

দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর যখন কামানের গর্জন স্তিমিত হয়ে আসে এবং বারুদের কটু গন্ধ ছাপিয়ে বাতাসে স্বাভাবিক আর্দ্রতা ফিরে আসে, তখন ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া বিপন্ন মানুষগুলো, প্রথম যে অমূল্য সম্পদটি খুঁজে পায় তা হলো, এক চিলতে ‘স্বস্তি’। সম্প্রতি ইরান, ইসরায়েল এবং আমেরিকার পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ মধ্যস্থতায় মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যে যুদ্ধবিরতির সুর প্রতিধ্বনিত হচ্ছে, তা বিশ্ববাসীর জন্য সাময়িক স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেও, সচেতন মানুষের মনে এক সুগভীর সংশয় ঝুলিয়ে রেখেছে। কেউ কেউ মনে করছেন, এই বিরতি কি পরবর্তী প্রলয়ের প্রস্তুতি? ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতি বা ‘সিজফায়ার’ শব্দের সংজ্ঞা প্রায়ই ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ১৯৪৮ সাল থেকে শুরু করে গত দশকের সিরীয়া বা ইয়েমেন সংকট প্রতিটি ক্ষেত্রে দেখা গেছে, যুদ্ধবিরতি স্থায়ী শান্তির ভিত্তি হিসেবে কাজ করার বদলে, বিবদমান পক্ষগুলোর জন্য অস্ত্রশস্ত্র পুনর্গঠন এবং রণকৌশল নতুনভাবে সাজানোর এক ‘কৌশলগত বিরতি’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। গ্লোবাল পিস ইনডেক্স এবং মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক গবেষণা সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, বিগত দুই দশকে এই অঞ্চলে সম্পাদিত প্রায় ৭০% যুদ্ধবিরতি চুক্তি, পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তিতে রূপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, যুদ্ধবিরতির প্রথম ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বিচ্ছিন্ন হামলার মাধ্যমে চুক্তির অবমাননা করা হয়েছে। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের তথ্যানুযায়ী বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্য বিশ্বের অন্যতম প্রধান অস্ত্র আমদানিকারক অঞ্চল। যখনই শান্তির টেবিলে আলাপ চলে, পর্দার আড়ালে অস্ত্র কেনাবেচার গ্রাফ প্রায়ই ঊর্ধ্বমুখী হতে দেখা যায়। এটি প্রমাণ করে, রাষ্ট্রগুলো মুখে শান্তির বুলি আওড়ালেও মনস্তাত্ত্বিকভাবে যুদ্ধের প্রস্তুতি থেকে সরে আসেনি।
ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ওয়াশিংটনের ডিপ্লোম্যাটিক করিডর থেকে তেহরানের রাজনৈতিক সচিবালয়, সবখানে শান্তির কথা উচ্চকিত হলেও, প্রত্যেকে নিজ নিজ ‘প্রক্সি’ বা ছায়াশক্তি টিকিয়ে রাখতে মরিয়া। এই দ্বিমুখী অবস্থান, যুদ্ধবিরতিকে কেবল একটি রাজনৈতিক দরকষাকষির হাতিয়ারে পরিণত করেছে। যতক্ষণ পর্যন্ত সংঘাতের মূলে থাকা দীর্ঘস্থায়ী জখমগুলোর সুষ্ঠু রাজনৈতিক চিকিৎসা না হচ্ছে, ততক্ষণ যুদ্ধবিরতি কেবল সাময়িক ‘ব্যান্ডেজ’। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, এই সংঘাতে অবকাঠামোগত ক্ষতির পরিমাণ কয়েক বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে এবং কয়েক লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে স্বস্তিতে হাসা মানুষগুলো জানে না, তাদের মাথার ওপর ঝুলে থাকা ড্যামোক্লিসের তলোয়ারটি কখন ঝলসে উঠবে। যুদ্ধ-সংশ্লিষ্ট নেতাদের বুঝতে হবে, বন্দুকের নল দিয়ে সাময়িক নীরবতা আনা সম্ভব হলেও, প্রকৃত সমৃদ্ধি এবং শান্তি আসে দীর্ঘমেয়াদি আলোচনার টেবিলে। নতুবা এই ‘স্বস্তি’ ইতিহাসের পাতায় ব্যর্থ প্রচেষ্টার গল্প হয়ে থাকবে। ইতিহাস এবং বর্তমান সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে যুদ্ধের ফলাফলকে, কোনো সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞায় ফেলা যাচ্ছে না। বরং পুরো চিত্রটি এক ঘন কুয়াশার মতো ধোঁয়াশাপূর্ণ রয়ে গেছে। আধুনিক যুদ্ধ কেবল ভূমির দখল নয়, বরং এটি এখন ‘পারসেপশন’ বা জনমানসে ভাবমূর্তি তৈরির লড়াই। যেখানে ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে প্রতিটি পক্ষই নিজেকে বিজয়ী প্রমাণের আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে। তেল আবিবের প্রধান রণকৌশল ছিল, তাদের ‘কোয়ালিটেটিভ মিলিটারি এজ’ বা আঞ্চলিক সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। তাদের লক্ষ্য ছিল, লেবানন বা সিরিয়ার মতো দেশগুলোতে ইরানের যে শক্তিশালী ‘প্রক্সি নেটওয়ার্ক’ বা ছায়াশক্তি রয়েছে, তাকে সমূলে উৎপাটন করা।
কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। শত শত কোটি ডলারের মার্কিন সামরিক সহায়তা এবং অত্যাধুনিক গোয়েন্দা নজরদারি থাকা সত্ত্বেও, হিজবুল্লাহ বা হামাসের মতো গোষ্ঠীগুলোর প্রতিরোধ ক্ষমতা তারা পুরোপুরি স্তব্ধ করতে পারেনি। সামরিক শক্তি থাকা সত্ত্বেও ‘অপ্রথাগত যোদ্ধাদের’ দমনে আধুনিক সামরিক শক্তির সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তেহরানের লক্ষ্য ছিল অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট। ইসরায়েলের কথিত অভেদ্য প্রতিরক্ষা দেয়াল ‘আয়রন ডোম’-এর সীমাবদ্ধতা বিশ্বমঞ্চে উন্মোচন করা। ইরানের ড্রোন ও ব্যালিস্টিক মিসাইল প্রযুক্তির বিস্তার প্রমাণ করেছে যে, কেবল ব্যয়বহুল প্রযুক্তি দিয়ে শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরান তাদের সাশ্রয়ী এবং সহজলভ্য ড্রোন দিয়ে ইসরায়েলের অত্যন্ত দামি ইন্টারসেপ্টের মিসাইলগুলোকে ব্যস্ত রেখে তাদের প্রতিরক্ষা বাজেটে বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে। এটি যুদ্ধ অর্থনীতিতে এক নতুন সমীকরণ যোগ করেছে। স্যাটেলাইট ইমেজ বিশ্লেষকদের সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, এই যুদ্ধের ফলে কেবল গাজা বা দক্ষিণ লেবাননের মতো অঞ্চলে অবকাঠামোগত ক্ষতির পরিমাণ ১০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। কয়েক লাখ মানুষ নিজ ভূমিতেই বাস্তুচ্যুত, যা একটি প্রজন্মকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই বিশাল মানবিক বিপর্যয় কোনো পক্ষের রাজনৈতিক বা সামরিক বিজয়ের চেয়ে অনেক বেশি ভারী। সামরিক শক্তির বৈশ্বিক সূচকে ইসরায়েল প্রযুক্তিতে এগিয়ে থাকলেও, ইরানের সারফেস-টু-সারফেস মিসাইল প্রযুক্তির সহজলভ্যতা আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে এক অভাবনীয় মোড় এনেছে। এই সংঘাতের সবচেয়ে অন্ধকার দিক হলো, বিশ্বশক্তির রহস্যময় এবং অনেক ক্ষেত্রে পক্ষপাতদুষ্ট ভূমিকা। মধ্যপ্রাচ্য আজ এমন এক রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে, যেখানে পরাশক্তিগুলো তাদের নতুন অস্ত্রের কার্যকারিতা পরীক্ষা করে। ওয়াশিংটন একদিকে শান্তির কথা বলে, অন্যদিকে ইসরায়েলকে বিলিয়ন ডলারের অত্যাধুনিক মারণাস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রাখে। এই ‘অস্ত্র দিয়ে শান্তি কেনা’র নীতি আদতে আগুন নেভানোর বদলে ঘি ঢালার কাজ করেছে। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের তথ্যানুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্য বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম প্রধান অস্ত্র আমদানিকারক অঞ্চল। যখন যুদ্ধবিরতি ঘোষিত হয়, পর্দার আড়ালে অস্ত্র কেনাবেচার গ্রাফ প্রায় ঊর্ধ্বমুখী হতে দেখা যায়। যা প্রমাণ করে, রাষ্ট্রগুলো শান্তির মোড়কে পরবর্তী সংঘাতের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
সাময়িক যুদ্ধবিরতিকে স্থায়ী শান্তিতে রূপান্তর করতে হলে কেবল নামকাওয়াস্তে গোলটেবিল বৈঠক যথেষ্ট নয়; এর জন্য প্রয়োজন মৌলিক মানসিক পরিবর্তন এবং আন্তর্জাতিক কাঠামোগত সংস্কার। ফিলিস্তিন সংকটের একটি স্থায়ী ও ন্যায়সংগত দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধান ছাড়া, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফেরানো অলীক কল্পনা। ইসরায়েল ও ইরানকে একে অপরের আঞ্চলিক সার্বভৌমত্বের প্রতি ন্যূনতম শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতে হবে। ইরান পারমাণবিক শক্তির অধিকারী হতে যাচ্ছে এটা কোনো প্রমাণিত সত্য নয়। আর হলেই বা কী? কে বলেছে, তারা মৌলবাদী সন্ত্রাসী রাষ্ট্র? যারা বলেছে, তাদের কথার বিশ্বাসযোগ্যতা কতটুকু? একই অভিযোগ তো ইরাকের সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধেও ছিল। কই, শেষ পর্যন্ত প্রমাণিত হয়েছে? আমাদের সামনে এক উজ্জ্বল উদাহরণ হলো ইউরোপীয় ইউনিয়ন। তারা যেভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ ক্ষত মুছে বাণিজ্যিক ঐক্যের মাধ্যমে আজ শান্তিতে আছে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যেও তেমন বাণিজ্যিক আন্তঃনির্ভরতা তৈরি করা জরুরি। যখন দেশগুলোর অর্থনৈতিক স্বার্থ একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হবে, তখন যুদ্ধের ঝুঁকি স্বাভাবিকভাবেই কমে আসবে। সংঘাতের শিকার হওয়া সাধারণ মানুষের মতামতকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে আনা এখন সময়ের দাবি। শান্তি কোনো ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। পারমাণবিক যুগে এসে ‘চোখের বদলে চোখ’ নীতি অনুসরণ করলে, পৃথিবী অন্ধ হয়ে যাবে। যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে বিশ্বনেতাদের উচিত, নিজেদের রাজনৈতিক ইগো বিসর্জন দিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনের মূল্য দেওয়া। জয়-পরাজয়ের ঊর্ধ্বে গিয়ে মানুষের বেঁচে থাকার আকুতিই শেষ পর্যন্ত সভ্যতার শ্রেষ্ঠ বিজয়। শান্তি কোনো গন্তব্য নয়, এটি একটি নিরন্তর পথচলা যা আলোচনার মাধ্যমে মসৃণ করতে হবে। মানুষ হিসেবে আমাদের জয় কেবল সম্প্রীতি আর সংলাপে।