শনিবার, ০৭ মার্চ ২০২৬, ০৩:০০ অপরাহ্ন

ইচ্ছামতো ব্যয়ে ফাঁপা ঢাকার দুই সিটি

বিডি ডেইলি অনলাইন ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৭ মার্চ, ২০২৬
  • ৪ বার

প্রায় সব খাতেই অস্বাভাবিক ব্যয়; সেই তুলনায় নামমাত্র রাজস্ব আয়। অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে রাজধানী ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন পরিচালনায় ঘটেছে এমনটিই। যার জের এসে পড়ছে এখন নির্বাচিত সরকারের কাঁধে। আর্থিক সংকটে পড়েছে সংস্থা দুটি। নাগরিক সেবা দিতে গিয়ে পড়তে হচ্ছে টানাপোড়েনে। এ দুই করপোরেশনে মেয়রের দায়িত্ব পালন করা সাবেক প্রশাসকদের আগ্রহ বেশি ছিল উন্নয়ন কাজের টেন্ডারে (দরপত্র)। যেগুলোর মধ্যে অপ্রয়োজনীয় হিসেবে চিহ্নিতের পর তাদের অনুমোদন করা বেশকিছু টেন্ডারের কাজ বাতিল করা হয়েছে। তবে টাকা খরচে অস্বাভাবিকতার এখানেই শেষ নয়, এমনকি দুই করপোরেশনের মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটির পরিচালন ব্যয় মেটাতে ভেঙে ফেলা হয়েছে ২০০ কোটি টাকার এফডিআর। এ ছাড়া প্রশাসকের নিয়ন্ত্রণাধীন ঐচ্ছিক তহবিল থেকেও ইচ্ছামতো ব্যয় করা হয়েছে কোটি কোটি টাকা।

স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি অর্থ ব্যয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি না থাকায় সিটি করপোরেশনে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। আয় ও ব্যয়ের ভারসাম্য না থাকায় যারা দায়িত্বে ছিলেন, তারা ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি) অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে রাজস্ব আয় ও ব্যয়ের পার্থক্য ছিল অস্বাভাবিক। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ডিএসসিসির আয়-ব্যয় সমন্বয়ের পর ৮২ কোটি ৫৩ লাখ টাকা উদ্বৃত্ত ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম অর্থবছরে আয়ের চেয়ে ১০২ কোটি টাকা বেশি ব্যয় হয়। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে আগের বছরের তুলনায় আয় বাড়লেও ব্যয় দ্বিগুণ বেড়ে ২০৪ কোটি টাকা হয়েছে।

ডিএসসিসির অর্থ বিভাগ থেকে পাওয়া তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত আয় ৫৩০ কোটি ৮২ লাখ টাকা। আগের অর্থবছরের এই সময়ে আয় ছিল ৪০৪ কোটি ২৪ লাখ টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ডিএসসিসির আয় ৭৯২ কোটি ৩০ লাখ, ব্যয় ৮৯৮ কোটি ২ লাখ টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ব্যয় ৯৭৯ কোটি ২১ লাখ, আয় ছিল ১ হাজার ৬১ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। ২০২২-২৩ সালে ১ হাজার ১৫ কোটি ৯২ লাখ আয়ের বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ৯৭০ কোটি ২০ লাখ টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে আয় ছিল ৮৭৯ কোটি ৭০ লাখ, ব্যয় হয়েছে ৮০২ কোটি ৮ লাখ টাকা।

ডিএসসিসির অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, ব্যাংকে রাখা ফিক্সড ডিপোজিট (এফডিআর) ভেঙে সে টাকা দিয়ে বর্ধিত ব্যয়ের চাপ সামাল দিচ্ছে করপোরেশন। অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে উন্নয়ন কার্যক্রম ও ঠিকাদারি বিল পরিশোধেও সংকট দেখা দিয়েছে। এমন অবস্থা চলতে থাকলে কয়েক মাসের মধ্যে ডিএসসিসির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দেওয়া সম্ভব হবে না।

করপোরেশনের একাধিক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী বলেন, তহবিলে অর্থ সংকট থাকায় ঠিকাদারদের বিল দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। উন্নয়ন কাজের গতি অনেক কমে এসেছে। অন্যদিকে চলতি মাসে ৭৫টি ওয়ার্ডের উন্নয়নের জন্য ১৫০ কোটি টাকার দরপত্র চলছে। পুরোনো কাজই চলছে না, নতুন কাজ শুরু হলে সংকট বাড়বে। ডিএসসিসির অর্থ বিভাগের এক কর্মকর্তা কালবেলাকে বলেন, ‘সাবেক মেয়র তাপস তার সময়কার তিন বছরের কিছু ঠিকাদারি বিল আটকে রেখেছিলেন। এর আগে সাবেক মেয়র সাঈদ খোকনের সময়কার অনেক ঠিকাদারের জামানতের টাকাও জমা ছিল। ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে এসব বিল ও জামানত একসঙ্গে পরিশোধ করতে হচ্ছে। গত ছয় মাসে আয় হয়েছে ৫৩০ কোটি টাকা। অন্যদিকে পরিচালন ব্যয় বাবদ খরচ করতে হয়েছে ৩১৫ কোটি এবং নিজস্ব অর্থায়নে উন্নয়ন ব্যয়ে গেছে ৪১৯ কোটি টাকা। এভাবে প্রতি মাসে আয়ের চেয়ে ব্যয় বাড়ছে। এতে করপোরেশনের আয় ও ব্যয়ের ভারসাম্য রক্ষা হচ্ছে না।’

এ কর্মকর্তা জানান, আয়-ব্যয়ের চাপ সামাল দিতে করপোরেশনের এফডিআর থেকে ২০০ কোটি টাকার বেশি খরচ করতে হয়েছে। বিভিন্ন ব্যাংকে এখন করপোরেশনের ফিক্সড ডিপোজিট রয়েছে ৮০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে সাধারণ তহবিলের টাকা ৪৬ কোটি। আপাতত উন্নয়ন খাতে টাকা ছাড় দেওয়া সম্ভব নয়। দ্রুত আয়-ব্যয়ের তারতাম্য না কমলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দেওয়ার সংগতিও থাকবে না ডিএসসিসির।

জানতে চাইলে ডিএসসিসির প্রশাসক আবদুস সালাম কালবেলাকে বলেন, ‘দীর্ঘ ১৭ বছরে করপোরেশনগুলোর যে অবস্থা করা হয়েছে; আমাদের রাজস্ব বাজেটের যে অবস্থা; তাতে আগামীতে যদি রাজস্ব বাজেটের ওপর ভর করে আমরা বেতন দিতে যাই, সেটা পারব না। বেতনের টাকা নেই। তারা সব শূন্য করে দিয়ে গেছে। তার ওপর আবার যেটা করেছে, তারা ১৫০০ কোটি টাকার অগ্রিম ওয়ার্ক অর্ডার দিয়ে গেছে। সেই টাকাটা কোথা থেকে আসবে? স্বাভাবিকভাবে এখন এটি নিয়ে চাপ আসবে।’

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ঈদের আগে অন্য খাত থেকে সমন্বয়ের মাধ্যমে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-বোনাস দেওয়ার চেষ্টায় রয়েছেন বলে জানান ডিএসসিসির নতুন এই প্রশাসক। ‘৪৭০ কোটি টাকার কাজের বিল দিয়ে গেছে। সেই টাকা নেই। আন্দোলন, নির্বাচন—এসব কারণে রাজস্বও কম আদায় হয়েছে। এখন যদি কিছু করতে হয়, তাহলে পে-অর্ডার ভাঙতে হবে; কিন্তু আমি পে-অর্ডার ভাঙাতে চাই না। প্রধানমন্ত্রীর কাছে বরাদ্দ চেয়েছি; যাতে সিটি করপোরেশন চালানোর জন্য সুবিধা হয়। এখন আমরা জোর দিয়েছি যেন রাজস্ব আয়টা বাড়ানো যায়। আপাতত এ মাসে অন্য খাত থেকে সমন্বয় করে যাতে বেতন-বোনাস দেওয়া যায়। সেগুলোর জন্য আমরা চেষ্টা করছি।’

আবদুস সালাম বলেন, ‘সিটি করপোরেশন ঠিকমতো চললে অর্থাৎ আয় অনুযায়ী ব্যয় যদি হয় তাহলে সিটি করপোরেশন তো এমন নয় যে, দেউলিয়া হয়ে যাবে। দেউলিয়া হয়নি; কিন্তু এখন রাজস্ব আয় কমে গেছে এবং রাজস্ব বাজেটটি তারা আগেই শেষ করে ফেলেছে। আগে ঢালাওভাবে যেসব ওয়ার্ক অর্ডার দেওয়া হয়েছে, সেসব কাজের আদৌ কোনো ভিত্তি আছে কি না, আমরা সেসব দেখে তারপর এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করব।’

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) তহবিল নিয়েও চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা। সাবেক প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে চলছে তদন্ত। সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার আশীর্বাদে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পাওয়া এজাজ তার মেয়াদের শেষ মুহূর্তে দিয়েছেন ১ হাজার ৪৭০ কোটি টাকার টেন্ডারের ওয়ার্ক অর্ডার। তাই দুর্নীতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করে কী কী সুবিধা নেওয়া হয়েছে, সেগুলো খতিয়ে দেখতে শুরু হচ্ছে তদন্ত।

জানা গেছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ডিএনসিসির আয় হয় ১১৭৭ কোটি টাকা। অন্যদিকে এ সময়ে ব্যয় হয় ১০৮২ কোটি টাকা। পরের অর্থবছরে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে আয় হয় ১১৭৮ কোটি টাকা। এ অর্থবছরে ব্যয় ১৪৩৮ কোটি টাকা। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে আয় হয়েছে ৭৫০ কোটি টাকা। এ সময়ে ৮১১ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। এর মধ্যে সর্বশেষ দুই অর্থবছরে প্রশাসকের ঐচ্ছিক তহবিল থেকে ১১ কোটি ৬৭ লাখ টাকা অনুদান দেওয়া হয়েছে।

ডিএনসিসির স্থায়ী আমানতে (এফডিআর) বিনিয়োগ রয়েছে ৮২৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে সাধারণ তহবিলে জনতা ব্যাংকে ৩৯৬ কোটি, সোনালী ব্যাংকে ১৩৫ কোটি, অগ্রণী ব্যাংকে ৭২ কোটি, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকে ৮ কোটি, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকে ৪ কোটি, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকে ৭ কোটি, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকে ১০ কোটি ও ফাস্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে ১০ কোটি টাকা রয়েছে। জামানত তহবিলে সোনালী ব্যাংকে ৩৫ কোটি, অগ্রণী ব্যাংকে ২৫ কোটি, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকে ৭ কোটি ও বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকে রয়েছে ৩ কোটি টাকা।

শিক্ষা বৃত্তি তহবিলে জনতা ব্যাংকে ২ কোটি ও সোনালী ব্যাংকে ৮ কোটি টাকা রয়েছে। অবসর ভাতা ও অবসর গ্রহণ সুবিধা তহবিলে (পেনশন) জনতা ব্যাংকে ৫৬ কোটি টাকা রয়েছে। সাধারণ ভবিষ্যৎ তহবিলে সোনালী ব্যাংকে ২০ কোটি ও জনতা ব্যাংকে রয়েছে ২৭ কোটি টাকা।

সংস্থাটির সাবেক প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ দাবি করেন, দায়িত্ব শেষ করার সময় তিনি একটি সমৃদ্ধ ডিএনসিসি রেখে গেছেন। ফেসবুকে লেখেন, ‘আমার এক বছরের মেয়াদের শেষ দিন ১০ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব বুঝিয়ে দিই। সেদিন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ২৬টি অ্যাকাউন্টে মোট ১ হাজার ২৬০ কোটি ১৫ লাখ ৫১ হাজার ৩১১ টাকা ৬০ পয়সা তহবিলে জমা রেখে একটি সমৃদ্ধ ডিএনসিসি রেখে এসেছি।’

সাবেক প্রশাসকের এমন দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ডিএনসিসি জানিয়েছে, সংস্থাটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা এবং বিভিন্ন ঠিকাদারি বিল পরিশোধ করা হয় করপোরেশনের সাধারণ তহবিল থেকে। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি বর্তমান প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান দায়িত্ব গ্রহণকালে ডিএনসিসির সাধারণ তহবিলে নগদ স্থিতি ছিল ২৫ কোটি টাকা এবং ফিক্সড ডিপোজিট ছিল বিভিন্ন তহবিলের ৮২৫ কোটি টাকা, যা আপৎকালীন দায় মেটানোর জন্য সংরক্ষিত রাখা আছে।

ডিএনসিসির ২০২৩-২৪ অর্থবছর শেষে ১ জুলাই ২০২৫ তারিখে সাধারণ তহবিলে নগদ স্থিতি ছিল ৫৯৭ কোটি টাকা এবং বিভিন্ন তহবিলের ফিক্সড ডিপোজিট ছিল ৮২৫ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজস্ব আদায় হয় ১ হাজার ১৭৮ কোটি টাকা অর্থাৎ ১ জুলাই ২০২৪ থেকে ৩০ জুন ২০২৫ পর্যন্ত মোট ক্যাশ ব্যালেন্স ১ হাজার ৭৭৫ কোটি টাকা। সাবেক প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ ২০২৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণ করার পর অতি উচ্চাবিলাষী বাজেট প্রণয়ন করে বিভিন্ন অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প গ্রহণ করে ১ জুলাই ২০২৪ থেকে ৩০ জুন ২০২৫ পর্যন্ত মোট ব্যয় করেছেন ১ হাজার ৪৩৯ কোটি টাকা। ফলে ১ জুলাই ২০২৫ তারিখে নগদ স্থিতি থাকে ৩৩৬ কোটি টাকা। ১ জুলাই ২০২৫ থেকে ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত রাজস্ব আদায় হয় ৮২০ কোটি টাকা। ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে নগদ স্থিতি দাঁড়ায় ১ হাজার ১৫৬ কোটি টাকা।

সাবেক প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ ফের অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প গ্রহণ করে ১ জুলাই ২০২৫ থেকে ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত এই অল্প সময়ের মধ্যে খরচ করেন ১ হাজার ১৩১ কোটি টাকা। বর্তমান প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান দায়িত্ব গ্রহণের দিন অর্থাৎ গত ২৫ ফেব্রুয়ারি নগদ স্থিতি থাকে ২৫ কোটি টাকা, যা ডিএনসিসির ইতিহাসে সর্বনিম্ন।

ডিএনসিসি কর্তৃপক্ষ বলছে, সাবেক প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ তঞ্চকতার আশ্রয় গ্রহণ করে ফিক্সড ডিপোজিটের ৮২৫ কোটি টাকা এবং করপোরেশনের বিভিন্ন নির্দিষ্ট তহবিল—যেমন জামানত তহবিল, পেনশন তহবিল, শিক্ষা তহবিল, জেনারেল প্রভিডেন্ট ফান্ড ইত্যাদি খাতের চলতি/সঞ্চয়ী হিসাবের ৪৩৫ কোটি টাকা একত্র করে মোট ১ হাজার ২৬০ কোটি টাকার একটি হিসাব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করে নগরবাসীকে বিভ্রান্ত করার অপপ্রয়াস চালিয়েছেন এবং ডিএনসিসির বর্তমান প্রশাসনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা করেছেন মাত্র।

সাবেক প্রশাসক শেষ কর্মদিবসে ১০ ফেব্রুয়ারি সাধারণ তহবিলে স্থিতির বিষয়টি গুরুত্ব না দিয়ে এবং প্রকল্পগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা হয়েছে কি না, তা যাচাই না করে তাড়াহুড়ো করে ৩৬টি বিলের নথি অনুমোদন করে গেছেন, যাতে প্রায় ৪২ কোটি টাকা বিভিন্ন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পাবে।

ডিএনসিসি প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেন, ‘সাবেক প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ যদি কোনো দুর্নীতি করে থাকেন, সে বিষয়ে আইনকানুন আছে, সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমি শুনেছি এরই মধ্যে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ডিএনসিসিতে কিছু ফাইল আমার কাছে এসেছে। যেখানে অনৈতিক কাজ হয়েছে। সেগুলো আলাদা করেছি, খতিয়ে দেখছি। আগের প্রশাসক ১ হাজার ৪৭০ কোটি টাকা টেন্ডার করে ফান্ড ছাড়ের নির্দেশ দিয়েছেন। এর মধ্যে বাইরের কিছু প্রজেক্টও আছে। শুধু টেন্ডারই করেননি, ওয়ার্ক অর্ডারও দিয়ে গেছেন।’

ডিএনসিসি প্রশাসক আরও বলেন, ‘ওয়ার্ক অর্ডার দিয়ে গেলে একজন প্রশাসক হিসেবে সেটা বাতিল করার এখতিয়ার আমার নেই। কারণ ওই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আইনগতভাবে টেন্ডার পেয়েছে, তাকে প্রশাসক দিয়েছে। অনিয়মের মাধ্যমে দেওয়া টেন্ডারগুলো আমি বাতিল করতে পারি। তাই সব টেন্ডার নিয়ে কাজ শুরু করেছি। এটা নিয়ে তদন্ত কমিটি করে যেখানে অনিয়ম হয়েছে, সেগুলো খুঁজে বের করে ব্যবস্থা নেব। এসব অনিয়মের সঙ্গে যদি অফিসের কোনো কর্মকর্তাও জড়িত থাকেন তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

ডিএনসিসিতে চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ায় ২৫টি দরপত্র বাতিল করেছেন নতুন প্রশাসক। দায়িত্ব ছাড়ার আগে বৈধতা দিতে ব্যর্থ হয়ে গা বাঁচাতে তড়িঘড়ি করে প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ নিজে পাঁচটি দরপত্র বাতিল করেছিলেন।

চলতি অর্থবছরে প্রশাসক এজাজের নির্দেশে অঞ্চল-৫-এর অধীনে ৫৯টি দরপত্র আহ্বান করা হয়। আর্থিক ও কারিগরি অনুমোদন ছাড়াই ১৫৬ কোটি টাকার এসব দরপত্র আহ্বান করেন ডিএনসিসির অঞ্চল-৫-এর সাময়িক বরখাস্ত নির্বাহী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান। প্রশাসকের আশকারা পেয়ে বেপরোয়া হয়ে ওঠা এ প্রকৌশলী নিয়ম না মেনে আহ্বান করা দরপত্র অনুমোদনের জন্য করপোরেশনের ঊধ্বর্তন কর্মকর্তাদের চাপ প্রয়োগ করতেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এ বিষয়ে ডিএনসিসির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আরিফুর রহমান বলেন, ‘বাতিল হওয়া দরপত্রগুলোতে প্রশাসনিক, আর্থিক ও কারিগরি অনুমোদনের অভাব ছিল। তবে ৫৯টি দরপত্রের মধ্যে মাত্র কয়েকটির প্রশাসনিক, আর্থিক ও কারিগরি অনুমোদন ছিল, বাকিগুলোর কোনো অনুমোদন ছিল না। দরপত্রগুলো বর্তমানে দাপ্তরিক তদন্তের অধীনে রয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘কোনো প্রকৌশলী দরপত্র আহ্বান করতে চাইলে প্রথমে আর্থিক অনুমোদন নেবেন দপ্তর থেকে, তারপর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী থেকে প্রধান প্রকৌশলী সবার থেকে কারিগরি অনুমোদন নেবেন; কিন্তু এসব দরপত্রে এ ধরনের কোনো নিয়মই মানা হয়নি। আমরা জানিও না যে, এসব দরপত্র হয়েছে।’

যদিও সাবেক প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ অনুমোদন ছাড়া দরপত্র আহ্বান ও বাতিলের বিষয়টি অস্বীকার করেন। তিনি অভিযোগকারীদের বোঝার সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। এজাজ বলেন, ‘দরপত্র আহ্বানের আগে প্রধান প্রকৌশলী, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এবং সংশ্লিষ্টদের নিয়ে আর্থিক ও কারিগরি কমিটি যাচাই-বাছাই করলে প্রশাসক দরপত্র অনুমোদন করেন। আমার কাজ শুধু দরপত্র অনুমোদন করা ছিল। বাকি কাজ ছিল কমিটির। এতে যারা আমার সংশ্লিষ্টতা তুলছেন তারা হয়তো মিথ্যা বলছেন অথবা না বুঝে বলছেন।’

রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে বিজ্ঞান জাদুঘরের উল্টোদিকে ‘ভূইয়া বাড়ি, ৬০ পশ্চিম আগারগাঁও’ নাম ফলকযুক্ত পাঁচতলা বাড়িটি মোহাম্মদ এজাজের। তিনি বাড়ির সামনে পার্ক, লাইব্রেরি ও রাস্তা করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসকের দায়িত্বে থাকাকালে বাজারদরের চেয়ে কয়েকগুণ দাম বাড়িয়ে অযোগ্য ঠিকাদারের কাছ থেকে ওয়াকিটকি কিনেছে ডিএনসিসি। দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী অভিজ্ঞতা না থাকলেও ‘স্টেট আইটি’ নামে একটি দেশি কোম্পানি সরবরাহের কাজটি পেয়েছে। কাজ পাওয়ার জন্য চীনা একটি কোম্পানির সনদ ব্যবহার করেছে প্রতিষ্ঠানটি। অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও ওই কোম্পানির কাছ থেকে ৭ কোটি ৯৪ লাখ টাকায় আনুষঙ্গিক সরঞ্জামসহ ৩৮০টি ওয়াকিটকি কিনেছে ডিএনসিসি।

এজাজের বিরুদ্ধে গাবতলী হাটের ইজারা নিয়ে বড় অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দরদাতাকে ১৫ কোটি ৭১ লাখ টাকায় হাটের ইজারা দেওয়া হয়। এতে গাবতলী হাট ইজারায় ডিএনসিসির আর্থিক লোকসানের পরিমাণ দাঁড়ায় সাড়ে ৫ কোটি টাকার বেশি। প্রশাসকের পছন্দের ব্যক্তি সর্বোচ্চ দরদাতা হতে না পারায় দরপত্র আহ্বানে প্রক্রিয়াগত ভুল দেখিয়ে ইজারার পরিবর্তে খাস আদায়ের সিদ্ধান্ত দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

জানতে চাইলে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান কালবেলাকে বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের প্রতি বছরের আয় ও ব্যয়ের ভারসাম্য থাকতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দুটি সিটি করপোরেশনে কীভাবে তহবিল খরচ হবে, সে ব্যাপারে কোনো ধরনের স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি ছিল না। অনেক ধরনের উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় করা হয়েছে, আদৌ সেটা প্রয়োজন কি না তা নিয়ে কাউকে জবাবদিহি করতে হয়নি। টাকাগুলো এভাবে ব্যয় হলো, এফডিআর ভাঙা হলো এবং এখন দেখা যাচ্ছে যে তহবিল প্রায় শূন্য।’

তদারকির দায়িত্বে থাকা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা, সিটি করপোরেশনের প্রশাসক এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সামগ্রিক ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন বলে মনে করেন এই নগর পরিকল্পনাবিদ। ‘সত্যিই এত টাকা ব্যয় হলেও রাস্তাঘাট মশানিধন থেকে শুরু করে ড্রেনের ব্যবস্থাপনা কোনো জায়গাতেই সিটি করপোরেশনের নাগরিকরা ভালো কোনো সেবা পাননি। অন্তর্বর্তী সরকার, যাদের দায়িত্ব ছিল সংস্কার এবং তারা নিজেরাও বলেছে যে, আমরা সংস্কারটাকে প্রাধান্য দিচ্ছি তাহলে এভাবে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় বা উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। দুই সিটিতে সাবেক প্রশাসকদের কোনো দুর্নীতি বা স্বজনপ্রীতির ঘটনা থাকলে তা আমলে নিয়ে তদন্ত করা উচিত। যেন ভবিষ্যতে এ ধরনের কোনো ঘটনা পুনরাবৃত্তি না ঘটে।’

আদিল মুহাম্মদ খান আরও বলেন, ‘অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় দুর্বল ছিল, প্রশাসকেরও জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল না। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সাবেক মেয়র সাঈদ খোকন ও শেখ ফজলে নূর তাপসের সময়কার বিতর্কিত উন্নয়ন কাজের বিল পরিশোধ করার আগে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অডিট করা উচিত ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের; কিন্তু তারা সেটি করেনি।’

নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2019 bangladeshdailyonline.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com