বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০১:০১ অপরাহ্ন

বিদায়লগ্নে অন্তর্বর্তী সরকার

বিডি ডেইলি অনলাইন ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১০ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ২৭ বার

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতন হয় ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। এর তিন দিন পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন। সব কিছু ঠিকঠাক থাকলে চলতি মাসের ২০ ফেব্রুয়ারির মধ্যেই নতুন রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করবে। তাই নির্বাচনের আগে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাসহ সংশ্লিষ্টরা বিদায়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

সরকারের দায়িত্ব চালিয়ে যাওয়া ব্যক্তিরা পাসপোর্ট হস্তান্তর, সরকারি বাসা ছেড়ে দেওয়া এবং দাপ্তরিক কার্যক্রম গুছিয়ে নেওয়ার কাজ করছেন। বর্তমান সরকার আসার পর দেশে এবং দেশের বাইরে সরকারি দায়িত্ব পাওয়া কর্মকর্তারাও বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সরকার বিদায়ের প্রভাব পড়েছে প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয়ে। সেখানে বিরাজ করছে ঢিলেঢালা ভাব। এর মধ্যেই অন্তর্বর্তী সরকারের সাফল্য তুলে ধরতে আজ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করছে বেশ কয়েকটি মন্ত্রণালয়। ভোটের আগে শেষ কর্মদিবসকে টার্গেট করে এ প্রস্তুতি দেখা গেছে। অন্যদিকে প্রশাসনের কর্মকর্তারাও এবারের নির্বাচনকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছেন। প্রশাসনকে কলঙ্কমুক্ত করার সুযোগ হিসেবে দেখছেন কেউ কেউ।

গতকাল সচিবালয়ের বেশ কয়েকটি দপ্তর ঘুরে দেখা গেছে ঢিলেঢালা ভাব। রুটিন দায়িত্ব পালন করছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। আগামীতে কোন দল ক্ষমতায় আসবে এ নিয়ে আলোচনা তাদের মধ্যে। কেউ কেউ পছন্দের দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। কেউবা অপেক্ষা করছেন ভোট পরবর্তী ফলাফলের।

গতকাল দেখা গেছে, বর্তমান সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টার পিএস ও বিশেষ সহকারী পিএস পছন্দের পদায়নের জন্য তদবির করছেন। কারও তদবির সরাসরি উপদেষ্টার মাধ্যমে। অনেকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এপিডি উইংয়ের এক যুগ্ম সচিবের দপ্তরে ভিড় করেছেন। উদ্দেশ্যÑ নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের আগেই কাক্সিক্ষত পদায়ন। নতুন করে প্রকল্প অনুমোদনসংক্রান্ত ফাইল আপাতত রেখে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন উপদেষ্টা ও সচিবরা। তাদের পিএসদের একটা অংশ অফিসে রাখা ব্যক্তিগত উপকরণ বাসায় নিয়ে যাওয়ার জন্য গোছাতে ব্যস্ত ছিলেন। উপদেষ্টাদের স্টাফদের মধ্যেও কথাবার্তায় নমনীয়তা খেয়াল করা গেছে। দুদিন আগে চোখে পড়া তাদের দাম্ভিকতা নেই।

এদিকে বিভিন্ন পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্তরাও বিদায়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাদের কেউ কেউ সম্ভাব্য ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন। অনেকের অবশ্য সে সুযোগ নেই। যারা বর্তমান সরকারের দায়িত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত তাদের অনেকে সরকারের বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে সরে যেতে হবে। সচিবসহ অন্যান্য পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্তদের মেয়াদ নির্ভর করবে নতুন সরকারের ইচ্ছার ওপর। বিভিন্ন দূতাবাসে কর্মরত ব্যক্তিসহ দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোয় দায়িত্বপ্রাপ্তদের বড় অংশই বিদায়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

জানা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যক্রম তুলে ধরতে আজ বেশ কয়েকটি মন্ত্রণালয় প্রেস ব্রিফিংয়ের আয়োজন করেছে। উদ্দেশ্য সাফল্য জাতির কাছে প্রকাশ করা। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়; সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় এবং রেলপথ মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম তুলে ধরবেন উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান। নৌপথ মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম তুলে ধরতে সংবাদ সম্মেলন করবেন সাখাওয়াত হোসেন। এ রকম অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমও তুলে ধরার কথা রয়েছে।

সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন সরকার এলে যাতে দায়িত্ব হস্তান্তর সহজ হয় এবং দ্রুত সবকিছু বুঝিয়ে দেওয়া যায়, এজন্য প্রস্তুত করে রাখা হচ্ছে। এমনকি নতুন সরকার এলে কোনোরকম কালক্ষেপণ না করেই দ্রুত ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা। নির্বাচনের পর যত দ্রুত সম্ভব নির্বাচিত সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম।

তবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এবং গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে অন্যরকম ব্যস্ততা। নতুন মন্ত্রীদের জন্য বাসা ও অফিস ঠিকঠাক করার কাজ করছে গণপূর্ত অধিদপ্তর। সরকারি আবাসন পরিদপ্তরও সমন্বয় করে প্রস্তুতি নিচ্ছে। এরই মধ্যে বেশ কয়েকজন উপদেষ্টা সরকারি বাসা ছেড়ে দিয়েছেন। আরও কয়েকজন বাসা ছাড়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে আবেদন করেছেন। বেইলি রোডের মিনিস্টার অ্যাপার্টমেন্টের ৩ নম্বর ভবনের বাসাটি প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী খোদা বকশ চৌধুরীর নামে বরাদ্দ ছিল। তিনি বাসাটি ছেড়ে দিয়েছেন। কর্মকর্তারা বলছেন, বাসাটি বরাদ্দ হওয়ার পর বেশি দিন থাকেননি তিনি। গৃহায়ণ ও গণপূর্ত, শিল্প এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান গত ৩১ জানুয়ারি সরকারি বাসা ছেড়ে দিয়েছেন। তিনি গুলশানের অ্যাভিনিউ সড়কের সিইএস (এ)-৫১, হোল্ডিং নম্বর ৯২-এ সরকারি বাসায় থাকতেন।

এর আগে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া হেয়ার রোডের ৬ নম্বর সরকারি বাসভবন ছেড়ে দেন। তা ছাড়া প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ, রেল, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, পরিবেশ ও তথ্য উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসানও বাসা ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানা গেছে।

এদিকে এবারের ভোটকে গ্রহণযোগ্য করতে প্রশাসনের কর্মকর্তারা নিরপেক্ষ থাকার চিন্তা করছেন। দলীয় লেজুড়বৃত্তির খেসারত হিসেবে অনেকের চাকরি চলে যাওয়া, কারাবরণ কিংবা ওএসডি হওয়ার সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো ভুলতে চান না তারা। দলকানাদের মধ্যে পরিবর্তন না এলেও প্রশাসনের একটা অংশ নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে চায়। তারা বলছেন, শেখ হাসিনার সরকারকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে তিনটি জাতীয় নির্বাচনে অন্যায় কর্মকাণ্ডে লিপ্ত ছিলেন প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তা। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচন বড় দৃষ্টান্ত। পরে এদের অনেকেই বাধ্যতামূলক অবসরে যান। আবার কাউকে ওএসডি করা হয়। কেউ কেউ কারাগারে আছেন। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার গত ১৫ বছরে রাজনৈতিক বিবেচনায় পদোন্নতি ও পদায়নে সকল রেকর্ড অতিক্রম করেছিল। তখন ‘চেইন অব কমান্ড’ বলতে কিছু ছিল না। সেই অভিজ্ঞতা সামনে রেখে এবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহিতার কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হয়েছেন তারা।

সংশ্লিষ্টরা জানান, এবারের ভোটে নিরপেক্ষতার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে প্রশাসনকে কলঙ্কমুক্ত করতে চান কর্মকর্তারা। এ জন্য নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা কঠোরভাবে অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা ডিসি ও ইউএনওরা। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, নির্বাচনকে সুষ্ঠু করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব প্রস্তুতি প্রায় শেষ করা হয়েছে।

নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2019 bangladeshdailyonline.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com