রবিবার, ০১ মার্চ ২০২৬, ০২:১২ অপরাহ্ন

অগ্নিঝরা মার্চ শুরু

বিডি ডেইলি অনলাইন ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ১ মার্চ, ২০২৬
  • ৫ বার

শুরু হলো মহান স্বাধীনতার মাস। আমাদের জাতীয় জীবনে গৌরব, বেদনা ও অদম্য প্রত্যয়ের এক অনন্য অধ্যায় স্বাধীনতার মাস মার্চ। এই মাস এলেই বাঙালির হৃদয়ে ফিরে আসে দীর্ঘ বঞ্চনার ইতিহাস, সংগ্রামের উত্তাল দিনগুলো এবং আত্মত্যাগে রঞ্জিত মুক্তিযুদ্ধের মহাকাব্য। স্বাধীনতা হঠাৎ করে অর্জিত হয়নি। এর পেছনে রয়েছে রক্তঝরা পথচলা, অবিরাম আন্দোলন এবং জাতিসত্তার স্বীকৃতির জন্য অদম্য লড়াই।

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটলেও পূর্ববাংলার মানুষের ভাগ্যে প্রকৃত মুক্তি আসেনি। পাকিস্তান রাষ্ট্রের অংশ হয়েও পূর্বাঞ্চলের বাঙালিরা শুরু থেকে বৈষম্যের শিকার হয়। জনসংখ্যায় সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়েও রাজনৈতিক ক্ষমতা, প্রশাসন, সামরিক বাহিনী ও অর্থনীতিতে পশ্চিম পাকিস্তানের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। পূর্ববাংলার উৎপাদিত পাট ও কৃষিপণ্যের বৈদেশিক মুদ্রা আয়-ব্যয় হতো মূলত পশ্চিমাঞ্চলের শিল্পায়নে। অথচ অবকাঠামো উন্নয়ন ও বিনিয়োগে পূর্বাঞ্চল ছিল উপেক্ষিত। রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দু চাপিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাঙালির আত্মপরিচয়ের ওপর সরাসরি আঘাত হানে। এরই প্রতিবাদে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন বাঙালির প্রথম সুসংগঠিত প্রতিরোধ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, যা পরবর্তী সব আন্দোলনের প্রেরণাসূত্র হয়ে ওঠে এবং জাতিসত্তার প্রশ্নে আপসহীন অবস্থান স্পষ্ট করে।

পরবর্তী সময়ে ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন এবং ১৯৬৬ সালে ছয় দফা কর্মসূচি বাঙালির স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে সুসংহত রূপ দেয়। ছয় দফা ছিল মূলত অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক ও সামরিক বৈষম্য দূর করে পূর্ববাংলাকে প্রকৃত স্বায়ত্তশাসন দেওয়ার রূপরেখা। এ দাবির জেরে গ্রেপ্তার, নির্যাতন ও আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার মতো দমন-পীড়ন নেমে আসে। কিন্তু দমে যায়নি বাঙালি। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান পাকিস্তানি সামরিক শাসনের ভিত কাঁপিয়ে দেয়।

১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। গণতান্ত্রিক রীতি অনুযায়ী ক্ষমতা হস্তান্তর হওয়ার কথা থাকলেও পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী নানা অজুহাতে তা বিলম্বিত করে। জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করা হয়, শুরু হয় গড়িমসি ও রাজনৈতিক চক্রান্ত। একই সময়ে ঘূর্ণিঝড় ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিপর্যস্ত পূর্ববাংলার মানুষের প্রতি কেন্দ্রীয় সরকারের উদাসীনতা ক্ষোভকে আরও তীব্র করে তোলে। বাঙালির মধ্যে জমে ওঠা বঞ্চনা বিস্ফোরণের অপেক্ষায় ছিল। ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা দেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ সেই ভাষণ ছিল একদিকে রাজনৈতিক প্রজ্ঞার অনন্য উদাহরণ, অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতির সাংগঠনিক আহ্বান।

অবশেষে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ গভীর রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে নৃশংস অভিযান শুরু করে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নির্বিচারে হত্যা, অগ্নিসংযোগ ও ধর্ষণের মাধ্যমে বাঙালির কণ্ঠরোধের চেষ্টা চলে। বিশ্ববিদ্যালয়, ছাত্রাবাস, পাড়া-মহল্লা কোথাও রেহাই মেলেনি। নিরস্ত্র মানুষের ওপর এ বর্বর ক্র্যাকডাউন বিশ্ববিবেককে নাড়া দেয়। ২৬ মার্চের প্রভাতে স্বাধীনতার ঘোষণা ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। সংগঠিত হতে থাকেন মুক্তিযোদ্ধারা। পরদিন ২৭ মার্চ মেজর জিয়াউর রহমান কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। মুক্তিপাগল বাঙালি জাতি গ্রাম থেকে শহর-সর্বত্র অস্ত্র তুলে নেয়, গড়ে ওঠে মুক্তিবাহিনী। প্রবাসে গঠিত হয় অস্থায়ী সরকার, কূটনৈতিক তৎপরতায় বিশ্বজনমত সংগঠিত করার প্রয়াস চলে।

নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদের আত্মদান এবং প্রায় দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমহানির বেদনার মধ্য দিয়ে জন্ম নেয় স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। অবশেষে ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের মধ্য দিয়ে দখলদার বাহিনী আত্মসমর্পণ করে। লাল-সবুজের পতাকা ওড়ে স্বাধীন আকাশে।

স্বাধীনতার মাস কেবল অতীতের স্মৃতিচারণ নয়; এটি আমাদের আত্মপরিচয়ের শিকড়। এই মাস আমাদের শেখায়-অন্যায় ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধই জাতির মুক্তির পথ। স্বাধীনতা মানে শুধু ভূখণ্ডের মুক্তি নয়; এটি ন্যায়, সাম্য, গণতন্ত্র ও মানবিক মর্যাদার অঙ্গীকার।

নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2019 bangladeshdailyonline.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com