

গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের সরকার পতনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকার দেশের স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে প্রণয়ন করা অপারেশনাল প্ল্যান (ওপি) বাতিল করে দেয়। এতে দীর্ঘদিন ধরে সফলভাবে পরিচালিত রোগ প্রতিরোধমূলক কর্মসূচিগুলো একের পর এক স্থবির হয়ে পড়ে। এসব কর্মসূচির মধ্যে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইনের পরিধি কমেছে, বন্ধ হয়ে গেছে কৃমি নিয়ন্ত্রণ সপ্তাহের কার্যক্রম। এ ছাড়া স্থগিত রয়েছে ম্যালেরিয়া ও কালাজ্বর কার্যক্রম; সক্রিয় নেই সংক্রামক ও অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমও। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অপারেশনাল প্ল্যান বাতিলসহ হেঁয়ালিতে ভরা ইউনূস সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে অচল করে দিয়েছে, যার প্রাথমিক বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে হামের প্রাদুর্ভাবের মাধ্যমে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে সামনে স্বাস্থ্য খাতে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিচ্ছে বর্তমান সরকার।
শিশু স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বড় ধাক্কা: দেশের শিশুস্বাস্থ্য সুরক্ষার সবচেয়ে কার্যকর ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কর্মসূচিগুলোর একটি ছিল জাতীয় ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইন। ১৯৭৪ সালে শুরু হওয়া এ উদ্যোগের মাধ্যমে অপুষ্টিজনিত অন্ধত্ব কার্যত নির্মূলের পর্যায়ে নিয়ে আসা সম্ভব হয়। একই সঙ্গে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুহার প্রায় ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে এই কর্মসূচির ভূমিকা রয়েছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে বছরে দুবার পরিচালিত এই কর্মসূচির মাধ্যমে ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী প্রায় ৯৮ শতাংশ শিশুকে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো হতো। কিন্তু ২০২৫ সালে তা কমিয়ে ১ বারে নামিয়ে আনা হয়, যাকে শিশুস্বাস্থ্য সুরক্ষার ক্ষেত্রে বড় ধরনের পশ্চাৎপদতা হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
একইভাবে কৃমি নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিও ছিল শিশুদের অপুষ্টি, রক্তস্বল্পতা ও শারীরিক বিকাশে বাধা প্রতিরোধের অন্যতম হাতিয়ার। ২০২৩ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর জাতীয় কৃমি নিয়ন্ত্রণ সপ্তাহে প্রায় ২ কোটি ৬০ লাখ শিশুকে কৃমিনাশক ওষুধ খাওয়ানো হতো। স্কুলগামী থেকে পথশিশু—সবাই এই কর্মসূচির আওতায় আসত। এমনকি সয়েল ট্রান্সমিটেড হেলমিনথোসিসও নির্মূলের পথে ছিল। কিন্তু এই কর্মসূচি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শিশুদের মধ্যে কৃমি সংক্রমণ ফের বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, কৃমিতে আক্রান্তদের মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশই ৫ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশু (৩২ শতাংশ)। ফলে এই কর্মসূচির স্থবিরতা সরাসরি শিশুস্বাস্থ্যকে হুমকির মুখে ফেলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব প্রতিরোধমূলক কর্মসূচি বন্ধ হয়ে গেলে তার প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে দৃশ্যমান না হলেও কিছুদিনের মধ্যেই অপুষ্টি, রোগপ্রবণতা ও শিশুমৃত্যুর হার বাড়তে শুরু করবে।
নিয়ন্ত্রণে থাকা রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা: গত এক দশকে বাংলাদেশ সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছিল, যা আন্তর্জাতিক মহলে প্রশংসিতও হয়। ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ এর অন্যতম উদাহরণ। ২০০৮ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে আক্রান্তের হার ৮০ শতাংশ এবং মৃত্যুহার ৯৬ শতাংশ কমানো সম্ভব হয়। কিন্তু এই অগ্রগতির ধারাবাহিকতা এখন বড় প্রশ্নের মুখে। ২০২৪ সাল থেকে ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির কার্যক্রম কার্যত স্থগিত রয়েছে। অথচ দেশে এখনো ১৩টি জেলা ম্যালেরিয়াপ্রবণ হিসেবে চিহ্নিত, যেখানে ২০২৩ সালেই ১৬ হাজার ৫৬৭ জন আক্রান্ত হয় এবং ৬ জনের মৃত্যু ঘটে। স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম বিশেষ করে মশারি বিতরণ, দ্রুত শনাক্তকরণ ও স্থানীয় চিকিৎসা বন্ধ করার কারণে অল্প সময়ের মধ্যেই সংক্রমণ ফের বাড়তে শুরু করবে।
একই চিত্র কালাজ্বরের ক্ষেত্রেও। দীর্ঘ প্রায় ১৮ বছরের ধারাবাহিক কর্মসূচির মাধ্যমে এই রোগকে উপজেলা পর্যায়ে প্রায় নির্মূল অবস্থায় আনা হয়েছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে কার্যক্রম বন্ধ থাকায় প্রায় ৩৮ মিলিয়ন ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে রোগটি ফের ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। একবার শিথিল হলেই আগের অর্জন দ্রুত হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এসব রোগ ভয়াবহ আকারে ছড়িয়ে দেশের স্বাস্থ্য খাতে বিপর্যয়ও ডেকে আনতে পারে।
এ বছর বাড়বে ডেঙ্গু-চিকুনগুনিয়া: বর্তমান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে পরিবর্তিত আবহাওয়া। চলতি বছর শুরু থেকেই তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি এবং মৌসুমের আগেই অনিয়মিত বৃষ্টিপাত শুরু হয়েছে। এ আবহাওয়া এডিস মশার বংশবিস্তার ও বিস্তারের জন্য অত্যন্ত অনুকূল।
গত বছর ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার পরও কার্যকর প্রস্তুতি না থাকায় এ বছর আরও ভয়াবহ পরিস্থিতির আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, নগর ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা, জলাবদ্ধতা এবং সমন্বিত মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। চিকুনগুনিয়া ও অন্যান্য বাহকবাহিত রোগও একই সঙ্গে বাড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। ফলে স্বাস্থ্য খাতের বিদ্যমান স্থবিরতার সঙ্গে জলবায়ুজনিত এই চাপ যুক্ত হয়ে একটি ‘ডাবল সংকট’ তৈরি করছে।
ওপি বাতিলে ভেঙে পড়ছে কাঠামো: বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বাস্থ্য খাতের বর্তমান সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে অপারেশনাল প্ল্যান (ওপি) বাতিলের সিদ্ধান্ত। ১৯৯৮ সাল থেকে চালু হওয়া এই সেক্টরভিত্তিক কর্মসূচি দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসে। এর আওতায় টিকাদান, মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য, রোগ নিয়ন্ত্রণ, হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা, মানবসম্পদ উন্নয়ন সবকিছু একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অধীনে পরিচালিত হতো। ফলে বিচ্ছিন্ন প্রকল্পের পরিবর্তে সমন্বিত উন্নয়ন সম্ভব হয়েছিল।
কিন্তু ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কর্তৃক ২০২৫-২০২৯ মেয়াদের পঞ্চম এইচএনপিএসপি বাতিল করে দুই বছর মেয়াদি প্রকল্প নেওয়ার সিদ্ধান্ত পুরো কাঠামোকেই ভেঙে দেয়। এমনকি শেষ পর্যন্ত তারা দুই বছর মেয়াদি সেই প্রকল্পও গ্রহণ করেনি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাঁচ বছরের ধারাবাহিক কর্মসূচিকে হঠাৎ করে বন্ধ করা বাস্তবসম্মত নয়, যার পরিণতি আমরা এরই মধ্যে দেখাতে পাচ্ছি। হামের মতো একটি নিয়ন্ত্রিত রোগে এরই মধ্যে শতাধিক শিশুর মৃত্যু ঘটেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, এই সিদ্ধান্তের ফলে শুধু চলমান কর্মসূচিই নয়, ভবিষ্যতের পরিকল্পনাও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এতে স্বাস্থ্যসেবার প্রাপ্যতা কমবে, রোগীর চাপ বাড়বে এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর আর্থিক বোঝা বাড়বে। সব মিলিয়ে, দীর্ঘদিনের অর্জনের ওপর দাঁড়িয়ে গড়ে ওঠা স্বাস্থ্য খাতের কাঠামো এখন ভেঙে পড়ার মুখে যার প্রভাব পড়তে পারে দেশের প্রতিটি পরিবারে।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) ভাইরোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সি বলেন, বিগত সরকার কোনো বেজলাইন সার্ভে বা জরিপ না করেই ট্রিলিয়ন ডলারের ওপি বাতিল করেছে। এমনকি এর বিকল্প কী হবে সেটিও তারা ঠিক করেনি। ফলে স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, পাঁচ বছর মেয়াদি ধারাবাহিক কর্মসূচির কারণেই সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে সাফল্য এসেছে। দুই বছরের প্রকল্প দিয়ে এই অর্জন ধরে রাখা সম্ভব নয়। এতে রোগ বাড়বে, সেবা কমবে এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে।
চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিচ্ছে বর্তমান সরকার: স্বাস্থ্য খাতের এই স্থবিরতা এবং নিয়ন্ত্রিত রোগের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি মোকাবিলার গুরুত্ব অনুধাবন করে বর্তমান সরকার বিশেষ প্রস্তুতি গ্রহণ শুরু করেছে। বিশেষ করে শিশুদের হামের প্রাদুর্ভাব রুখতে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিগত সরকারের নীতিগত পরিবর্তনের কারণে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে এবং স্বাস্থ্য খাতে সম্ভাব্য বিপর্যয় ঠেকাতে পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণই এখন সরকারের মূল চ্যালেঞ্জ।
স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাজমুল হোসেন বলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে হাম একটি আতঙ্ক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। চার-পাঁচ মাস বয়সী শিশুরা আক্রান্ত হতে শুরু করেছে। এরই মধ্যে টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে। তবে এর সঙ্গে ভিটামিন ‘এ’ ও কৃমিনাশক খাওয়াতে হবে। নয়তো এ ধরনের রোগের প্রাদুর্ভাব সামনে আমরা আরও দেখতে পাব।