

প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) সাবেক মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদের নকশাতেই বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক এম ইলিয়াস আলীকে গুম করা হয়। ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল রাতে মামুন খালেদের দিকনির্দেশনা অনুযায়ী, ডিজিএফআই ও র্যাবের বিশেষ দল ইলিয়াস আলীকে গুম করে। গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর মিরপুর মডেল থানার দেলোয়ার হোসেন হত্যা মামলায় পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিয়ে মামুন খালেদকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। এ ছাড়া বিএনপির আরেক নেতা চৌধুরী আলম গুমের ঘটনাতেও মামুন খালেদকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। এ ব্যাপারে মামুন খালেদ মুখ খুলতে শুরু করেছে বলে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান।
এদিকে মানবপাচার আইনে রাজধানীর পল্টন থানায় করা মামলায় সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও ফেনী-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে গতকাল ছয় দিনের রিমান্ডে নিয়েছে গোয়েন্দা পুলিশ। এ সাবেক সেনা কর্মকর্তা এক-এগারো সরকারের আমলে কয়েকটি ব্যবসায়ী গ্রুপের মালিকের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেন বলে অভিযোগ পেয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। এ ব্যাপারে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী টাকা নেওয়ার কথা অস্বীকার করেছেন। তবে গোয়েন্দা পুলিশের কাছে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার তথ্যপ্রমাণ রয়েছে। এ ছাড়া এক-এগারো সরকারের
আমলে ট্রুথ কমিশন গঠনের মাধ্যমে তিন শতাধিক সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে দায়মুক্তি দেওয়ার মাধ্যমে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ব্যাপারেও তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তবে এ অভিযোগ তিনি অস্বীকার করে বলেছেন, এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে অনেকেই যুক্ত ছিলেন। তারা শুধু তালিকা করে দিয়েছিলেন ট্রুথ কমিশনের কাছে।
এদিকে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে হত্যাযজ্ঞ এবং বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের গুমের অভিযোগে দুটি মামলায় আলোচিত দুই সাবেক সেনা কর্মকর্তা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ও শেখ মামুন খালেদকে আগামী ৭ এপ্রিল তাদের হাজির করার নির্দেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এই দুজনের মধ্যে মামুন খালেদ ছিলেন বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আয়নাঘরের রূপকার। ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল ঢাকার বনানী থেকে বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী গুমের সময় মামুন খালেদ ছিলেন ডিজিএফআইয়ের মহাপরিচালক।
একাধিক সূত্রে জানা গেছে, ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিকের নির্দেশে ইলিয়াস আলী গুমের সার্বিক নকশা তৈরি করেন মামুন খালেদ। পরবর্তীকালে তার দিকনির্দেশনাতেই ডিজিএফআই ও র্যাবের বিশেষ টিম ইলিয়াস আলীকে গুম করেন। পরবর্তীকালে র্যাব সব কিছু জেনেশুনেও ইলিয়াস আলীকে উদ্ধারে বেশ কয়েকটি অভিযানের নাটক সাজায়। এই নাটকের নকশাও মামুন খালেদ করে দেন। গত বছর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ১৬৪ ধারায় র্যাব সদস্য সার্জেন্ট তাহেরুল ইসলাম ইলিয়াস আলীকে অপহরণ ও হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে চাঞ্চল্যকর জবানবন্দি দেন। সেখানে উঠে আসে এই গুম ও হত্যাকাণ্ডের নির্দেশদাতা ছিলেন সেই সময়কার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জবানবন্দিতে উঠে আসে র্যাবের সাবেক কর্মকর্তা চাকরিচ্যুত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের নির্দেশে ঘটনার রাতে শেরাটন হোটেল থেকে তিনি ইলিয়াস আলীকে অনুসরণ করেন।
মহাখালী পৌঁছার পর জিয়াউল আহসান নিজেই আরেকটি টিম নিয়ে ইলিয়াস আলীর গাড়ি অনুসরণ করেন। ইলিয়াস আলীর গাড়ি বনানীর ২নং সড়কের বাসার সামনে পৌঁছার আগেই বনানীর সাউথ পয়েন্ট স্কুলের সামনে থেকে তাকে তুলে নেওয়া হয়। ইলিয়াস আলীর সঙ্গে তার ড্রাইভার আনসারকেও অপহরণ করা হয়। গাড়িটি জলখাবার হোটেলের সামনে দিয়ে বনানীর ২ নম্বর সড়কে ঢোকার পর এই অপহরণের ঘটনা ঘটে।
গুম কমিশন তদন্তকালে জানতে পারেনÑ জিয়াউল আহসানের রানার হিসেবে গুম ও খুন মিশনের হুকুম তামিল করতেন ওয়ারেন্ট অফিসার জিয়া ও ইমরুল। পরে বিষয়টি গুম কমিশন থেকে গত বছর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে জানায়। তারা এ ব্যাপারে অধিকতর তদন্তকালে ইলিয়াস আলী গুমের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উদ্ঘাটন করে। বেশ কয়েকজনকে শনাক্তও করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, ইলিয়াস আলীকে গুমের পর তার স্ত্রীকে নানা জায়গায় অভিযানের নামে বিভ্রান্ত করা হয়েছিল। এই বিভ্রান্ত করার নকশাও মামুন খালেদ তৈরি করেছিলেন। ঘটনার চার দিন পর র্যাব সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা ইলিয়াস আলীর স্ত্রীকে ফোন করে বলেছিলেনÑ আমাদের কাছে ইনফরমেশন আছে, উনাকে (ইলিয়াস আলী) পাওয়া যেতে পারে, আপনারা প্রিপারেশন রাখেন। এরপর ওই র্যাব কর্মকর্তা আরও একদিন ফোন করে একই কথা শোনান। একপর্যায়ে ফোন করা বন্ধ করে দেন। কয়েক দিন পর জনৈক এক ব্যক্তি ফোন করে ইলিয়াস আলীর স্ত্রীকে জানান, ইলিয়াস আলী জীবিত আছেন। আপনি ইচ্ছে করলে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারেন। কীভাবে সাক্ষাৎ করা যায় সেটিও তিনি বলে দেন। স্বামীর সন্ধান পেতে পর দিনই প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ চেয়ে আবেদন করে পরিবার। অনুমতিও মেলে। দুই পুত্র ও শিশুকন্যাকে গণভবনে ডাকেন শেখ হাসিনা। তার সন্তানদের মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনাও দেন।
শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাতের কিছু দিন পর গাজীপুরের পুবাইল থেকে ইলিয়াস আলীর স্ত্রীর মোবাইলে আরও একটি ফোন আসে। এক নারী ফোন করে জানান, ইলিয়াস আলীকে পাওয়া যেতে পারে, দ্রুত পুবাইলে আসেন। বেশ কয়েকজন দলীয় নেতা ও র্যাব কর্মকর্তাসহ দ্রুত পুবাইলে যায় তার পরিবার। সেখানে যাওয়ার পর স্থানীয়রা জানান, একজন লোককে মাইক্রোবাসে করে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এরপর তার স্ত্রীর কাছে আরও একটি উড়ো খবর আসেÑ মৌলভীবাজারের কুলাউড়া সীমান্তে ইলিয়াস আলীকে ফিরে পাওয়া যেতে পারে। সেখানে র্যাব অভিযান চালায়। পরে ইলিয়াস আলীর পরিবার জানতে পারে, বিভ্রান্ত করতেই এমন খবর রটানো হয়। র্যাবের এই নাটকের পেছনেও ছিলেন মামুন খালেদ।