শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬, ১০:৫০ পূর্বাহ্ন

সার্ক পুনরুজ্জীবনে সক্রিয় ঢাকা

বিডি ডেইলি অনলাইন ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২ জুন, ২০২৬
  • ৪০ বার

দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক)কে পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ জোরদার হয়েছে। প্রায় এক দশক ধরে কার্যত অচল হয়ে থাকা এই আঞ্চলিক জোটকে সক্রিয় করার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তাদের নির্বাচনী ইশতেহারেও সার্ককে কার্যকর ও গতিশীল করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে। তবে ভারত এখনও এ বিষয়ে সতর্ক ও অনাগ্রহী অবস্থানে রয়েছে। দিল্লির মতে, পাকিস্তানকে ঘিরে নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবাদ-সংক্রান্ত উদ্বেগ কাটেনি। ফলে সার্ক পুনরুজ্জীবনের বাস্তব সম্ভাবনাও সীমিত।

এর আগে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারের স্বার্থে সার্ক পুনরুজ্জীবনের আহ্বান জানান। তার বক্তব্যের পর ভারতীয় কূটনৈতিক মহলেও বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় দক্ষিণ এশিয়ায় একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক সংস্থার প্রয়োজনীয়তা আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় বেশি।

সম্প্রতি তুরস্কের আন্তালিয়ায় অনুষ্ঠিত আন্তঃরাষ্ট্রীয় কূটনীতি ফোরামে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান দক্ষিণ এশিয়ায় সহযোগিতা বৃদ্ধির জন্য সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, এ অঞ্চলে সহযোগিতার অপার সম্ভাবনা রয়েছে এবং রাজনৈতিক অচলাবস্থা কাটাতে সংলাপ ও কূটনীতির কোনো বিকল্প নেই। তার ভাষায়, সার্ক প্রতিষ্ঠায় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ঐতিহাসিক ভূমিকা ছিল। আঞ্চলিক জনগণের কল্যাণ, জীবনমানের উন্নয়ন এবং আত্মনির্ভরশীলতা বৃদ্ধির লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম অগ্রাধিকার হলো সার্ককেপুনরুজ্জীবিত করা। তার মতে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য, জ্বালানি সহযোগিতা, যোগাযোগ এবং অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সার্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হতে পারে। একই অনুষ্ঠানে পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার এবং আফগানিস্তানের প্রতিনিধিরাও অংশ নেন।

এদিকে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান সম্প্রতি সার্কের মহাসচিব মোহাম্মদ গোলাম সারওয়ারের সঙ্গে বৈঠকে সংগঠনটিকে আরও গতিশীল করার বিভিন্ন উপায় নিয়ে আলোচনা করেন। সেখানে সম্ভাব্য সার্ক শীর্ষ সম্মেলন, ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা এবং দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা নিরসনের বিষয় গুরুত্ব পায়। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বৈঠকে সার্ক পুনরুজ্জীবনের বিষয়ে ‘অটল অঙ্গীকার’ পুনর্ব্যক্ত করা হয়। ঢাকার মতে, সার্ক সনদের মূলনীতি-সার্বভৌম সমতা, আঞ্চলিক অখণ্ডতা, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতিই দক্ষিণ এশিয়ার সহযোগিতার ভিত্তি হওয়া উচিত।

বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারেও দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। দলটির নীতিগত অবস্থানে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ ও পারস্পরিক সম্মানভিত্তিক সম্পর্ক গড়ে তোলা, সার্ককে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সহযোগিতার কার্যকর প্ল্যাটফর্মে রূপ দেওয়া, আঞ্চলিক যোগাযোগ ও জনগণের মধ্যে সংযোগ বৃদ্ধি এবং বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সংযোগের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে একক কোনো দেশের ওপর অতিনির্ভরতা কমিয়ে বহুমুখী কূটনীতি পরিচালনার কথাও বলা হয়েছে।

তবে সার্ক পুনরুজ্জীবনের প্রশ্নে ভারতের অবস্থান এখনও কঠোর। ২০১৬ সালে ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের উরি হামলার পর ইসলামাবাদে অনুষ্ঠেয় ১৯তম সার্ক শীর্ষ সম্মেলন বয়কট করে ভারত। পরে বাংলাদেশ, ভুটান ও আফগানিস্তানও সরে দাঁড়ালে সম্মেলনটি স্থগিত হয়ে যায়। এর পর আর কোনো সার্ক শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়নি। ভারত দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, পাকিস্তান সন্ত্রাসবাদকে রাষ্ট্রীয় কৌশল হিসেবে ব্যবহার করছে এবং সেটিই সার্কের অচলাবস্থার প্রধান কারণ।

সম্প্রতি নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশি সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রি বলেন, ‘সার্ককে ফলপ্রসূ করতে অতীতে আমরা অনেক পদক্ষেপ নিয়েছিলাম, কিন্তু আশানুরূপ ফল পাইনি।’ তিনি আরও বলেন, ‘এ অঞ্চলে একটি দেশ সন্ত্রাসবাদের বিস্তার ঘটিয়েছে। ফলে সার্ক স্থবির হয়ে পড়েছে। অতীতে যারা সন্ত্রাসবাদকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে, তারা সেই অবস্থান থেকে সরে এসেছেÑ এমনটি বিশ্বাস করার যথেষ্ট সুযোগ নেই।’

ভারতের পররাষ্ট্রসচিব জানান, দিল্লি এখন আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে বঙ্গোপসাগরীয় বহুমুখী কারিগরি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা উদ্যোগ (বিমসটেক)কে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। তার ভাষায়, ‘আমরা বিমসটেক নিয়ে আশাবাদী। বাংলাদেশ বর্তমানে এর সভাপতির দায়িত্ব পালন করছে। ফলে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা এগিয়ে নেওয়ার বাস্তব সম্ভাবনা রয়েছে।’ কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের এই অবস্থান মূলত পাকিস্তানকে পাশ কাটিয়ে বিকল্প আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্মকে শক্তিশালী করার কৌশলের অংশ।

অন্যদিকে, পাকিস্তান ধারাবাহিকভাবে সার্ক সক্রিয় করার পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছে। একই সময়ে চীন বাংলাদেশ ও পাকিস্তানকে নিয়ে একটি ত্রিদেশীয় সহযোগিতা ফোরাম গঠনের আগ্রহ দেখিয়েছে। পরে মিয়ানমারকে যুক্ত করে আরেকটি আঞ্চলিক উদ্যোগ নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ায় ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা বাড়ার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ একদিকে সার্ক পুনরুজ্জীবনের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালাচ্ছে, অন্যদিকে বিমসটেকসহ অন্যান্য আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্মেও সক্রিয় ভূমিকা রাখছে।

দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রশ্নে নতুন করে কূটনৈতিক মেরুকরণ তৈরি হচ্ছে। বাংলাদেশ যেখানে সার্ককে পুনরায় কার্যকর করার পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা নিতে চাইছে, সেখানে ভারত নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবাদ ইস্যুকে সামনে রেখে বিকল্প প্ল্যাটফর্মের দিকে ঝুঁকছে। ফলে সার্কের ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের গতি-প্রকৃতি এবং দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক সমীকরণের ওপর।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ও সাবেক রাষ্ট্রদূত এম. হুমায়ুন কবির বলেন, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই সার্ককে সক্রিয় করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রীও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আলোচনায় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরছেন। তবে ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্বের কারণে দীর্ঘদিন ধরে সার্ক নিষ্ক্রিয় রয়েছে। তার মতে, বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় দক্ষিণ এশিয়ার গুরুত্ব বেড়েছে, কিন্তু কার্যকর কোনো আঞ্চলিক সংস্থা নেই। এ অঞ্চলের মানুষের উন্নয়ন, যোগাযোগ, জ্বালানি সহযোগিতা, জলবায়ু পরিবর্তনসহ বিভিন্ন অভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক সংস্থা এখন সময়ের দাবি।

নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2019 bangladeshdailyonline.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com