

ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি আগ্রাসনের প্রভাবে ইতোমধ্যে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে প্রায় সব ধরনের জ¦ালানি পণ্যের দাম বেড়েছে। গতকাল রবিবার আরেক দফা বাড়ানো হয়েছে জ্বালানি তেলের দাম যা আজ থেকে কার্যকর হবে। এর মধ্যেই চলতি সপ্তাহে আরও বড় দুঃসংবাদ অপেক্ষা করছে। বিইআরসি সূত্র বলছে, এবার বাড়ানো হচ্ছে বিদ্যুতের দাম। এ দাম কার্যকর হবে জুনের ১ তারিখ (আজ) থেকে। চলতি সপ্তাহেই দাম বৃদ্ধির ঘোষণা করবে বিইআরসি।
জানা গেছে, প্রথমে গত ১ এপ্রিল, পরে মে মাসে বিদ্যুতের দাম বাড়াতে সরকারের মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদন চেয়েছিল বিদ্যুৎ বিভাগ। এরপর মন্ত্রিসভা কমিটি থেকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করে দেয় সরকার। সেই কমিটি বিদ্যুতের দাম বাড়াতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া অনুমোদন করে। পরে বিদ্যুৎ বিভাগের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলোর দাম বৃদ্ধির আবেদন আমলে নিয়ে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) দ্রুতগতিতে দাম সমন্বয়ের গণশুনানির আয়োজন করেছে। গত মে মাসের ২০ ও ২১ তারিখ
ছয়টি বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির ওপর গণশুনানি শেষ করে। সেখানে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বাবিউবো) প্রস্তাবিত পাইকারি বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর আবেদনের ওপর শুনানি হয়। এ ছাড়া পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের (পিজিসিবি) হুইলিং চার্জ বা সঞ্চালন চার্জ বা দাম বাড়ানোর আবেদনের ওপর শুনানি হয়। খুব দ্রুতগতিতে সব প্রক্রিয়া শেষ করে এখন বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর অপেক্ষায় আছে বিইআরসি। বিইআরসি সূত্রে জানা যায়, ঈদের আগেই প্রায় সব কিছু চূড়ান্ত করে রেখেছে সংস্থাটি। এখন কেবল আনুষ্ঠানিক ঘোষণা বাকি।
এদিকে গণশুনানিতে অংশ নিয়ে ব্যবসায়ী, বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ বিদ্যুতের দাম না বাড়ানোর আবেদন করেন। ব্যবসায়ীরা বলেছেন, বিদ্যুতের দাম না বাড়িয়ে বরং বিদ্যুতের দাম কমানো উচিত। বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলোর দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেছে বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ।
এদিকে বিইআরসির একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে আমাদের সময়কে বলেছেন, জুনের প্রথম সপ্তাহ থেকেই বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির ঘোষণা আসতে পারে। কারণ মে মাসের মধ্যেই আনুষ্ঠানিক সব ধরনের কাজ শেষ করার নির্দেশনা ছিল।
পাইকারি থেকে খুচরা উভয় পর্যায়ে দাম বাড়ানোর বিষয়টি অনেকটা নিশ্চিত বলে জানা গেছে। নতুন দাম জুনের ১ তারিখ থেকেই কার্যকর করতে চায় বিদ্যুৎ বিভাগ।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) পাইকারি পর্যায়ে ইউনিটপ্রতি ১ দশমিক ২০ টাকা (১৭ শতাংশ) থেকে ১ দশমিক ৫০ টাকা (২১ শতাংশ) দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে। বিইআরসি সূত্রে জানা যায়, প্রস্তাবের প্রায় কাছাকাছি দাম বাড়বে। বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে মন্ত্রিসভা কমিটিতে প্রায় একই পরিমাণ দাম বাড়ানোর প্রস্তাব প্রেরণ করা হয়েছিল। পরে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে যে উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে সেই কমিটিও একই পরিমাণে দাম বাড়ানোর বিষয়ে সম্মত হয়েছে।
বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেছেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে আদেশ দেওয়া হবে। তবে এখনই সুনির্দিষ্ট তারিখ বলা যাচ্ছে না। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দাম নির্ধারণের বিষয়ে কাজ চলছে। এখনই সুনির্দিষ্ট কোনো পরিমাণ বলা যায় না। চূড়ান্ত হলেই বলা যাবে। তিনি আরও বলেন, পাইকারি দাম বৃদ্ধির প্রস্তাবে ১৭ থেকে ২১ শতাংশের কথা বলা হয়েছে, এর কাছাকাছিই থাকবে।
বিপিডিবির দাম বৃদ্ধির প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিদ্যুতের সম্ভাব্য উৎপাদন খরচ পড়বে প্রায় ১ লাখ ৪৩ হাজার ১০৮ কোটি টাকা। প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম পড়বে ১২ দশমিক ৯১ টাকার মতো। বিদ্যমান পাইকারি দামে বিক্রিতে আয় হবে ৭৭ হাজার ৫৫৩ কোটি টাকা। এতে করে ঘাটতি দাঁড়াবে প্রায় ৬৫ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। ইউনিটপ্রতি ১ দশমিক ২০ টাকা (১৭ শতাংশ) বৃদ্ধি হলে ঘাটতি কমবে ১ হাজার ৩২৯ কোটি আর ১ দশমিক ৫০ টাকা (২১ শতাংশ) হারে দাম বাড়লে ঘটতি কমবে ১ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকা।
সর্বশেষ ২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি নির্বাহী আদেশে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়। ওই আদেশে পাইকারি বিদ্যুতের গড় দর ৬ দশমিক ৭০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭ দশমিক ০৪ টাকা করা হয়। যদিও কোম্পানিভিত্তিক বিক্রির পার্থক্যের কারণে গড় বিক্রি মূল্য ৬ দশমিক ৯৯ টাকা দাঁড়িয়েছে বলে দাবি বিপিডিবির। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯-২০ অর্থবছরে বিদ্যুতের গড় উৎপাদন খরচ ছিল ২ দশমিক ১৩ টাকা, ২০২০-২১ অর্থবছরে ৩ দশমিক ১৬ টাকা আর ২০২২ সালে সাড়ে ৮ টাকার মতো, এখন গড় উৎপাদন খরচ ১৩ টাকার কাছাকাছি। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, ডলারের দাম বেড়ে যাওয়াকে কারণ দেখানো হয়। তবে সংশ্লিষ্টরা নানা রকম দুর্নীতি, অনিয়ম, অসম চুক্তি ও অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করে আসছেন।
বিদ্যুতের বিদ্যমান পাইকারি দরে লোকসান দিচ্ছে বলে দাবি করেছে বিতরণ সংস্থা ও কোম্পানিগুলো। লোকসান ঠেকাতে ডেসকো ৯ দশমিক ৬৭ শতাংশ, ডিপিডিসি ৬ দশমিক ৯৬ শতাংশ, ওজোপাডিকো ১০ শতাংশ, আরইবি ৫ দশমিক ৯৩ শতাংশ; অন্যদিকে নেসকো ইউনিটপ্রতি ৩ পয়সা এবং বিপিডিবি ২৯ পয়সা বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে।
পাশাপাশি পাইকারি দাম এবং সঞ্চালন চার্জ সমান হারে বাড়ানোর আবেদন করেছে কোম্পানিগুলো। বিদ্যুতের একমাত্র সঞ্চালন কোম্পানি পিজিসিবি (পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি) প্রতি ইউনিটে যথাক্রমে ৩০ ও ৩১ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৪৮ ও ৪৯ পয়সা করার প্রস্তাব করেছে।
ঢাকা ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি পিএলসির (ডেসকো) প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি ২০২৪ পর্যন্ত পাইকারি দাম ৩৬ দশমিক ৯৮ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। ওই সময়ে গ্রাহক পর্যায়ে দাম বাড়ানো হয়েছে মাত্র ২৫ দশমিক ০২ শতাংশ। এতে করে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ডেসকোর ১ হাজার ৬২ কোটি, পরবর্তী দুই অর্থবছরে যথাক্রমে ৯৫২ এবং ৫৯৬ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। লোকসান ঠেকাতে হলে দাম ৯ দশমিক ৬৭ শতাংশ বাড়ানো জরুরি। এছাড়া নতুন করে পাইকারি দাম বাড়লে সমহারে বাড়ানোর কথা বলেছে।
ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি) তার প্রস্তাবে বলেছে পাইকারি দাম যে হারে বেড়েছে খুচরা সে হারে বাড়েনি। তাই ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৬৪৩ কোটি টাকা, পরের বছর ৩০২ কোটি এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৩৬ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে কোম্পানির। লোকসান সামাল দিতে হলে ৬ দশমিক ৯৬ শতাংশ হারে দাম বাড়ানো প্রয়োজন।
পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) তার প্রস্তাবে বলেছে, ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নিট লোকসান দিয়েছে ১৬৯৮ কোটি টাকা। গ্রাহক পর্যায়ে দাম না বাড়লে চলতি অর্থবছরে ২ হাজার ৮৯৭ কোটি টাকা লোকসান হবে। লোকসান ঠেকাতে হলে ৫ দশমিক ৯৩ শতাংশ হারে দাম বাড়ানো প্রয়োজন। পাইকারি দাম বাড়লে ৫ দশমিক ৯৩ শতাংশের সঙ্গে সেই পরিমাণও যোগ করার আবেদন করেছে আরইবি।
প্রসঙ্গত, পৃথিবীর যেকোনো দেশে যুদ্ধ লাগলেই আর্থিক ক্ষতির শিকার হয় বাংলাদেশ। এর আগে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের বলি হতে হয়েছে। সেই সময় জ¦ালানি তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে শুরু করে সব ধরনের নিত্যপণ্যের দাম বাড়ে। ইউক্রেন যুদ্ধ এবং কোভিডের ধাক্কা চলতে চলতে আবার ইরান যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাবের শিকার বাংলাদেশ।
সরকারের বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির উদ্যোগের বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে জ¦ালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল আলম আমাদের সময়কে বলেন, বিইআরসি একটি স্বাধীন সংস্থা হলেও তারা বরাবরই সরকারের নির্দেশ পালন করে আসছে। বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে যে নির্দেশনা দেওয়া হয়, সেই রকম করেই দাম নির্ধারণ করে। গণশুনানি অনেকটা লোক দেখানো মঞ্চায়ন।