

আবারও আলোচনায় দুবাইভিত্তিক কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ড ও চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে লাভজনক নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি)। এবার একই দিনে পরপর দুটি চিঠি ইস্যু করা হয়েছে এনসিটি নিয়ে। একটি চিঠিতে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে আলোচনায় ইচ্ছুক না হলে তা বাতিল করতে বলা হয়েছে। এর পরপরই অন্য চিঠিতে আলোচনা অব্যাহত রাখার কথা বলা হয়েছে।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন-১ অধিশাখার সিনিয়র সহকারী সচিব ফারজানা হোসেন স্বাক্ষরিত ৪ জুনের ১৮.০০.০০০০.০৩৮.০৭.০০১.২৩-১৩৫ স্মারক নম্বরে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানকে উদ্দেশ করে লেখা চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ‘চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের এনসিটি টার্মিনাল পরিচালনা প্রতিষ্ঠান নিয়োগের লক্ষ্যে চলমান নেগোসিয়েশন এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য অথবা নেগোসিয়েশন এগিয়ে নিতে ইচ্ছুক না হলে, সে ক্ষেত্রে এ প্রক্রিয়া বাতিল করার বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।’
তাহলে দুই ধরনের চিঠি কেন ইস্যু করা হলো এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দুই চিঠির বক্তব্য তো একই রকম। উভয় চিঠিতেই আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য বলা হয়েছে।
তাহলে কি ডিপি ওয়ার্ল্ড পরিচালনার দায়িত্ব পাবে? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পাবে কি পাবে না তা নেগোসিয়েশনের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত হবে।
এদিকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, যেহেতু আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একটি প্রক্রিয়া মেনে আলোচনা চলছে, তাই চাইলেও এর থেকে বেরিয়ে আসা যাবে না। নেগোসিয়েশন পর্যায়ে অমিল হলেই শুধু এ প্রক্রিয়া থেকে বের হয়ে আসা যাবে। অন্যথায় সেই সুযোগ নেই।
কিন্তু এনসিটি টার্মিনাল যাতে ডিপি ওয়ার্ল্ডকে তথা কোনো বিদেশি কোম্পানিকে বরাদ্দ দেওয়া না হয়, সে জন্য গত ২৯ জানুয়ারির পর থেকে সংসদ নির্বাচনের আগ পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে গিয়েছিল বন্দরের শ্রমিক কর্মচারী পরিষদ। তাদের দাবি ছিল কোনোভাবেই চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে লাভজনক টার্মিনাল এনসিটিকে বিদেশি কোম্পানির কাছে বরাদ্দ দেওয়া যাবে না। প্রয়োজনে বে-টার্মিনালে তারা বিনিয়োগ করুক। এখন আবারও ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে আলোচনার বিষয়টি উঠে এসেছে।
বিষয়টি নিয়ে দেশ রূপান্তরের পক্ষ থেকে কথা হয় আন্দোলনকারীদের নেতা ইব্রাহিম খোকনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমরা আগের অবস্থানে অটল রয়েছি। এনসিটি কোনো বিদেশি কোম্পানির কাছে বরাদ্দ দেওয়ার প্রক্রিয়া গ্রহণ করা হলে আবারও আন্দোলন কর্মসূচি দেব। আমরা কোনোভাবেই এনসিটিতে বিদেশি কোম্পানি চাই না। বিদেশি কোম্পানি বিনিয়োগ করতে চাইলে গ্রিনফিল্ডে বিনিয়োগ করুক। রেডিমেড বন্দরের (ইকুইপমেন্টে সমৃদ্ধ চালু বন্দর) পরিচালনা করতে তারা কেন আসবে?’
রেডিমেডে কেন আগ্রহ? : চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ল্যান্ড লর্ড (সরকারের ভূমিতে প্রাইভেট বিনিয়োগে বন্দর নির্মাণ) পদ্ধতির দিকে ধাবিত হচ্ছে। কিন্তু তারপরও এনসিটির প্রতি ডিপি ওয়ার্ল্ডের বেশি দৃষ্টি। এখন তারা আবার সিসিটিও (চিটাগাং কনটেইনার টার্মিনাল) পরিচালনা করতে চায়। গত বছর চট্টগ্রাম বন্দরের মোট কনটেইনারের ৪৪ শতাংশ এনসিটিতে, ৩৬ শতাংশ জিসিবিতে (জেনারেল কার্গো বার্থ), ১৬ শতাংশ সিসিটিতে এবং প্রায় ৪ শতাংশ পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালে হ্যান্ডলিং হয়েছে। ড্রাফট ও আধুনিক ইকুইপমেন্ট বেশি থাকায় বড় জাহাজগুলো এনসিটি ও সিসিটিতে ভিড়ে এবং কনটেইনারও বেশি হ্যান্ডলিং করে। এনসিটি ও সিসিটি পরিচালনার দায়িত্ব পেলে ডিপি ওয়ার্ল্ড চট্টগ্রাম বন্দরের ৬০ শতাংশ কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের দায়িত্ব পেয়ে যাবে।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সাবেক সদস্য (প্রশাসন ও পরিকল্পনা) জাফর আলম বলেন, রেডিমেড বন্দরে বিনিয়োগ কম। যেদিন বিনিয়োগ করবে, সেদিন থেকেই লাভ আসবে। কিন্তু গ্রিনফিল্ডে টার্মিনাল নির্মাণে সময় যেমন বেশি লাগবে, ঠিক তেমনি বিনিয়োগে টাকাও বেশি লাগবে। রিটার্ন আসতে দেরি হবে। সে জন্য রেডিমেডে আগ্রহ বেশি।
পূর্বের প্রেক্ষাপট : এনসিটি টার্মিনাল নিয়ে উচ্চ আদালত থেকে বিদেশি অপারেটরের সঙ্গে চুক্তির প্রক্রিয়ার বৈধতা প্রশ্নে করা রিট গত ২৯ জানুয়ারি খারিজ করে দিয়েছিল হাইকোর্ট। বিচারপতি জাফর আহমেদের একক হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেয়। রিটের বিষয়ে রায়ের দেড় মাসেরও বেশি সময় আগে হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিভক্ত রায় দিয়েছিল। ২৯ জানুয়ারির রায়ের মাধ্যমে হাইকোর্টে সংখ্যাগরিষ্ঠ মতে রিট ও রুল খারিজের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে। এতে বিদেশিদের (ডিপি ওয়ার্ল্ড) বরাদ্দ দিতে কোনো আইনগত সমস্যা নেই। আর এরপর থেকেই আন্দোলনের ঘোষণা দেওয়া বন্দরের জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল এবং যা পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদে রূপ নেয়। মূলত তাদের আন্দোলনের মুখে অন্তর্বর্তী সরকার বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দুদিন আগে ঘোষণা দিতে বাধ্য হয়েছিল এনসিটি চুক্তির বিষয়ে তারা (অন্তর্বর্তী সরকার) এগোবে না। নির্বাচিত সরকার এসে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। গত ৪ জুন নির্বাচিত সরকার এনসিটি ইস্যুতে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
উল্লেখ্য, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়েই দেশের ৯৩ শতাংশ পণ্য পরিবাহিত হয়ে থাকে। এ বন্দরের সবচেয়ে লাভজনক টার্মিনাল হলো এনসিটি কনটেইনার টার্মিনাল। ২০০৭ সালে ৫৭০ কোটি টাকা খরচ করে এক হাজার মিটার দৈর্ঘ্যরে এই নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের (এনসিটি) চারটি বার্থ নির্মাণ করা হয়েছিল। বন্দরের ১৮টি অত্যাধুনিক কি গ্যান্ট্রি ক্রেনের মধ্যে ১৪টিই স্থাপন করা হয়েছে এখানে। একযোগে চারটি জাহাজ ভেড়ার সক্ষমতা সম্পন্ন এই টার্মিনালে, রয়েছে একাধিক রাবার টায়ার্ড গ্যান্ট্রি ক্রেনও। চট্টগ্রাম বন্দরের মোট অপারেশনাল কার্যক্রমের প্রায় ৪৪ শতাংশ কাজ এই টার্মিনালে হয়। লাভজনক এই রেডিমেড টার্মিনালটি বিদেশিদের বরাদ্দ দেওয়ার বিষয়ে আন্দোলনকারীদের আপত্তি।
তাদের মতে, পতেঙ্গার লালদিয়ায় টার্মিনাল নির্মাণের জন্য বিশ^খ্যাত এপি মুলারের সঙ্গে সরকার ৪৫ বছরের চুক্তি করলেও আপত্তি ছিল না। একইভাবে বে-টার্মিনালের তিনটি টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার দায়িত্ব দিলেও বিরোধিতা করা হয়নি। কিন্তু একটি চালু টার্মিনাল যেখানে বন্দরের নিজস্ব ইকুইপমেন্ট ও জনবল রয়েছে, সেই টার্মিনাল কেন বিদেশিদের পরিচালনার জন্য ইজারা দেওয়া হবে? এর আগে ইকুইপমেন্ট ছাড়া সৌদি আরবের রেড সি গেটওয়েকে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল দেওয়া হয়েছে পরিচালনার জন্য। সেখানেও শ্রমিক-কর্মচারীরা বাধা দেয়নি।