সোমবার, ০২ মার্চ ২০২৬, ০৪:২১ পূর্বাহ্ন

কয়লা খনি বন্ধের ‘ষড়যন্ত্রে’ ক্ষুব্ধ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা

বিডি ডেইলি অনলাইন ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৯ নভেম্বর, ২০২৫
  • ২৯ বার

কয়লার দাম কমানোকে কেন্দ্র করে খনি বন্ধ করার ষড়যন্ত্র চলছে বলে অভিযোগ করেছেন বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি কোম্পানি লিমিটেডের (বিসিএমসিএল) কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তাদের অভিযোগ, কয়লা আমদানিকারকদের স্বার্থে এ ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ ও দাবি জানিয়ে জ¦ালানি উপদেষ্টা, পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ চিঠি দিয়েছেন তারা। সূত্রমতে, কয়লার মূল্য কমানো নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হওয়ায় ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে বাধ্যবাধকতা থাকলেও কোম্পানির বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) আয়োজন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোম্পানিটি জ¦ালানি বিভাগের। আর এর কয়লার ক্রেতা প্রতিষ্ঠান হচ্ছে বিদ্যুৎ বিভাগ। এখানে মারাত্মক স্বার্থের দ্বন্দ্ব থাকার পরও বিদ্যুৎ বিভাগের সচিবসহ তিনজনকে জ¦ালানি বিভাগের কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদে যুক্ত করায় তারা বিসিএমসিএলের স্বার্থ দেখছেন না।

বিসিএমসিএল সূত্র জানায়, প্রতিবছরের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে কোম্পানির বার্ষিক সাধারণ সভার আয়োজনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু এজিএমের তারিখ নির্ধারণ এবং কয়লার বর্তমান বিদ্যমান দাম প্রতিটন ১৭৬ ডলার ধরে তৈরি করা কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনের বিষয় দুটি অনুমোদন মেলেনি। ফলে এজিএম অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। সূত্রমতে, কয়লার নতুন করে দাম নির্ধারণ হয়নি এখনো। দাম নির্ধারণে একটি কমিটি কাজ করছে। অথচ মৌখিক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে আন্তর্জাতিক মূল্য ধরে ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরের অডিট রিপোর্ট তৈরি করে এজিএমের আয়োজন করতে।

এসব বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো চিঠিতে শ্রমিক-কর্মচারীরা বলেছেন, বড়পুকুরিয়া কয়লা খনিকে বন্ধের চক্রান্ত চলছে। এ ছাড়া বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির কয়লার একমাত্র ক্রেতা বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। কিন্তু বড়পুকুরিয়ার কোম্পানির বোর্ড চেয়ারম্যান বিদ্যুৎ বিভাগের সচিবসহ বিদ্যুৎ বিভাগের তিনজন কর্মকর্তা থাকায় স্বার্থের সংঘাত তৈরি হয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব, পিডিবির একজন

সদস্য এবং বিদ্যুৎ বিভাগের একজন উপসচিব বসিএমসিএলের পরিচালনা পর্ষদে রয়েছেন। এ তিনজনই বিদ্যুৎ বিভাগের স্বার্থ দেখতে গিয়ে তারা জ¦ালানি বিভাগের কোম্পানিটির স্বার্থ দেখছে না। ৭ সদস্যের বোর্ডের মধ্যে তিনজনই কয়লার একমাত্র ক্রেতা পিডিবির তথা বিদ্যুৎ বিভাগের। তারা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারের কয়লার দাম কম অজুহাতে জ¦ালানি বিভাগের একটি কোম্পানির বাস্তবতা বিবেচনা না করে লোকসানের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

চিঠিতে বলা হয়, বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের ও পেট্রোবাংলার নিয়ন্ত্রণাধীন একটি প্রতিষ্ঠান। জ¦ালানি বিভাগের দিকনির্দেশনায় খনিটি গত ১৫ বছর যাবৎ লাভজনক কোম্পানি হিসেবে চলছে। সম্প্রতি একটি মহল কয়লার দাম কমানোর চেষ্টা করছে, যার ফলে খনিটি বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বর্তমানে খনি থেকে উত্তোলিত সম্পূর্ণ কয়লা তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিক্রি-সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে কয়লার পাহাড় জমছে।

বড়পুকুরিয়ার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলছে, সরকার যদি কয়লার দাম কমানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে সেটার একটা অফিসিয়াল অর্ডার থাকতে হবে। কিন্তু কোনো অফিসিয়াল অর্ডার ছাড়াই মৌখিক নির্দেশনায় ১৭৬ ডলার থেকে কমিয়ে আন্তর্জাতিক রেট ধরে অডিট করে সাধারণ সভা করতে বলছে বোর্ড চেয়ারম্যান। এটা সম্পূর্ণ বেআইনি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বোর্ড সভার একজন আমাদের সময়কে বলেন, গত বোর্ড সভায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানে বোর্ড চেয়ারম্যান কয়লার মূল্য দ্রুত পুনর্নির্ধারণ করে আর্থিক প্রতিবেদন প্রস্তুত করে বোর্ড সভায় উপস্থানের নির্দেশ দেন। তবে ৩১ ডিসেম্বর এজিএম করতে হলে সময় কম থাকার বিষয়টি তুলে ধরে বিসিএমসিএলের উপমহাব্যবস্থাপক (হিসাব) বলেন, ১৯৯৪ সালের কোম্পানি আইন অনুযায়ী বার্ষিক সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কমপক্ষে ২১ দিন পূর্বে পরিচালনা পর্ষদ সভার অনুমোদনক্রমে নোটিশ জারি করতে হবে এবং নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন বার্ষিক সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কমপক্ষে ১৪ দিন পূর্বে চূড়ান্ত করতে হবে। যদি ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫-এর মধ্যে বার্ষিক সাধারণ সভা আয়োজন করা সম্ভব না হয়, তবে ১৯৯৪ সালের কোম্পানির আইন অনুযায়ী হাইকোর্ট বিভাগের অনুমোদন গ্রহণের জন্য কোম্পানির যেকোনো সদস্যকে আবেদন করতে হবে।

এ বিষয়ে জ¦ালানি উপদেষ্টা মোহাম্মদ ফাওজুল কবির খান আমাদের সময়কে বলেন, আমি বিষয়টি খোঁজ নিয়ে কথা বলছি। কোম্পানির নিয়ম অনুযায়ী সঠিক সময়েই সাধারণ সভা করতে হবে। কেন সঠিক সময়ে সাধারণ সভা করা যাবে, না সেটা খতিয়ে দেখছি।

এ বিষয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব ফারজানা মমতাজের কাছে জানতে টেলিফোন করা হলে তিনি বলেন, এখন একটা মিটিংয়ে আছি। আমি পরে কথা বলব।

প্রসঙ্গত, ২০০১ সালে একনেকের সভায় তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রে সরবরাহকৃত কয়লার বিক্রয়মূল্য ৬০ মার্কিন ডলার নির্ধারিত হয়। পরবর্তী সময় জ¦ালানি বিভাগ কয়লার সমীক্ষা ব্যয় ও অন্যান্য ব্যয়সহ উত্তোলন ব্যয় বিবেচনা করে কয়লার বিক্রয়মূল্য পর্যায়ক্রমে ৭০, ৮৪, ১০৫, ১৩০ ও সর্বশেষ ২০২২ সালের ১ জানুয়ারি ১৭৬ মার্কিন ডলার নির্ধারণ করা হয়। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে বিশেষ করে ইন্দেনেশিয়ায় কয়লার দাম কম এমন যুক্তিকে বড় পুকুরিয়ার কয়লার দাম ৯০ ডলার করতে চায় পিডিবি।

প্রসঙ্গত বড়পুকুরিয়া কর্তৃপক্ষ বলছে, ২০২২ সালে বিসিএমসিএলের কয়লার মূল্য ১৭৬ মার্কিন ডলার ছিল। কিন্তু তখন আন্তর্জাতিক বাজারে সমমানের কয়লার মূল্য ৪০০ ডলারের ওপরে ছিল। ওই সময়ে বিসিএমসিএলকে পিডিবি কয়লার মূল্য ৪০০ ডলারের পরিবর্তে সরকার নির্ধারিত মূল্য পরিশোধ করে। এক্সএমসি-সিএমসি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে সম্পাদিত চতুর্থ চুক্তি ২০২১ থেকে ২০২৭ সাল পর্যন্ত বিধায় ২০২২ সালে উত্তোলিত কয়লার পিডিবির কাছে বিক্রয়মূল্য ১৭৬ ডলার পুনর্নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে চুক্তিকালীন সময়ের ব্যয়কে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে বড়পুকুরিয়ার কয়লার মূল্য ১৭৬ ডলার জ¦ালানি বিভাগ হতে নির্ধারিত রয়েছে। তা সত্ত্বেও সরকারি সিদ্ধান্ত ছাড়াই পিডিবি জোরপূর্বক কম মূল্য পরিশোধ করে আসছে। ফলে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর থেকে এ পর্যন্ত বিসিএমসিএলের এক হাজার ১৭৮ কোটি টাকা পিডিবির কাছে বকেয়া থাকায় বর্তমানে আর্থিক সংকটে খনিটি বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। উন্মুক্ত বাজারে বড়পুকুরিয়ার কয়লার প্রচুর চাহিদা থাকা সত্ত্বেও বাইরে বিক্রির অনুমোদনও মিলছে না।

খনি কর্তৃপক্ষ বলছে, বিসিএমসিএল পরিচালনা পর্ষদের সাতজন পর্যদ সদস্যের মধ্যে পর্ষদ চেয়ারম্যানসহ বিদ্যুৎ বিভাগেরই ৩ জন সদস্য রয়েছে। ফলে এ তিনজন সদস্য নিজেদের মর্জিমাফিক পর্ষদ সভায় সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। বড়পুকুরিয়াই একমাত্র কয়লা বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান, যার একমাত্র ক্রেতা পিডিবি। আর এই বিদ্যুৎ বিভাগই কয়লাসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। অর্থাৎ ক্রেতা নিজেই বিক্রেতার মালামালের মূল্য নির্ধারণ করে। ফলে খনির স্বার্থ উপেক্ষিত হচ্ছে।

নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2019 bangladeshdailyonline.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com