

ফাল্গুনের এই সময়টায় বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ আর সোহরাওয়ার্দী উদ্যান এক ভিন্ন রূপ ধারণ করে। অমর একুশে বইমেলা শুধু বই কেনাবেচার জায়গা নয়, এটি বাঙালির আবেগ ও মননের এক প্রাণের উৎসব। নতুন বইয়ের মলাটের ঘ্রাণ, পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা ওল্টানোর শব্দ আর হাজারো পাঠকের পদচারণে মুখরিত এই প্রাঙ্গণ আমাদের মনে করিয়ে দেয়- বই কেবল কিছু কালির আঁচড় আর কাগজের সমষ্টি নয়; এটি মানবসভ্যতার সবচেয়ে বিশ্বস্ত আয়না। যুগে যুগে মানুষের চিন্তা, দর্শন, আনন্দ আর যন্ত্রণাকে সযত্নে ধারণ করে আসছে এই বই। তবে প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষের এই যুগে দাঁড়িয়ে, যখন আমাদের হাতের মুঠোয় পুরো বিশ্ব, তখন অনেকের মনেই একটি প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন জাগে- স্ক্রিনের এই যুগে ছাপা বই কি টিকবে? এই ফিচারে আমরা সেই উত্তরই খুঁজব। ফিরে তাকাব বইয়ের সুদীর্ঘ ইতিহাসে, জানব বিশ্বের শীর্ষ বইমেলা আর ‘বেস্টসেলার’ বইয়ের পেছনের মেকানিজম এবং বোঝার চেষ্টা করব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও ডিজিটাল বিপ্লবের এই সময়ে বইয়ের ভবিষ্যৎ ঠিক কোথায় দাঁড়িয়ে। লিখেছেন শামস বিশ্বাস
আজ আমরা মলাটবদ্ধ যে ঝকঝকে মুদ্রিত বই হাতে নিই, তার শুরুটা এতটা সহজ ছিল না। বইয়ের ইতিহাস মূলত মানুষের স্মৃতি ও জ্ঞানকে স্থায়ী করার ইতিহাস। প্রাচীন মেসোপটেমিয়ায় (বর্তমান ইরাক ও এর আশপাশের অঞ্চল) সুমেরীয়রা কাদামাটির তৈরি নরম ফলকে বা ‘ক্লে ট্যাবলেট’-এ কীলকাকার (কিউনিফর্ম) লিপিতে তাদের হিসাব-নিকাশ আর রাজাদের বীরত্বগাথা লিখে রাখত। রোদ বা আগুনে পুড়িয়ে শক্ত করা সেই মাটির ফলকগুলোই ছিল মানবসভ্যতার আদি বই।
এরপর প্রাচীন মিশরীয়রা আবিষ্কার করল ‘প্যাপিরাস’- নীলনদের তীরের নলখাগড়াজাতীয় গাছ থেকে তৈরি এক ধরনের লেখার মাধ্যম, যা সাধারণত স্ক্রল বা গোটানো অবস্থায় রাখা হতো। কালের পরিক্রমায় প্যাপিরাসের জায়গা নিল পশুর চামড়া থেকে তৈরি তুলনামূলক টেকসই ‘পার্চমেন্ট’ বা ‘ভেলাম’। মধ্যযুগে এই পার্চমেন্টের ওপর দিনের পর দিন বসে পরম যত্নে পাণ্ডুলিপি বা ম্যানুস্ক্রিপ্ট তৈরি করতেন মঠের সন্ন্যাসীরা। এটি ছিল চরম সময়সাপেক্ষ এবং ব্যয়বহুল একটি কাজ। বই তখন ছিল কেবল রাজপরিবার, অভিজাত শ্রেণি বা ধর্মীয় উপাসনালয়ের কুক্ষিগত সম্পদ। সাধারণ মানুষের জ্ঞানের আলোয় পৌঁছানোর কোনো উপায়ই ছিল না।
এরপর আসে সেই যুগান্তকারী মুহূর্ত। ১৪৪০ সালের দিকে জার্মানিতে জোহানেস গুটেনবার্গ আবিষ্কার করলেন মুভেবল টাইপ প্রিন্টিং প্রেস বা ছাপাখানা। এই একটি আবিষ্কার পুরো মানবসভ্যতার গতিপথ চিরতরে বদলে দেয়। গুটেনবার্গের ছাপাখানার কল্যাণে বইয়ের উৎপাদন ব্যয় ও সময় জাদুকরীভাবে কমে আসে। জ্ঞান আর গুটিকয়েক মানুষের সিন্দুকে বন্দি রইল না, তা ছড়িয়ে পড়তে শুরু করল সাধারণ মানুষের মাঝে। শুরু হলো এক নতুন বিপ্লব- জ্ঞানের বিপ্লব।
এই ছাপাখানার পর প্রকাশনাশিল্পে সবচেয়ে বড় বিপ্লবটি আসে বিংশ শতাব্দীতে- ‘পেপারব্যাক’ বা পেপার কভারের বইয়ের মাধ্যমে। ১৯৩৫ সালে অ্যালেন লেন যখন ‘পেঙ্গুইন বুকস’ প্রতিষ্ঠা করেন, তখন তার মূল লক্ষ্য ছিল এক প্যাকেট সিগারেটের দামে সাধারণ মানুষের হাতে বিশ্বমানের সাহিত্য তুলে দেওয়া। এই বিপ্লব বইকে অভিজাতদের ড্রয়িংরুম থেকে সাধারণ মানুষের পকেটে নিয়ে আসে। পাশাপাশি বইয়ের প্রসারে বড় ভূমিকা রেখেছে প্রচ্ছদশিল্প। একসময় চামড়ায় বাঁধাই করা বইয়ে কেবল সোনার অক্ষরে নাম লেখা থাকত। কিন্তু ধীরে ধীরে প্রচ্ছদ হয়ে ওঠে ভিজ্যুয়াল আর্ট। আধুনিক যুগে ডিজিটাল ইলাস্ট্রেশন ও টাইপোগ্রাফির জাদুতে প্রচ্ছদ এমনভাবে তৈরি করা হয়, যা পাঠকের মনস্তত্ত্বে গভীর প্রভাব ফেলে এবং তাকে বইটি হাতে তুলে নিতে বাধ্য করে।
বইয়ের বিস্তারের জন্য প্রয়োজন ছিল একটি বড় পরিসরের, যেখানে পাঠক, লেখক ও প্রকাশকের মেলবন্ধন ঘটবে। সেই ধারণা থেকেই বইমেলার উৎপত্তি। সারা বিশ্বে অসংখ্য বইমেলা অনুষ্ঠিত হলেও, আকার, বিস্তৃতি ও বাণিজ্যিক প্রভাবের দিক থেকে শীর্ষ ১০টি বইমেলা হলো:
ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলা : জার্মানিতে অনুষ্ঠিত বাণিজ্যিক দিক থেকে বিশ্বের বৃহত্তম এবং প্রাচীনতম বইমেলা এটি।
লন্ডন বুক ফেয়ার : ইউরোপের প্রকাশকদের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র এবং স্বত্ব কেনাবেচার বড় বাজার যুক্তরাজ্যের এই লন্ডন বুক ফেয়ার।
বোলোগনা চিলড্রেনস বুক ফেয়ার : ইতালিতে অনুষ্ঠিত বিশ্বের শিশুসাহিত্যের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ মেলা এটি।
কায়রো আন্তর্জাতিক বইমেলা : মিসরে অনুষ্ঠিত এই মেলা আরব বিশ্বের সবচেয়ে বড় মেলা। যা আফ্রিকান সাহিত্যেরও বড় হাব।
কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলা : দর্শক সমাগম এবং সাধারণ পাঠকের উপস্থিতির দিক থেকে ভারত্তও বটেই বিশ্বের অন্যতম বৃহৎও।
বুয়েনস আইরেস আন্তর্জাতিক বইমেলা : আর্জেন্টিনায় অনুষ্ঠিত লাতিন আমেরিকার সবচেয়ে বড় সাহিত্য উৎসব।
গুয়াদালাজারা আন্তর্জাতিক বইমেলা : মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিত স্প্যানিশ ভাষার প্রকাশনার সবচেয়ে বড় বাজার।
বেইজিং আন্তর্জাতিক বইমেলা : এশিয়ার দ্রুত বর্ধনশীল এবং অন্যতম বৃহৎ প্রকাশনা মেলা।
নয়াদিল্লি বিশ্ব বইমেলা : ভারতে অনুষ্ঠিত দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বড় প্রকাশনা আয়োজন।
লিভর প্যারিস : ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত ইউরোপের সাহিত্যপ্রেমী ও বুদ্ধিজীবীদের তীর্থস্থান।
একুশ শতকে এসে পড়ার অভ্যাসে সবচেয়ে বড় যে ধাক্কাটি লেগেছে, তা হলো ডিজিটাল বিপ্লব। স্মার্টফোন, কিন্ডেল (Kindle) আর ই-বুকের যুগে অনেকেই ভেবেছিলেন ছাপা বইয়ের দিন হয়তো শেষ। কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রযুক্তি বইকে ধ্বংস করেনি, বরং পড়ার মাধ্যমকে বহুমুখী করেছে।
বিশেষ করে অডিওবুক এবং শ্রুতিনাট্যের উত্থান প্রকাশনাশিল্পে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। যানজটের এই নগরীতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাসে বসে থাকা মানুষটি হয়তো ক্লান্তিতে বইয়ের পাতা ওল্টাতে পারেন না, কিন্তু ইয়ারফোনে তিনি ঠিকই শুনে নিচ্ছেন কোনো টানটান থ্রিলার, রোমান্টিক গল্প বা ক্লাসিক উপন্যাস। বর্তমানে ইউটিউব বা পডকাস্ট প্ল্যাটফর্মগুলোতে চমৎকার আবহসংগীত (BGM) ও ভিজ্যুয়াল কনটেন্ট যুক্ত করে তৈরি করা হচ্ছে বাংলা অডিও স্টোরি। শ্রোতাদের ধরে রাখতে এই গল্পগুলোর দৈর্ঘ্য ও নির্মাণশৈলী এমনভাবে সাজানো হয়, যা নতুন প্রজন্মের এক বিশাল অংশকে সাহিত্যের কাছাকাছি রাখছে। এই অডিও স্টোরিগুলো মূলত আমাদের প্রাচীনকালের ‘মৌখিক গল্প বলার’ (Oral Storytelling) ঐতিহ্যকেই ডিজিটাল ফরম্যাটে ফিরিয়ে এনেছে, যা বইয়ের একটি শক্তিশালী বিকল্প ও সহায়ক মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বইয়ের ভবিষ্যৎ কেবল ই-বুক বা অডিওবুকেই থেমে নেই, যুক্ত হচ্ছে অগমেন্টেড রিয়েলিটি বা এআর (AR) প্রযুক্তি। স্মার্টফোনের ক্যামেরা বইয়ের নির্দিষ্ট পাতায় ধরলেই স্টিল ছবিগুলো থ্রিডি (3D) অ্যানিমেশন বা ভিডিওতে রূপ নিচ্ছে! বিশেষ করে শিশুতোষ বই বা বিজ্ঞানের জটিল বিষয়গুলো বোঝাতে এই প্রযুক্তি জাদুর মতো কাজ করছে। পাঠক শুধু পড়ছেন না, বরং বইয়ের চরিত্রগুলোর সঙ্গে ইন্টার্যাক্ট করতে পারছেন। এই প্রযুক্তি প্রমাণ করে যে, ছাপা বই এবং ডিজিটাল মাধ্যম একে অপরের শত্রু নয়, বরং পরিপূরক।
অনলাইনের যুগে ছাপা বইয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে যখনই তর্ক ওঠে, তখন বিজ্ঞান বা নিউরোসায়েন্সের দ্বারস্থ হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে স্ক্রিন আর কাগজের বই পড়ার মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে। আমরা যখন স্মার্টফোন বা কম্পিউটারের স্ক্রিনে কিছু পড়ি, তখন আমাদের মস্তিষ্ক মূলত ‘স্কিমিং’ (Skimming) বা দ্রুত চোখ বোলানোর মুডে থাকে। আমরা শুধু প্রয়োজনীয় তথ্যটুকু খুঁজি।
অন্যদিকে, একটি কাগজের বই হাতে নিলে আমাদের মস্তিষ্ক ‘ডিপ রিডিং’ (Deep Reading) বা গভীর মনোযোগের স্তরে প্রবেশ করে। বইয়ের পৃষ্ঠার গন্ধ, পাতা ওল্টানোর স্পর্শ- এগুলো আমাদের স্নায়ুকে শান্ত করে এবং কল্পনাশক্তিতে শান দেয়। স্ক্রিনের নীল আলো যেখানে ‘স্ক্রিন ফ্যাটিগ’ বা চোখের ক্লান্তি তৈরি করে, সেখানে ছাপা বই মানুষের ধীশক্তি ও মনোযোগ ধরে রাখতে অতুলনীয়। তাই হাজারো প্রযুক্তির ভিড়েও মানুষ দিনশেষে নিজের মানসিক প্রশান্তির জন্যই ছাপা বইয়ের কাছে ফিরে আসে।
বইয়ের মলাটে ‘বেস্টসেলার’ তকমাটি পাঠকদের দারুণভাবে আকৃষ্ট করে। বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ধরা হয় ‘নিউইয়র্ক টাইমস বেস্টসেলার’ (NYT) তালিকাকে। তারা কীভাবে এই তালিকা করে? এনওয়াইটি মূলত স্বাধীন বইয়ের দোকান, চেইন শপ ও পাইকারি বিক্রেতাদের কাছ থেকে প্রতি সপ্তাহে গোপনে বিক্রির তথ্য সংগ্রহ করে এই তালিকা তৈরি করে, যাতে কেউ তথ্য ম্যানিপুলেট করতে না পারে। অন্যদিকে বর্তমান ডিজিটাল যুগে ‘অ্যামাজন বেস্টসেলার’ তালিকা তৈরি হয় সম্পূর্ণ রিয়েল-টাইম ডেটা এবং অ্যালগরিদমের ওপর ভিত্তি করে। প্রতি ঘণ্টায় তাদের এই তালিকা আপডেট হয়। তবে সাহিত্যিক মহলে একটি বিতর্ক সব সময়ই থাকে- বেস্টসেলার মানেই কি কালজয়ী সাহিত্য? অনেক সময় দারুণ মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি, আকর্ষণীয় প্রচ্ছদ এবং সোশ্যাল মিডিয়ার ট্রেন্ড কাজে লাগিয়ে একটি সাধারণ মানের বইও সাময়িকভাবে বেস্টসেলার হতে পারে। কিন্তু যে বইগুলো শতবছর ধরে পাঠকের হৃদয়ে টিকে থাকে, সেগুলোই প্রকৃত অর্থে সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। বর্তমান ডিজিটাল যুগে একটি বই শুধু ভালো লেখা হলেই ‘বেস্টসেলার’ হয় না; এর পেছনে থাকে সুপরিকল্পিত ডিজিটাল গ্রোথ স্ট্র্যাটেজি। অ্যামাজন বা রকমারির মতো প্ল্যাটফর্মে একটি বইকে শীর্ষ তালিকায় আনতে প্রকাশকদের এখন সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশনের (SEO) ওপর নির্ভর করতে হয়। বইয়ের নাম, মেটাডেটা, ক্যাটাগরি এবং কি-ওয়ার্ড (Keyword) সঠিকভাবে নির্বাচন না করলে হাজারো বইয়ের ভিড়ে একটি চমৎকার বইও হারিয়ে যেতে পারে। অ্যালগরিদম বোঝে ডেটা, আর পাঠকের কাছে পৌঁছানোর জন্য সেই ডেটাকে নিখুঁতভাবে সাজানোই এখন আধুনিক প্রকাশকদের বড় চ্যালেঞ্জ।
পাশাপাশি, বইয়ের প্রচারে সোশ্যাল মিডিয়ার ভূমিকা এখন অভাবনীয়। ‘বুকটক’ (BookTok) বা ‘বুকস্টাগ্রাম’ (Bookstagram)-এর মতো হ্যাশট্যাগগুলো সারাবিশ্বে বইয়ের বিক্রি কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। একজন ইনফ্লুয়েন্সার যখন কোনো থ্রিলার বা রোমান্টিক বই নিয়ে ১৫ সেকেন্ডের একটি রিলস বা শর্টস তৈরি করেন, তখন রাতারাতি সেই বইয়ের বিক্রি হু হু করে বেড়ে যায়। গুডরিডস (Goodreads)-এর মতো প্ল্যাটফর্মে পাঠকদের রিভিউ এবং রেটিং এখন যেকোনো প্রথাগত পত্রিকা বা সমালোচকের রিভিউর চেয়ে বেশি শক্তিশালী। অর্থাৎ, আজকের দিনে বেস্টসেলার হওয়ার দৌড়ে সাহিত্যগুণের পাশাপাশি নিখুঁত ডিজিটাল মার্কেটিং এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
বই কেবল মানুষকে বিনোদন দেয় বা শিক্ষিত করে, তা নয়; যুগে যুগে বই সমাজ, ধর্ম ও রাষ্ট্রযন্ত্রের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছে। নতুন চিন্তা বা প্রথা ভাঙার ভয়ে ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে অনেক কালজয়ী বইকে করা হয়েছে নিষিদ্ধ, আবার কিছু বই আজও রয়ে গেছে অমীমাংসিত রহস্য হয়ে।
পৃথিবীর সবচেয়ে রহস্যময় বই : বিশ্বের সবচেয়ে রহস্যময় বইটির নাম ‘ভয়নিচ ম্যানুস্ক্রিপ্ট’ (Voynich Manuscript)। কার্বন ডেটিং অনুযায়ী ১৫০০ শতকের শুরুর দিকে লেখা এই বইটি আজ পর্যন্ত কোনো ভাষাবিদ, ক্রিপ্টোগ্রাফার বা সুপারকম্পিউটার পাঠোদ্ধার করতে পারেনি! অদ্ভুত সব অজানা উদ্ভিদ, গ্রহ-নক্ষত্র আর মানুষের ছবি দিয়ে ভরা এই বই কোন ভাষায় লেখা এবং এর উদ্দেশ্য কী- তা আজও এক নি-িদ্র রহস্য।
কাঠগড়ায় ওঠা সাহিত্য : ১৯২৮ সালে প্রকাশিত ডিএইচ লরেন্সের ‘লেডি চ্যাটার্লিজ লাভার’ (Ladz Chatterley’s Lover) বইটি অশ্লীলতার দায়ে দীর্ঘকাল নিষিদ্ধ ছিল। এমনকি বইটি ছাপানোর জন্য প্রকাশককে যুক্তরাজ্যের আদালতে বিচারের মুখোমুখি হতে হয়েছিল, যা প্রকাশনাজগতে মত প্রকাশের স্বাধীনতার এক ঐতিহাসিক মামলা হিসেবে পরিচিত।
বিতর্কের ঝড় তোলা উপন্যাস : ভøাদিমির নাবোকভের ‘লোলিটা’ (Lolita) উপন্যাসটি এর সংবেদনশীল বিষয়বস্তুর জন্য প্রকাশের পরপরই যুক্তরাজ্য, ফ্রান্সসহ বিভিন্ন দেশে নিষিদ্ধ হয়। তবে সময়ের পরিক্রমায় এটি বিংশ শতাব্দীর অন্যতম সেরা ধ্রুপদী সাহিত্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।
ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা : চার্লস ডারউইনের ‘অন দ্য অরিজিন অব স্পিসিস’ (On the Origin of Species) প্রকাশের পর বিবর্তনবাদ নিয়ে ধর্মীয় সমাজে যে প্রবল বিতর্কের ঝড় উঠেছিল, তা আজও পুরোপুরি থামেনি। অন্যদিকে, ১৯৮৮ সালে প্রকাশিত সালমান রুশদির ‘দ্য স্যাটানিক ভার্সেস’ (The Satanic Verses) বিশ্বজুড়ে এতটাই রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল যে, লেখকের ওপর মৃত্যুফতোয়া জারি করা হয় এবং বইটি বহু দেশে আজও নিষিদ্ধ।
এই বইগুলোর ইতিহাস আমাদের একটি অকাট্য সত্যই মনে করিয়ে দেয়- ছাপা কাগজের মলাটে বন্দি শব্দাবলি আসলে কতটা শক্তিশালী হতে পারে!
বইয়ের ঘ্রাণেরও নাম আছে! পুরনো বা নতুন বইয়ের পাতার যে সোঁদা গন্ধ আমাদের মুগ্ধ করে, ইংরেজিতে তার একটি গালভরা বৈজ্ঞানিক নাম রয়েছে- ‘বিব্লিওসমিয়া’ (Bibliosmia)। মূলত কাগজের ভেতরের রাসায়নিক উপাদানগুলোর ভাঙনের ফলেই এই চমৎকার ঘ্রাণ তৈরি হয়।
কিনে না পড়ার জাপানি নাম : বই কিনে বুকশেলফে জমিয়ে রাখা কিন্তু পড়ার সময় না পাওয়া- বইপ্রেমীদের এই চিরচেনা অভ্যাসের একটি দারুণ জাপানি নাম আছে, আর তা হলো ‘সুনডোকু’ (Tsundoku)।
বিশ্বের সবচেয়ে দামি বই : ইতিহাসের সবচেয়ে দামি বইটির নাম ‘কোডেক্স লেস্টার’ (Codex Leicester)। এটি আসলে বিশ্বখ্যাত শিল্পী ও বিজ্ঞানী লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির নিজের হাতে লেখা একটি ডায়েরি বা সায়েন্টিফিক জার্নাল। ১৯৯৪ সালে মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস এটি প্রায় ৩০.৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে (যা বর্তমান বাজারমূল্যে আরও অনেক বেশি) কিনে নিয়েছিলেন!
সাহিত্যের সবচেয়ে বড় বাক্য : ফরাসি ঔপন্যাসিক ভিক্টর হুগোর কালজয়ী উপন্যাস ‘লে মিজারেবলস’ (Les Misérables)-এ এমন একটি বাক্য রয়েছে, যাতে কোনো যতিচিহ্ন বা ফুলস্টপ ছাড়াই টানা ৮২৩টি শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে! সাহিত্যের ইতিহাসে এটি অন্যতম দীর্ঘ বাক্যের স্বীকৃতি পেয়েছে।
বইহীনতার ভয় বা ফোবিয়া : পড়ার মতো আর কোনো বই বাকি নেই, অথবা হাতের কাছে পড়ার মতো কিছু নেই- বইপোকাদের এই ভয় বা আতঙ্ককেও বিজ্ঞানের ভাষায় সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এর নাম ‘অ্যাবিব্লিওফোবিয়া’ (Abibliophobia)।
মানুষের লেখা প্রথম গল্প : মাটির ফলকে লেখা মেসোপটেমীয় সভ্যতার ‘দ্য এপিক অব গিলগামেশ’ (The Epic of Gilgamesh)-কে পৃথিবীর ইতিহাসের প্রথম লিখিত সাহিত্য বা গল্প হিসেবে ধরা হয়।
সবচেয়ে বড় উপন্যাস : ফরাসি লেখক মার্সেল প্রুস্তের লেখা ‘ইন সার্চ অব লস্ট টাইম’ (In Search of Lost Time) গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস অনুযায়ী বিশ্বের সবচেয়ে বড় উপন্যাস। এতে আনুমানিক ৯৬ লাখেরও বেশি অক্ষর এবং ১৩ খণ্ডের বিশাল ব্যাপ্তি রয়েছে!
কে কতটুকু পড়ে? বই পড়ার মাধ্যম যেমন বদলেছে, তেমনি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে মানুষের পাঠাভ্যাসেও রয়েছে দারুণ বৈচিত্র্য। সংস্কৃতির ভিন্নতার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের পড়ার ধরনও ভিন্ন হয়। বিশ্বের কয়েকটি দেশের পাঠাভ্যাসের দিকে তাকালে বেশ চমকপ্রদ কিছু তথ্য পাওয়া যায় :
ভারত : ‘ওয়ার্ল্ড কালচার স্কোর ইনডেক্স’-এর জরিপ অনুযায়ী, সপ্তাহে সবচেয়ে বেশি সময় বই পড়ার ক্ষেত্রে শীর্ষ দেশ হলো ভারত। সেখানকার মানুষ সপ্তাহে গড়ে ১০ ঘণ্টার বেশি সময় পড়ার পেছনে ব্যয় করে। বিশাল জনসংখ্যা এবং বৈচিত্র্যময় সাহিত্যের চর্চা এর অন্যতম কারণ।
আইসল্যান্ড ও নর্ডিক দেশগুলো : শীতপ্রধান নর্ডিক দেশগুলোতে বই পড়ার হার বিস্ময়করভাবে বেশি। এর মধ্যে আইসল্যান্ডের একটি চমৎকার ঐতিহ্য হলো ‘জোলাবোকাফ্লড’ বা ‘ক্রিসমাস বুক ফ্লাড’। বড়দিনের আগের রাতে তারা একে অপরকে বই উপহার দেয় এবং সারারাত জেগে চকোলেট খেতে খেতে সেই বই পড়ে।
জাপান : জাপানিদের পড়ার কালচার একেবারেই ভিন্ন। তাদের বিশাল একটি অংশ ট্রেনের মতো পাবলিক ট্রান্সপোর্টে যাতায়াতের সময় বই বা ‘মাঙ্গা’ (জাপানি কমিকস) পড়ে। বর্তমানে সেখানে কাগজের পাশাপাশি স্মার্টফোনে ওয়েবটুন বা লাইট নভেল পড়ার প্রবণতা আকাশচুম্বী।
যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য : পশ্চিমা দেশগুলোতে কাগজের বইয়ের পাশাপাশি ই-বুক এবং অডিওবুকের বিশাল বাজার তৈরি হয়েছে। মানুষ এখন জগিং করা, গাড়ি চালানো বা ঘরের কাজ করার ফাঁকে পডকাস্ট বা অডিওবুক শুনতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে।
বাংলাদেশ : আমাদের দেশের পাঠাভ্যাসে ফেব্রুয়ারি মাস এক বিশাল প্রভাব ফেলে। ইদানীং তরুণ প্রজন্মের মাঝে থ্রিলার, অনুবাদ সাহিত্য, আত্ম-উন্নয়নমূলক (মোটিভেশনাল) এবং ধর্মীয় বই পড়ার এক নতুন জোয়ার তৈরি হয়েছে, যা প্রকাশনাশিল্পকে নতুন করে বাঁচিয়ে রাখছে।
বইয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনায় বর্তমান সময়ের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI)। চ্যাটজিপিটি (ChatGPT), জেমিনি (Google Gemini), গর্ক (Grok)-এর মতো এআই টুলগুলোর উত্থানের পর অনেকেই আশঙ্কা করছেন, তবে কি মানুষের বদলে রোবটই আগামীর বেস্টসেলার উপন্যাস লিখবে?
সত্যি বলতে, প্রকাশনা শিল্পে এআই-এর প্রভাব অনস্বীকার্য। একটি বইয়ের ডিজিটাল গ্রোথ স্ট্র্যাটেজি তৈরি করা, এসইও (SEO) ফ্রেন্ডলি মেটাডেটা লেখা, কিংবা বইয়ের প্রোমোশনের জন্য এআই জেনারেটেড নজরকাড়া ছবি ও ভিডিও তৈরি করার ক্ষেত্রে প্রযুক্তির এই ব্যবহার অভাবনীয় সাফল্য এনে দিচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় সঠিক পাঠকদের টার্গেট করে বইয়ের প্রচারণায় এআই দারুণ সহায়ক। কিন্তু যখন প্রশ্ন আসে সৃজনশীলতার, তখন এআই এখনও মানুষের বিকল্প নয়।
একটি কালজয়ী উপন্যাস কেবল শব্দের গাঁথুনি নয়; এর ভেতরে লুকিয়ে থাকে লেখকের জীবনের গভীর যাতনা, আনন্দ, প্রেম ও দীর্ঘশ্বাসের নির্যাস। মানুষের এই সূক্ষ্ম অনুভূতির জায়গা কোনো অ্যালগরিদম নিতে পারে না। তাই এআই প্রকাশনা শিল্পের ডিজিটাল মার্কেটিং বা প্রুফরিডিংয়ের শক্তিশালী হাতিয়ার হতে পারে, কিন্তু লেখকের আবেগ ও মননের বিকল্প সে কখনই হতে পারবে না।
প্রকাশনাশিল্পে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর প্রবেশ কেবল লেখালেখির মাঝেই সীমাবদ্ধ নেই। বরং বইয়ের প্রোমোশন এবং ভিজ্যুয়াল প্রেজেন্টেশনে এটি যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে। একটি নতুন বই বাজারে আসার আগে তার ট্রেইলার বা প্রমোশনাল ভিডিও তৈরি করতে এখন অনেক প্রকাশক এআই চালিত ইমেজ ও ভিডিও জেনারেশন টুল ব্যবহার করছেন। সঠিক ‘প্রম্পট’ (Prompt) ব্যবহার করে নিখুঁত এবং হাই-রেজোলিউশন ছবি বা ভিডিও তৈরি করা হচ্ছে, যা বইয়ের থিম বা চরিত্রগুলোকে পাঠকের সামনে মূর্ত করে তুলছে।
এমনকি সোশ্যাল মিডিয়া ক্যাম্পেইন সাজানো, টার্গেট অডিয়েন্স বিশ্লেষণ করা এবং পাঠকের পছন্দ অনুযায়ী বইয়ের রিকমেন্ডেশন দেওয়ার ক্ষেত্রেও এআই ডেটা সায়েন্স ও অ্যানালিটিকস দারুণভাবে কাজ করছে। তবে এআই যতই শক্তিশালী হোক না কেন, সাহিত্যের মূল আত্মা হলো মানুষের অনুভূতি। মির্জা গালিব বা জীবনানন্দ দাশের কবিতায় যে যন্ত্রণাবোধ, দর্শন আর জীবনের গভীরতা পাওয়া যায়, কিংবা মানুষের জীবনের ছোট ছোট চাওয়া-পাওয়ার যে জটিল সমীকরণ- তা কোনো এআই টুল নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারে না। এআই বড়জোর একজন লেখকের সহকারী বা ডিজিটাল মার্কেটার হিসেবে কাজ করতে পারে, কিন্তু সৃজনশীলতার চূড়ান্ত রিমোট কন্ট্রোলটি মানুষের হাতেই থেকে যাবে।
বিশ্বের এই বড় বড় মেলাগুলোর দিকে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়- এগুলোর বেশির ভাগই মূলত প্রকাশকদের ব্যবসা, অনুবাদ স্বত্ব বা কপিরাইট কেনাবেচার (B2B) জায়গা। কিন্তু আমাদের অমর একুশে বইমেলার প্রেক্ষাপট ও স্পিরিট সম্পূর্ণ ভিন্ন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের রক্তস্নাত ইতিহাসের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এই মেলা পৃথিবীতে একমাত্র, যা একটি ভাষার অধিকার আদায়ের জন্য নিবেদিত। এটি কেবল একটি বাণিজ্যিক আয়োজন নয়; মাসব্যাপী চলা এই মেলা বাঙালির সাংস্কৃতিক জাগরণ, প্রতিবাদ এবং লেখক-পাঠকের আত্মার নিবিড় মেলবন্ধনের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
বইয়ের জগতে একটি বই কতটা জনপ্রিয়, তা অনেক সময় মাপা হয় এর বিক্রির পরিমাণ দিয়ে। ধর্মীয় গ্রন্থগুলোর বিক্রি ও বিতরণ হিসাবের বাইরে রাখলে, একক বই হিসেবে সর্বকালের সর্বাধিক বিক্রীত ১০টি বইয়ের আনুমানিক তালিকাটি এমন :
-ডন কুইক্সোট, লিখেছেন, মিগুয়েল দে সার্ভান্তেস
-আ টেল অব টু সিটিজ, লিখেছেন, চার্লস ডিকেন্স
-দ্য লর্ড অব দ্য রিংস, লিখেছেন, জেআরআর টলকিয়েন
-দ্য লিটল প্রিন্স, লিখেছেন, অঁতোয়ান দ্য স্যাঁত-এক্সুপেরি
-হ্যারি পটার অ্যান্ড দ্য ফিলোসফারস স্টোন, লিখেছেন, জেকে রাউলিং
-অ্যান্ড দেন দেয়ার ওয়্যার নান, লিখেছেন, আগাথা ক্রিস্টি
-দ্য হবিট, লিখেছেন, জেআরআর টলকিয়েন
-ড্রিম অব দ্য রেড চেম্বার, লিখেছেন, কাও শুয়েচিন
-অ্যালিসেস অ্যাডভেঞ্চারস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড, লিখেছেন, লুইস ক্যারল
-দ্য লায়ন, দ্য উইচ অ্যান্ড দ্য ওয়ার্ডরোব, লিখেছেন, সিএস লুইস
বইয়ের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, মাটির ফলক থেকে প্যাপিরাস, গুটেনবার্গের ছাপাখানা এবং আজকের ই-বুক- বই বারবার তার খোলস পাল্টেছে। মাধ্যমের এই পরিবর্তন যুগেরই দাবি। কিন্তু পরিবর্তিত হয়নি মানুষের গল্প শোনার ও জানার আদিম আকাক্সক্ষা।
প্রযুক্তি যতই এগোতে থাকুক, বইয়ের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কটি অত্যন্ত ব্যক্তিগত ও আত্মিক। ডিজিটাল যুগে হয়তো বইয়ের মার্কেটিংয়ের ধরন পাল্টাবে, কিন্তু মলাটবদ্ধ নতুন বইয়ের ঘ্রাণ এবং প্রিয় লেখকের অটোগ্রাফ নেওয়ার তীব্র আবেগ কখনও ফুরাবার নয়। অনলাইনের এই যুগে ছাপা বই কেবল টিকেই থাকবে না, বরং তার স্বকীয়তা ও আভিজাত্য নিয়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী মানুষের মননে রাজত্ব করে যাবে।