

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল ঘিরে সমঝোতার আলোচনা এগোলেও এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো। কয়েক দফা বৈঠকের পরও নতুন নতুন বিষয় সামনে আসায় ধীরগতিতে এগোচ্ছে চুক্তি সম্পাদনের প্রক্রিয়া। সমঝোতার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় জট তৈরি হয়েছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিং, তৃতীয় টার্মিনাল থেকে অর্জিত আয় বণ্টন এবং বিমানের অর্থ পরিশোধের নিশ্চয়তা নিয়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পারফরম্যান্স সিকিউরিটি, লাইবিলিটি ফ্রিজ এবং সরকারের সম্ভাব্য কমফোর্ট লেটারের মতো গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। ফলে অবকাঠামো নির্মাণের পর এখন তৃতীয় টার্মিনালের পরিচালন ও আর্থিক কাঠামো চূড়ান্ত করাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জটিলতা থাকলেও আগামী ১৬ ডিসেম্বর তৃতীয় টার্মিনাল চালুর লক্ষ্য ধরে কাজ করছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)।
থার্ড টার্মিনাল নিয়ে প্রথম দফার আলোচনা ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। ওই বৈঠকে উঠে আসা বিভিন্ন বিষয় সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর কাছে পাঠানো হচ্ছে। তারা প্রস্তাবগুলো পর্যালোচনা করে পরবর্তী আলোচনায় অংশ নেবে। চলতি সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে দ্বিতীয় দফার আলোচনা হতে পারে। তবে সব বিষয়ে একসঙ্গে সমঝোতা না হওয়ায় চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছাতে আরও সময় লাগতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
থার্ড টার্মিনাল পরিচালনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হয়ে উঠেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিং। বর্তমানে শাহজালাল বিমানবন্দরে গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছে বিমান। টার্মিনাল চালু হলে এই কার্যক্রম কীভাবে পরিচালিত হবে, বিমানের দায়িত্ব কতটুকু থাকবে এবং এর আর্থিক কাঠামো কী হবে- এসব বিষয় এখনও চূড়ান্ত হয়নি।
গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিংয়ের দায়িত্ব ও এর মাধ্যমে অর্জিত আয় থার্ড টার্মিনালের সামগ্রিক পরিচালন কাঠামোর সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। ফলে কে কোন দায়িত্ব পালন করবে এবং সেই দায়িত্বের বিপরীতে আর্থিক সুবিধা বা দায় কীভাবে নির্ধারিত হবে, তা নিয়ে সমঝোতা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এই বিষয়টির নিষ্পত্তি না হওয়ায় চূড়ান্ত চুক্তির প্রক্রিয়াও গতি হারাচ্ছে।
আলোচনায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিদ্যমান আর্থিক দায় ও দায়িত্বের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব দায় নতুন পরিচালন কাঠামোর ওপর কীভাবে প্রভাব ফেলবে, তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন। আলোচনায় একটি অবস্থান উঠে এসেছে- বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের নিজস্ব আর্থিক দায় সরাসরি অন্য পক্ষের নেওয়া সম্ভব নয়। বিমানের নিজস্ব দায়-দায়িত্ব বিমানকেই বহন করতে হবে।
এই বিষয়টির নিষ্পত্তি না হলে ভবিষ্যতে পরিচালন ও আর্থিক জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। বিশেষ করে থার্ড টার্মিনালের কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর বিমানের পুরনো বা সংশ্লিষ্ট আর্থিক দায় কীভাবে বিবেচনা করা হবে, তা চুক্তিতে স্পষ্ট করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
থার্ড টার্মিনাল থেকে বিভিন্ন সেবা ও কার্যক্রমের মাধ্যমে অর্জিত আয় কীভাবে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে বণ্টন হবে, সেটিও সমঝোতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিংসহ বিভিন্ন সেবা থেকে আয় কীভাবে হিসাব করা হবে এবং কোন পক্ষ কী পরিমাণ অর্থ পাবে- এ নিয়ে এখনও চূড়ান্ত কাঠামো তৈরি হয়নি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিষয়টি শুধু বর্তমান আয় বণ্টনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ভবিষ্যতে টার্মিনালের পরিচালন ব্যয়, বিভিন্ন পক্ষের দায়িত্ব এবং আর্থিক দায়ও এর সঙ্গে যুক্ত। ফলে চূড়ান্ত সমঝোতার আগে পুরো আর্থিক কাঠামো স্পষ্ট করা প্রয়োজন। কোন খাতে কত অর্থ ব্যয় হবে, কোন পক্ষ কী দায়িত্ব নেবে এবং সেই অনুযায়ী আয় কীভাবে ভাগ হবে- এসব বিষয়ও সমঝোতার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
বিমানের অর্থ পরিশোধে নিশ্চয়তা চায় জাপানি প্রতিষ্ঠান
সমঝোতার ক্ষেত্রে আরেকটি স্পর্শকাতর বিষয় হলো বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের অর্থ পরিশোধের নিশ্চয়তা। আলোচনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের মতে, সংশ্লিষ্ট জাপানি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বিমানের আর্থিক দায় যথাসময়ে পরিশোধ হবে কিনা, সে বিষয়ে নিশ্চয়তা চাওয়া হয়েছে।
বিমানের আর্থিক সক্ষমতা ও দায় পরিশোধের বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য কী ধরনের ব্যবস্থা থাকবে, সেটিই এখন আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অর্থ পরিশোধে কোনো ধরনের বিলম্ব বা ব্যর্থতা হলে সংশ্লিষ্ট পক্ষ কীভাবে সুরক্ষিত থাকবে, সেই বিষয়েও শর্ত নির্ধারণের চেষ্টা চলছে।
বিমানের আর্থিক দায়ের ক্ষেত্রে সরাসরি সরকারি গ্যারান্টি দেওয়ার বিষয়টি এখনও চূড়ান্ত হয়নি। এর পরিবর্তে সরকারের পক্ষ থেকে ‘কমফোর্ট লেটার’ দেওয়ার প্রস্তাব আলোচনায় এসেছে। এই চিঠির মাধ্যমে সরকার বিমানের অর্থ পরিশোধের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক আশ্বাস দিতে পারে। তবে এই চিঠির আইনি কাঠামো কী হবে এবং এটি আর্থিক গ্যারান্টির বিকল্প হিসেবে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়েও আলোচনা চলছে। অর্থাৎ জাপানি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বিমানের অর্থ পরিশোধের নিশ্চয়তা চাওয়া হলেও সরকার সরাসরি বিমানের সব আর্থিক দায়ের গ্যারান্টর হবে কিনা, সেটি এখনও নির্ধারিত হয়নি।
বিমানের অর্থ পরিশোধ নিশ্চিত করতে ‘পারফরম্যান্স সিকিউরিটি’ রাখার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কাছ থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ নিরাপত্তা জামানত রাখা হতে পারে। নির্ধারিত সময়ে বিমান অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হলে সেই জামানত থেকে অর্থ সমন্বয়ের সুযোগ থাকবে। তবে জামানত থেকে অর্থ নেওয়ার পরও যদি কোনো ঘাটতি থাকে, তখন কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সেটিও এখনও আলোচনায় রয়েছে। এ ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার একটি সম্ভাব্য কাঠামোর কথাও উঠে এসেছে। ফলে শুধু জামানত রাখা নয়, অর্থ পরিশোধে ব্যর্থতার পরবর্তী পরিস্থিতি কীভাবে সামাল দেওয়া হবে, সেটিও চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হয়ে উঠেছে।
বিমানের দায়-দায়িত্বের ক্ষেত্রে ‘লাইবিলিটি ফ্রিজ’ কত দিন কার্যকর থাকবে, সেটিও এখনও চূড়ান্ত হয়নি। সময়সীমা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ থার্ড টার্মিনাল পরিচালনার সঙ্গে বিমানের বিদ্যমান বা সংশ্লিষ্ট আর্থিক দায় কীভাবে বিবেচনা করা হবে, তার ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে।
পরবর্তী বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। লাইবিলিটি ফ্রিজের সময়সীমা নির্ধারণের পাশাপাশি ওই সময়ের মধ্যে দায় নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া এবং পরবর্তী সময়ে দায়ের ব্যবস্থাপনা কীভাবে হবে, সেটিও আলোচনার অংশ হতে পারে।
থার্ড টার্মিনালের শেয়ার কাঠামো নিয়েও আলোচনা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রেফারেন্সিয়াল শেয়ারের বিষয়টি মোটামুটি এগিয়েছে। অর্থাৎ শেয়ার কাঠামো নিয়ে আলোচনায় কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে। তবে এর সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য আর্থিক ও বাণিজ্যিক শর্ত এখনও পুরোপুরি চূড়ান্ত হয়নি। ফলে শেয়ার কাঠামোয় অগ্রগতি হলেও গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিং, আয় বণ্টন এবং বিমানের আর্থিক দায়ের মতো বিষয়গুলো এখনও সমঝোতার গতি ধীর করছে।
আলোচনায় জটিলতা থাকলেও তৃতীয় টার্মিনাল চালুর লক্ষ্য থেকে সরে আসেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সদস্য (প্রশাসন) এসএম লাবলুর রহমান ‘আমাদের সময়কে বলেন, আলোচনা চলছে। সব সমস্যার সমাধান করে ১৬ ডিসেম্বর চালুর লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, আর্থিক ও পরিচালনাগত বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা চললেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তৃতীয় টার্মিনাল চালুর লক্ষ্য ধরে এগোচ্ছে কর্তৃপক্ষ।
সংশ্লিষ্টদের মতে, তৃতীয় টার্মিনাল নিয়ে সমঝোতার প্রক্রিয়া থেমে নেই। বরং পক্ষগুলো এখনও সমঝোতার পথেই রয়েছে। তবে আলোচনায় নতুন নতুন বিষয় যুক্ত হওয়ায় প্রতিটি বিষয় আলাদাভাবে যাচাই ও পর্যালোচনা করতে হচ্ছে। চলতি সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে সম্ভাব্য দ্বিতীয় দফার আলোচনায় গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিংয়ের দায়িত্ব, আয় বণ্টনের কাঠামো, বিমানের আর্থিক দায় এবং সরকারের নিশ্চয়তার ধরন নিয়ে আরও আলোচনা হতে পারে। একই সঙ্গে পারফরম্যান্স সিকিউরিটি, লাইবিলিটি ফ্রিজ এবং কমফোর্ট লেটারের মতো শর্তও আলোচনায় গুরুত্ব পাবে।