সোমবার, ০২ মার্চ ২০২৬, ০৪:২১ পূর্বাহ্ন

বক্তব্য বিবৃতি আর আশ্বাস আছে, আসামি গ্রেপ্তার নেই

বিডি ডেইলি অনলাইন ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ৩০ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৩৭ বার

মানিকগঞ্জসহ দেশের কয়েকটি স্থানে মব তৈরি করে বাউলদের ওপর হামলার ঘটনায় আসামিদের গ্রেপ্তারের আশ্বাস এসেছে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে। বিভিন্ন সংগঠন বিবৃতি দিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা আসামি গ্রেপ্তারে জোরালো অভিযান চালানোর কথাও জানিয়েছেন। তবে এত কিছুর পরও কোনো আসামি গ্রেপ্তার হয়নি বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র ও সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন গতকাল আমাদের সময়কে বলেন, বাউলদের ওপর হামলার ঘটনায় মামলা হয়েছে। আসামি গ্রেপ্তারে চেষ্টা করছে পুলিশ। হামলাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার হবে।

বাউলদের ওপর হামলার ঘটনার সূত্রপাত গত ৪ নভেম্বর মানিকগঞ্জের ঘিওরে একটি পালাগানের আসরে আবুল সরকার মহারাজের পরিবেশনাকে ঘিরে। সেই ঘটনার পর আবুল সরকারকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে গত ২৩ নভেম্বর মানিকগঞ্জে বাউলশিল্পী আবুল সরকার মহারাজের ভক্ত-অনুরাগীদের ওপর প্রথমে হামলা হয়। পরে ঠাকুরগাঁও ও খুলনায় বাউলরা হামলার শিকার হন। বাউলদের ওপর এসব হামলার ঘটনায় আসামিদের গ্রেপ্তার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

সরকারের পক্ষ থেকেও আসামি গ্রেপ্তারের ব্যাপারে জিরো টলারেন্স বলে ঘোষণা দেওয়া হয়। গত বৃহস্পতিবার এ নিয়ে কথা বলেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। তিনি বলেন, যাঁরা বাউলদের ওপর হামলা করেছেন, তাঁদের খুব দ্রুত গ্রেপ্তার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সে অনুযায়ী মানিকগঞ্জের পুলিশ কাজ করছে। অন্যান্য যে জায়গায় হামলা হয়েছে, সেসব জায়গায় পুলিশ সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করছে। সাংবাদিকরা দ্রুত ফলাফল জানতে পারবেন।

তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বাউলদের উপর হামলাকারীদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে পুলিশ উভয় সংকটে পড়েছেন। একদিকে আইন অনুযায়ী হামলাকারীদের গ্রেপ্তারে চাপ তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে তৌহিদী জনতার ব্যানারে বাউলদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হচ্ছে। সামাজিক মাধ্যমসহ বিভিন্ন অঙ্গনে উসকানি দেওয়া হচ্ছে। এখন হামলাকারীদের গ্রেপ্তার করলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে। তাই বাউলদের ওপর হামলাকারীদের গ্রেপ্তারে ধীরগতিতে চলছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক আমাদের সময়কে বলেন, মানিকগঞ্জসহ দেশের কয়েকটি স্থানে বাউলদের মারধর করার জন্য কাউকে আইনের মুখোমুখি হতে হচ্ছে না। কারও ভিন্নমত থাকতেই পারে। তাতে কোনো ব্যক্তিকে অন্য ব্যক্তি শাসন করার সুযোগ নেই। এটা একেবারেই আইনের শাসনের পরিপন্থি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছে বলে মনে হচ্ছে না। এগুলো নিয়ন্ত্রণ করার উপায় আইনের শাসন কার্যকর করা। এই ধরনের অপরাধের বিচার না হলে আরও ভয়াবহ ঘটনা মুখোমুখি হওয়া লাগতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, আমাদের প্রশাসন যদি সচল হয়, পুলিশ কর্মকর্তারা যদি ভয়ভীতি ছেড়ে একটু নড়েচড়ে বসেন, তাহলে বাউলদের ওপর হামলার ঘটনা কমে যাবে। আর সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অবস্থান যদি দুর্বল থাকে, তাহলে এ হামলা আরও বাড়বে।

বাউলদের ওপর হামলার ঘটনায় দেশের অনেক বিশিষ্টজন, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক ও বাংলাদেশ মহিলা পরিষদসহ নিন্দা ও উদ্বেগ জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন। বাউল আবুল সরকারের স্ত্রী আলেয়া বেগম বলেছেন- বাউলরা এখন আতঙ্কে ও মানসিকভাবে কষ্টে আছেন।

কবি ফরহাদ মজহার বলেছেন, বাংলাদেশের অনেক মানুষ বাউল গান থেকেই তাঁদের জীবন দর্শন খুঁজে নেয়। বাউলরা কাউকে আক্রমণ করে না। তাঁরা মানুষের মনের কথা বলেন, প্রাণের কথা বলেন, প্রেমের কথা বলেন।

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র বলছে, বাউলশিল্পীদের ওপর হামলার প্রবণতা আইনের শাসন ও মানবাধিকার সুরক্ষার জন্য গভীর হুমকি। বাউলদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। রাষ্ট্র তার দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে সংঘাত, সহিংসতা ও সামাজিক অসহিষ্ণুতা বাড়তে পারে।

নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2019 bangladeshdailyonline.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com