

কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলায় ভয়াবহ আকারে ছড়িয়ে পড়েছে গরুর ভাইরাসজনিত চর্মরোগ ‘লাম্পি স্কিন ডিজিজ’ (এলএসডি)। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে শত শত গরু আক্রান্ত হওয়ায় চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন খামারি ও গরু ব্যবসায়ীরা।
ইতোমধ্যে বহু খামারি তাদের স্বপ্নের গরু হারিয়ে পথে বসার উপক্রম হয়েছেন। আক্রান্ত গরুর শরীরে গুটি, জ্বর, ক্ষত ও চামড়া পচে যাওয়ার ঘটনায় গোটা উপজেলায় সৃষ্টি হয়েছে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি।
খামারিদের অভিযোগ, সরকারি পর্যায়ে পর্যাপ্ত ভ্যাকসিন না থাকায় রোগ প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। অন্যদিকে ব্যয়বহুল চিকিৎসা করিয়েও অনেক গরুকে বাঁচানো যাচ্ছে না। এতে ঈদকেন্দ্রিক পশু ব্যবসায় বড় ধরনের ধস নামার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার ইসলামাবাদ, সুলতানাবাদ, ফরাজিকান্দি, এখলাসপুর, জহিরাবাদ, ষাটনল, সাদুল্ল্যাপুর, বাগানবাড়ি, ফতেহপুর ইউনিয়ন ও ছেংগারচর পৌর এলাকার প্রায় প্রতিটি গ্রামেই কমবেশি গরু আক্রান্ত হয়েছে। আক্রান্ত গরুর দুধ উৎপাদন কমে যাচ্ছে, শরীরজুড়ে ক্ষত তৈরি হচ্ছে এবং চামড়া নষ্ট হয়ে বাজারমূল্য কমে যাচ্ছে। ফলে দুধ, মাংস ও চামড়া শিল্পেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
গত সোমবার (১১ মে) গজরা ইউনিয়নের খাককান্দা গ্রামে হৃদয়বিদারক এক ঘটনার সৃষ্টি হয়। প্রান্তিক খামারি হোসনেয়ারা বেগমের কোরবানির ঈদ উপলক্ষে লালন-পালন করা প্রায় আড়াই লাখ টাকা মূল্যের একটি বড় গরু লাম্পি স্কিন রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস হারিয়ে এখন তিনি দিশাহারা।
অন্যদিকে ইসলামাবাদ ইউনিয়নের বাসিন্দা শুভ জানান, প্রায় ২০ দিন আগে তাদের ৯ মাসের অন্তঃসত্ত্বা গাভী মারা গেছে। গাভীটির ওপরই পরিবারের বড় ধরনের আশা নির্ভর করছিল। একই ধরনের কষ্টের কথা জানান খামারি আলম নুরী। কয়েক দিন আগে তার শখের গরুটি মারা যাওয়ায় তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন।
ছেংগারচর পৌর এলাকার ওটারচর গ্রামের ক্ষুদ্র খামারি আতাউর রহমান বলেন, আমার একটি গরু লাম্পি স্কিন রোগে আক্রান্ত হয়েছিল। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অনেক টাকা খরচ করে চিকিৎসা করিয়েছি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত গরুটি মারা যায়। ডাক্তাররা বলেছেন, এই রোগের নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই।
সুজাতপুর গ্রামের খামারি জসিম উদ্দিন বলেন, আমার খামারে সাত-আটটি গরু রয়েছে। চারদিকে যেভাবে রোগ ছড়াচ্ছে, তাতে প্রতিদিন আতঙ্কে থাকতে হচ্ছে। ঈদের আগে গরু আক্রান্ত হলে ব্যবসায় বড় ধরনের ধস নামবে। এতে আমরা ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়বো।
মাঠ পর্যায়ে দেখা গেছে, মশা ও মাছির মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে গরু প্রথমে তীব্র জ্বরে আক্রান্ত হচ্ছে। পরে শরীরজুড়ে গুটি বসন্তের মতো ক্ষত তৈরি হয়ে চামড়া পচে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ক্ষতস্থান থেকে রক্ত ও পুঁজ বের হচ্ছে। আক্রান্ত গরু খাবার গ্রহণ বন্ধ করে দুর্বল হয়ে পড়ছে। ফলে চিকিৎসা করিয়েও অনেক গরুকে বাঁচানো সম্ভব হচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্ষাকাল ও আর্দ্র আবহাওয়ায় এ রোগের সংক্রমণ আরও দ্রুত বৃদ্ধি পায়। বর্তমানে মতলব উত্তরজুড়ে যেভাবে রোগ ছড়িয়ে পড়ছে, তাতে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে পুরো উপজেলার ডেইরি শিল্প বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়বে।
প্রাণিস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জানান, গোট পক্সের ভ্যাকসিন কিছু ক্ষেত্রে কার্যকর হতে পারে। তবে সেই ভ্যাকসিনেরও সংকট রয়েছে। সাধারণত ২১ দিনের মধ্যে রোগটি নিয়ন্ত্রণে আসে। তাই আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা বা নিবন্ধিত প্রাণিচিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. শ্যামল চন্দ্র দাস বলেন, লাম্পি স্কিন রোগের নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই। এটি একটি ভাইরাসজনিত রোগ। সচেতনতা ও পরিচর্যার মাধ্যমেই রোগ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। আক্রান্ত পশুকে অবশ্যই আলাদা রাখতে হবে এবং খামারের পরিবেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।
তিনি আরও বলেন, সরকারিভাবে এ রোগের ভ্যাকসিন খুবই সীমিত। তবে বেসরকারিভাবে কিছু ভ্যাকসিন মতলবে পাওয়া যাচ্ছে। আমাদের রেজিস্টার অনুযায়ী প্রতিদিন চার থেকে পাঁচটি আক্রান্ত গরু চিকিৎসা নিচ্ছে। এছাড়াও বাইরে থেকেও অনেক গরুকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে পুরো উপজেলায় পাঁচ শতাধিক গরু এই রোগে আক্রান্ত রয়েছে। চলতি বছরে সরকারিভাবে প্রায় ৮০০ গরুকে ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছে।
ডা. শ্যামল চন্দ্র দাস বলেন, রোগের লক্ষণ অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়া হয়। প্রাথমিকভাবে অ্যান্টিপাইরেটিক ও অ্যান্টিহিস্টামিন ব্যবহার করা হয়। ক্ষতস্থানে পভিসেপ বা ভায়োডিন দিয়ে ড্রেসিং করে বোরিক বা সালফানিলামাইড পাউডার ব্যবহার করা যেতে পারে। অযথা অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের প্রয়োজন নেই।
খামারিদের প্রতি পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, আক্রান্ত গরুকে আলাদা করে মশারির ভেতরে রাখতে হবে, যাতে অন্য গরু আক্রান্ত না হয়। আক্রান্ত গাভীর দুধ বাছুরকে না খাইয়ে মাটিতে পুঁতে ফেলতে হবে। আক্রান্ত গরুর ব্যবহৃত জিনিসপত্রও আলাদা রাখতে হবে।