

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে ‘পুশইন’ নিয়ে সৃষ্ট উত্তেজনার মধ্যেই আজ সোমবার ভারতের নয়াদিল্লিতে শুরু হচ্ছে বিজিবি ও বিএসএফের মহাপরিচালক (ডিজি) পর্যায়ের ৫৭তম সীমান্ত সম্মেলন। চার দিনব্যাপী এই সীমান্ত সম্মেলনে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে পুশইন বন্ধের দাবিকে। পাশাপাশি সীমান্তহত্যা, বাংলাদেশের আকাশসীমায় ভারতীয় ড্রোন ও হেলিকপ্টারের অনুপ্রবেশ রোধ, সীমান্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ দূষণ রোধ ও সীমান্তসংক্রান্ত বিভ্রান্তিকর প্রচারণাসহ ১৬টি বিষয় তুলে ধরা হবে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার গঠনের পর এবং পশ্চিমবঙ্গে প্রথমবারের মতো বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর এটিই হবে এ ধরনের প্রথম বৈঠক।
বিজিবি সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এবারের বৈঠকের প্রথম এজেন্ডাই হচ্ছে পুশইন। বাংলাদেশের অভিযোগ, গত দুই বছরে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ দুই হাজারের বেশি মানুষকে বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে দিয়েছে। তাদের মধ্যে বাংলাদেশি নাগরিকের পাশাপাশি রোহিঙ্গা এবং ভারতীয় নাগরিকও ছিলেন। এসব ঘটনায় প্রচলিত যাচাই-বাছাই ও দ্বিপক্ষীয় প্রত্যাবাসন
প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে। বিএসএফ সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টে নারী-পুরুষকে জড়ো করে বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টা করছে; কিন্তু বিজিবির বাধায় বাংলাদেশে ঠেলে দিতে পারছে না।
বিশেষ করে গত মে মাস থেকে চলতি জুনের শুরু পর্যন্ত উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে দুই শতাধিক মানুষকে বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা হয়েছে বলে বিজিবির দাবি। বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্টে বিজিবি পরিচয় নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কাউকে গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায়। ফলে কয়েকটি এলাকায় দুই বাহিনীর মধ্যে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হয়; যা এখনও অব্যাহত রয়েছে। কোথাও কোথাও পুশইন ঠেকাতে বাংলাদেশি নাগরিকরা বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিজিবির এক কর্মকর্তা আমাদের সময়কে বলেন, আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার এবং দুই দেশের বিদ্যমান সমঝোতা অনুযায়ী নাগরিক প্রত্যাবাসনের নির্দিষ্ট পদ্ধতি রয়েছে। সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে কাউকে সীমান্তে ছেড়ে দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।
বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে প্রতিবেশী ভারত সরকারকে জানিয়ে দিয়েছে, যথাযথ পরিচয় যাচাইয়ের মাধ্যমে যেসব ব্যক্তি বাংলাদেশি হিসেবে শনাক্ত হবেন, কেবল তাদেরই গ্রহণ করা হবে। অন্য কোনো দেশের নাগরিক বা রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা মেনে নেওয়া হবে না।
পুশইনের পাশাপাশি সীমান্তহত্যা বন্ধের দাবিও জোরালোভাবে তুলবে বিজিবি। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দীর্ঘদিনের অভিযোগ, সীমান্তে প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতির পরিপন্থি। তাই সীমান্তে প্রাণহানি শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানাবে বাংলাদেশ।
এবার সম্মেলনে ভারতীয় ড্রোন ও হেলিকপ্টারের আকাশসীমা লঙ্ঘনের বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। বিজিবির অভিযোগ, সীমান্তবর্তী নদী ও দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় নজরদারির জন্য বিএসএফ প্রায়ই ড্রোন ব্যবহার করছে এবং অনেক ক্ষেত্রে সেগুলো বাংলাদেশের আকাশসীমায় প্রবেশ করছে। একইভাবে উত্তরাঞ্চল ও পার্বত্য সীমান্তে ভারতীয় হেলিকপ্টারের প্রবেশের ঘটনাও ঘটেছে বলে দাবি করা হয়েছে। এসব কার্যক্রম বন্ধে ভারতের কাছে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানাবে বাংলাদেশ।
অবকাঠামোগত সহযোগিতার অংশ হিসেবে দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা ছিটমহলে অপটিক্যাল ফাইবার সংযোগ স্থাপনের জন্য তিনবিঘা করিডোর ব্যবহারের বিষয়টিও আলোচনায় তুলবে বিজিবি। বাংলাদেশের ছিটমহল দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা গ্রামে অপটিক্যাল ফাইবার স্থাপন করতে হলে এর সংযোগ সড়ক ‘তিনবিঘা করিডোর’ ছাড়া কোনো উপায় নেই।
এ ছাড়া ত্রিপুরা থেকে আখাউড়ামুখী চারটি খাল দিয়ে ভারতের শিল্পবর্জ্য বাংলাদেশে প্রবেশ করে পরিবেশ ও কৃষির ক্ষতি করছে বলে অভিযোগ তুলে সীমান্ত এলাকায় বর্জ্য শোধনাগার স্থাপনের প্রস্তাবও দেবে বিজিবি। আখাউড়ায় চার খালের মুখে চারটি বর্জ্য শোধনের জন্য ইটিপি স্থাপন করার তাগিদ দেবে বাংলাদেশ।
প্রথমবারের মতো সীমান্তসংক্রান্ত তথ্যযুদ্ধও আলোচ্যসূচিতে এসেছে। বিজিবির মতে, ভারতের কিছু গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে বাংলাদেশ সীমান্ত নিয়ে বিভ্রান্তিকর ও উসকানিমূলক তথ্য প্রচার করা হচ্ছে, যা সীমান্তবাসীর মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এ ধরনের প্রচার বন্ধে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে ভারতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানানো হবে।
পূর্বানুমতি ছাড়া যেন সীমান্তের দেড়শ গজের মধ্যে কোনো অবকাঠামো নির্মাণ না করা হয় এ বিষয়টি বৈঠকে তুলবে বিজিবি। এ ছাড়া কুশিয়ারা নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা চাইবে বিজিবি। ২০২২ সালে ভারতের সঙ্গে সই হওয়া চুক্তির অধীনে ভারত ও বাংলাদেশের যৌথ নদী কুশিয়ারা থেকে ১৫৩ কিউসেক পানি উত্তোলন করবে বাংলাদেশ। কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে এই নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে বাংলাদেশ বঞ্চিত হয়। যে কারণে এ বিষয়টি আলোচনায় তুলবে বিজিবি।
এ ছাড়া বৈঠকে মাদক, মানব পাচার, আন্তঃসীমান্ত অপরাধ দমনসহ আরও নানা ইস্যু আলোচনায় স্থান পাবে। বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলে তৎপর বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর ক্যাম্প রয়েছে ভারত সীমান্তে। বিশেষ করে কুকিচীনের ক্যাম্প রয়েছে। বিজিবি এসব সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর ক্যাম্প সম্পর্কে তথ্য চাইবে।
চার দিনব্যাপী এই বৈঠকে বাংলাদেশের ১৫ সদস্যের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী। ভারতীয় প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন বিএসএফ মহাপরিচালক প্রবীণ কুমার। সীমান্তে সাম্প্রতিক উত্তেজনার কারণে এবারের বৈঠক শুধু নিয়মিত সীমান্ত সম্মেলন নয়, বরং দুই দেশের মধ্যে আস্থা পুনর্গঠন এবং পুশইনসহ অমীমাংসিত ইস্যু সমাধানের একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সুযোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সীমান্তে পুশইন ঠেকাতে সতর্ক বিজিবি : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
গতকাল রবিবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠকে বাংলাদেশ সীমান্তে অবৈধ পুশইনসহ সব গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে আলোচনা করবে। সীমান্তে আমাদের বর্ডার গার্ড সতর্ক আছে। সব অবৈধ পুশইনের চেষ্টাকে আমরা বাধা দেব।’
বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠক ইস্যুতে মন্ত্রী বলেন, ‘এ বৈঠকে সীমান্ত পরিস্থিতি, দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা এবং বিশেষ করে অবৈধ পুশইনের বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে তুলে ধরা হবে।’
তিনি জানান, বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠক নিয়মিতভাবে একবার বাংলাদেশে এবং পরেরবার ভারতে অনুষ্ঠিত হয়। এবার বৈঠকের আয়োজন ভারতেই হচ্ছে। কারণ, এটি তাদের পালা।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘সেখানে সব বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে। আমরা কূটনৈতিক চ্যানেলে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করছি এবং আমাদের সীমান্তরক্ষী বাহিনী সতর্ক রয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, সরকার সব ধরনের অবৈধ পুশইনের চেষ্টা প্রতিহত করতে প্রস্তুত। তবে এসব সমস্যা প্রাথমিকভাবে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান করা উচিত।
সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে নিয়মিত সংলাপ চলমান রয়েছে এবং আসন্ন বৈঠকেও এসব বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে।