

ইরান যুদ্ধের দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেছে। এর মধ্যেই শত শত মানুষের প্রাণহানি, লাখ লাখ মানুষের বাস্তুচ্যুতি এবং হাজারো কোটি ডলার ব্যয়ের মধ্য দিয়ে এই সংঘাত এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। যুদ্ধের এ ধ্বংসযজ্ঞ এখন শুধু ইরানেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং গোটা মধ্যপ্রাচ্যকে এক চরম অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিয়েছে। কবে এই সংঘাত থামবে বা শেষ পর্যন্ত ক্ষতির পরিমাণ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা নিয়ে বিশ্বজুড়েই এখন গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ন্যাশনাল পাবলিক রেডিওর (এনপিআর) এক বিশ্লেষণে বিশেষজ্ঞদের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে, বর্তমানে যেসব পরিসংখ্যান পাওয়া যাচ্ছে, তা কেবল দৃশ্যমান ও তাৎক্ষণিক তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে, বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রভাব ও বেসামরিক প্রাণহানির প্রকৃত চিত্র যখন সামনে আসবে, তখন এই ক্ষতির পরিমাণ বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বাহিনীর তীব্র হামলায় ইরানের পাশাপাশি লেবানন এবং অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলোও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্কুল, হাসপাতালসহ বিভিন্ন বেসামরিক স্থাপনায় হামলার কারণে মানবিক সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। অন্যদিকে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল সরবরাহ পথ হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতার কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম রেকর্ড পরিমাণ বেড়েছে, যার প্রভাব পড়ছে সারা বিশ্বের অর্থনীতিতে।
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এই যুদ্ধ কেবল সামরিক দিক থেকেই নয়, আর্থিকভাবেও এক বিশাল বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। মাত্র ১২ দিনের ব্যবধানে মার্কিন প্রশাসনকে বিপুল অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে। খোদ যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও এই যুদ্ধ নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে। সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, অর্ধেকের বেশি মার্কিন নাগরিক এ সংঘাতের বিপক্ষে মত দিয়েছেন।
যুদ্ধের একেবারে শুরুতেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। এরপর তার ছেলে মোজতবা খামেনি নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিরোধের ঘোষণা দেন।
আর্থিক ক্ষতি
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের তথ্যমতে, প্রথম ১২ দিনে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৬.৫ বিলিয়ন ডলার। ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র প্রথম ১০০ ঘণ্টাতেই ওয়াশিংটন খুইয়েছে প্রায় ৩.৭ বিলিয়ন ডলার।
কাঠামোগত ক্ষতি
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ও জয়েন্ট চিফস চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইনের দেওয়া তথ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল জোটের হামলায় লক্ষ্যবস্তু ছিল ১৫ হাজারের বেশি। এর মধ্যে মিনাব শহরের একটি স্কুলে হামলায় ১৬৮ জন নিহত হন, যাদের বেশির ভাগই শিশু। ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড বলছে, এ সময় ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হওয়া ইরানি নৌযানের সংখ্যা ৯০টির বেশি। ইউকে মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস বলছে, অত্র অঞ্চলে এ সময় আক্রান্ত হয় ১৬টি জাহাজ। ধ্বংস হয়েছে ৩০টির বেশি ইরানি মাইনলেয়ার।
জবাবে ইরান মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন ও ইসরায়েলি লক্ষ্যবস্তুতে দুই হাজারের বেশি ‘শাহেদ’ ড্রোন নিক্ষেপ করেছে। ইরাকের এরবিলে পশ্চিমা সামরিকঘাঁটিতেও ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। এই ড্রোন হামলার কৌশলগত ক্ষেত্রে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের সহায়তা রয়েছে বলে পশ্চিমা দেশগুলো দাবি করেছে।
জ্বালানি তেলের দাম
বিজনেস ইনসাইডারের মার্কেট ট্র্যাকারের তথ্যানুযায়ী, ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের সর্বোচ্চ দাম উঠেছিল প্রতি ব্যারেল ১১৯.৫০ ডলার। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা কর্তৃক ছাড়কৃত তেল ৪০ কোটি ব্যারেল ও যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত মজুদ থেকে ছাড়কৃত তেল ১৭.২ কোটি ব্যারেল।
এই যুদ্ধে পরাশক্তিগুলোর অবস্থানও স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। যেখানে রাশিয়া ইরানকে কৌশলগত সামরিক সহায়তা দিচ্ছে, সেখানে চীন ইরানের স্কুলে হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য মানবিক সহায়তা হিসেবে দুই লাখ ডলার অনুদান পাঠিয়েছে। অন্যদিকে যুদ্ধের বিপুল ব্যয় ও তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে নিজ দেশেই রাজনৈতিক চাপে পড়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।