সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৫৫ অপরাহ্ন

বদলে যাওয়া বাংলাদেশের গল্প শুনবে বিশ্ব

বিডি ডেইলি অনলাইন ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৭ বার

বিশ্বের নেতাদের মিলনমঞ্চ নিউইয়র্কে যখন ধ্বনিত হবে পৃথিবীর নানা প্রান্তের রাজনীতি, সংকট আর সম্ভাবনার গল্প, তখন সেই বিশ্বমঞ্চে নতুন বাংলাদেশের কণ্ঠস্বর হয়ে দাঁড়াবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গণতান্ত্রিক নবযাত্রার বার্তা, বদলে যাওয়া বাংলাদেশের স্বপ্ন ও ভবিষ্যতের পথরেখা নিয়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে আসছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ লক্ষ্যে আজ সোমবার ভোরে নিউইয়র্কের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়বেন তিনি। ২৪ সেপ্টেম্বর সাধারণ বিতর্কে প্রথমবারের মতো সরকারপ্রধান হিসেবে তার কণ্ঠে উচ্চারিত হবে বাংলাদেশের কথা, গণতন্ত্র ও জাতীয় স্বার্থ থেকে অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান, জলবায়ু ন্যায়বিচার থেকে রোহিঙ্গা সংকট, বিশ্বশান্তি থেকে বহুপক্ষীয় সহযোগিতা।

মাত্র পাঁচ দিনের সফর প্রধানমন্ত্রীর; অথচ তার পরতে পরতে থাকছে বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক পরিচয়, কূটনৈতিক প্রত্যাশা ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার বহুমাত্রিক বার্তা। নিউইয়র্কের বিশ্বমঞ্চে তাই এবার উচ্চারিত হতে যাচ্ছে পরিবর্তিত বাংলাদেশের এক নতুন পরিচয়ের গল্প।

সংক্ষিপ্ত সফর শেষে ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে তারেক রহমান দেশের উদ্দেশে রওনা হবেন। সফরে তার সঙ্গে থাকবে তুলনামূলক ছোট আকারের একটি প্রতিনিধি দল। তবে সময়ের হিসাবে সংক্ষিপ্ত হলেও এবারের নিউইয়র্ক সফর রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে অত্যন্ত ব্যস্ত হতে যাচ্ছে।

এবারের সফরের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক তাৎপর্য হলো, নতুন সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর জাতিসংঘের সর্বোচ্চ বৈশ্বিক মঞ্চে এটিই বাংলাদেশের প্রথম অংশগ্রহণ। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানেরও এটি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে প্রথম ভাষণ। অন্যদিকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বর্তমানে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি।

নিউইয়র্কে পৌঁছে ২২ সেপ্টেম্বর থেকেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি শুরু হবে। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের আয়োজনে রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের জন্য দেওয়া স্বাগত প্রাতঃরাশে অংশ নেওয়ার পর তিনি সাধারণ পরিষদের উদ্বোধনী কর্মসূচিতে যোগ দেবেন। সন্ধ্যায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আয়োজনে রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান এবং তাদের সহধর্মিণীদের সম্মানে দেওয়া অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার কর্মসূচিও রয়েছে। সফরের বিভিন্ন পর্যায়ে বিশ্বনেতাদের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক ও আনুষ্ঠানিক বৈঠকও হবে।

২৩ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচি আরও ব্যস্ত। আন্তর্জাতিক দাতব্য ও মানবিক সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকের পাশাপাশি বৈশ্বিক বৈষম্য সংকট মোকাবিলা নিয়ে আয়োজিত আলোচনায় বক্তব্য দেবেন তিনি। ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা, নরওয়ে ও স্পেনের উদ্যোগে আয়োজিত এই আলোচনায় বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং উন্নয়ন সহযোগিতার বিষয় গুরুত্ব পেতে পারে। একই দিনে জাতিসংঘ মহাসচিবের উদ্যোগে আয়োজিত ‘ক্লাইমেট অ্যাকশন অ্যান্ড জাস্ট ট্রানজিশন’ উচ্চপর্যায়ের বৈঠকেও অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী। জাতিসংঘের সূচি অনুযায়ী ২৩ সেপ্টেম্বর জলবায়ু কার্যক্রম ও ন্যায্য রূপান্তর নিয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। এই দিন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান কূটনৈতিক অগ্রাধিকার রোহিঙ্গা সংকট নিয়েও একটি গুরুত্বপূর্ণ সাইড ইভেন্ট অনুষ্ঠিত হবে।

২৪ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ দিন। ওই দিন সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে সৃষ্ট অস্তিত্বগত হুমকি মোকাবিলায় আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের সভায় উদ্বোধনী বক্তব্য দেওয়ার কর্মসূচি রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। জাতিসংঘের আনুষ্ঠানিক সূচিতে ২৪ সেপ্টেম্বর এই উচ্চপর্যায়ের সভার কথা রয়েছে। নিম্নভূমি ও উপকূলীয় দেশ হিসেবে বাংলাদেশ সেখানে জলবায়ু অর্থায়ন, অভিযোজন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলা এবং জলবায়ু ন্যায়বিচারের দাবি তুলে ধরতে পারে। একই দিন মাতৃ ও নবজাতকের স্বাস্থ্য এবং মিডওয়াইফারি নিয়ে বাংলাদেশের উদ্যোগে একটি সাইড ইভেন্ট অনুষ্ঠিত হবে।

এদিন বিকালে সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্কে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের পক্ষে ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এবারের ভাষণও বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার আলোকে সাজানো হচ্ছে। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তর, নতুন রাজনৈতিক যাত্রা, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, জলবায়ু পরিবর্তন ও জলবায়ু অর্থায়ন, রোহিঙ্গা সংকট, দারিদ্র্য বিমোচন, বৈশ্বিক শান্তি এবং বহুপক্ষীয় সহযোগিতার বিষয়গুলো বক্তব্যে গুরুত্ব পাবে। বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ও সম্পদ ফেরত আনার বিষয়টিও জাতিসংঘে বাংলাদেশের বক্তব্যে গুরুত্ব পেতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তন ও জলবায়ু ন্যায়বিচারও প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অবদান বিষয়টিও থাকবে।

সাইডলাইনে বৈঠক হবে যাদের সঙ্গে : সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে প্রধানমন্ত্রী বেশ কয়েকটি দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বসবেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, কুয়েতের ক্রাউন প্রিন্স শেখ সাবাহ আল-খালেদ আল-সাবাহ, থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী আনুতিন চার্নভিরাকুল, ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগে, ক্রোয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আন্দ্রেই প্লেনকোভিচ এবং হাইতির প্রধানমন্ত্রী সঙ্গে বৈঠকে প্রস্তুতির রয়েছে। এ ছাড়া জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস, জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ফলকার টুর্ক, শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার বারহাম সালিহ, ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তার সঙ্গে বৈঠকের কর্মসূচি রয়েছে। এর বইরে প্রধানমন্ত্রী ওয়াল স্ট্রিট ও মেটাসহ (ফেসবুক) আরও কিছু ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ প্রতিনিধিদের সঙ্গেও বৈঠক করবেন।

যুক্তরাষ্ট্র বিএনপিতে প্রাণচাঞ্চল্য : প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে ঘিরে প্রবাসী বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যেও ব্যাপক প্রাণচাঞ্চল্য দেখা গেছে। নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসে প্রতিদিন বিকালে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা সমবেত হয়ে মিছিল করছেন। নিউইয়র্কে বসবাসকারী বিএনপি সমর্থক শফিউল আলম বলেন, নেতা তারেক রহমান নিউইয়র্ক আসছেন— এটা আমাদের জন্য বিরাট প্রাপ্তি। বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের অনেক নেতাকর্মী ও সমর্থক বিভিন্ন রাজ্যে থাকেন। তারাও নিউইয়র্কে এসেছেন। ক্যালিফোর্নিয়া থেকে নিউইয়র্কে আসা সাব্বির আহমেদ বলেন, আমরা প্রবাসীরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি।

নিউইয়র্কে বিএনপির প্রস্তুতি : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বরণে যুক্তরাষ্ট্র বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলোর মধ্যেও ব্যাপক প্রস্তুতি চলছে। শনিবার নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির পক্ষ থেকে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক এবং উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার সাংগঠনিক সমন্বয়ক আনোয়ার হোসেন খোকন। লিখিত বক্তব্যের শুরুতেই তিনি বাংলাদেশের জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের এবারের জাতিসংঘ সফরকে ‘ঐতিহাসিক’ হিসেবে উল্লেখ করেন। বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের যুক্তরাষ্ট্র সফরকে সামনে রেখে তার নামে কথিত ‘ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা’ থাকার যে প্রচারণা চলছে, তা প্রত্যাখ্যান করেন যুক্তরাষ্ট্রে বিএনপির নেতারা। তারা বলেন, তারেক রহমানের নামে কোনো ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা নেই। এ ধরনের প্রচারণা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং ‘ফ্যাসিস্টদের অপপ্রচার’।

সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন বিএনপির কেন্দ্রীয় সদস্য আব্দুল লতিফ সম্রাট, গিয়াস আহমেদ, জিল্লুৃর রহমান জিল্লুর, মিজানুর রহমান ভুঁইয়া মিল্টন, মোস্তফা কামাল পাশা বাবুল প্রমুখ।

সফরসঙ্গী হচ্ছেন ৩৫ জন : গতকাল রবিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম জানান, এবারের সফরে জাতিসংঘের নির্ধারিত কর্মসূচিকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মোট ৩৫ জন সফরসঙ্গী থাকবেন। তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং ওয়াশিংটনে নিযুক্ত বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি যুক্তরাষ্ট্র থেকেই নিউইয়র্কে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যুক্ত হবেন। তিনি জানান, প্রতিনিধি দলে চারজন মন্ত্রী থাকছেন। পাশাপাশি দুজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বও প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে নিউইয়র্কে যাবেন।

জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গীদের মধ্যে রয়েছেন— জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব ড. গোলাম মহিউদ্দিন এবং বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক। এ ছাড়া সফরে থাকছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত এবং আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।

কঠোর নিরাপত্তার চাদরে নিউইয়র্ক : জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনকে ঘিরে বিশ্বনেতাদের মিলনমঞ্চ নিউইয়র্ক এখন কঠোর নিরাপত্তার বলয়ে। জাতিসংঘ সদর দপ্তর ও আশপাশের এলাকায় নেওয়া হয়েছে নজিরবিহীন নিরাপত্তাব্যবস্থা। নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগ (এনওয়াইপিডি), যুক্তরাষ্ট্রের সিক্রেট সার্ভিস, এফবিআই, স্টেট ডিপার্টমেন্টের ডিপ্লোম্যাটিক সিকিউরিটি সার্ভিস এবং জাতিসংঘ পুলিশ সমন্বিতভাবে নিরাপত্তা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে জাতিসংঘ সদর দপ্তরসংলগ্ন এলাকায় বিভিন্ন স্তরের তল্লাশি ও নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা হয়েছে।

নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2019 bangladeshdailyonline.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com