

(ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৪১৯৩)
হাসা হারাম নয়, তবে নবী (সা.) অতিরিক্ত হাসতে নিষেধ করেছেন।
২. বেচাকেনায় অতিরিক্ত শপথ করবে না : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা বেচাকেনায় অতিরিক্ত শপথ করা থেকে বেঁচে থাকো। কারণ এটি পণ্য বিক্রি বাড়ায়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার বরকত নষ্ট করে দেয়।’
(মুসলিম, হাদিস : ১৬০৭; নাসাঈ, হাদিস : ৪৪৬০)
বেচাকেনায় অতিরিক্ত শপথ করার কারণে মিথ্যা জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। এর ফলে ক্রেতারা বিক্রেতার কথায় আস্থা হারাতে পারে।
৩. অতিরিক্ত প্রশ্ন করবে না : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের জন্য তিনটি বিষয় অপছন্দ করেছেন—অযথা ‘এটা বলা হয়েছে, ওটা বলা হয়েছে’ ধরনের কথাবার্তা বলা, সম্পদের অপচয় এবং অতিরিক্ত প্রশ্ন করা।
৪. অতিরিক্ত নসিহত করবে না : ইবনু মাসউদ (রা.) বলেন, ‘নবী (সা.) আমাদের নির্দিষ্ট কিছু দিনে নসিহত করতেন, যাতে আমরা বিরক্ত না হয়ে যাই।’
(বুখারি, হাদিস : ৭০)
৫. তাওয়াফের সময় অতিরিক্ত কথা বলবে না : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তাওয়াফ হলো নামাজের মতো। অতএব, তোমরা যখন তাওয়াফ করবে, তখন কম কথা বলবে।’
(নাসাঈ, হাদিস : ২৯২২)
তাওয়াফের সময় কথা বলা বৈধ, তবে অতিরিক্ত কথা বলা উচিত নয়। কারণ এতে এই মহান ইবাদতের সময় দোয়া, আল্লাহর কাছে বিনয় ও প্রার্থনা থেকে মানুষ বঞ্চিত হতে পারে।
৬. রাতে অপ্রয়োজনে অতিরিক্ত বাইরে বের হবে না : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘রাত গভীর হওয়ার পর তোমরা বাইরে বের হওয়া কমিয়ে দাও। কারণ আল্লাহ তাআলার কিছু প্রাণী আছে, যেগুলো তিনি পৃথিবীতে ছড়িয়ে দেন।’
(আবু দাউদ, হাদিস : ৫১০৪)
অতএব, রাত গভীর হওয়ার পর কোনো প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বারবার বের হওয়া উচিত নয়।
৭. যা কিছু শুনবে, সবকিছু প্রচার করবে না : মূলত কথা বলা বৈধ; কিন্তু একজন মানুষ যা কিছু শোনে, তা যাচাই-বাছাই না করে সবকিছু বলে বেড়ালে সে মিথ্যার মধ্যে পড়তে পারে। কারণ সে যা শুনেছে তার কিছু অংশ সত্য না-ও হতে পারে। ফলে যাচাই না করে তা অন্যের কাছে প্রচার করলে সে বিপদে পড়তে পারে এবং মানুষের কাছে তার বিশ্বাসযোগ্যতাও নষ্ট হতে পারে। এ কারণেই রাসুলুল্লাহ (সা.) মানুষ যা শোনে, তা সবকিছু বলে বেড়াতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘একজন ব্যক্তির মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে সে যা কিছু শোনে, তা-ই বলে বেড়ায়।’
(মুসলিম, ভূমিকা; আবু দাউদ, হাদিস : ৪৯৯২)
অতএব, কোনো সংবাদ বা তথ্য শুনলেই তা অন্যের কাছে প্রচার করা উচিত নয়; বরং তা সত্য কি না, তা যাচাই করা জরুরি।
৮. বন্ধুকে অতিরিক্ত দেখতে যেয়ো না : কারো সঙ্গে অতিরিক্ত সাক্ষাৎ করলে কখনো কখনো সে বিরক্ত বা ক্লান্ত হয়ে পড়তে পারে। বুদ্ধিমান ব্যক্তি হলো সে, যে এ বিষয়ে ভারসাম্য বজায় রাখে—একেবারে কমও নয়, আবার অতিরিক্তও নয়। এ কারণেই নবী (সা.) বন্ধুর সঙ্গে অতিরিক্ত সাক্ষাৎ না করার প্রতি ইঙ্গিত দিয়েছেন, যদিও বন্ধুকে দেখতে যাওয়ার মধ্যে সওয়াব রয়েছে। উদ্দেশ্য হলো, যাতে সাক্ষাতে একঘেয়েমি না আসে এবং বন্ধুর হৃদয়ে তোমার প্রতি ভালোবাসা বৃদ্ধি পায়। তিনি বলেছেন, ‘বিরতি দিয়ে সাক্ষাৎ করো; এতে ভালোবাসা বৃদ্ধি পাবে।’
(মুসনাদ বাজ্জার, হাদিস : ৯৩১৫)
তবে এর ব্যতিক্রমও রয়েছে। যার সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক আছে, অথবা যার সঙ্গে যৌথ কাজ বা দায়িত্ব আছে, তার সঙ্গে নিয়মিত সাক্ষাৎ করতে কোনো অসুবিধা নেই। একইভাবে মা-বাবার সঙ্গে সাক্ষাতের ক্ষেত্রেও এটি প্রযোজ্য নয়।
৯. স্বাভাবিক সীমার বাইরে অতিরিক্ত ভোগ-ব্যবহার করবে না : আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা খাও ও পান করো, কিন্তু অপচয় কোরো না। নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের ভালোবাসেন না।’
(সুরা : আরাফ, আয়াত : ৩১)
১০. অতিরিক্ত খাবে না : নবী (সা.) অতিরিক্ত পরিমাণে পেট ভরে খাওয়া থেকে নিষেধ করেছেন। এক ব্যক্তি নবী (সা.)-এর সামনে ঢেকুর তুলল। তখন তিনি বললেন, ‘তোমার ঢেকুর আমাদের থেকে দূরে রাখো। কারণ দুনিয়ায় যারা সবচেয়ে বেশি পেট ভরে খায়, কিয়ামতের দিন তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষুধার্ত থাকবে।’
(তিরমিজি, হাদিস : ২৪৭৮)
এই হাদিসের উদ্দেশ্য হলো অতিরিক্ত পেট ভরে খাওয়া থেকে মানুষকে নিরুৎসাহ করা। কারণ যে ব্যক্তি বেশি খায়, সে বেশি পান করে; বেশি পান করার ফলে বেশি ঘুমায়; বেশি ঘুমের কারণে তার মেধা ও মননশক্তি ভোঁতা হয়ে যেতে পারে; এর ফলে তার অন্তর কঠিন হয়ে যায়; শরীর অলস হয়ে পড়ে এবং ইবাদতে তার আগ্রহ ও উদ্যম কমে যায়।
পরিশেষে ইসলাম মানুষকে ভারসাম্য, সংযম ও পরিমিতিবোধ শিক্ষা দেয়। হাসি-ঠাট্টা, কথা বলা, ব্যবসা, প্রশ্ন করা, নসিহত করা, বন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ, ভোগ-ব্যবহার কিংবা খাদ্য গ্রহণ—কোনোটিই সব সময় নিষিদ্ধ নয়; কিন্তু কোনো বৈধ কাজও যখন সীমা অতিক্রম করে, তখন তা মানুষের দ্বিন, চরিত্র, সময়, সম্পদ ও অন্তরের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে।