

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দেশের স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে বড় ধরনের পরিবর্তনের পথে হাঁটছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনে এবার থাকছে না দলীয় প্রতীক, পোস্টার ও ইভিএম। স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে ভোটারদের সমর্থনসূচক স্বাক্ষর জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতাও তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। একই সঙ্গে বাড়ানো হতে পারে জামানতের পরিমাণ এবং নির্বাচনী সময়ে সংসদ সদস্যদের প্রভাব কমাতে নতুন বিধিনিষেধ আরোপের চিন্তাও করছে কমিশন। ইসি সূত্র বলছে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে অতীতে সম্পৃক্ততা থাকলেও তা প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে সরাসরি বাধা হবে না; বরং আচরণবিধি মেনে চলাই হবে প্রধান শর্ত।
ইসি কর্মকর্তারা জানান, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালা ও আচরণবিধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্থানীয় সরকার নির্বাচন ব্যবস্থায় বেশ কিছু সংস্কার আনা হচ্ছে। প্রচারণার ক্ষেত্রে পোস্টার নিষিদ্ধ করা, বিলবোর্ড ও সামাজিক মাধ্যমে প্রচারের নিয়ম নির্ধারণ, প্রার্থীদের জন্য নতুন শর্ত এবং নির্বাচনকালীন আচরণবিধি আরও কার্যকর করার বিষয়ে কাজ চলছে। সংস্কার
প্রস্তাব নিয়ে আগামী ১৫ জুনের মধ্যে সব অংশীজন ও নাগরিকদের মতামত নিয়ে খসড়া প্রকাশ করবে ইসি। চলতি মাসেই চূড়ান্ত হতে পারে নির্বাচনী বিধিমালা।
নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ আমাদের সময়কে বলেন, নির্বাচনে প্রার্থীদের ক্ষেত্রে অঙ্গীকারনামা আগে কখনো ছিল না। গত সংসদ নির্বাচনের আগে আমরা রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর ক্ষেত্রে একটি অঙ্গীকারনামার বিধান যুক্ত করলাম। এর মধ্যে রাজনৈতিক দলের অঙ্গীকারনামায় ছিল আমার দলের প্রার্থী ও নেতাকর্মীরা আচরণবিধি মেনে চলছে। এতে দলের সভাপতি ও সম্পাদক স্বাক্ষর করেছে। অপর অঙ্গীকারনামা প্রার্থীর ক্ষেত্রে, তিনিও আচরণবিধি মেনে চলার অঙ্গীকার করেছেন। এতে অঙ্গীকার করলেও আচরণবিধি মানতে হতো, স্বাক্ষর না করলেও বিধি মানতে হবে। তিনি আরও বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও সেই বিধিমালা নিয়ে আলোচনা চলছে। এটা যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা ৫০ শতাংশ। বাতিলও হতে পারে। কারণ অঙ্গীকার করলেও আচরণবিধি মানতে হবে, না করলেও মানতে হবে। সুতরাং অপ্রয়োজনীয় মনে হলে অঙ্গীকারনামা অংশটুকু বাতিলও হতে পারে। আবার যদি যুক্ত হয়ও, ক্ষেত্রে এতটুকুই হতে পারে। এর বেশি কিছু না।
এই অঙ্গীকারনামার ফলে কার্যক্রম নিষিদ্ধ কোনো দলের নেতাকর্মীদের নির্বাচনে অংশগ্রহণে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হবে কিনা, এমন প্রশ্নে এই নির্বাচন কমিশনার বলেন, না। তা হবে না। এখানে অঙ্গীকারনামা থাকলে কেবল আচরণবিধি মেনে চলার অঙ্গীকার প্রসঙ্গ থাকবে, এর বেশি না।
বিধি সংশোধন প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, স্থানীয় নির্বাচনে জামানতের পরিমাণ কিছুটা বাড়ানো হবে, যাতে যোগ্য প্রার্থীরা নির্বাচনে অংশ নেন। এ ছাড়া পোস্টার থাকবে না, অনলাইনে মনোনয়ন জমা দেওয়ার বিষয়টি থাকবে না এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে ন্যূনতম ১ শতাংশ ভোটারের সমর্থনের নথি জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতাও থাকবে না। তিনি জানান, উপজেলা পরিষদে সংসদ সদস্যদের (এমপি) অফিস থাকে। এতে তাদের প্রভাব বিস্তারের সুযোগ থাকে। নির্বাচনের সময় এমপিরা যেন উপজেলা পরিষদে না যান বা কম যান, সেটিও নির্বাচনী আচরণবিধিতে যুক্ত করার কথা ভাবা হচ্ছে।
নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ বলেন, ‘আইনবিধি সংশোধনের কার্যক্রম চলমান রয়েছে, যা আগামী ১৫ জুনের মধ্যে অংশীজন ও নাগরিকদের মতামত গ্রহণে খসড়া প্রকাশ করা হবে। আর জুনের মধ্যেই আইনবিধির সব কার্যক্রম শেষ করা হবে।
ইসি সচিব আখতার হোসেন আমাদের সময়কে বলেন, বিধিমালা সংশোধন বিষয়ে কমিশন পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে। বিধি প্রণয়নের কাজ চলছে বলেও জানান তিনি।
ইসির সংশ্লিষ্ট শাখা সূত্র জানিয়েছে, নির্বাচিন বিধির খসড়ায় নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিষিদ্ধ বা নিষেধাজ্ঞার আওতাধীন কোনো রাজনৈতিক দল বা সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা নেই, এই মর্মে ইসির তৈরি করা অঙ্গীকারনামায় সই দিতে হবে। কেউ তথ্য গোপন করলে ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর ফলে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পদে থাকা নেতাকর্মীদের নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া পথ রুদ্ধ হবে।
সূত্র জানিয়েছে, এই বিধান যুক্ত করবে না কমিশন। কারণ এবারের নির্বাচনে দলীয় প্রতীক থাকছে না। ফলে কোনো দলের প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়ায় প্রক্রিয়া নেই। সেক্ষেত্রে সবাই স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত হবেন। সেক্ষেত্রে দলের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অঙ্গীকারনামার বিষয়টি থাকছে না।
সংলাপে বসছে ইসি
এদিকে নির্বাচনী বিধিমালা চূড়ান্ত করে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনে রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, বিশেষজ্ঞসহ অংশীজনের সঙ্গে সংলাপ করতে চায় ইসি। সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ নাকি ইউনিয়ন পরিষদÑ কোন প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন আগে হবে, তা নিয়ে অংশীজনদের সঙ্গে সংলাপে বসার পরিকল্পনা করছে ইসি। রাজনৈতিক দল, শিক্ষক, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, নারী প্রতিনিধি, গণমাধ্যমকর্মী, নির্বাচন বিশ্লেষক ও সংশ্লিষ্টদের মতামত নিয়ে জনগণের জন্য কোন প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন আগে আয়োজন করা বেশি জরুরি ও উপযোগী হবে, সে বিষয়ে একটি গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্তে পৌঁছানো।
ইসি কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে ইউনিয়ন পরিষদ ছাড়া অধিকাংশ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিশূন্য এবং বিচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত হচ্ছে। তাই কোন প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন আগে করা হবে, তা নিয়ে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা বা সংলাপের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
আট ধাপে ইউপি নির্বাচন
বিভাগ ভিত্তিকভাবে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের ভোট সম্পন্ন করতে প্রাথমিক পরিকল্পনা করেছে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি।
ইসির নির্বাচন পরিচালনা শাখার সূত্র জানায়, চলতি বছরেই ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। সে ক্ষেত্রে আট বিভাগের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আট ধাপে হতে পারে। অর্থাৎ রাজশাহী বিভাগের ৫৬৫টি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন একসঙ্গে আয়োজন করা হবে। একইভাবে বাকি বিভাগগুলোর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনও পর্যায়ক্রমে সম্পন্ন করা হবে। শুধু ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন শেষ করতেই প্রয়োজন হবে আটটি ধাপ। একইভাবে বিভাগভিত্তিক উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচন আয়োজন করা হলে মোট ৩২টি ধাপ লাগতে পারে। তবে সরকার থেকে ভিন্ন কোনো সিদ্ধান্ত এলে সে অনুযায়ী কমিশন ব্যবস্থা নেবে।
নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ বলেন, আমরা বিভাগভিত্তিক স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের কথা ভাবছি। কারণ সারা দেশে একসঙ্গে জাতীয় নির্বাচন করতে পারলে একটি বিভাগে নির্বাচন আয়োজন করা কঠিন হওয়ার কথা নয়।
ইসির নির্বাচন পরিচালনা শাখার তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট ইউনিয়ন পরিষদ রয়েছে ৪ হাজার ৫৮১টি। এর মধ্যে চলতি বছর নির্বাচন উপযোগী হবে ৩ হাজার ৭৫৫টি এবং আগামী বছর আরও ৩৪৯টি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন উপযোগী হবে। এ ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের ভেঙে দেওয়া ৩৩০টি পৌরসভা, ৪৯৫টি উপজেলা পরিষদ, ১২টি সিটি করপোরেশন এবং ৬১টি জেলা পরিষদ বর্তমানে নির্বাচন উপযোগী অবস্থায় রয়েছে। নতুন করে বগুড়াকে সিটি করপোরেশন ঘোষণার অনুমোদন দিয়েছে সরকার। ফলে দেশে সিটি করপোরেশনের সংখ্যা দাঁড়াবে ১৩টি। পাশাপাশি নতুন পাঁচটি উপজেলা অনুমোদন করায় উপজেলার সংখ্যা হবে ৫০০। নতুন উপজেলার মধ্যে বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলা ভাগ করে মোকামতলা, কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলা ভাগ করে মাতামুহুরী, ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা ভাগ করে রুহিয়া ও ভুল্লী এবং লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা ভাগ করে চন্দ্রগঞ্জ উপজেলা করা হয়েছে।
ইসির নির্বাচন পরিচালনা শাখার কর্মকর্তারা বলছেন, স্থানীয় সরকারের কোনো প্রতিষ্ঠান নির্বাচন উপযোগী হলেও নির্বাচন আয়োজনের বিষয়টি অনেকাংশে সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে। সরকার চাইলে নির্বাচন কমিশন নির্বাচন আয়োজন করবে। সেক্ষেত্রে আগামী নভেম্বরের প্রথমার্ধে ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভার নির্বাচনের প্রথম ধাপের নির্বাচন শুরু হতে পারে।
মাঠ পর্যায়ে থেকে ব্যালট বাক্সের হিসাব চায় ইসি
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগাম প্রস্তুতি হিসাবে মাঠ পর্যায়ে থেকে ব্যালট বাক্সের হিসাব ও চাহিদা প্রেরণ নির্দেশনা দিয়েছে ইসি।
ইসির নির্বাচন পরিচালনা শাখার কর্মকর্তারা জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগাম প্রস্তুতির অংশ হিসাবে মাঠ পর্যায়ে কতটি ব্যালট বক্স আছে কিংবা কোনো এলাকায় আরও কতটি লাগবে তা নির্ধারণ করার জন্য এ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে সব কাজ প্রায় শেষের দিকে; আগামী সপ্তাহের মধ্যে প্রতিবেদন চূড়ান্ত করে তা কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করা যাবে।
এ বিষয়ে ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেন, নির্বাচন করতে আমাদের যেসব মালামাল প্রয়োজন, সে প্রস্তুতি আমাদের আছে। গত ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচন আমরা করলাম। সে সময় কিছু বাড়তি ব্যালট বাক্স কিনেছিলাম। হিসাব করে দেখলাম, গণভোটের জন্য কেন্দ্রপ্রতি অতিরিক্ত একটি করে ব্যালট বাক্স লাগবে। সেই ব্যালট বাক্সগুলো কিন্তু রয়ে গেছে। যেহেতু ধাপে ধাপে নির্বাচন হবে, সেহেতু সরঞ্জামের দিক থেকে আমাদের কোনো ঘাটতি আছে বলে আমার মনে হয় না। তবে মাঠ পর্যায়ে কোনো ঘাটতি আছে কিনা তা যাচাই করতেই অঞ্চলভিত্তিক তথ্য যাচাই করা হচ্ছে।