শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬, ০৫:৫০ পূর্বাহ্ন

দাদন আর ঋণের ফাঁদে উপকূলের জেলেজীবন

বিডি ডেইলি অনলাইন ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৯ মে, ২০২৬
  • ২০ বার

মেঘনা ও উপকূলঘেঁষা বরিশাল, ভোলা, বরগুনা ও চাঁদপুর অঞ্চলের লাখো জেলের জীবনে এখন সবচেয়ে বড় বাস্তবতা দারিদ্র্য, ঋণ আর অনিশ্চয়তা। সরকারি নিষেধাজ্ঞার কারণে দীর্ঘ সময় মাছ ধরতে না পারায় আয় বন্ধ হয়ে গেছে। নিবন্ধিত জেলেরা সামান্য চাল ও কিছু প্রণোদনা পেলেও বিপুলসংখ্যক অনিবন্ধিত জেলে কোনো সহায়তা পাননি। ফলে পরিবার চালাতে বাধ্য হয়ে তারা মহাজন ও আড়তদারদের কাছ থেকে চড়া সুদে দাদন নিয়েছেন।

বরিশাল ব্যুরো: বরিশালের হিজলা ও মেহেন্দিগঞ্জের ধুলখোলা, মেমানিয়া, হরিনাথপুর, বড়জালিয়া, উলানিয়া, গোবিন্দপুরসহ বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে এক থেকে দেড় লাখ জেলের বসবাস। মেঘনাসহ বিভিন্ন নদীকে ঘিরেই তাদের জীবন-জীবিকা। কিন্তু মাছ ধরার ওপর একের পর এক নিষেধাজ্ঞা তাদের জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তুলেছে।

হিজলার বড়জালিয়া ইউনিয়নের বাউশিয়া এলাকার ৫৫ বছর বয়সী জেলে ইয়াকুব বেপারি বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞায় মাছ ধরতে পারিনি। সংসার চালাতে চড়া সুদে দাদন নিতে হয়েছে। দাদন নিতে নিতেই জীবন শেষ হয়ে যাচ্ছে।’

জেলেদের অভিযোগ, ব্যাংক থেকে সহজ শর্তে ঋণ না পাওয়ায় তারা বাধ্য হয়ে মহাজনের কাছে যান। মৌসুমের শুরুতে নৌকা মেরামত, জাল কেনা, জ্বালানি ও খাদ্যের জন্য ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত দাদন নিতে হয়; কিন্তু সেই ঋণের বিপরীতে নির্দিষ্ট আড়তেই মাছ বিক্রি করতে বাধ্য করা হয় তাদের। বাজারে দাম বেশি থাকলেও অন্য কোথাও মাছ বিক্রির সুযোগ নেই।

বরিশালের জেলেরা জানান, এক মৌসুমের জন্য লাখে ২৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত সুদ গুনতে হয়। বছরের পর বছর সুদের টাকা শোধ করলেও আসল ঋণ রয়ে যায়। অনেকের বিরুদ্ধে চেক জালিয়াতির মামলাও হয়েছে। কারণ ঋণ নেওয়ার সময় মহাজনরা আগাম সই করা চেক ও স্ট্যাম্প রেখে দেন।

মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, বরিশাল বিভাগে নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা প্রায় ৪ লাখ হলেও বাস্তবে অনিবন্ধিতসহ এ সংখ্যা ৫ লাখের বেশি। অনিবন্ধিত জেলেরা সরকারি ভিজিএফ সহায়তা বা প্রণোদনা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

বরিশালের হিজলা উপজেলা মৎস্যজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. সোলাইমান জমদ্দার বলেন, বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ নিতে নিতে ঋণের বোঝায় জেলেরা জর্জরিত। মাছের দামও ভালো পাচ্ছে

না। সংসার চালাতে তাদের খুব কষ্ট হয়ে যায়।

বরিশাল জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. মো. হাদিউজ্জামান বলেন, জেলেরা যদি ব্যাংক লোন নিতে চান, তারা যদি আমাদের কাছে আসেন, আমরা তাদের সহযোগিতা করব; কিন্তু তাদের তো আগে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে।

জেলেদের ব্যাংক ঋণের মাধ্যমে অর্থের জোগান দেওয়া গেলে দাদন রোধসহ মাছেরও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।

ভোলার জেলেরা সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন: বরিশালের মতো ভোলার চিত্রও প্রায় একই। নদী ভাঙনকবলিত এ জেলার দুই লাখের বেশি মানুষ মাছ ধরার ওপর নির্ভরশীল। নিষেধাজ্ঞার কারণে দীর্ঘ সময় নদীতে যেতে না পারায়, সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন জেলেরা।

ভোলার তফু মাঝি বলেন, দুই মাস মাছ ধরতে পারিনি। অভিযান শেষ হলে নদীতে যাব, কিন্তু যে গদি থেকে দাদন নিয়েছি, মাছ সেখানেই বিক্রি করতে হবে। ইলিশাঘাটের মফিজ মাঝির ভাষায়, মাছ ধরতে পারি না, এনজিওর কিস্তি দিতে হয়, সংসার চালাতে হয়; তাই বাধ্য হয়ে আবার দাদন নিতে হচ্ছে।

জেলেদের দাবি, মাছ বিক্রির সময় আড়তদাররা কমিশন কেটে নেন। ভোলার কিছু আড়তে ১০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন নেওয়া হয়। যদিও আড়তদারদের দাবি, তারা জেলেদের সহায়তা করেন বলেই এ কমিশন নেন।

ভোলার ক্ষুদ্র মৎস্যজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. মামুন বলেন, দাদন আর এনজিও ঋণের ভারে জর্জরিত জেলেরা; এখন মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, আবার মাছধরা শুরু হলে কম-বেশি যা পাব, বিক্রি করতে হবে দাদন নেওয়া মহাজনের গদিতে। এসব কারণে জেলেদের দিন পরিবর্তন হয় না। তবে ইলিশা মাছঘাটের মৎস্য ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আলাউদ্দিন ফরাজী জানান, একেকজন আড়তদারের লাখ লাখ টাকা জেলেদের কাছে দাদন দেওয়া, এককালীন একজন জেলেকে ১ লাখ বা ৫০ হাজার টাকা দাদন দিলে তার কাছে মাছ বিক্রির কমিশনের মাধ্যমে পরিশোধ করতে হয়। শতকরা ১০ টাকা কমিশন নেওয়া হয়।

জেলেদের ওপর কোনো আড়ৎদার জুলুম করে না, বরং তাদের নদীতে আপদ-বিপদ সবকিছু আড়তদারকে দেখতে হয়।

বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ভোলা শাখার কর্মকর্তা মো. রাসেল জানান, মৎস্যজীবীদের জন্য অনেক ধরনের ঋণের ব্যবস্থা আছে; কিন্তু তারা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন না। ভোলা জেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা ইকবাল হোসেন জানান, জেলেরা এসে আমাদের কাছে পরামর্শ চাইলে আমরা তাদের ব্যাংক লোনের বিষয়ে সহযোগিতা করতে পারি; কিন্তু তারা আমাদের কাছে আসে না।

উপকূলীয় জেলা বরগুনার জেলেরাও সংকটে: জেলার পায়রা ও বিষখালী নদী ঘিরে হাজারও জেলে পরিবার এখন ঋণের চাপে বিপর্যস্ত। জাল, ট্র্রলার, ডিজেল ও বরফের বাড়তি খরচের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও মাছধরার নিষেধাজ্ঞা।

পায়রা নদীর জেলে রহিম মাঝি বলেন, জাল-ডিজেল কিনতে এক লাখ টাকা দাদন নিয়েছি। এখন মাছ যাই ধরি, আড়তদারই দাম ঠিক করে দেন। আর বিষখালী নদীপারের জেলে নাসির উদ্দিন বলেন, নিষেধাজ্ঞায় আয় বন্ধ থাকে; কিন্তু সংসার, বাজার আর বাচ্চাদের পড়াশোনার খরচ তো থেমে থাকে না। পরে মাছ ধরলেও সব টাকা ঋণ শোধে চলে যায়।

চাঁদপুরের জেলেরাও ভালো নেই: জেলার পদ্মা-মেঘনা পারের জেলেদের অবস্থাও আলাদা নয়। অনেকেই বলছেন, দাদন না নিলেও মাছ বিক্রি করতে আড়তে কমিশন দিতে হয়। ফলে এ চক্র থেকে বের হওয়ার পথ নেই।

সদরের সাখুয়া গ্রামের জেলে ওসমান ঢালী জানান, প্রায় ৩০ বছর আগে ৫০০ টাকা দাদন নিয়ে মাছধরা শুরু করেছিলেন। এখন সেই দাদনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে অর্ধলাখ টাকায়।

চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনা ও সাগরে মাছ ধরেন মো. হানু গাজী (৩৬)। তিনি বলেন, তার দুটি মাছ ধরার নৌকায় ১০ জন কাজ করে। দাদন নিয়েছেন চার মহাজনের কাছ থেকে। নিজ জেলা ছাড়াও হাতিয়া চেয়ারম্যানঘাট ও বরিশালের একটি ঘাট থেকে দাদন নিয়েছেন। সাগরে মাছ ধরতে গেলে ওই এলাকার নেতাদের পতাকা ছাড়া মাছ ধরা যায় না। সাগরের নিয়ন্ত্রণে থাকে ক্ষমতাসীন দলের নেতারা।

তিনি আরও বলেন, ইচ্ছা করলেই দাদন থেকে বেরিয়ে আসতে পারছি না। কারণ নদীতে ইলিশ কম। কারেন্টজাল দিয়ে নদীতে মাছ ধরলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গ্রেপ্তার করে। জামিন নিতে টাকা লাগে। ওই সময় মহাজনরা গিয়ে জামিনে টাকা খরচ করে। নতুন করে আবার টাকা বিনিয়োগ করতে হয় জাল কিনতে; যার ফলে দাদনের পরিমাণ প্রতি বছরই বাড়তে থাকে।

চাঁদপুর সদর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মির্জা ওমর ফারুক বলেন, চাঁদপুরের নৌ সীমানায় প্রায় অর্ধলক্ষাধিক নিবন্ধিত জেলে রয়েছে। এসব জেলের বিকল্প কর্মসংস্থান তৈরির জন্য মৎস্য বিভাগ বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে বেশ কয়েক বছর চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, অন্য পেশায় যুক্ত হওয়ার জন্য; যাতে করে তারা ঋণ ও দাদনের ভেড়াজাল থেকে বেরিয়ে আসতে পারে। তবে জেলেরা নিজেরা সচেতন না হলে সচ্ছল হতে কষ্টকর হবে।

নিউজটি সহায়তা করেছেন আল মামুন বরিশাল, ইয়ামিন হোসেন ভোলা (উত্তর), সুজন শীল বরগুনা ও এমএ লতিফ, চাঁদপুর

নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2019 bangladeshdailyonline.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com