

আজ ২৭ সেপ্টেম্বর বিশ্ব পর্যটন দিবস। ‘ডিজিটাল রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় আগামীর পর্যটন’- এবারের এই প্রতিপাদ্য সামনে রেখে বাংলাদেশেও শুরু হচ্ছে সপ্তাহব্যাপী নানা কর্মসূচি। শোভাযাত্রা, সাইকেল র্যালি, সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের সিটি ট্যুর, পর্যটন খাতের অংশীজন ও বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে মতবিনিময়, প্রদর্শনী ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। এবারের আয়োজনের বিশেষ দিক হলো, প্রথমবারের মতো ১৩টি ক্যাটাগরিতে ‘বাংলাদেশ পর্যটন পুরস্কার ২০২৬’ দেওয়া।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড, বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনসহ মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন সংস্থা এসব কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। পর্যটন খাতে ডিজিটাল প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি বিদেশি পর্যটক আকর্ষণে আন্তর্জাতিক প্রচার জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
শোভাযাত্রা ও সিটি ট্যুর : আজ সকাল ৯টায় রাজধানীর পশ্চিম আগারগাঁওয়ের পর্যটন ভবনের সামনে থেকে শোভাযাত্রার মধ্য দিয়ে সপ্তাহব্যাপী কর্মসূচি শুরু হবে। পর্যটন খাতের সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন অংশীজন এতে অংশ নেবেন। শোভাযাত্রায় আবহমান বাংলার জীবনধারা, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ঐতিহ্য ও ঢাকার ঐতিহ্য তুলে ধরা হবে।
সকাল সাড়ে ৯টায় হবে সাইকেল র্যালি। এরপর সকাল ৯টা ৪০ মিনিটে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের উদ্যোগে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের নিয়ে সিটি ট্যুরের উদ্বোধন হবে। গাইডেড ট্যুরের মাধ্যমে তারা ঢাকার বিভিন্ন পর্যটন আকর্ষণ ঘুরে দেখার সুযোগ পাবে।
আগামীকাল ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যটন খাতের অংশীজনদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা হবে। ৩০ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশে অবস্থানরত বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের সঙ্গে মতবিনিময় অনুষ্ঠিত হবে। কূটনীতিকদের মাধ্যমে বাংলাদেশের পর্যটন সম্পর্কে প্রচার বাড়ানো এবং বিদেশি পর্যটক আকর্ষণের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের সঙ্গে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়টি এসব আয়োজনে গুরুত্ব পাবে।
এআই দিয়ে পর্যটন গন্তব্যের অভিজ্ঞতা : বিশ্ব পর্যটন দিবসের মূল আয়োজন হবে আগামী ৩ অক্টোবর শেরেবাংলা নগরের বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে। সেখানে ১২টি বিষয়ভিত্তিক প্রদর্শনী স্টলে দেশের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি, খাবার, জিআই পণ্য, কারুশিল্পের স্মারক, তাঁত ও বস্ত্র, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ঐতিহ্য, পর্যটন গন্তব্য এবং আবহমান বাংলার জীবনধারা তুলে ধরা হবে।
প্রতিপাদ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রদর্শনীতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারও দেখানো হবে। এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে পর্যটন গন্তব্যের অভিজ্ঞতা, টাইম ট্রাভেল এবং বিভিন্ন পর্যটন স্থানে ছবি তোলার ধারণা তুলে ধরা হবে। ওই দিন বিকাল ৩টায় ‘ডিজিটাল রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় আগামীর পর্যটন’ শীর্ষক আলোচনা সভা হবে। এতে পর্যটন খাতে ডিজিটাল প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করবেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও বিশেষজ্ঞরা।
প্রথমবার ১৩ ক্যাটাগরিতে পর্যটন পুরস্কার : এবারের আয়োজনের অন্যতম আকর্ষণ ‘বাংলাদেশ পর্যটন পুরস্কার ২০২৬’। প্রথমবারের মতো এ পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড এ পুরস্কার দেবে।
পর্যটন শিল্পের টেকসই উন্নয়ন, সেবার মানোন্নয়ন, উদ্ভাবন, ডিজিটাল রূপান্তর, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ, নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করা এবং পরিবেশ ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, উদ্যোক্তা ও পর্যটন উদ্যোগকে ১৩টি ক্যাটাগরিতে পুরস্কার দেওয়া হবে। আয়োজকদের মতে, পুরস্কারের মাধ্যমে পর্যটন খাতে উদ্ভাবনী ও দায়িত্বশীল উদ্যোগকে উৎসাহিত করার পাশাপাশি টেকসই পর্যটন বিকাশে গতি তৈরি হবে।
জিডিপিতে পর্যটনের অবদান বাড়ানোর লক্ষ : পর্যটন খাতকে জাতীয় অর্থনীতির মূলধারায় আরও শক্তভাবে যুক্ত করার লক্ষ্য নিয়েছে সরকার। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব ফাহমিদা আখতার জানিয়েছেন, বর্তমানে জিডিপিতে পর্যটন খাতের অবদান ২ থেকে ৩ শতাংশ। এটি ৭ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
পর্যটন খাতের প্রকৃত অবদান ও সম্ভাবনা নিরূপণে স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্ট তৈরির কাজ চলছে। এর মাধ্যমে কর্মসংস্থান, দেশি-বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা, ইনবাউন্ড ও আউটবাউন্ড পর্যটন এবং পর্যটকদের পছন্দের গন্তব্যসহ খাতটির অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যাবে।
এই তথ্যের ভিত্তিতে পর্যটন মাস্টারপ্ল্যানও হালনাগাদ করা হচ্ছে। সরকারের কৌশলগত উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে এটি সম্পন্ন করার প্রত্যাশা রয়েছে।
বিদেশি পর্যটক আকর্ষণে আন্তর্জাতিক প্রচার : বিদেশি পর্যটক বাড়াতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের পর্যটন সম্পদ ও ভাবমূর্তি তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকী জানিয়েছেন, বিদেশি কূটনীতিকদের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যায়ের প্রভাবশালী ব্লগার, ইনফ্লুয়েন্সার ও সাংবাদিকদের যুক্ত করে বাংলাদেশকে তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিদেশে আন্তর্জাতিক পর্যটন মেলা ও বিভিন্ন আয়োজনে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি পর্যটনসংশ্লিষ্ট কর্মীদের প্রশিক্ষণের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। বিমানবন্দরে বিদেশি পর্যটকদের সঙ্গে প্রথম যোগাযোগকারী ইমিগ্রেশন পুলিশের সদস্যদেরও প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
পর্যটন বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, বাংলাদেশের পর্যটন সম্পদ ও আতিথেয়তার ঐতিহ্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরার পাশাপাশি পর্যটকদের সেবার অভিজ্ঞতা উন্নত করাও এসব উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।
সপ্তাহব্যাপী কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দেশের পর্যটন খাতের সম্ভাবনা, ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পর্যটনকে তুলে ধরার বিষয়গুলো সামনে আনা হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রথমবারের পর্যটন পুরস্কারের মাধ্যমে খাতটির বিভিন্ন উদ্যোগ ও অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
পর্যটন দিবসে কক্সবাজারে পর্যটকের ঢল
‘ডিজিটাল রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় আগামীর পর্যটন’ প্রতিপাদ্যে আজ রবিবার বিশ্ব পর্যটন দিবস পালিত হচ্ছে। দিবসটি ও সাপ্তাহিক ছুটিকে কেন্দ্র করে গতকাল শনিবার থেকেই পর্যটকের ঢলে মুখর হয়ে উঠেছে কক্সবাজার। গত বৃহস্পতিবার থেকেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকরা আসতে শুরু করেন। সৈকতের লাবণী, সুগন্ধা ও কলাতলী পয়েন্টসহ বিভিন্ন স্থানে দেখা গেছে পর্যটকদের ভিড়।
বিশ্ব পর্যটন দিবস উপলক্ষে কক্সবাজারে চলছে তিন দিনের পর্যটন মেলা। লাবণী পয়েন্টের উন্মুক্ত মঞ্চের পাশে আয়োজিত এ মেলায় রয়েছে প্রায় অর্ধশত ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের স্টল। প্রতিদিন মঞ্চে ফোক গান, কাওয়ালি, দ্বৈত গানসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশিত হচ্ছে। পর্যটকরাও মেলায় ঘুরে এসব আয়োজন উপভোগ করছেন।
দিবসটি উপলক্ষে আজ বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়েছে। এতে ট্যুরিস্ট পুলিশের মোটরসাইকেল বহর, সৈকতের ঘোড়ার বহর ও বিচ বাইকসহ কক্সবাজারের ঐতিহ্য তুলে ধরা হবে। পর্যটন শিল্পের বিকাশ ও প্রসারে বিভিন্ন স্লোগানসংবলিত প্ল্যাকার্ড নিয়ে পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও পর্যটকরাও এতে অংশ নেবেন।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল মান্নান বলেন, পর্যটকদের সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে তিন দিনব্যাপী পর্যটন মেলার আয়োজন করা হয়েছে। পর্যটকরা যাতে কোনো ধরনের হয়রানির শিকার না হন, সেজন্য পর্যটন সেলের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে একাধিক দল মাঠে কাজ করছে।