

অ্যামাজনের গভীর সবুজের মাঝে বয়ে আসা বাতাসে যেন এক অদৃশ্য টান রয়েছে; পৃথিবী নিজেই যেন শ্বাসরুদ্ধ হয়ে অপেক্ষা করছে, নেতারা কী সিদ্ধান্ত নেবেন! ব্রাজিলের বেলেম শহর এখন সেই অপেক্ষার মাঠে পরিণত হয়েছে যেখানে প্রতিটি সকাল উদ্বেগে শুরু হয় আর প্রতিটি রাত শেষ হয় অনিশ্চয়তায়। কপ-৩০-এর পঞ্চম দিনের আলোচনা সেই অনিশ্চয়তাকে আরও ঘনীভূত করেছে। যেন সবাই জানে পৃথিবী সংকটে, কিন্তু সমাধান কে আনবে- সে উত্তর খুঁজতে সবাই একে অন্যের দিকে তাকিয়ে আছে।
এমনই এক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের নাম বারবার উচ্চারিত হয়েছে বেলেমের মঞ্চে। সাগরপাড়ের ছোট্ট দেশ বাংলাদেশÑ যে প্রতিদিন সমুদ্রের ঢেউয়ের সঙ্গে লড়াই করে, লবণাক্ততার কষ্ট সহ্য করে এবং ঘূর্ণিঝড়ের আঘাত থেকে বাঁচার জন্য নতুন নিয়ম তৈরি করছে- তা বিশ্বে একটি উদাহরণ হয়ে উঠেছে। কপ-৩০-এর আলোচনায় উঠে এসেছে, বাংলাদেশ কি শুধু ঝুঁকির দেশ, নাকি টিকে থাকার লড়াইয়ের সবচেয়ে শক্তিশালী উদাহরণ? জলবায়ু অর্থায়ন, অভিযোজন সহায়তা ও ক্ষয়ক্ষতির তহবিল বিষয়ে বহু প্রতিনিধিই বলেছেন, বাংলাদেশের চেয়ে বেশি বাস্তব অভিজ্ঞতা কার আছে?
বেলেমের আলোচনা প্রতিদিনই গভীর হচ্ছে। আদিবাসী জনগণের অধিকার, তথ্য বিভ্রান্তি ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াই, স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় নতুন হেলথ অ্যাকশন প্ল্যান এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বন্ধ করতে বিশ্ব কতটা সাহস দেখাতে পারবেÑ এসবই ছিল আলোচনার বিষয়। যেন বেলেম শুধুই একটি সম্মেলনের স্থান নয়, পৃথিবীর ভবিষ্যতের রায় লেখার আদালত হয়ে উঠেছে।
জলবায়ু সম্মেলনের পঞ্চম দিনে বৈশ্বিক জ্বালানি রূপান্তর, সবুজ শিল্পায়ন এবং প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়েছে। টেকসই ভবিষ্যতের দিকে এগোতে শক্তি, শিল্প ও আর্থিক খাতের সমন্বিত ভূমিকা অপরিহার্য- সেটিই বারবার উঠে এসেছে মন্ত্রিপর্যায়ের আলোচনায়।
দিনের শুরুতেই অনুষ্ঠিত হয় বেলেম ফোরএক্স পলেজ বাস্তবায়নবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের গোলটেবিল বৈঠক। টেকসই জ্বালানি ব্যবহারে ২০৩৫ সালের মধ্যে চার গুণ বৃদ্ধি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এই পলেজ গ্রহণ করা হয়েছে। বৈঠকে জ্বালানি নির্ভর গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ব্যবহার বাড়াতে বাস্তবমুখী পদক্ষেপ উপস্থাপন করেন বিভিন্ন দেশের মন্ত্রী ও আন্তর্জাতিক অংশীদাররা। এখানেই উদ্বোধন করা হয় ক্লিন এনার্জি মিনিস্টেরিয়াল ফিউচার ফুয়েলস অ্যাকশন প্ল্যান- যা ভবিষ্যতে টেকসই জ্বালানি উৎপাদন ও ব্যবহার সম্প্রসারণের প্রধান প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করবে। এ সময়ই প্রকাশিত হয় বেলেম ডিক্লারেশন অন গ্লোবাল গ্রিন ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন, যেখানে বিশেষ করে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোতে সবুজ শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করার বহুপাক্ষিক পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়।
বিশ্বের প্রধান অর্থনীতির প্রতিনিধিরা বলেন, সবুজ প্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কম কার্বন শিল্প রূপান্তর এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে জলবায়ু ও উন্নয়ন লক্ষ্যের অগ্রগতি একই সঙ্গে সম্ভব। পরে জীবাশ্ম জ¦ালানি থেকে সরে আসার নতুন পথ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের সভায় গ্লোবাল স্টকটেকের নির্দেশনা অনুযায়ী উচ্চাকাক্সক্ষা থেকে বাস্তবায়নের দিকে যাওয়ার সুনির্দিষ্ট কৌশল নিয়ে আলোচনা করা হয়। বিভিন্ন দেশ জাতীয় কর্মপরিকল্পনা উপস্থাপন করে জানায়, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে তারা কীভাবে নীতি, প্রযুক্তি ও আর্থিক কাঠামো সমন্বয় করছে।
নৌপরিবহন খাতে জ্বালানি রূপান্তরও দিনটির আলোচনায় ছিল গুরুত্বপূর্ণ। শিপিং খাতে জ্বালানির ভবিষ্যৎ শীর্ষক সেশনে বিভিন্ন দেশ ও বৈশ্বিক মেরিটাইম শিল্প আগামী ১২ মাসে কী ধরনের পদক্ষেপ নেবে তা তুলে ধরে। এখানে বলা হয়, আইএমও সদস্য দেশগুলো শিগগিরই বৈশ্বিক নিয়ন্ত্রক কাঠামো নিয়ে বৈঠকে বসবে, যেখানে টেকসই জ্বালানি ব্যবহারের প্রণোদনা, কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং ঝুঁকিপূর্ণ দেশের সহায়তা সবই আলোচনায় আসবে।
দিনের শেষভাগে অনুষ্ঠিত গ্রিড ও স্টোরেজে দ্রুত অগ্রগতি শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের সেশনে বিদ্যুৎ গ্রিড সম্প্রসারণ, শক্তি সঞ্চয় ব্যবস্থা, বিদ্যুতায়ন এবং জ্বালানি প্রবেশাধিকার নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আসে। এ সময় উদ্বোধন করা হয় গ্লোবাল গ্রিডস অ্যান্ড স্টোরেজ ইমপ্লিমেন্টেশন কো-অর্ডিনেটিং কাউন্সিল, প্রকাশ করা হয় গ্লোবাল এনার্জি স্টোরেজ অ্যান্ড গ্রিডস পলেজের অগ্রগতি, উপস্থাপন করা হয় ইনভেস্টেবল পাইপলাইন্স ফ্রেমওয়ার্ক, যা জাতীয় জ্বালানি লক্ষ্যকে বিনিয়োগযোগ্য প্রকল্পে রূপান্তরে সহায়তা করবে।
বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা পরিষ্কারভাবে বলেছেন, অভিযোজন অর্থায়ন দ্রুত এবং কার্যকরভাবে শুরু হওয়া দরকার। বিশেষত অভিযোজনের জন্য বাংলাদেশের যে তহবিলের প্রয়োজন তা সরাসরি প্রবাহিত হওয়া জরুরি, যাতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমানো সম্ভব হয়। বাংলাদেশের জন্য কপ-৩০ একটি বিশেষ মুহূর্ত, কারণ বাংলাদেশ প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। স্লাইডিং উপকূল, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন যেন বাংলাদেশের প্রতিদিনের জীবনযাত্রার অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে এসবের মোকাবিলা করতে গিয়ে প্রয়োজন দ্রুত ও কার্যকর অর্থায়ন এবং সহায়তা।
সেশনগুলোর মধ্যে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে বেলেম হেলথ অ্যাকশন প্লান ঘোষণা, যা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়া দেশগুলোর জন্য একটি নতুন রূপরেখা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ একাধিক অংশগ্রহণকারী দেশ এই উদ্যোগে সমর্থন জানিয়েছে, যা দুর্যোগ প্রতিরোধী স্বাস্থ্য ব্যবস্থা উন্নয়নের জন্য পাথেয় হতে পারে। পাশাপাশি ব্রাজিলের প্রতিনিধিরা বলেছেন, আমরা এখন নির্ভরশীলতা থেকে মুক্তির পথে হাঁটছি এবং জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে দূরে সরে যাওয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে প্রস্তুত।
অভিযোজন সূচক নিয়েও আলোচনা চলে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বিশেষত আফ্রিকা এবং আরব দেশগুলো দ্রুত অভিযোজন সূচক বাস্তবায়নের বিপক্ষে নিজেদের অবস্থান জানিয়েছে। তাদের মতে, এটি তাদের দেশের অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ ফেলতে পারে। তবে বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা এই সূচকগুলোর দ্রুত বাস্তবায়ন এবং যথাযথ অর্থায়নের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন এবং দাবি করেছেন শুধু মিটিগেশন বা ক্ষয়ক্ষতির জন্য প্রতিশ্রুতি নয়, অভিযোজনের জন্যও প্রয়োজন কার্যকর অর্থায়ন।
বেলেমের বাইরে আন্দোলনকারীরা, উদ্ভিদ ও বনপ্রেমীরা এবং আদিবাসী জনগণ সম্মেলনস্থলের দিকে প্রবেশদ্বার বন্ধ করে দিয়ে তাঁদের প্রতিবাদ জানান। এই প্রতিবাদ বলে দেয়, জলবায়ু পরিবর্তন শুধু পরিবেশের সমস্যা নয়, জীবন-মরণ প্রশ্নও।
বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা যদিও বড় কোনো ঘোষণা বা চুক্তিতে এগিয়ে আসেননি, তবে তাঁদের দাবিগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের অভিযোজনের প্রক্রিয়া আরও দ্রুততর করা, ক্ষতিপূরণের তহবিলে সরাসরি প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা এবং অভিযোজন অর্থায়নের জন্য ত্বরিত পদক্ষেপের গুরুত্ব উল্লেখ করেছেন তাঁরা। অনেক বিশ্লেষকই বলছেন, কপ-৩০-এ বাংলাদেশের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ; দেশটি আন্তর্জাতিক মঞ্চে সমর্থন পাচ্ছে, কিন্তু কার্যকর কর্মসূচি ও বাস্তবায়ন এখনও প্রয়োজন।
বেলেম শহরে চলমান ৩০তম জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলনে বাংলাদেশের প্যাভিলিয়নে আর্টিকেল সিক্স অব দ্য প্যারিস এগ্রিমেন্ট পাথওয়েজ ফর ইমিশন রিডাকশন শীর্ষক একটি বিশেষ সেশন অনুষ্ঠিত হয়। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ নাবিদ শফিউল্লাহর সভাপতিত্বে আয়োজিত এ সেশনে প্রধান অতিথি ছিলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফরিদা আখতার। অনুষ্ঠান সঞ্চালনায় ছিলেন পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. জিয়াউল হক।
সেশনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ও বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মোট গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ প্রায় ৯০৯৮ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই-অক্সাইড সমতুল্য (২০২২), যা বৈশ্বিক নিঃসরণের মাত্র ০.৩৮ শতাংশ। সেক্টরভিত্তিক হিসাবে শক্তি খাতের অবদান ৪৬ শতাংশ, কৃষি ৩৯ শতাংশ, শিল্প ৮ শতাংশ এবং বর্জ্য খাত ৭ শতাংশ। ২০২২ সালের বেস ইয়ার অনুযায়ী মোট কার্বন নিঃসরণ ছিল ২৫২ মিলিয়ন টন, যার মধ্যে ৪৮.৮১ শতাংশ আসে শক্তি খাত থেকে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ফরিদা আখতার বলেন, সমন্বিত আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ছাড়া প্যারিস চুক্তির আর্টিকেল ৬ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। বাংলাদেশ নিজস্ব সক্ষমতা এবং বৈশ্বিক অংশীদারদের সহায়তা নিয়ে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় এগিয়ে যাবে, এ বিষয়ে আমি আশাবাদী।
সভাপতির বক্তব্যে অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ নাবিদ শফিউল্লাহ বলেন, আর্টিকেল ৬ দেশগুলোর মধ্যে নির্গমন বাণিজ্য, প্রযুক্তি স্থানান্তর ও আর্থিক বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশ এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, টেকসই পরিবহন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং কার্বন সংরক্ষণ প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের আহ্বান জানাচ্ছে।
সেশনের প্যানেল আলোচনায় অংশ নিয়ে ওয়াটারকিপার বাংলাদেশ-এর কো-অর্ডিনেটর শরিফ জামিল বলেন, বাংলাদেশ ও ব্রাজিল উভয় দেশেই স্থানীয় জনগণ ও নদীনির্ভর অর্থনীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই সবুজ উন্নয়ন হতে হবে জনগণকেন্দ্রিক। কার্বন বাজারে অংশগ্রহণ মানে শুধু আর্থিক সুবিধা নয়; এটি হতে হবে ন্যায্য ও স্বচ্ছ বৈশ্বিক চুক্তির অংশ।
প্যানেলিস্ট হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সোমালিয়ার মিনিস্ট্রি অব এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ক্লাইমেট চেঞ্জ-এর প্রতিনিধি মোহাম্মদ আলী আহমেদ। তিনি বলেন, আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো যদি একসঙ্গে কাজ না করে, তবে বৈশ্বিক নিঃসরণ হ্রাস সম্ভব নয়। আর্টিকেল ৬ সেই যৌথ প্রচেষ্টার দিকনির্দেশনা দিচ্ছে। সমাপনী বক্তব্যে পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. জিয়াউল হক বলেন, কার্যকর কার্বন বাজার গঠনের জন্য সঠিক ইমিশন ইনভেন্টরি, গবেষণালব্ধ তথ্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। বাংলাদেশ প্যাভিলিয়নে আয়োজিত এই সেশনটি কপ-৩০এ দেশের অঙ্গীকার, সক্ষমতা ও কার্বন বাণিজ্য সংক্রান্ত ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা স্পষ্ট করেছে বলে অংশগ্রহণকারীরা মন্তব্য করেন।