শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬, ০৫:৫২ পূর্বাহ্ন

‘গৃহহীন’ ৩২ সচিব

বিডি ডেইলি অনলাইন ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ৩ মে, ২০২৬
  • ১৯ বার

রাজশাহী নগরীর পদ্মাপারের বড়কুঠি এলাকার অত্যন্ত মূল্যবান খাসজমি, যা মূলত ভূমিহীনদের পুনর্বাসনে বরাদ্দ হওয়ার কথা। সেটিই ‘গৃহহীন’ পরিচয়ে দখলে নিয়েছেন বর্তমান ও সাবেক একদল শীর্ষ আমলা। আমাদের সময়ের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, বিসিএস ক্যাডারের ৩২ কর্মকর্তা ‘প্রত্যয়’ নামে একটি সমবায় সমিতি গড়ে তুলে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ঠিকানাকে নিজেদের অফিস দেখিয়ে নিবন্ধন নেন। এরপর নীতিমালা উপেক্ষা করে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে নামমাত্র মূল্যে প্রায় দুই বিঘা জমি বরাদ্দ নিয়ে সেখানে গড়ে তুলছেন বিলাসবহুল বহুতল কন্ডোমিনিয়াম।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, সমিতির একাধিক সদস্য সরকারি আবাসন প্রকল্পে নিজ নামে প্লট থাকার পরও নিজেদের ‘ভূমিহীন’ দাবি করেছেন, যা সরাসরি নীতিমালার লঙ্ঘন। শুধু তাই নয়, সমবায় অধিদপ্তরের অনুমোদিত শেয়ার মূলধনের সীমা অতিক্রম করে কোটি টাকার বিনিয়োগ, লিজের শর্ত ভেঙে ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করে সম্পত্তি হস্তান্তরের উদ্যোগ এবং নিয়মিত অডিট না করা- এসব অনিয়মের পরও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জামানায় কেউ ছিলেন সিনিয়র সচিব, কেউ সচিব কেউবা উপ-সচিব বা সিনিয়র সহকারী সচিব। সবাই বিসিএস ক্যাডার। প্রশাসনের কর্মকর্তা। আওয়ামী লীগ আমলে কোনো না কোনো সময় তারা চাকরি করেছেন রাজশাহীতে- এমন ৩২ বিসিএস ক্যাডার জোট বেঁধে খাতা-কলমে করেছেন প্রত্যয় নামে সমবায় সমিতি। ডিসি অফিসের ভূমি ভবনকে সেই সমিতির কার্যালয় দেখিয়ে তারা সমবায় অধিদপ্তর থেকে নিয়েছেন নিবন্ধন। এরপর তারা ‘গৃহহীন’ সেজে বাড়ি নির্মাণের কথা বলে প্রত্যয় সমবায় সমিতির নামে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে প্রায় দুই বিঘা খাস জমি হাতিয়ে নিয়েছেন। রাজশাহী নগরীর প্রাণকেন্দ্র জিরোপয়েন্টের অদূরে পদ্মাপারে বড়কুঠি এলাকার সেই জমিতে নির্মাণ করা হচ্ছে বিলাসবহুল কন্ডোমিনিয়াম। এখানে অন্তত তিনটি বহুতল ভবন নির্মাণ করা হবে। এরই মধ্যে ১৪ তলা একটি ভবনের নির্মাণকাজ প্রায় শেষ। একটি ভবন থাকবে সেই ৩২ সৌভাগ্যবান বিসিএস ক্যাডারের নামে। তবে এই মূল্যবান খাস জমি হাতিয়ে নিতে তারা পদে পদে লঙ্ঘন করেছেন অকৃষি জমি বন্দোবস্ত নীতিমালা।

সচিবদের খাসজমি জালিয়াতির বিষয়ে ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু সাফ বলেছেন. ‘আমি জানি আগে যে নির্বাচন কমিশনের

সচিব ছিল এবং রাজশাহীতে বিভাগীয় কমিশনার (হেলালুদ্দীন আহমদ) ছিল তার নেতৃত্বে এটা হয়েছে। এটা আমাদের নজরে আছে। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য উচ্চপর্যায়ে আমরা ইতোমধ্যে কথাবার্তা বলেছি। কেউ জোর করে যদি জনগণের সম্পত্তি বা ভূমিহীনদের সম্পত্তি নিজেদের নামে করে থাকে সে যারাই হোক কেন, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।’

এদিকে সমবায় অধিদপ্তরের রাজশাহী বিভাগীয় কার্যালয়ের যুগ্ম নিবন্ধক মোখলেছুর রহমান বলেন, ‘প্রত্যয় হলো বড় বড় অফিসারের সমিতি। সমিতির শুরু থেকে অডিট দীর্ঘ হয়নি। আমি একবার তৎকালীন সদস্য সচিব (যুগ্ম সচিব) এসএম তুহিনুর আলমকে ফোন করে সমিতির অডিট করাতে অনুরোধ করি। বলি, এবার অডিট না করালে সমিতি বন্ধ করে দেব। কিন্তু তিনি ওই সময় আমাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে ফোন কেটে দেন।’ তুহিনুর আলম আরও জানান, প্রথম অডিটেই সমিতি অকার্যকর পাওয়া যায়। তখনই সমবায় নিবন্ধন আইনের ৫৩ ধারা অনুযায়ী এই সমিতির নিবন্ধন বাতিলের সুযোগ ছিল।

হাসিনার কাছে জমি নেওয়া সেই সৌভাগ্যবান সচিবরা

গৃহহীন সেজে শেখ হাসিনার কাছ থেকে নামমাত্র টাকায় জমি নেওয়া এই সৌভাগ্যবান কর্মকর্তারা হলেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব (বর্তমানে ওএসডি) মেজবাহ্ উদ্দীন চৌধুরী, অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ (বর্তমানে কারাগারে), সাবেক সচিব নূর-উর রহমান, রাজশাহীর সাবেক জেলা প্রশাসক হেলাল মাহমুদ শরীফ, রাজশাহী সিটি করপোরেশনের সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আজাহার আলী, রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (আরডিএ) সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুস সামাদ, রাজশাহীর সাবেক অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার আমিনুল ইসলাম ও সুলতান আব্দুল হামিদ, রাজশাহীর সাবেক অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক শেখ মজিবুর রহমান, সাবেক উপসচিব ড. বশিরুল আলম, ক্যানবেরায় বাংলাদেশ দূতাবাসে নিযুক্ত সাবেক মিনিস্টার ড. দেওয়ান মো. শাহরিয়ার ফিরোজ, সাবেক যুগ্ম সচিব জাকির হোসেন, আরডিএর বর্তমান চেয়ারম্যান (যুগ্ম সচিব) এসএম তুহিনুর আলম, উপ-সচিব সাদেকুল ইসলাম ও আওয়ামী লীগের ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী পিএস ও উপ-সচিব ড. রাজ্জাকুল ইসলাম, রাজশাহীর সাবেক জেলা প্রশাসক শামীম আহমেদ, আরডিএর সাবেক চেয়ারম্যান দেওয়ান মো. আব্দুস সামাদ, সাবেক উপসচিব মোমিনুর রহমান, সাবেক সচিব জিয়াউল হাসান, উপসচিব সাইফুর রহমান খান, উপসচিব আতাউল গনি, অতিরিক্ত সচিব (অবসরপ্রাপ্ত) শফিকুল ইসলাম, অতিরিক্ত সচিব (অবসরপ্রাপ্ত) ড. এবিএম শরীফ উদ্দিন, একেএম মাসুদুজ্জামান, আবদুল মান্নান, রাজশাহীর সাবেক জোনাল সেটেলমেন্ট কর্মকর্তা উপ-সচিব সিতারা বেগম, উপসচিব শরীফুন্নেসা, আরডিএর সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কমলা রঞ্জন দাস, সাবেত আলী, সাবেক সচিব মুহাম্মদ ইবরাহিম, উপ-সচিব মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন এবং উপ-সচিব আলমগীর কবির। এদের মধ্যে ইতোমধ্যেই কেউ কেউ চাকরি থেকে অবসর যাপন করছেন। অনেকেরই দপ্তর ও পদবি পরিবর্তন হয়েছে। আর নানা অভিযোগে জুলাই বিপ্লবের পর কাউকে কাউকে ওএসডি করা হয়েছে। কেউ কেউ কারাগারে। এসব কর্মকর্তার বেশির ভাগই আওয়ামী লীগ আমলে শুদ্ধাচার পুরস্কার পেয়েছেন।

সচিবদের ভুয়া সমিতির নামে খাসজমি

আমাদের সময়ের দীর্ঘ অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পদ্মাপারের মূল্যবান এই জমি লিজ নিয়েছে বিসিএস কর্মকর্তাদের সংগঠন ‘প্রত্যয় সমবায় সমিতি’। প্রত্যয় সমবায় সমিতির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমলাদের বাড়ি নির্মাণের জন্য ৩৮ কাঠা জমি বরাদ্দ দেন। বাজারমূল্য অনুযায়ী জমির দাম অন্তত ৫০০ কোটি টাকা। কিন্তু জমির লিজমূল্য ধরা হয়েছে মাত্র তিন কোটি ৮৯ লাখ টাকা। যদিও সেলামি প্রদানের কথা রেজিস্ট্রার বহি-২-এ উল্লেখ নেই। ২০১৮ সালের ৪ মার্চ প্রত্যয় সমবায় সমিতির ৩২ জন সদস্যের নামে জমি রেজিস্ট্রি হয়েছে। যার দলিল নং ১৩০১। ২০১৮ সালের ২৫ এপ্রিল তাদের নামে ভূমি অফিস থেকে নামজারিও হয়েছে। যার প্রস্তাবিত খতিয়ান নং ১১০৩৩ এবং খারিজ কেস নং ৫১৩৩/৯-১/১৭-১৮। সেই জমিতে এখন গড়ে উঠছে একাধিক বহুতল ভবন। এই ভবনটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘আমানা-প্রত্যয় কন্ডোমিনিয়াম’। ‘আমানা হোমস লিমিটেড’ নামে একটি ডেভেলপার কোম্পানি ভবন নির্মাণ করছে।

নীতিমালা মানার বালাই নেই

অকৃষি খাসজমি ব্যবস্থাপনা ও বন্দোবস্ত নীতিমালা-১৯৯৫-এর ৩ (ঢ) ধারা মোতাবেক ওই জমি বিসিএস কর্মকর্তাদের সংগঠন ‘প্রত্যয় সমবায় সমিতির নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়। ওই ধারায় বলা হয়েছে, কমপক্ষে ২০ বছর বা তার বেশি সরকারি/আধা সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার চাকরিতে নিয়োজিত আছেন বা ছিলেন এমন কমপক্ষে ৩০ জন বা তার চেয়ে বেশি কর্মচারী বা কর্মকর্তার সমন্বয়ে গঠিত সমবায় সংগঠনকে বহুতল বিশিষ্ট আবাসিক ভবন (ন্যূনপক্ষে পাঁচতলা ফ্ল্যাট বাড়ি) নির্মাণের জন্য মেট্রোপলিটন এলাকায় সর্বোচ্চ এক একর পর্যন্ত খাস জমি বন্দোবস্ত দেওয়া যাবে। কিন্তু অবৈধ সুবিধাভোগী সচিবরা ক্ষমতার দাপটে এই নীতিমালার ধার ধারেননি। নীতিমালা অনুযায়ী, এ ধরনের জমি বরাদ্দ পেতে সমবায় সমিতির যারা সদস্য হবেন, তাদের চাকরির বয়স কমপক্ষে ২০ বছর হতে হবে। কিন্তু খাসজমির জন্য আবেদনের সময় শামীম আহমেদ. ড. রাজ্জাকুল ইসলাম, এসএম তুহিনুর আলম. শরীফুন্নেসা, আলমগীর কবীর, সালাহউদ্দীন, সাইফুর রহমান ও আতাউল গনিসহ অনেক কর্মকর্তাই বিসিএস ক্যাডার হিসেবে চাকরির বয়স ২০ বছর হয়নি। এরপরও ক্ষমতার দাপটে তারা নীতিমালা লঙ্ঘন করেই সমিতির সদস্য হন এবং জমি বরাদ্দ পান।

সরকারি কোটায় প্লট বাগিয়েও ‘ভূমিহীন’ তারা

অকৃষি খাসজমি ব্যবস্থাপনা ও বন্দোবস্ত নীতিমালায় আরও উল্লেখ আছে, মেট্রোপলিটন এলাকা বা জেলা শহরে বাড়ি বা বাড়ি করার মতো জমি আছে এমন কর্মচারী বা কর্মকর্তা সংগঠনের সদস্য হতে পারবেন না। অথচ গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সংরক্ষিত কোটায় রাজশাহী নগরীর তেরখাদিয়া হাউজিং এস্টেট প্রকল্পে সাবেক সচিব নূর উর রহমান (প্লট নং ২৫) ও উপসচিব আলমগীর কবীর (প্লট নং ৫৬) বরাদ্দ প্লট নিয়েছেন। একইভাবে সরকারি চাকরিজীবী কোটায় নাটোর হাউজিং এস্টেট প্রকল্পে প্লটের (নং ৭৩) মালিক হয়েছেন উপ-সচিব সিতারা বেগম। এ ছাড়া সরকারি চকরিজীবী কোটায় রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (আরডিএ) বনলতা আবাসিক প্রকল্পে আজাহার আলী (প্লটনং ২৪) , শেখ মজিবুর রহমান (প্লট নং ১১৭ বি), কমলা রঞ্জন দাশ (প্লটনং ১১৭ এ)। আরডিএর চন্দ্রিমা আবাসিক প্রকল্পেও সরকারি চাকরিজীবী কোটায় সিতারা বেগম (প্লটনং ৩১০) বরাদ্দ নিয়েছেন। এ ক্ষেত্রেও তারা নিয়মনীতির তোয়াক্কা করেননি।

পদে পদে সচিবদের অনিয়ম

সমবায় অধিদপ্তর থেকে প্রত্যয় সমবায় সমিতির অনুমোদিত শেয়ার মুলধন ৫০ লাখ টাকা। অর্থাৎ তারা ৫০ লাখ টাকার বেশি কোনো খাতে বিনিয়োগ করতে চাইলে সমবায় অধিদপ্তরের অনুমোদন লাগবে। কিন্তু অনুমোদন ছাড়াই আবাসন খাতে প্রায় ৪ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে সরকারি কর্মকর্তাদের সংগঠন প্রত্যয় সমবায় সমিতি। রাজশাহী নগরীর বড়কুঠি ভূমি অফিসের পাশে পদ্মার তীরে গড়ে উঠছে তাদের এই আবাসন প্রকল্প। প্রকল্পটির নাম দেওয়া হয়েছে- ‘আমানা-প্রত্যয় কন্ডোমিনিয়াম’। রাজশাহীর ‘আমানা হোমস লিমিটেড’ নামে একটি ডেভেলপার কোম্পানি নির্মাণকাজ করছে। প্রত্যয় সমবায় সমিতির লিজ নেওয়া ৩৮ কাঠার জমিতে ইতোমধ্যে একটি ১৪ তলার বহুতল ভবন উঠেছে। আরও দুটি বহুতল ভবন নির্মাণ করা হবে এখানে। সমিতির নামে কেনা জমির দখল এবং জমির স্বত্ব হস্তান্তরের ক্ষেত্রেও সমবায় সমিতি বিধিমালা লঙ্ঘন করেছে প্রত্যয়। ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়া লিজের শর্ত অনুযায়ী, সমবায় সমিতির নামে বসবাসের জন্য ৫ তলার বেশি ফ্ল্যাট নির্মাণ করতে হবে। অন্য কোনো উদ্দেশ্যে লিজ নেওয়া জমি ব্যবহার করা যাবে না। কিন্তু প্রত্যয় সমবায় সমিতি ও ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান আমানা হোমস লিমিটেডের মধ্যে ২০১৮ সালের ১১ জুলাই সম্পাদিত হওয়া চুক্তিনামা দলিল আমাদের সময়ের হাতে এসেছে। এতে দেখা যায়, চুক্তি অনুযায়ী আমানা হোমস তিনটি বহুতল আবাসিক ভবন নির্মাণ করবে। এর মধ্যে চুক্তি অনুসারে দুটি ভবনই তারা পাবে। সেগুলো ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান আমানা হোমস দলিলের মাধ্যমে বিক্রি করবে। অর্থাৎ লিজের শর্ত ভঙ্গ করে ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের কাছে সম্পত্তি হস্তান্তরের পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দিয়েছে প্রত্যয় সমবায় সমিতি। চুক্তিপত্রে বলা হয়েছে, আরএস রেকর্ডে সরকারের নামে থাকা এ সম্পত্তি ভূমি মন্ত্রণালয় ২০১৭ সালের ২৬ অক্টোবর প্রত্যয় সমবায় সমিতির অনুকূলে বন্দোবস্ত হিসেবে অনুমোদন দেয়। এরপর রাজশাহী জেলা প্রশাসকের পক্ষে বোয়ালিয়ার তৎকালীন সহকারী কমিশনার (ভূমি) এমএম সামিরুল ইসলাম ২০১৮ সালের ৪ মার্চ প্রত্যয়ের নামে দলিল করে দেন।

ডিসি অফিসকে সমিতির অফিসে দেখিয়ে নিবন্ধন

প্রত্যয় সমবায় সমিতিকে ২০১২ সালের ২৭ মে নিবন্ধনের সনদ দেয় সমবায় অধিপ্তরের রাজশাহী জেলা কার্যালয়। নিবন্ধন নম্বর ৫৩২। তৎকালীন জেলা সমবায় অফিসার আব্দুর রাজ্জাক স্বাক্ষরিত সনদে দেখা যায়, সমিতির ঠিকানা- ভূমি ভবন (২য় তলা), জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, রাজশাহী। অর্থাৎ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়কে সমিতির অফিস দেখিয়ে নিবন্ধন নেওয়া হয়েছে। অথচ বাস্তবে ওই ভবনে সমিতির কোনো অফিস নেই। অফিস ভাড়ার কোনো প্রমাণপত্রও নেই। এই সমিতির কার্যক্রম রাজশাহী বিভাগজুড়ে বিস্তৃত করতে রেজিস্ট্রেশন সংশোধন করা হয়। ২০১৪ সালের ১ অক্টোবর সমবায় অধিদপ্তরের রাজশাহী বিভাগীয় কার্যালয়ের যুগ্ম নিবন্ধক আহসান কবীর স্বাক্ষরিত সনদ দেওয়া হয়। সেখানেও প্রত্যয় সমবায় সমিতির কার্যালয় দেখানো হয়েছে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়কে। অভিযোগ রয়েছে, কেবল খাসজমি হাতিয়ে নিতেই পদস্থ কর্মকর্তারা অবৈধ প্রভাব খাটিয়ে সমিতির কার্যালয় হিসেবে ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করেছেন। তাদের চাপে সমবায় অধিদপ্তর নিবন্ধন দিতে বাধ্য হয়। এমনকি ওই সময় প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে জমি লিজ নিতেও এই ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার হয়। এদিকে ২০২২-২০২৩ সালেও সমবায় অধিদপ্তরের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে প্রত্যয় সমবায় সমিতির ঠিকানা জেলা প্রশাসকের কার্যালয় দেখানো হয়েছে। কিন্তু সমিতির সভাপতির মৌখিক তথ্যে সমিতির ঠিকানা তাদের আবাসন প্রকল্পের ‘আমানা-প্রত্যয় কন্ডোমিনিয়াম’ বলে প্রতিবেদনে অডিট কর্মকর্তা উল্লেখ করেছেন। সমিতির রেকর্ডপত্র যাচাই করে দেখা যায়, নিয়মিত বার্ষিক সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয় না।

অডিটেও অকার্যকর প্রত্যয় সমিতি

নিবন্ধনদাতা সরকারি সংস্থা হিসেবে সমবায় অধিদপ্তর প্রতি অর্থবছর প্রত্যয় সমবায় সমিতির কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে নিরীক্ষা প্রতিবেদন তৈরি করার কথা। কিন্তু ২০১২ সালে সমিতিটি নিবন্ধন পেলেও নিয়মিত অডিট করা হয়নি। প্রথম অডিট হয় ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে। ২০১৯ সালের ৭ জুলাই থেকে ২০২০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সমিতির কার্যক্রমের ওপর ওই নিরীক্ষা প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। আমাদের সময়ের হাতে আসা ওই প্রতিবেদনে দেখা যায়, সাংগঠনিক ও আর্থিক কার্যক্রম মূল্যায়নে প্রত্যয় সমবায় সমিতিকে নিষ্ক্রিয় ও অকার্যকর ঘোষণা করা হয়। একই সঙ্গে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে বলা হয়, ‘সমিতির নিবন্ধিত ঠিকানায় কোনো অফিস নেই। সেখানে কাউকে পাওয়া যায়নি। কোনো খাতাপত্রও পাননি অডিট কর্মকর্তা।’ অকার্যকর হওয়ায় প্রত্যয় সমবায় সমিতির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণেরও সুপারিশ করা হয় প্রতিবেদনে। কিন্তু এরপরও সমবায় অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে রহস্যজনক কারণে প্রত্যয় সমবায় সমিতির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ২০২২-২০২৩ সালের অডিটে ধরা পড়ে, প্রত্যয় সমবায় সমিতিতে বিগত ৬ বছর বৈধ ব্যবস্থাপনা কমিটিও ছিল না। অন্তর্বর্তী ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠনেও জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছেন তারা। যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়াই কমলা রঞ্জন দাশকে প্রধান করে তিন সদস্যের অন্তর্বর্তী ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করা হয়। কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়াই নির্বাচন পরিচালনা কমিটিও গঠন করা হয়। কেবল মূল্যবান জমি হাতিয়ে নিতেই অবৈধ ও নামেমাত্র কমিটি দিয়ে সমিতিকে সচল দেখানোর অপচেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ। সমিতির বার্ষিক বাজেটেরও কোনো অনুমোদন নেই। প্রতিবছর অডিট সম্পন্ন হওয়ার দুই মাসের মধ্যে বার্ষিক সাধারণ সভা হওয়ার কথা। কিন্তু হয় না।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে প্রত্যয় সমবায় সমিতির বর্তমান সভাপতি ও অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব ড. এবিএম শরীফ উদ্দীন বলেন, ‘আমরা যখন সমবায় সমিতি গঠনের উদ্যোগ নিই তখন কিন্তু নীতিমালা অনুযায়ী ১০ জনও কর্মকর্তা পাচ্ছিলাম না। তখন যারা সিনিয়র ছিল তারা বলছে, এসব প্রকল্প বাংলাদেশে হতে গেলে লাগবে ১০ বছর। জমি পেতে পেতে চাকরির বয়স ২০ বছর পূর্ণ হয়ে যাবে। তাই জুনিয়র অফিসারদের নিয়েও সমিতি করা হয়েছিল। প্রথমদিকে তুহিন (এসএম তুহিনুর আলম) দায়িত্বে ছিল, সে-ই এসব বলতে পারবে। আমার সব বিষয় জানা নেই। তবে যোগাযোগ করা হলে প্রত্যয় সমবায় সমিতির তৎকালীন সদস্য সচিব/সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমানে আরডিএর চেয়ারম্যান (যুগ্ম সচিব) এসএম তুহিনুর আলম কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তবে তিনি বলেছেন, সরকার তো আমাদের সব কাগজপত্র দেখেই লিজ দিয়েছে।

এদিকে রাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতারণা করে জমি হাতিয়ে নেওয়ার বিষয়ে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) রাজশাহী বিভাগীয় কমিটির সভাপতি আহমদ সফিউদ্দীন বলেন, ‘ছলচাতুরী করে নিয়ম ভঙ্গ করে এবং নিজেদের ভূমিহীন ঘোষণা করে এই যে সরকারি জমি দখল- সবকিছুর মধ্যেই এক ভয়ংকর অনিয়ম দুর্নীতি। প্রশাসন ক্যাডারের শীর্ষ কর্মকর্তারা যেভাবে আইন ভেঙে এই কাজটি করেছেন তা অত্যন্ত দুঃখজনক। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ঠিকানায় কোনো সমিতির অফিস হতে পারে কি? অডিটে যেখানে অকার্যকর সমিতি ঘোষণা করেছে সেখানে এভাবে সরকারি জমি জবর দখল করা অত্যন্ত অন্যায়। অনিয়মে জড়িত কর্মকর্তাদের আইনের আওতায় এনে সম্পূর্ণ প্রকল্প এবং বরাদ্দ বাতিল করতে হবে।’

নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2019 bangladeshdailyonline.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com