

রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা গত ২৪ ঘণ্টায় খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। তবে চিকিৎসকদের ডাকে সাড়া দিচ্ছেন তিনি। এ অবস্থাকে স্থিতিশীল মনে করছেন চিকিৎসকরা। এর মধ্যে গতকাল বুধবার তার চিকিৎসা সহায়তায় যুক্তরাজ্যের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রিচার্ড বিল ঢাকায় পৌঁছে মেডিক্যাল বোর্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন বলে জানিয়েছে বিএনপি চেয়ারপারসনের প্রেস উইং। এর আগে, গত মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলনে খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসক এজেডএম জাহিদ হোসেন জানিয়েছিলেন ব্রিটিশ এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ঢাকায় আসার কথা।
টানা ১১ দিন ধরে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন খালেদা জিয়া। গত ২৭ নভেম্বর থেকে করোনারি কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) নিবিড় পর্যবেক্ষণে আছেন সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী। তার শারীরিক অবস্থা অপরিবর্তিত। তবে চিকিৎসকদের ডাকে সাড়া দিচ্ছেন। দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধায়নে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে চিকিৎসা চলছে তার। গতকাল বুধবার রাতে চীনের আরও একটি চিকিৎসক দল ঢাকায় পৌঁছেছে।
বর্তমান শারীরিক অবস্থার কারণে খালেদা জিয়াকে অন্য কোথাও স্থানান্তর করার বিষয়ে সংশয়ে আছেন চিকিৎসকরা। বিএনপি চেয়ারপারসনের উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেওয়ার বিষয়ে দল ও পরিবারের পক্ষ থেকে প্রস্তুতি রাখা হয়েছে। তার চিকিৎসায় গঠিত মেডিক্যাল বোর্ডের একজন চিকিৎসক গতকাল বুধবার রাতে জানান, ফুসফুসে স্বাভাবিকভাবে বাতাস
চলাচল করানোর জন্য মেকানিক্যাল ভেন্টিলেশনে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে খালেদা জিয়াকে। কিডনি কার্যক্রম সচল রাখতে বিকালে তার ডায়ালাইসিস করা হয়েছে। তিনি বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসনের অবস্থা অপরিবর্তিত। আগের মতোই আছেন। উন্নতি-অবনতি কোনোটাই বলা যাচ্ছে না। কিছুটা রেসপন্স করছেন। চিকিৎসক ও পরিবারের সদস্যরা ডাক দিলে কিছুটা সাড়া দেওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে এটাকে আশানুরূপ উন্নতি বলা যাচ্ছে না। তার স্বাস্থ্যের বিভিন্ন প্যারামিটার ওঠানামা করছে।
বিদেশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা ঢাকায় : খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় গঠিত মেডিক্যাল বোর্ডকে সহযোগিতা করতে বিদেশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা ঢাকায় এসেছেন। গতকাল সকালে যুক্তরাজ্যের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রিচার্ড বিলি ঢাকা আসেন। দুপুরে তিনি এভারকেয়ার হাসপাতালে যান। রিচার্ড বিলিসহ তিন দিন আগে আসা চীনের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নিয়ে মেডিক্যাল বোর্ড রাতে মিটিং করে। এ সময় খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের সর্বশেষ পরীক্ষা-নিরীক্ষার রিপোর্ট পর্যালোচনা করা হয়।
স্বাস্থ্যের খোঁজ নিতে হাসপাতালে প্রধান উপদেষ্টা
তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্ত্রী এবং বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের খোঁজখবর নিতে গতকাল বুধবার রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে যান প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সন্ধ্যা ৭টার পর হাসপাতালে পৌঁছান তিনি। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বেগম খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন, অধ্যাপক ডা. শাহাবুদ্দিন তালুকদার, খালেদা জিয়ার ছোট ছেলের স্ত্রী সৈয়দা শামিলা রহমান এবং ছোট ভাই শামীম এস্কান্দার স্বাগত জানান প্রধান উপদেষ্টাকে। তিনি প্রায় আধা ঘণ্টা হাসপাতালে অবস্থান করেন। এ সময় তিনি বেগম জিয়ার পরিবার ও দলের নেতাকর্মীদের ধৈর্য ধারণের আহ্বান জানান।
বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে তাঁর চিকিৎসক দল প্রধান উপদেষ্টাকে ব্রিফ করেন। তারা জানান, যুক্তরাষ্ট্রের মাউন্ট সিনাই ও জনস হপকিন্স এবং যুক্তরাজ্য ও চীনসহ বিভিন্ন দেশের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধান ও সহায়তায় বেগম জিয়ার চিকিৎসা চলছে। এ সময় সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস পুনর্ব্যক্ত করেন প্রধান উপদেষ্টা। একই সঙ্গে তিনি দেশবাসীর কাছে খালেদা জিয়ার আরোগ্য কামনায় দোয়া ও প্রার্থনার আহ্বান জানান। হাসপাতাল পরিদর্শনকালে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে গতকাল দুপুরে খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের খোঁজ নিতে হাসপাতালে যান মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার। পরে তার একজন ব্যক্তিগত কর্মকর্তা বলেন, ম্যাডাম (ফরিদা আখতার) বিএনপি চেয়ারপারসনকে দেখতে গিয়েছিলেন। তিনি সিসিইউর ভেতরে প্রবেশ করেছিলেন। উপদেষ্টার ডাকে সাড়া দেন বিএনপি চেয়ারপারসন; ইশারায় সালামের জবাব দেন।
খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসক অধ্যাপক এজেডএম জাহিদ হোসেন জানান, বিএনপি চেয়ারপারসনের শয্যাপাশে কিছুক্ষণ অবস্থান করেন প্রধান উপদেষ্টা। তার সুস্থতা কামনায় দোয়া করেন। পরে তার স্বাস্থ্যের সর্বশেষ অবস্থা প্রধান উপদেষ্টাকে ব্রিফ করেন ডা. জাফর ইকবাল। তিনি আরও জানান, দেশি-বিদেশি চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে চলছে খালেদা জিয়ার চিকিৎসা। গতকাল যুক্তরাজ্যের একটি বিশেষজ্ঞ দল এসেছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, কাতার, সৌদি আরব, পাকিস্তান ও ভারত ইতোমধ্যে চিকিৎসা সহায়তার হাত বাড়িয়েছে।
বিদেশে নিয়ে চিকিৎসার ব্যাপারে এজেডএম জাহিদ হোসেন বলেন, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা যদি মনে করেন তাকে (খালেদা জিয়া) স্থানান্তর করা সম্ভব, তখনই উনাকে চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে নিয়ে যাওয়া হবে।
সুস্থতা কামনায় দোয়া ও মোনাজাত
গতকাল বুধবারও রাজধানীসহ সারাদেশে দোয়া ও মোনাজাতের মধ্য দিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনা করেন দলটির নেতাকর্মীরা। দুপুরে নয়াপল্টনে জাতীয়তাবাদী কৃষকদল ও পল্লী চিকিৎসক অ্যাসোসিয়েশন আয়োজিত দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়। এ সময় বিএনপির শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। রাজধানীর শ্যামলীতে দোয়া মোনাজাত ও সদকায়ে জারিয়া হিসেবে সন্দ্বীপের মুছাপুরে জনদুর্ভোগ লাগবে কাঠের ব্রিজ নির্মাণ করে দেন কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক সহসাধারণ সম্পাদক রফী উদ্দীন ফয়সাল। এদিন বাদ আছর রাজধানীর পল্লবী সিটি ক্লাব মাঠে খালেদা জিয়ার রোগমুক্তি কামনায় দোয়া মোনাজাতের আয়োজন করেন ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক আমিনুল হক। মুন্সীগঞ্জের লৌহজং কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দানে বিএনপি ও অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের উদ্যোগে দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়। এতে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব আব্দুস সালাম আজাদসহ হাজারো নেতাকর্মী অংশ নেন।
খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার আপডেট জানতে প্রতিদিনই হাসপাতাল সংলগ্ন এলাকায় ভিড় করছেন দলটির নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ।
প্রসঙ্গত, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন ধরে হƒদরোগ, ডায়াবেটিস, আর্থ্রাইটিস, লিভার সিরোসিস, কিডনি জটিলতাসহ নানা শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছেন। গত ৮ জানুয়ারি উন্নত চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যান বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। লন্ডন ক্লিনিকে টানা ১৭ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ২৫ জানুয়ারি ছেলে তারেক রহমানের বাসায় লন্ডন ক্লিনিকের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অধ্যাপক প্যাট্রিক কেনেডি ও অধ্যাপক জেনিফার ক্রসের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা নেন। যুক্তরাজ্যে উন্নত চিকিৎসা শেষে গত ৬ মে দেশে ফেরেন বিএনপি চেয়ারপারসন।