

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সৃষ্ট যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে চলেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের মূল্য ছিল ৬৫ মার্কিন ডলার। মাত্র ২৪ দিনের ব্যবধানে তা ১২০ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। যুদ্ধ যদি ছয় মাস স্থায়ী হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল ব্যারেলপ্রতি ১৫০ মার্কিন ডলার এবং যুদ্ধ এক বছর স্থায়ী হলে তেলের মূল্য ২০০ মার্কিন ডলার অতিক্রম করতে পারে।
জ্বালানি তেল এমনই এক উপকরণ, যা বেশির ভাগ উৎপাদন কার্যক্রমের প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে প্রয়োজন হয়। জ্বালানি তেলের কার্যকর বিকল্প এখনো উদ্ভাবিত হয়নি। জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির ফলে বাংলাদেশের মতো জ্বালানি তেল আমদানিনির্ভর দেশগুলো সবচেয়ে বিপদে পতিত হয়েছে। জ্বালানি তেল রিজার্ভারের ধারণক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে আপৎকালীন বিশাল মজুদ গড়ে তোলা সম্ভব হয় না।
এর আগে সরকারের পক্ষ থেকে জ্বালানি তেল ব্যবহারের ক্ষেত্রে সংযমী হওয়ার জন্য সবার প্রতি আহবান জানানো হয়েছিল, কিন্তু তাতে পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হয়নি। এই অবস্থায় গত ২৫ মার্চ সকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে তাঁর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক বিশেষ জরুরি সভায় দেশের জ্বালানি তেল সংকট পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করা হয়। এতে বলা হয়, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে দেশে জ্বালানি তেলের সংকট দেখা দিয়েছে। তবে এই মুহূর্তে জনগণের অসুবিধার কথা বিবেচনা করে সরকার ঢালাওভাবে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পক্ষে নয়।
উল্লেখ্য, এর আগে বিমানের জন্য ব্যবহার্য জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি করা হলেও সাধারণভাবে জ্বালানি তেলের মূল্য অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। সরকার জনগণকে আতঙ্কিত না হওয়ার জন্য পরামর্শ দিয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি যে এক শ্রেণির অসৎ ব্যবসায়ী পেট্রল পাম্পের জ্বালানি তেল চোরাপথে খোলাবাজারে বিক্রি করে দিচ্ছেন। ফলে পেট্রল পাম্পে তেল পাওয়া না গেলেও খোলাবাজারে উচ্চমূল্যে জ্বালানি তেল পাওয়া যাচ্ছে। প্রতিটি পেট্রল পাম্পের সামনে জ্বালানি তেল ক্রয়ে আগ্রহীদের প্রচণ্ড ভিড় লক্ষ করা যাচ্ছে।
যুদ্ধের কারণে পুরো বিশ্ব এখন উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল মনে করেছিল, ইরানের শীর্ষ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যা করলে ইরানি জনগণ সরকার পতনের দাবিতে রাস্তায় নামবে। ফলে খুব সহজেই ইরানের শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন সাধন করে নিজেদের পছন্দের কাউকে ক্ষমতায় বসানো সম্ভব হবে। কিন্তু আক্রমণকারীদের সেই প্রত্যাশা পূরণ হওয়ার কোনো সম্ভাবনা আপাতত দেখা যাচ্ছে না, বরং এই অপরিণামদর্শী যুদ্ধ ইরানি জাতিকে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি ঐক্যবদ্ধ করেছে। আক্রান্ত হওয়ার পর ইরান এভাবে ঘুরে দাঁড়াবে এবং প্রতি আক্রমণ শুরু করবে, তা খোদ যুক্তরাষ্ট্রও ভাবতে পারেনি। এর আগেও ইরান-ইসরায়েল প্রথাগত যুদ্ধ হয়েছে, কিন্তু সেই যুদ্ধের সঙ্গে এবারের যুদ্ধের মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। আগেরবার ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি অংশগ্রহণ না করে প্রক্সি যুদ্ধ করেছে। আর এবার যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ইরানে আক্রমণ চালিয়েছে এবং ইসরায়েল তাতে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে যুদ্ধে অংশ নিয়েছে। এর আগে ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের সময় আক্রমণ-প্রতি আক্রমণ যুদ্ধরত দুটি দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু এবারের যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের অন্তত ১২টি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের যেসব মুসলিম দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি বা স্থাপনা রয়েছে, তার প্রতিটিকেই লক্ষ্যবস্তু হিসেবে নির্ধারণ করে ইরান আক্রমণ করে চলেছে। শুধু মার্কিন সামরিক স্থাপনায়ই নয়, ইরান এসব দেশের জ্বালানি তেল উৎপাদন ও শোধনাগারেও মিসাইল হামলা চালিয়ে ব্যাপক ক্ষতি করেছে। ফলে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের সংকট তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যুদ্ধ যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় (যে আশঙ্কা অত্যন্ত প্রকট), তাহলে জ্বালানি তেলের সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। তৈলাস্ত্রের কী ক্ষমতা, তা বিশ্ববাসী প্রথমবার প্রত্যক্ষ করেছিল ১৯৭৩ সালে ইসরায়েল-আরব যুদ্ধের সময়। সেই সময় যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর আরব দেশগুলো জ্বালানি তেল রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছিল। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়। যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের মূল্য ছিল ব্যারেলপ্রতি তিন মার্কিন ডলার। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে তা ১২ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছিল। নিকট অতীতে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির অস্বাভাবিক আচরণ প্রত্যক্ষ করা গেছে ২০০৮ সালে। সেই সময় বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিয়েছিল। জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি পেয়ে একসময় ব্যারেলপ্রতি ১৪৮ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছিল। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর ২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশগুলো রাশিয়ান জ্বালানি তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। একই সঙ্গে ওপেকভুক্ত দেশগুলো জ্বালানি তেলের উত্তোলন স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে কমিয়ে দেয়। এতে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের সংকট দেখা দেয়। উল্লেখ্য, রাশিয়া বিশ্ব জ্বালানি তেলের এক-দশমাংশ জোগান দেয়। রাশিয়া সেই সময় ভিন্ন পথে জ্বালানি তেল রপ্তানি শুরু করে। এ ছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলো রাশিয়া থেকে গোপনে জ্বালানি ক্রয় করলে তাদের রাশিয়ান মুদ্রা রুবলের মাধ্যমে মূল্য পরিশোধ করতে হতো। ২০২২ সালে যে জ্বালানি তেলের সংকট সৃষ্টি হয়েছিল, তার মূলে ছিল প্রধানত পরিবহনব্যবস্থার দুর্বলতা। কিন্তু ২০২৬ সালে ইরানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী যে জ্বালানি তেলের সংকট শুরু হয়েছে, তার পেছনে পরিবহন সংকটের পাশাপাশি উৎপাদন হ্রাস পাওয়ার বিষয়টিও সমভাবে দায়ী। কারণ ইরান মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন স্থাপনার পাশাপাশি দেশগুলোর তেলক্ষেত্রে এবং জ্বালানি তেল শোধনাগারেও হামলা চালাচ্ছে। ফলে এসব দেশ তাদের জ্বালানি তেলক্ষেত্রগুলো নিরাপত্তার কারণে বন্ধ করে দিয়েছে অথবা উৎপাদন হ্রাস করেছে। ২০২২ সালে বিভিন্ন দেশের মজুদ থেকে ১৮ কোটি ব্যারেল জ্বালানি তেল বাজারে ছেড়ে কিছুটা হলেও পরিস্থিতি সামাল দেওয়া গিয়েছিল। কিন্তু এবার ৪০ কোটি ব্যারেল জ্বালানি তেল বাজারে ছাড়ার ঘোষণা দিয়েও পরিস্থিতির কোনো আশাব্যঞ্জক উন্নতি করা যাচ্ছে না। এই জ্বালানি তেলের মজুদ রয়েছে মূলত যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি সহানুভূতিসম্পন্ন কয়েকটি দেশে। কিন্তু পরিবহন সংকটের কারণে মজুদকৃত এসব জ্বালানি তেল বাজারে আনা যাচ্ছে না। এসব জ্বালানি তেল বাজারে আনতে হলে হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করতে হবে। ইরান পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও তার প্রতি সহানুভূতিসম্পন্ন কোনো দেশের জ্বালানি তেলবাহী জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে দেওয়া হবে না। বিশ্ব জ্বালানি তেলের অন্তত ২০ শতাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্র দেশগুলোকে হরমুজ প্রণালি ইরানের প্রভাবমুক্ত করার জন্য যুদ্ধজাহাজ প্রেরণের অনুরোধ করলেও তা প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করা আপাতত সম্ভব হচ্ছে না।
সৌদি আরব ও ইরাকের মধ্যে জ্বালানি তেল পরিবহনের জন্য কিছু বিকল্প পাইপলাইন রয়েছে। কিন্তু সেগুলোর ধারণক্ষমতা খুব একটা বেশি নয়, যা দিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবেলা করা সম্ভব হবে। প্রতিদিন গড়ে সাড়ে তিন থেকে সাড়ে পাঁচ মিলিয়ন ব্যারেল জ্বালানি তেল এসব পাইপলাইন দিয়ে সঞ্চালন করা সম্ভব। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা বিদ্যমান। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বছরে প্রায় ১১২ বিলিয়ন মিটার লিকুইফাইড ন্যাচারাল গ্যাস (এলএনজি) যেত। বর্তমানে হরমুজ প্রণালি দিয়ে এখন আর কোনো এলএনজি পরিবহন সম্ভব হচ্ছে না। এলএনজি সরবরাহের একটি বিকল্প পথ আছে, যা কাতার থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাত হয়ে ওমান পর্যন্ত চলে গেছে। কিন্তু এই পাইপলাইনের সঞ্চালনক্ষমতা বছরে ২০ থেকে ২২ বিলিয়ন ঘনমিটার। কিন্তু এই স্বল্প পরিমাণ এলএনজি দিয়ে চাহিদা মেটানো সম্ভব নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের বৃহৎ আর্থিক প্রতিষ্ঠান ব্ল্যাকরকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ল্যারি ফিংক বলেছেন, ইরান যদি ভূ-রাজনৈতিকভাবে পশ্চিমাদের জন্য হুমকি হিসেবে থেকে যায় এবং জ্বালানি তেলের মূল্য ব্যারেলপ্রতি ১৫০ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয় এবং কিছুদিন স্থায়ী হয়, তাহলে প্রতিটি দেশের অর্থনীতিতে তার বিরূপ প্রভাব পড়বে। এতে জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি পাবে, উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে এবং ভোক্তা ব্যয় কমে যাবে। ফলে বিশ্ব অর্থনীতি নিশ্চিতভাবেই মন্দার কবলে পতিত হবে।
যুদ্ধ কত দিন চলবে এবং হরমুজ প্রণালি কত দিন বন্ধ থাকবে, তা নিশ্চিত নয়। ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি তেলের বাজার কখন স্থিতিশীল ও স্বাভাবিক হয়ে আসবে, তা নিশ্চিত করে কেউই বলতে পারছে না। চলমান যুদ্ধে বাংলাদেশ কোনো পক্ষভুক্ত নয়, জড়িত তো নয়ই। কিন্তু তার পরও এই যুদ্ধের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে আমরা মুক্ত থাকতে পারছি না। বাংলাদেশ আমদানীকৃত জ্বালানিনির্ভর একটি দেশ। আমাদের প্রতিটি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে যে জ্বালানিশক্তি ব্যবহৃত হয়, তা বিদেশ থেকে উচ্চমূল্যে ক্রয় করে আনতে হয়। বাংলাদেশের নিজস্ব জ্বালানি বলতে একমাত্র প্রাকৃতিক গ্যাসকেই বোঝায়, কিন্তু সেই গ্যাসের জোগানও দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাতে নিশ্চিতভাবেই বলা যেতে পারে যে আমরা ভবিষ্যতে মারাত্মক বিপদে পতিত হতে যাচ্ছি। সম্ভাব্য জ্বালানিসংকট মোকাবেলার জন্য আমাদের এখনই উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এ জন্য স্বল্পমেয়াদি উদ্যোগের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে জ্বালানি স্থিতিশীলতা সৃষ্টি হয়। দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগের মধ্যে নতুন নতুন গ্যাসক্ষেত্রে অনুসন্ধান ও উত্তোলনের ব্যবস্থা করতে হবে। যেসব গ্যাসফিল্ডে গ্যাস আছে, কিন্তু এখনো উত্তোলন শুরু হয়নি, সেগুলোতে উত্তোলন কার্যক্রম শুরু করতে হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে ভারত ও মায়ানমারের মীমাংসিত সমুদ্রসীমায় তেল-গ্যাস উত্তোলনের উদ্যোগ নিতে হবে। প্রয়োজনে গভীর সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য বিদেশি কম্পানির সঙ্গে চুক্তি করা যেতে পারে।
গ্যাস ও জ্বালানি তেল ব্যবহারের ক্ষেত্রে সরকার কৃচ্ছ্র সাধনের আহবান জানিয়েছে। এর প্রতি গুরুত্বারোপ করে সর্বপর্যায়ে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমাদের মিতব্যয়ী হতে হবে। একই সঙ্গে জ্বালানি তেল আমদানির জন্য নতুন নতুন সূত্র খুঁজে বের করতে হবে। বাংলাদেশ চেষ্টা করলে সরাসরি রাশিয়া থেকে জ্বালানি তেল আমদানি করতে পারে। এর পাশাপাশি ভারত ও চীন থেকে জ্বালানি তেল আমদানি করা যেতে পারে। ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা চলাকালে চীন ইরান থেকে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল আমদানি করে বিশাল মজুদ গড়ে তুলেছে। কাজেই সেখান থেকে জ্বালানি তেল আমদানি করা যেতে পারে। আর তাৎক্ষণিক প্রয়োজন মেটানোর জন্য ভারত থেকে জ্বালানি তেল আমদানি করা যায়। সরকার জ্বালানি তেলের সংকট নিয়ে সচেতন রয়েছে। আগামী তিন মাসের জন্য জ্বালানি তেল আমদানির পরিকল্পনা নির্ধারণ করেছে। এই পরিকল্পনা মোতাবেক এপ্রিল মাসে চার লাখ ৫০ হাজার টন, মে মাসে চার লাখ ৯০ হাজার পাঁচ টন এবং জুন মাসে চার লাখ ৩০ হাজার টন জ্বালানি তেল আমদানি করা হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল ডিজেলের মূল্য ৮৮.৪৪ থেকে ২৩৬.৬০ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। অকটেনের মূল্য ৭৮.৩৯ থেকে ১৬৩.৭১ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। জেট ফুয়েলের মূল্য ৮৯.৪০ থেকে ২২৮.৪০ মার্কিন ডলারে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি সত্ত্বেও সরকার জেট ফুয়েল ছাড়া অন্য কোনো জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি করেনি। অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি পর্যাপ্ত পরিমাণ জ্বালানি তেল আমদানি নিশ্চিত করতে হবে।
জ্বালানি তেল আমদানির বিষয়টি কিছুটা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার বটে। এ ছাড়া একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল আমদানি করে রাখাও সম্ভব নয়। কারণ বাংলাদেশে জ্বালানি তেল সংরক্ষণের জন্য যে রিজার্ভার রয়েছে, তার ধারণক্ষমতা বেশি নয়। বাংলাদেশ বর্তমানে জ্বালানি তেলের যে সংকট মোকাবেলা করছে, তা সাময়িক। তাই আমাদের এখন ধৈর্যধারণ করতে হবে। কারো সিদ্ধান্তগত ভুলের কারণে এই সংকট তৈরি হয়নি। তাই সরকারকে পরিস্থিতি মোকাবেলার সময় দিতে হবে। এই মুহূর্তে সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হবে ধৈর্য ধরে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা এবং সর্বপর্যায়ে জ্বালানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে কৃচ্ছ্র সাধন করা।
লেখক : সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বর্তমানে প্রফেসর ইমেরিটাস এবং বাহরাইনে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত