

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়ে সরকার গঠন করতে পারলেও দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে প্রার্থী হওয়ায় অন্তত শতাধিক নেতাকে বহিষ্কার করতে হয়েছে বিএনপিকে। তারপরও নির্বাচনী লড়াই থেকে বিরত রাখতে পারেনি তাদের। বরং বহিষ্কৃতদের মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ৭ জন দলের মনোনীত কিংবা জোট সমর্থিত প্রার্থীদের হারিয়ে জয় ছিনিয়ে নেন। অনেক আসনে বিদ্রোহী প্রার্থী নিজে পরাজয়ের পাশাপাশি দল ও জোটের প্রার্থীর পরাজয়ের কারণ হয়েছেন। ফলে নির্বাচন পরবর্তী সময়ে দল ও সমর্থিত প্রার্থীরা প্রকাশ্যে বিদ্রোহী প্রার্থীদের নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। দল থেকে বহিষ্কৃত এ নেতাদের অনেকেই জেলা, উপজেলা বা পৌর শাখার গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন। এখন তারা আবার দলে ফেরার সুযোগ খুঁজছেন। তবে এই মুহূর্তে দলে ফেরানোর বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বিএনপির। বরং দলের চেয়ারম্যান বহিষ্কৃতদের বিষয়ে খুবই কঠোর অবস্থানে আছেন বলে জানা গেছে। ফলে শিগগিরই এসব নেতাকে দলে ফেরা হচ্ছে না।
জানা গেছে, বহিষ্কৃত এ নেতাদের অনেকে দলের নীতিনির্ধারকদের কাছে ভুল স্বীকার করে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করেছেন। বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারে আবেদনের প্রস্তুতিও রয়েছে অনেকের। কেউ কেউ হাইকমান্ডের সুদৃষ্টির আশায় এখন চুপচাপ থেকে দলের পক্ষে কাজ চালিয়ে যেতে যান।
প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান আমাদের সময়কে বলেন, আমরা চেয়েছিলাম স্বতন্ত্র প্রার্থীরা যেন দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নির্বাচন করা থেকে বিরত থাকেন। তারা ভোটের মাঠে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কাজ করবেন। কিন্তু প্রত্যাশা রাখেননি তারা। পরবর্তী সময়ে দল থেকে বহিষ্কার হয়েছেন। নির্বাচনের পর এখন ফিরতে চাচ্ছেনÑ ভালো; দেখা যাক কী করা যায়।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে ১১৭টি আসনে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দেন অন্তত ১৯০ জন বিএনপি নেতা। পরে দলীয় নির্দেশনা মেনে বেশির ভাগ নেতা তাদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নেন। তবে দলের কঠোর অবস্থান মানেননি অনেক গুরুত্বপূর্ণ নেতা। তাতে ৭৮টি আসনে বিদ্রোহী প্রার্থী থেকে যান। এ কারণে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে তাদের দল থেকে বহিষ্কার করেছিল বিএনপি। তাদের পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় সারাদেশের আরও সহস্রাধিক নেতাকর্মীকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। এই ৭৮টি আসনের মধ্যে ২১টি আসনে জিতেছেন জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থীরা। আর বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন সাতটি আসনে। সব মিলিয়ে ২৮টি আসনে ভোটের ফলে প্রভাব রেখেছেন বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীরা। তারা ভেবেছিলেন নিজ এলাকায় তাদের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা অনেক। তবে নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল তাদের সেই ভুল ভেঙে দিয়েছে। সাতজন বাদে বেশির ভাগ প্রার্থীই বিশাল ব্যবধানে হেরেছেন।
নির্বাচনী ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিদ্রোহীদের কারণে বিএনপি ধরাশায়ী হয় ২১ আসনে। ঢাকা-১২ আসনে বিএনপি সমর্থিত বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক পেয়েছেন ৩০ হাজার ৯৬৩ ভোট। বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী সাইফুল আলম (নীরব) পেয়েছেন ২৯ হাজার ৮৬৯ ভোট। দুজনের সম্মিলিত ভোট ৬০ হাজার ৮৩২ ভোট। বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থী ও বিদ্রোহী প্রার্থীর মধ্যে ভোট ‘ভাগ’ হয়ে যাওয়ায় এ আসনে ৫৩ হাজার ৭৭৩ ভোট পেয়ে জয় পেয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী সাইফুল আলম খান মিলন। সিলেট-৫ আসনে বিএনপির সমর্থিত জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সভাপতি উবায়দুল্লাহ ফারুক পেয়েছেন ৬৯ হাজার ৭৭৪ ভোট। বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী মামুনুর রশিদ পেয়েছেন ৫৬ হাজার ৩৬৯ ভোট। ফলে এই আসনে ৭৯ হাজার ৩৫৫ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী খেলাফত মজলিসের আবুল হাসান।
নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে বিএনপি সমর্থিত জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের প্রার্থী মনির হোসেন কাসেমী পেয়েছেন ৮০ হাজার ৬১৯ ভোট। এ আসনে বিএনপির দুজন বিদ্রোহী প্রার্থী মো. শাহ আলম ও মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন যথাক্রমে ৩৯ হাজার ৫৮৯ ভোট ও ৪ হাজার ৭৭৯ ভোট পান। ফলে বিএনপির ভোট ভাগাভাগি হওয়া এই আসনে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলের প্রার্থী জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আব্দুল্লাহ আল আমিন ১ লাখ ৬ হাজার ১৭১ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। একইভাগে বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় চট্টগ্রাম-১৬, পাবনা-৪, বাগেরহাট-১, ঝিনাইদহ-৪, নড়াইল-২ যশোর-৫, মাদারীপুর-১, ঢাকা-১৪, সাতক্ষীরা-৩, ময়মনসিংহ-৬, পাবনা-৩, শেরপুর-১, গাইবান্ধা-৫, বাগেরহাট-২ এবং বাগেরহাট-৪ সংসদীয় আসন হারিয়েছে বিএনপি।
এদিকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়া বেশ কয়েকজন বহিষ্কৃত নেতা আমাদের সময়কে জানান, নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কারণে দলের বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত তারা মেনে নিয়েছেন। কিন্তু দলের আদর্শেই তারা অবিচল থাকবেন। বরং প্রার্থী হওয়ার কারণে বহিষ্কারকে তারা বিএনপির কৌশল হিসেবেও বিবেচনা করছেন। আবার দলে ফিরতে নানা উপায়ে চেষ্টা অব্যাহত রাখতে চান তারা। তবে বিএনপি কেন্দ্রীয় নেতারা তাদের এমন বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছেন।
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আমাদের সময়কে বলেন, বিদ্রোহী কিংবা স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বহিষ্কারাদেশ বিষয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এই বিষয়টি দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও স্থানীয় কমিটির সদস্যদের সিদ্ধান্তেই হবে। এর বেশি কিছু বলতে পারব না।
বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা বলছেন, যারা দলের সিদ্ধান্ত মানেন না তাদের ফেরা না ফেরার মধ্যে দলের সাংগঠনিক কোনো প্রভাব পড়বে না। বরং যারা দলের বাইরে গিয়ে নির্বাচন করে পরাজিত হয়েছেন, তাদের ফেরার পথ সহজতর হবে না; যতটা সহজতর হবে যারা বিজয়ী হয়েছেন। এ বিষয়ে দলীয় হাইকমান্ডের অবস্থান কঠোর। স্পষ্ট বার্তা শৃঙ্খলা ভঙ্গের পর আপসের সুযোগ নেই। দল আগে, ব্যক্তি পরে। এ ছাড়া তাদের দলে ফেরার আলোচনা নিয়ে তৃণমূলে তৈরি হয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। কেউ বলছেন কঠোরতা দরকার, কেউ চাইছেন সমঝোতা। এমন অবস্থায় বহিষ্কৃত নেতাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দলের হাইকমান্ডের বারবার দেওয়া সতর্কবার্তায়ও কান দেননি বিএনপির স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। তারা শেষ পর্যন্ত ধানের শীষ কিংবা বিএনপি মনোনীত প্রার্থীর বিপক্ষে লড়েছেন। অধিকাংশ স্বতন্ত্র প্রার্থী ধরাশায়ী। হারের পর এবার তাদের কারও কারও মোহভঙ্গ হয়েছে। বহিষ্কৃত সেই প্রার্থীরাই এখন দলে ফিরতে চাইছেন। অনেকটাই নীরবে তৎপরতা চালাচ্ছেন; বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগ শুরু করছেন। যদিও বিএনপির নীতিনির্ধারকরা আপাতত বহিষ্কৃত স্বতন্ত্র প্রার্থীদের দলে ফেরাতে নারাজ। বিএনপির শীর্ষ পর্যায় থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে থাকা বেশ কিছু নেতার সঙ্গে আলোচনা করা হলেও তারা নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে রাজি হননি। বরং তারা দলীয় হাই কমান্ডকে জানিয়েছেন যে, জিতলেও তারা শেষ পর্যন্ত বিএনপির সঙ্গেই থাকবেন।
নাম প্রকাশ না করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ভোটে লড়ে পরাজিত হওয়া একজন আমাদের সময়কে বলেন, দীর্ঘ ৩০ বছরের অধিক সময় বিএনপির রাজনীতিতে সম্পৃক্ত থেকেছি। নির্বাচন ঘিরে বহিষ্কার করে দেওয়ার কোনো মানে হয় না। স্বতন্ত্র নির্বাচন করে প্রায় লাখের কাছাকাছি ভোট পেয়েছি; তাই দলের ফেরার বিষয়ে কোনো আক্ষেপ নেই। দল যদি মনে করে তাহলে বিবেচনা করব। অন্যথায় দলে ফেরার আবেদনও করব না। বরং তিনি গঠিত সরকারকে জোড়াতালির সরকার বলেও আখ্যা দেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সংগঠক কিংবা জনসম্পৃক্ততা আছেÑ এমন নেতাদের বের করে দিলে দলটি তৃণমূল পর্যায়ে সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হবে পড়বে। তবে এটাও স্বাভাবিক এদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোতে এমন উদাহরণ অনেক আছে যে, নির্বাচনের আগে দল থেকে বহিষ্কার করলেও পরে আবার দলের ফিরিয়ে নেওয়া হয়। বিএনপির ক্ষেত্রেও এমনটাই হতে পারে। বিশেষ করে যারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে বিদ্রোহী তকমা পেয়েছেন, তাদের মধ্যে যারা বিজয়ী হয়েছেন তারা বিএনপিতেই ফিরে আসা নিয়ে সংশয় নেই বলেই বিএনপির মধ্যে এ নিয়ে উদ্বেগ কম বলে মনে হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলছেন, বিএনপির দিক থেকে শক্ত বার্তা যায়নি বলেই এত বিপুল সংখ্যক আসনে বিএনপি নেতারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছিল। এটা নির্বাচনী কৌশলও হতে পারে।
বিএনপির নির্বাহী কমিটির সহ-দপ্তর সম্পাদক (বহিষ্কৃত) তাইফুল ইসলাম টিপু। নাটোর-১ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে তিনিও পরাজিত হয়েছেন। আমাদের সময়কে তিনি বলেন, বিএনপি আমাদের আনুষ্ঠানিকভাবে বহিষ্কার করেছে। আদর্শিক কিংবা নীতিগত জায়গা থেকে আমি বিএনপিতেই আছি। আগে পদে ছিলাম, এখন সমর্থক, কর্মী হিসেবে কাজ করে যাব। দল যদি মনে করে আমাদের কাজে লাগাবে, তাহলে সেটি করতে পারে। তবে বহিষ্কার প্রত্যাহারে আবেদন করবেন না বলেও জানান তিনি।