

নির্বাচনের পর অন্তত দুই বছর বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম না বাড়ানোর আলোচনা থাকলেও ক্ষমতায় আসার মাত্র তিন মাসের মাথায় বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) পাইকারি ও খুচরাÑ উভয় পর্যায়েই নতুন মূল্যহার ঘোষণা করেছে, যা চলতি জুন মাসের বিল থেকে কার্যকর হবে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, খুচরা পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় দাম ১ টাকা ৫২ পয়সা এবং পাইকারি পর্যায়ে ১ টাকা ৩৯ পয়সা বেড়েছে। খুচরা পর্যায়ে গড় মূল্য ১৬ দশমিক ৬৮ এবং পাইকারি পর্যায়ে ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ বেড়েছে। একই সঙ্গে সঞ্চালন চার্জও প্রায় ২৪ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। এর ফলে আবাসিক, কৃষি, শিল্প, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে বৈদ্যুতিক গাড়ির চার্জিং স্টেশনÑ সব শ্রেণির গ্রাহককেই বেশি দাম গুনতে হবে।
বিইআরসির হিসাব অনুযায়ী, পাইকারি পর্যায়ে এই মূল্যবৃদ্ধির ফলে বছরে অতিরিক্ত প্রায় ১৪ হাজার ২০০ কোটি টাকা আয় হবে। দাম এত বাড়ানোর পরও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) ঘাটতি পূরণে সরকারকে বছরে প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে। কমিশন বলছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন, আমদানি, ক্রয়, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি সামগ্রিক আর্থিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নতুন ট্যারিফ নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে ভোক্তারা বলছেন, আয় না বাড়লেও একের পর এক নিত্যপণ্য ও সেবার দাম বৃদ্ধির মধ্যে বিদ্যুতের নতুন মূল্যহার সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে দেবে। অর্থনীতিবিদ ও জ্বালানি বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, বিদ্যুতের এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব শুধু বিদ্যুৎ বিলেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; শিল্প উৎপাদন, সেচ কার্যক্রম, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং সার্বিক মূল্যস্ফীতির ওপরও প্রভাব পড়বে।
১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের পরে ক্ষমতাসীন বিএনপি তিন মাসের মধ্যেই গড়ে প্রায় ২০ শতাংশ বিদ্যুতের দাম বাড়াল। এ ছাড়া বাড়ানো হয়েছে জ¦ালানি তেল, এলপিজি এবং অনন্য জ¦ালানি পণ্যের
দাম। এসব করা হয়েছে ইরানযুদ্ধে জ¦ালানি তেলের দাম বৃদ্ধির অজুহাতে। গ্রাহক পর্যায়ে সর্বনিম্ন লাইফলাইন নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সৃষ্টি করা স্লাবেও দাম বাড়ানো হয়েছে। অর্থাৎ গ্রাহক পর্যায়ে ১৫ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ১৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ দাম বাড়ানো হয়েছে। গতকাল বুধবার রাজধানীর আইইবি ভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বিদ্যুতের নতুন বর্ধিত দামের ঘোষণা দেন। এ সময় অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন কমিশনের সদস্য আব্দুর রাজ্জাক, মিজানুর রহমান, সৈয়দা সুলতানা রাজিয়া ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ শাহিদ সারওয়ার। কমিশনের আদেশ অনুযায়ী, জুন মাসের বিল থেকেই নতুন দাম কার্যকর হবে।
বিইআরসির সরবরাহ করা তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের গড় মূল্য প্রতি ইউনিট ৭ টাকা। নতুন সিদ্ধান্তে তা ১ টাকা ৩৯ পয়সা বাড়িয়ে ৮ টাকা ৩৯ পয়সা করা হয়েছে। অন্যদিকে খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের গড় মূল্য ৯ টাকা ১১ পয়সা থেকে বেড়ে দাঁড়াবে ১০ টাকা ৬৩ পয়সায়। এ ছাড়া বিদ্যুতের সঞ্চালন মূল্যহার বা হুইলিং চার্জও বাড়ানো হয়েছে। বিদ্যমান ৩১ দশমিক ৩৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৩৮ দশমিক ৮৬ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। উল্লেখ্য, ছয়টি বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি পাইকারি দামে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড থেকে বিদ্যুৎ কিনে গ্রাহকদের কাছে বিক্রি করে। অন্যদিকে বিতরণ কোম্পানিগুলো গ্রাহকদের কাছে খুচরা দামে বিদ্যুৎ বিক্রি করে।
বিইআরসি জানায়, বিদ্যুৎ উৎপাদন, ক্রয় ও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যয় এবং সার্বিক আর্থিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নতুন মূল্যহার নির্ধারণ করা হয়েছে। কমিশনের হিসাবে, পাইকারি মূল্যবৃদ্ধি সত্ত্বেও পিডিবির ঘাটতি পূরণে সরকারকে বছরে প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে। এর আগে গত মে মাসের শুরুতে বিদ্যুতের পাইকারি, সঞ্চালন ও খুচরা মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব জমা দেয় বিপিডিবি, পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ (পিজিসিবি), ডেসকো, ডিপিডিসি, পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড, ওজোপাডিকো ও নেসকো। এসব প্রস্তাবের ওপর ২০ ও ২১ মে গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়।
বিপিডিবি পাইকারি পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১ টাকা ২০ পয়সা থেকে ১ টাকা ৫০ পয়সা পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছিল। অন্যদিকে বিভিন্ন বিতরণ কোম্পানি ৩ পয়সা থেকে ২৯ পয়সা পর্যন্ত মূল্যবৃদ্ধির আবেদন করে।
বিদ্যুতের নতুন মূল্যহার নিয়ে ভোক্তাদের মধ্যে উদ্বেগ ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। একাধিক গ্রাহক আমাদের সময়কে বলেছেন, এমনিতে মানুষের রোজগার নানা কারণে সংকীর্ণ হয়ে আসছে। অর্থনৈতিক মন্দাভাব বিরাজ করছে। সবকিছুর দাম বাড়ছে, কিন্তু সেই অনুপাতে মানুষের আয় বাড়ছে না। এমন পরিস্থিতিতে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ বলে অভিহিত করেছেন সাধারণ গ্রাহক। তারা বলছেন, এভাবে চলতে থাকলে সংসার চালানো কঠিন হয়ে যাবে। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে দাম বাড়ানোর প্রয়োজন হলে সেটি বুঝি, কিন্তু অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে ব্যয় বেড়ে থাকলে তার দায়ও কি সাধারণ মানুষকেই বহন করতে হবে?’
ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা ড. শামসুল আলম দাম বৃদ্ধির প্রতিক্রিয়ায় বলেন, সমস্যার প্রভাব সবখানেই পড়বে এবং মূল্যস্ফীতি বাড়বে। মূল্যস্ফীতি অনেক বেশি হলে ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পাবে। জনগণের যেহেতু ক্রয়ক্ষমতা কমে যাবে, জ্বালানি নিরাপত্তার কোনো সুরাহা হবে না। খাদ্য নিরাপত্তা ও উৎপাদনশীলতার ওপর প্রভাব পড়বে। ইতোমধ্যে সার সংকটের কারণে উৎপাদনে প্রভাব পড়েছে। তিনি বলেন, খাদ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে সংরক্ষণ এবং কৃষি এখন ভীষণভাবে বিদ্যুৎ-নির্ভর। এখানে ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় মূল্যস্ফীতি আরেক দফা বাড়বে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রভাব শুধু বিদ্যুৎ বিলেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। শিল্প উৎপাদন ব্যয়, সেচ কার্যক্রম, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়েও এর প্রভাব পড়তে পারে। ফলে মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা ভোক্তাদের ওপর নতুন করে আর্থিক চাপ বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
নতুন ঘোষিত দর অনুযায়ী আবাসিক, কৃষি, শিল্প, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, সেচ ও বৈদ্যুতিক গাড়ির চার্জিং স্টেশন সব শ্রেণির গ্রাহককেই আগের তুলনায় বেশি দাম গুনতে হবে।
নতুন ট্যারিফে আবাসিক গ্রাহকদের ক্ষেত্রে ব্যবহারভেদে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৬৯ পয়সা থেকে সর্বোচ্চ ২ টাকা ৭৪ পয়সা পর্যন্ত বেড়েছে। শতাংশের হিসাবে বিভিন্ন শ্রেণিতে দাম বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত।
নতুন দর অনুযায়ী, আবাসিক প্রান্তিক গ্রাহকদের (০ থেকে ৫০ ইউনিট) প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ টাকা ৩২ পয়সা, যা আগের চেয়ে ৬৯ পয়সা বা ১৪ দশমিক ৯০ শতাংশ বেশি। ০ থেকে ৭৫ ইউনিট ব্যবহারকারীদের জন্য ইউনিটপ্রতি দাম ৬ টাকা ১৮ পয়সা, যা ৯২ পয়সা বা ১৭ দশমিক ৪৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
এ ছাড়া ৭৬ থেকে ২০০ ইউনিট ব্যবহারে প্রতি ইউনিটের দাম হবে ৮ টাকা ৫০ পয়সা, যা ১ টাকা ৩ পয়সা বেশি। ২০১ থেকে ৩০০ ইউনিটের জন্য নতুন দর ৯ টাকা ১০ পয়সা, যা ১ টাকা ৫১ পয়সা বৃদ্ধি পেয়েছে। ৩০১ থেকে ৪০০ ইউনিটের ক্ষেত্রে ইউনিট প্রতি দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৯ টাকা ৬২ পয়সা এবং ৪০১ থেকে ৬০০ ইউনিটের জন্য ১৫ টাকা ১ পয়সা। সবচেয়ে বেশি ব্যবহারকারী শ্রেণি অর্থাৎ ৬০০ ইউনিটের বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করলে প্রতি ইউনিটের জন্য গুনতে হবে ১৭ টাকা ৩৫ পয়সা, যা আগের তুলনায় ২ টাকা ৭৪ পয়সা বেশি।
কৃষি সেচে ব্যবহৃত বিদ্যুতের ইউনিটপ্রতি দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ টাকা ৪ পয়সা। এ খাতে প্রতি ইউনিটে ৭৯ পয়সা বা ১৫ দশমিক ৪ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি করা হয়েছে।
ক্ষুদ্র শিল্পের ফ্ল্যাট রেটে ইউনিটপ্রতি বিদ্যুতের দাম হয়েছে ১২ টাকা ৭৩ পয়সা, যা বিদ্যমান দামের চেয়ে ১ টাকা ৯৭ পয়সা বেশি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, উপাসনালয় ও হাসপাতালের জন্য ইউনিটপ্রতি নতুন দাম ৯ টাকা ৫ পয়সা, যা আগের চেয়ে ১ টাকা ৫০ পয়সা বেশি।
রাস্তার বাতি ও পানির পাম্পে ব্যবহৃত বিদ্যুতের ইউনিটপ্রতি দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১১ টাকা ৪৬ পয়সা। একইভাবে বৈদ্যুতিক গাড়ির চার্জিং স্টেশনের জন্য নতুন দাম ১১ টাকা ৩৬ পয়সা, যা ১ টাকা ৭৪ পয়সা বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাণিজ্যিক ও অফিস শ্রেণির গ্রাহকদের জন্য ইউনিটপ্রতি বিদ্যুতের দাম ১৫ টাকা ৩৬ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ শ্রেণিতে দাম বেড়েছে ২ টাকা ৩৫ পয়সা বা ১৮ দশমিক ৬ শতাংশের বেশি।
শিল্প খাতেও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি করা হয়েছে। ৩৩ কেভি শিল্প গ্রাহকদের জন্য ইউনিটপ্রতি নতুন দাম ১২ টাকা ৭৫ পয়সা এবং ১৩২ থেকে ২৩০ কেভি শিল্প গ্রাহকদের জন্য ১২ টাকা ৬৬ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। উভয় ক্ষেত্রেই প্রতি ইউনিটে ২ টাকা করে দাম বাড়ানো হয়েছে।
এদিকে দাম বাড়ানোর ঘোষণার সময় কমিশনের সদস্য জালাল আহমেদ সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরে বলেন, পাইকারি বিদ্যুতের দাম ১৯.৮৫ শতাংশ বাড়ানোর পরও বিপিডিবির বছরে ৪১ হাজার কোটি টাকা লোকসান হবে। তিনি বলেন, বিদ্যুতের বর্তমান পাইকারি দর ইউনিটপ্রতি ৭ টাকা থেকে গড়ে ১.৩৯ টাকা বাড়িয়ে ৮.৩৯ টাকা করা হয়েছে। ইউনিটপ্রতি গড়ে ১.৩৯ টাকা বৃদ্ধিতে ১৪ হাজার ২০০ কোটি টাকা বাড়তি আয় হবে। এরপর ৪১ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে।
এক প্রশ্নে বলেন, সরকারি মালিকানাধীন বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোর আরওআর (রেট অব রিটার্ন) ১২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৬ শতাংশ করা হয়েছে। এতে উৎপাদন খরচ কিছুটা হলেও কমে আসবে। অন্যদিকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন বাড়লে ভবিষ্যতে বিদ্যুতের দাম কমানোর পর্যায়ে যেতে পারে। কোনো কারণে কমানো না গেলেও হয়তো বাড়ানোর প্রয়োজন নাও হতে পারে। বিদ্যুতের দাম সমন্বয়ের আদেশের সঙ্গে মেরিট অর্ডার ডেসপাচ (সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ কেন্দ্র আগে ব্যবহার), ক্যাপাসিটি চার্জসহ বেশকিছু সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা থাকবে। এগুলো সময়ে সময়ে যাচাই করা হবে।
চেয়ারম্যান বলেন, গ্রাহক পর্যায়ে ইউনিটপ্রতি বর্তমান দর (গড়) ৯.১১ টাকা থেকে ১.৫২ টাকা বাড়িয়ে ১০.৬৩ টাকা করা হয়েছে। এক প্রশ্নে বলেন, বিতরণ কোম্পানিগুলোর নির্দিষ্ট পরিমাণ আরওআর ধরে দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। বিদ্যুতের সব শ্রেণির গ্রাহকের দাম বাড়লেও বিদ্যমান ডিমান্ড চার্জ অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। আবাসিক ও সেচে নিম্নচাপে ((২৩০/৪০০ ভোল্ট) কিলোওয়ার্টপ্রতি ডিমান্ড চার্জ ৪২ টাকা, মধ্যমচাপে (১১ কেভি) ৯০ টাকা অপরিবর্তিত রাখা হয়। অন্য খাতের মধ্যে সর্বোচ্চ নির্মাণ শিল্পে ১২০ টাকা ডিমান্ড চার্জ রয়েছে।
সময় এবং চাপের (নিম্ন, মধ্যম ও উচ্চচাপ) ওপর ভিত্তি করে ভিন্ন ভিন্ন বিল দিতে হবে ভোক্তাদের। তুলনামূলকভাবে পিক আওয়ার (বিকাল ৫টা থেকে রাত ১১টা) বিদ্যুতের দাম বেশি নির্ধারণ করা হয়েছে। সবচেয়ে কম রয়েছে সুপার পিক আওয়ারে (ভোর ৫টা থেকে সকাল ৯টা)। এ ছাড়া সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত অফ-পিক, তবে কিছু বিশেষ গ্রাহকের ক্ষেত্রে রাত ১১টা থেকে ভোর ৫টায়ও অফপিক হিসেবে বিবেচিত হবে। অফপিকে তুলনামূলক দাম কিছুটা বেশি পড়বে।
সর্বশেষ ২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি নির্বাহী আদেশে গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ৮.৫০ শতাংশ বাড়ানো হয়। একই সঙ্গে পাইকারি দর ৬.৭০ টাকা থেকে ৫ শতাংশ বাড়িয়ে ৭.০৪ টাকা করা হয়।
বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি প্রত্যাহারের দাবি স্টিল মিল মালিকদের : বিদ্যুতের দাম ও সঞ্চালন চার্জ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন দেশের স্টিল মিল মালিকরা। গতকাল বুধবার এক বিবৃতিতে তারা জানান, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় না নিয়েই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা শিল্প খাতে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে।
বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসএমএ) জানায়, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) বিদ্যুতের গড় দাম ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ এবং সঞ্চালন চার্জ প্রায় ২৩ দশমিক ৯৬ শতাংশ বাড়িয়েছে। এতে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়।
স্টিল মিল মালিকদের মতে, কোভিড-পরবর্তী সময়ে শিল্প খাত দীর্ঘদিন ধরে উচ্চব্যয় চাপে রয়েছে। ব্যাংক ঋণের সুদহার বৃদ্ধি, টাকার অবমূল্যায়ন, গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়া, নির্মাণ খাতের মন্দা এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার কারণে অনেক কারখানা এখন লোকসান বহন করে চলছে। তারা আরও জানান, গত কয়েক বছরে বিদ্যুতের ট্যারিফ প্রায় ৩৬ শতাংশ এবং ডিমান্ড চার্জ ১২৫ শতাংশের বেশি বেড়েছে। একই সময়ে গ্যাসের দামও কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।
স্টিল মিল মালিকরা সতর্ক করে বলেন, বিদ্যুতের দাম বাড়লে উৎপাদন খরচ আরও বৃদ্ধি পাবে, বিনিয়োগ কমে যাবে এবং দেশের শিল্প প্রতিযোগিতা সক্ষমতা দুর্বল হবে। এর ফলে কর্মসংস্থান ও শিল্প স্থিতিশীলতা ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তাদের দাবি, বিদ্যুৎ মূল্যবৃদ্ধি শুধু একটি ট্যারিফ নয়, এটি শিল্প টিকে থাকার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তাই নতুন মূল্যহার অবিলম্বে প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছেন তারা।