

দেশের আলোচিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ইউরেনিয়াম বা ফুয়েল লোডের মাধ্যমে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের চূড়ান্ত দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে। তবে ১৯৬১ সাল থেকে শুরু করে নানা পর্যায়ে প্রচেষ্টার পর ২০১৫ সালে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সত্যিকারের গতি পায়। এরপরও নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে অবশেষে বিদ্যুৎ উৎপাদনের দ্বারপ্রান্তে কেন্দ্রটি।
আগামী এক মাস থেকে ৪০ দিনের মধ্যে নানা করিগরি পরীক্ষার মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হবে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে। ১০ থেকে ২০ শতাংশ করে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়তে বাড়তে চলতি বছরের ডিসেম্বর থেকে ২০২৭ সালের জানুয়ারির মধ্যে প্রথম ইউনিট থেকে সক্ষমতার
পুরোটা প্রায় ১২শ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ শুরু করবে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি। দ্বিতীয় ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করতে হয়তো আরও দুই বছর লাগবে, এমন ধারণা করছে সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্বব্যাপী পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বৈশিষ্ট্য হলো এ ধরনের কেন্দ্র থেকে দীর্ঘ মেয়াদে সুফল পাওয়া যায়। একই সঙ্গে প্রাকৃতিক গ্যাস এবং আমদানি করা এলএনজি, কয়লা, জ¦ালানি তেল দিয়ে যে বিদ্যুৎকেন্দ্র চলে সেই সব বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন খরচ কম। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অন্যান্য জ¦ালানি দিয়ে ১২শ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে যে খরচ হবে, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে সেই পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করলে বছরে অন্তত এক বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় হবে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভাবনা ১৯৬১ সালের দিকে শুরু হলেও তৎকালীন পাকিস্তান সরকার পরে এই প্রকল্পটি বাতিল করে দেয়। তার পরবর্তী সরকারগুলো নানা পর্যায়ে বিচ্ছিন্নভাবে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করলেও সেটা বাস্তবায়িত হয়নি। সর্বশেষ বিগত আ.লীগ সরকার ২০১৫ সাল থেকে প্রকল্পটির বাস্তবমুখী অগ্রগতির দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। পর্যায়ক্রমে গতকাল ফুয়েল লোডের মাধ্যমে বাংলাদেশের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের স্বপ্ন বাস্তবতায় রূপ নেয়। এর মধ্য দিয়ে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারকারী দেশের তালিকায় বাংলাদেশ বিশ্বের ৩৩তম দেশ হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে।
দেশের ইতিহাসে এককভাবে আর্থিক দিক দিয়ে সবচেয়ে বড় প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন কাজ করছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন পরমাণু শক্তি কমিশন। এ প্রকল্পের আওতায় ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের দুটি ইউনিট নির্মাণ করছে রাশিয়ার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অ্যাটমস্ট্রয়এক্সপোর্ট।
পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার পাকশী ইউনিয়নে পদ্মা নদীর পাড়ে রূপপুর গ্রামে নির্মাণ করা হয়েছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। রাশান ফেডারেশনের স্টেট অ্যাটমিক এনার্জি করপোরেশন (রোসাটম)-এর কারিগরি সহায়তায় ও বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের অধীনে তৃতীয় প্রজন্মের ভিভিআর-১২০০ প্রযুক্তির দুটি ইউনিট নির্মাণ করা হচ্ছে। এ কেন্দ্র থেকে ২৪শ মেগাওয়াট বেজলোড বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র হলো জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে টেকসই প্রাথমিক জ্বালানি উৎস।
উল্লেখ্য, ২০১৫ সালের ইন্টিগ্রেটেড এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার মাস্টার প্ল্যানের আওতায় বাংলাদেশ একটি মিশ্র জ্বালানি নীতি গ্রহণ করেছে, যা ধীরে ধীরে জীবাশ্ম জ্বালানির নির্ভরতা থেকে নবায়নযোগ্য শক্তি ও পারমাণবিক শক্তিসহ পরিচ্ছন্ন ও টেকসই উৎসের দিকে অগ্রসরমান। রূপপুর গ্রিন এনার্জির অংশ। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, স্বাধীনতার পর থেকে প্রতিটি পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাতেই বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়নে অগ্রাধিকার দেওয়া হয় এবং বিভিন্ন সময়ে নানা পারমাণবিক বিদ্যুৎ-সমৃদ্ধ দেশের কাছ থেকে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চাওয়া হয়। ১৯৭৭ সালে ফরাসি সফরাটম-এর ফিজিবিলিটি স্টাডি হলেও কোনো অগ্রগতি হয়নি।
পরে ১৯৮১ সালে ইনস্টিটিউড অব নিউক্লিয়ার সায়েন্স অ্যান টেকনোলজি (আইনএনএসটি) গঠিত হয়ে পারমাণবিক গবেষণা ও অবকাঠামো উন্নয়নে কাজ শুরু করে এবং ১৯৮৬ সালে সাভারে ৩ মেগাওয়াট গবেষণা রিঅ্যাক্টর চালু হয়। ১৯৮৭-৮৮ এবং ১৯৯০-৯৬ সালে প্রাক-প্রস্তুতি শুরু হলেও নানা বাস্তবায় সেটা আর এগোয়নি। ১৯৯৬ সালের জাতীয় জ্বালানি নীতি পারমাণবিক শক্তিকে বিকল্প উৎস হিসেবে অনুমোদন করে। ১৯৯৭-২০০০ সময়ে উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রকল্প ত্বরান্বিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয় ও ৬০০ মেগাওয়াট কেন্দ্রের প্রস্তুতিমূলক কাজ শুরু করা হয়। পরে ২০০৫ সালে চীনের সঙ্গে সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং ২০০৭ সালে দুটি ৫০০ মেগাওয়াট ইউনিট স্থাপনের প্রস্তাব অনুমোদনের প্রক্রিয়ার চেষ্টা চললেও কার্যত তেমন কিছু হয়নি।
পরবর্তী সময়ে ২০০৮ সালে সরকার প্রকল্পে চীনের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করে এবং আন্তর্জাজিত আণবিক সংস্থা আইএইএ ২০০৯ থেকে ২০১১ সময়সীমায় প্রযুক্তিগত সহায়তা ঘোষণা করে। ২০০৯ সালে আ.লীগ সরকারের সময়ে একটি কার্যকর অগ্রগতি সাধিত হয়। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বিশেষ করে রাশিয়ার সঙ্গে অংশীদারত্ব শুরু হয় ২০১১ সালের আইজিসিএ চুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে। ২০০৯-২০১২ সাল পর্যন্ত প্রাক-প্রকল্প কার্যক্রমের মধ্যে ছিল সাইট সিলেকশন, পরিবেশগত সমীক্ষা এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) সুপারিশ বাস্তবায়ন।
প্রস্তুতিমূলক পর্যায়ে (২০১৩-২০১৭) সম্ভাব্যতা যাচাই, প্রযুক্তি নির্বাচন, নকশা উন্নয়ন, অবকাঠামো নির্মাণ এবং নিরাপত্তা প্রয়োজনীয়তা পূরণের জন্য ডিপ মিক্সিং প্রযুক্তির মাধ্যমে ভূমি স্থিতিশীলকরণের কাজ অন্তর্ভুক্ত ছিল। ডিসেম্বর ২০১৫ সালের বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন (বিএইসি) দুই হাজার ৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন দুই ইউনিটের বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে রাশিয়ার সংস্থা জেএসসি এটমস্ট্রয়এক্সপোর্টের সঙ্গে চুক্তি করে। প্রকল্পের মোট খরচ প্রায় ১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার, যার মধ্যে রাশিয়া ৯০ শতাংশ অর্থায়ন করছে রাশিয়া। কিন্তু ডলারের দাম বাড়ায় ২৬ হাজার কোটি টাকা খরচ বেড়েছে প্রকল্পের। ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা খরচ হবে রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মূল নির্মাণকাজ শুরুর নিমিত্তে ২০১৬ সালে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ থেকে সাইটিং লাইসেন্স প্রদান করা হয়। রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে নান পর্যায়ে অসংখ্য লাইনেন্স ও অনুমেদান গ্রহণ করতে হয়েছে বাংলাদেশকে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ইউনিট-১-এর ডিজাইন অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন লাইসেন্স পাওয়ার পর ২০১৭ সালের ৩০ নভেম্বর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী প্রকল্পের মূল নির্মাণকাজ শুরুর উদ্বোধন করেন। সম্প্রতি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উভয় ইউনিটের নির্মাণকাজের সিংহভাগ সম্পন্ন হয়েছে এবং প্রথম ইউনিটে গতকাল থেকে জ¦ালানি লোডিং শুরু হয়।