল করা হয়েছে।
গত ১৬ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত দুদকের এক কমিশন সভায় এ দুই কর্মীকে পুনর্বহালের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কমিশনের এ সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে গত বুধবার এ সংক্রান্ত পৃথক অফিস আদেশ ও প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। দুদক চেয়ারম্যান বিচারপতি একেএম আসাদুজ্জামান আদেশ দুটিতে স্বাক্ষর করেন।
দুদকের আদেশ অনুযায়ী, ২০১১ সালের ২৪ জানুয়ারি চট্টগ্রামের ডবলমুরিং মডেল থানায় করা একটি মামলায় র্যাব গ্রেপ্তার করে দুদকের চট্টগ্রাম-১ সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের তৎকালীন উপপরিচালক এমএম শাব্বির হাসানকে। আদালতের নির্দেশে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। গ্রেপ্তারের দুই দিন পর ওই বছরের ২৬ জানুয়ারি তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। একই বছর তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলাও করা হয়।
ওই বিভাগীয় মামলায় ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত কমিশন সভায় শাব্বির হাসানকে চাকরি থেকে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে তার বিরুদ্ধে করা ফৌজদারি মামলার বিচার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত এ শাস্তি কার্যকর স্থগিত রাখা হয়। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে চট্টগ্রামের বিভাগীয় বিশেষ আদালত ২০২৬ সালের ২১ মে তাকে বেকসুর খালাস দেন।
আদালতের এ রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল না করার সিদ্ধান্ত নেয় দুদক। পরবর্তী সময়ে আদালতের রায়, আপিল না করার সিদ্ধান্ত এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনা করে গত ১৬ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত কমিশন সভায় শাব্বির হাসানের বিরুদ্ধে চলমান বিভাগীয় মামলার অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। একই সঙ্গে তার সাময়িক বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করে চাকরিতে পুনর্বহালের নির্দেশ দেওয়া হয়।
অন্যদিকে, দুদকের প্রধান কার্যালয়ে ডাটা এন্ট্রি/কন্ট্রোল অপারেটর হিসেবে কর্মরত মো. আবু ইউসুফ শাহকেও ফৌজদারি মামলায় খালাসের পর চাকরিতে পুনর্বহাল করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে গাইবান্ধা সিদ্দিকিয়া দ্বিমুখী সিনিয়র মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষকে ভয়ভীতি দেখিয়ে একটি অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পেতে সহায়তার কথা বলে অর্থ দাবির অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় ২০০৯ সালে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তবে ফৌজদারি মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বিভাগীয় শাস্তি কার্যকর স্থগিত রাখা হয়।
এ ঘটনায় গাইবান্ধা থানায় করা মামলায় ২০১০ সালে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। পরে ২০১৬ সালের ৩০ আগস্ট রংপুরের বিশেষ জজ আদালত দণ্ডবিধির ১৬১ ধারায় আবু ইউসুফ শাহকে দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ১০ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও ছয় মাসের কারাদণ্ড দেন। একই সঙ্গে দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫ (২) ধারায় তাকে চার বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ওই রায়ের পর তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করে দুদক।
তবে ওই রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করেন আবু ইউসুফ শাহ। ২০১৯ সালের ৯ মে হাইকোর্ট তার আপিল মঞ্জুর করে তাকে খালাস দেন। এ রায়ের বিরুদ্ধে একই বছর সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগে ক্রিমিনাল পিটিশন করে দুদক। ২০২৪ সালের ২৬ নভেম্বর আপিল বিভাগ কমিশনের করা পিটিশন খারিজ করে দেন।
এর পর আদালতের রায় ও দুদকের আইন অনুবিভাগের মতামত পর্যালোচনা করে আবু ইউসুফ শাহর বিরুদ্ধে নেওয়া বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার, বিভাগীয় মামলার অভিযোগ থেকে অব্যাহতি এবং তাকে চাকরিতে পুনর্বহালের সিদ্ধান্ত নেয় কমিশন।
দুদকের পৃথক আদেশে বলা হয়েছে, দুই কর্মকর্তার বরখাস্ত বা সাময়িক বরখাস্তের সময়কাল তাদের কর্মকাল হিসেবে গণ্য হবে। আদেশ জারির তারিখ থেকে পুনর্বহালের সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে। দুদকের প্রশাসন ও মানবসম্পদ বিভাগ থেকে জারি করা আদেশে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পাশাপাশি কমিশনের বিভিন্ন বিভাগ ও দপ্তরকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।