

ইরানের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির বাণিজ্যিক অংশীদারদের লক্ষ্য করে সোমবার নতুন করে কঠোর নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করা হতে পারে বলে জানিয়েছেন মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট। পাল্টা হুমকি দিয়ে ইরান বলেছে, অর্থনৈতিক যুদ্ধ অব্যাহত থাকলে পারস্য উপসাগর থেকে সব ধরনের তেল রপ্তানি বন্ধ করে দেওয়া হবে। বার্তাসংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।
সোমবার স্থানীয় সময় দুপুর ১টায় সংবাদ সম্মেলন করার কথা রয়েছে বেসেন্টের। সেখানে ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর পদক্ষেপের ঘোষণা আসতে পারে। রোববার ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস-এ প্রকাশিত এক মতামত নিবন্ধে বেসেন্ট এটিকে কোনো প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ‘এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় আর্থিক যুদ্ধ’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি সামরিক হামলা স্থগিত থাকলেও ছয় মাস ধরে চলা সংঘাতের অবসানে দুই দেশের মধ্যে কার্যকর কোনো আলোচনাও হয়নি। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলা শুরুর পর থেকে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। নিহতদের বড় অংশ ইরান ও লেবাননের। এ ঘটনায় ইরানের প্রচলিত সামরিক সক্ষমতার বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং দেশটির অর্থনীতিও ব্যাপক চাপের মুখে পড়েছে। হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিও নিহত হয়েছেন।
তবে ইরানের হাতে এখনো ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা রয়েছে। এসব অস্ত্র দিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোতে হামলা এবং হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী জাহাজকে হুমকি দেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে তেহরানের। এর ফলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে জাহাজ চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বর্তমান অবস্থা এখনো স্পষ্ট নয়।
নতুন নিষেধাজ্ঞার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য সম্পর্কে বিস্তারিত না জানালেও বেসেন্ট ইরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও আর্থিক সম্পর্ক বজায় রাখা দেশগুলোকে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেন, ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক অব্যাহত রাখার পরিণতি সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে বিবেচনা করা উচিত।
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন পদক্ষেপের বিষয়ে আগে থেকেই প্রস্তুতি নিচ্ছিল ইরান। রোববার ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহসেন রেজাই অর্থনৈতিক পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, অর্থনৈতিক যুদ্ধ চলতে থাকলে হরমুজ প্রণালি কিংবা পারস্য উপসাগরের অন্য কোনো পথ কোনো জায়গা দিয়েই এক ফোঁটা তেল রপ্তানি করা হবে না। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক যুদ্ধে যে দেশ অংশ নেবে বা সমর্থন করবে, ইরান তাদের কর্মকাণ্ডকে ‘যুদ্ধের অংশগ্রহণ’ হিসেবে বিবেচনা করবে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্র চীনকেও ইরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্কের বিষয়ে সহযোগিতা করার আহ্বান জানিয়েছিল। ঐতিহাসিকভাবে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে চীনের তেল আমদানির বড় অংশ আসে। তবে ওয়াশিংটনে চীনা দূতাবাসের এক মুখপাত্র বলেন, নিষেধাজ্ঞা ও চাপ কোনো সমস্যার সমাধান করে না। তিনি কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানান।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার আগেই আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের অর্থনীতি দুর্বল অবস্থায় ছিল। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রিয়ালের দরপতন, জ্বালানি সংকট ও দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি দেশটির অর্থনীতিতে ছিল নানা কাঠামোগত দুর্বলতা। যুদ্ধের পর অবকাঠামো ক্ষতি, বাণিজ্য ব্যাহত হওয়া, উৎপাদন কমে যাওয়া এবং পুনর্গঠনের বিপুল ব্যয় পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
ইরানের কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, নতুন করে বড় ধরনের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলে জনগণের দুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে। এতে দেশে নতুন করে বিক্ষোভ দেখা দিতে পারে এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতি জনসমর্থন আরও দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি আলোচনা না থাকলেও কাতার, পাকিস্তান ও তুরস্কসহ কয়েকটি দেশ কূটনৈতিক উদ্যোগ চালিয়ে যাচ্ছে। জুনে সুইজারল্যান্ডে দুই দেশের মধ্যে সর্বশেষ সরাসরি আলোচনা হয়েছিল।
ইরান জানিয়েছে, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির সোমবার তেহরান সফর করবেন। আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তা পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এ সফর হচ্ছে বলে জানিয়েছে তেহরান। পাকিস্তানের একটি সরকারি সূত্র জানিয়েছে, মুনিরের আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞার হুমকিসহ সাম্প্রতিক পরিস্থিতি উঠে আসতে পারে।
ছয় মাসের সংঘাতে ইরান ও লেবাননে হাজার হাজার মানুষ নিহত এবং লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, সংঘাতে তাদের ১৮ জন সামরিক সদস্য নিহত এবং ৭৫০ জনের বেশি আহত হয়েছেন।