

আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপি এককভাবেই সরকার গঠনের অবস্থায় আছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ মন্তব্য করেন।
তারেক রহমান বলেন, ‘শেখ হাসিনার পতনের মধ্য দিয়ে ছাত্রনেতৃত্বাধীন গণ-অভ্যুত্থান যে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করেছে, তার পূর্ণতা আসবে কেবল অবাধ ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে। ’
তিনি দাবি করেন, ‘বিএনপি এখন জনগণের আস্থার শীর্ষে রয়েছে এবং অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমেই পরিবর্তন আসবে।
তারেক রহমান বলেন, ‘আমরা আত্মবিশ্বাসী যে আমরা জয়ী হব। আমরা জোরালোভাবে বিশ্বাস করি যে এককভাবে সরকার গঠনের অবস্থায় আমরা রয়েছি।’
১৭ বছর লন্ডনে নির্বাসিত জীবনযাপন করা তারেক রহমান দেশে ফেরা প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘আমি মনে করি, আমার বাংলাদেশে ফেরার সময় খুব সন্নিকটে। সামনে নির্বাচন। নির্বাচনে দলীয় কায়ক্রম পরিচালনার জন্যই শিগগিরই দেশে ফিরবো।’
সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান আওয়ামী লীগকে ‘ফ্যাসিস্ট’ আখ্যা দিয়ে জানান, ছাত্রনেতৃত্বাধীন নতুন দলসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যৌথভাবে সরকার গঠনে বিএনপি প্রস্তুত। তিনি বলেন, ‘আমরা তাদের রাজনীতিতে স্বাগত জানাব। তারা তরুণ, তাদের ভবিষ্যৎ রয়েছে।’
তারেক রহমান তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগগুলোকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত দাবি করে বলেন, বিগত সরকার প্রতিহিংসাবশত উদ্দেশ্যমূলকভাবে এই অপপ্রচার চালিয়েছে। এসবের কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। আমরা প্রতিহিংসামূলক রাজনীতির চক্র ভাঙতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বিএনপি দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেয় না। গত আগস্ট থেকে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে দলের সাত হাজার সদস্যকে বহিষ্কার করা হয়েছে বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং এটি চলমান থাকবে।
২০০৮ সালে ফাঁস হওয়া এক মার্কিন কূটনৈতিক বার্তা এবং বিএনপি আমলের দুর্নীতির অভিযোগ প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশি গণমাধ্যমে ছড়ানো ভুয়া বর্ণনাই ওই মার্কিন তারবার্তার ভিত্তি তৈরি করেছিল। এতে আমার বিরুদ্ধে সুষ্পষ্ট কোনো দুর্নীতির প্রমাণ তুলে ধরতে পারেনি। যা এসেছে সবেই বিগত সরকারের মিথ্যা প্রপাগান্ডা। আমার বিরুদ্ধে কোনো দুর্নীতি প্রমাণ করা যায়নি। সব মামলাই এখন প্রত্যাহার হয়েছে। বিএনপির আমলে দুর্নীতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যেকোনো সরকারের কিছু ত্রুটি থাকে। বিএনপি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকাকালে কোনো দুর্নীতি হয়নি তা অস্বীকার করা যাবে না। তবে বিএনপি দুর্নীতি প্রতিরোধে বরাবরই ছিল সোচ্চার। যেমন, বিএনপিই দুর্নীতি দমন কমিশন গঠন করে।
আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফিরে আসার প্রসঙ্গে প্রশ্নের জবাবে তারেক রহমান বলেন,, অবশ্যই সবার রাজনীতি করার অধিকার আছে এবং আমরা তো চাই সবাই রাজনীতি করুক। বহুদলীয় রাজনীতিতে আমরা বিশ্বাস করি। কিন্তু দল হিসেবে যদি অন্যায়ের সঙ্গে জড়িত থাকে, তাহলে দেশের আইন অনুযায়ী আগে তার বিচার হবে। দেশের আইন সিদ্ধান্ত নেবে। যদি তারা অপরাধী হিসেবে দোষী সাব্যস্ত হয়, তাহলে রাজনীতি বা নির্বাচনে অংশ নেয়া কীভাবে সম্ভব।
শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে দুর্নীতি, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুমের মতো দমন-পীড়নের অভিযোগ রয়েছে। তারেক রহমান বলেন, ‘নির্বাচিত হলে তার সরকার শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠদের বিদেশে পাচার করা কোটি কোটি ডলার পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে।
ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বিষয়ে তারেক রহমান বলেন, তাঁর নীতি হবে ‘সবকিছুর আগে বাংলাদেশ’। শেখ হাসিনার আমলে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে তিনি ‘একপাক্ষিক’ বলে অভিহিত করে বলেন, ভবিষ্যতে এই সম্পর্ক হবে ‘সমমর্যাদাভিত্তিক ও ভারসাম্যপূর্ণ’।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান দেশের জন্য কিছু অর্থনৈতিক পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে পোশাক রফতানির ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে বাংলাদেশকে অ্যামাজন, ইবে ও আলিবাবার মতো বৈশ্বিক অনলাইন বিক্রেতাদের ‘সাপ্লাই হাব’ হিসেবে গড়ে তোলা। পাশাপাশি ভারতের সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে একপক্ষীয় সম্পর্ক পুনর্বিন্যাস করে ‘সবকিছুর আগে বাংলাদেশ’ভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণের প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি।
ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের দুই বড় রাজনৈতিক দল—আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে বিরোধ শুধু রাজনীতিতে নয়, পারিবারিক উত্তরাধিকারেরও প্রতিফলন। শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা, আর তারেক রহমান শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পুত্র।
এতে আরও বলা হয়, ৫৯ বছর বয়সী তারেক রহমান ২০০৮ সাল থেকে নির্বাসনে রয়েছেন। তার বিরুদ্ধে একাধিক দুর্নীতির মামলা রয়েছে, যেগুলোকে তিনি ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে দাবি করেছেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, নতুন বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এলে ‘প্রতিহিংসার রাজনীতি’ বন্ধ করবে। আগামী ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের দিকে বাংলাদেশ যখন এগিয়ে যাচ্ছে, তখন বিভিন্ন জরিপে বিএনপি এগিয়ে রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসেবে উঠে আসবেন। এদিকে অন্তর্বর্তী সরকার শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক কার্যক্রম থেকে নিষিদ্ধ করেছে।
ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনকালে বিরোধী মত দমন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুমের ঘটনা ঘটেছে। বর্তমানে আওয়ামী লীগ নেতাদের বিরুদ্ধে বিচার চলছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশের পরবর্তী সরকারকে দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি সামাল দিতে হবে। তৈরি পোশাক খাত যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্কের মুখে পড়েছে, একই সঙ্গে প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের অবনমনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।