শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬, ১১:৩৩ পূর্বাহ্ন

সুলতানচাঁপার রাজসিক সৌন্দর্য

বিডি ডেইলি অনলাইন ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬
  • ১৯ বার

প্রায় ২২ বছর আগে সুলতানচাঁপা দেখি মিরপুর বোটানিক্যাল গার্ডেনে। তখন ডিজিটাল ক্যামেরা ততটা সহজলভ্য ছিল না। ম্যানুয়েল ক্যামেরায় ছবি তুলে প্রিন্ট করে দেখাই অধ্যাপক দ্বিজেন শর্মাকে। তার মুখেই প্রথম সুলতানচাঁপার নাম শুনি। গ্রামে দেখা কন্ন্যাল বা পুন্নাগ গাছই যে সুলতানচাঁপা সে রহস্যটাও তিনিই উন্মোচন করেন। ছেলেবেলায় ফুলের সৌন্দর্য খুব একটা চোখে না পড়লেও গাছতলায় অনেকবার পরিপক্ক ফল দেখেছি। যখন স্কুলে পড়ি তখনো গ্রামের বাজারে হাটবারে কন্ন্যাল (ফল) বিক্রি হতে দেখেছি। এ কারণে বোটানিক্যাল গার্ডেনে রাজসিক গড়নের সেই একই পাতার গাছ দেখে কিছুটা বিভ্রান্ত হয়েছিলাম।

২০২৫ সালে ঘটল চমকপ্রদ এক ঘটনা। একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলকে সাক্ষাৎকার দেওয়ার জন্য গিয়েছিলাম রমনা নার্সারিতে। অভ্যাসবশত প্রিয় গাছগুলো দেখছিলাম। আগাম বৃষ্টিতে প্রাণ-প্রাচুর্যে রূপসী হয়ে উঠেছিল গাছগুলো। হঠাৎ চোখ আটকে গেল একটি গাছে। ফুলভর্তি গাছটি। সাদা রঙের ফুলগুলো স্নিগ্ধতা ছড়াচ্ছে। মুহূর্তে ছুটে গেলাম গাছটির কাছে। বিস্মিত আমি, চোখ বড় বড় করে অপলক তাকিয়ে থাকলাম গাছটির দিকে। ছুঁয়ে দেখলাম। বিড় বিড় করে বললাম, কত বড় হয়েছে গাছটি।

২০১৩ সালে সুলতানচাঁপার দুটো গাছ রোপণ করি এখানে। একটি হারিয়ে গেলেও বেঁচে আছে এই গাছটি। সুদর্শন পাতা ও ডালপালায় বেশ সুদৃশ্য হয়ে উঠেছে। সুলতানচাঁপার প্রতি আমার কিঞ্চিৎ পক্ষপাত রয়েছে। সুদর্শন এই গাছ ঢাকায় বেশ দুষ্প্রাপ্য। জানামতে ঢাকার মিরপুরে জাতীয় উদ্ভিদ-উদ্যানের কয়েকটি গাছই ছিল ঢাকাবাসীর জন্য। এ কারণে অনেক কষ্টে সংগ্রহ করা দুটি চারা রমনা পার্কে রোপণ করি সেখানে। যার একটি এখন মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। কয়েক বছর খোঁজখবর নেওয়ার পর গাছ দুটির কথা বেমালুম ভুলেই গিয়েছিলাম। সেদিন আক্ষরিক অর্থেই চমকে গিয়েছিলাম। জানি না, কত বছর ধরে ফুল ফুটছে গাছটিতে। পরে অবশ্য চারুকলা অনুষদ এবং বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণেও দুটি গাছ লাগানো হয়েছে। অথচ এমন সুদর্শন গাছ নগরের বৃক্ষায়ণ পরিকল্পনায় আরও বেশি পরিমাণে থাকা প্রয়োজন।
সুলতানচাঁপা উপকূলীয় অঞ্চলের গাছ হলেও ইদানীং সংখ্যায় অনেক কমেছে। ২০১৪ সালের জুলাই মাসের বর্ষণমুখর কোনো একদিন লক্ষ্মীপুর জেলার রামগতি থেকে সোনাপুর আসার পথে সুলতানচাঁপার যে প্রস্ফুটন প্রাচুর্য দেখেছি তা কোনোদিনই ভুলব না। একসঙ্গে ৫টি গাছে ফুল ফুটেছে। গুচ্ছবদ্ধ অসংখ্য ফুলের সৌরভ ছড়িয়ে পড়েছে চারপাশে। কিন্তু সেদিন হাতের কাছে পেয়েও সঙ্গে ক্যামেরা ছিল না বলে ফুলটি অধরাই থেকে গেল! ফিরে এলাম দুঃখবোধ নিয়ে। এই অপ্রাপ্তি অনেকদিন তাড়া করে ফিরেছে। ২০১৫ সালে একেবারে পাকাপোক্ত ব্যবস্থা করে আবার গেলাম সেখানে। না, এবারও নাগাল পেলাম না ফুলটির। ফোটেনি যথাসময়ে। মনে হলো সময়ের গরমিল! হয়তো কিছুটা আগেই ফুটেছে, না হয় কয়েকটা দিন পরেই ফুটবে।

সুলতানচাঁপা (Calophyllum inophyllum) চিরসবুজ লম্বাটে গড়নের বৃক্ষ। সাধারণত ১২ মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। পাতা ঝলমলে সবুজ, আগা গোল। স্থানানুসারে গ্রীষ্মের শেষ থেকে শীত পর্যন্ত সুগন্ধি ফুল ফোটে। তবে বেশিরভাগ সময়ই বর্ষায় ফুটতে দেখা যায়। শাখায়িত মঞ্জরিতে ছোট ছোট সুগন্ধি সাদা ফুল ফোটে। ৪-গুচ্ছের পুংকেশর হলুদ রঙের। আকারে ছোট হলেও ফুলের গড়ন বেশ রাজসিক।

সুলতানচাঁপার কাঠ নানা কাজে লাগে। গাছের বিভিন্ন অংশ ভেষজ চিকিৎসায় ব্যবহার্য। বীজ থেকে তৈরি হয় সবুজ রঙের সুগন্ধি তেল। বাজারে এই তেলের নাম ডিমো বা পিনেই অয়েল। তেল বিভিন্ন ধরনের ক্ষতচিকিৎসায় কাজে লাগে। ছায়াবৃক্ষ হিসেবেও অনন্য। এ গাছ থেকে এক ধরনের ধুনা গদ তৈরি হয় যা বাণিজ্যিকভাবে টাকামাকা গাম  নামে পরিচিত। বাকলের রস শক্তিশালী রেচক এবং পাতার নির্যাস চোখের ক্ষত নিরাময়ে উপকারী। ফুল চর্মরোগ এবং মানসিক রোগের চিকিৎসায় কার্যকর। আমাদের দেশে এ গাছ কাঠ, রঙ ও তেলের জন্য ব্যবহার হলেও ভারতে জাল রাঙানো থেকে শুরু করে বিচিত্র কাজে ব্যবহৃত হতে দেখা যায়।

লেখক : প্রকৃতি ও পরিবেশবিষয়ক লেখক

নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2019 bangladeshdailyonline.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com