

হামের প্রকোপ বাড়ায় জরুরি ভিত্তিতে আজ থেকে হাম-রুবেলার টিকাদান কর্মসূচি শুরু হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে ১৮ জেলার ৩০ উপজেলায় ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী সব শিশুকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে হাম-রুবেলার টিকা দেওয়া হচ্ছে। এদিকে, গতকাল হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৬ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, রবিবার সকাল ৯টা থেকে দেশের ১৮ জেলার ৩০টি উপজেলায় একযোগে এ টিকাদান কার্যক্রম শুরু হচ্ছে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে ঝুঁঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে এই কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য আগামী ২১ মের মধ্যে পর্যায়ক্রমে সারাদেশে এ কার্যক্রম সম্পন্ন করা। তিনি বলেন, হামের টিকা সম্পূর্ণ নিরাপদ ও কার্যকর। আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। গুজব প্রতিরোধে সবাইকে সচেতন থেকে এই কার্যক্রমে অংশ নিতে হবে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, কর্মসূচির উদ্বোধনী দিনে পাঁচটি স্থানে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সরাসরি উপস্থিত থাকবেন এবং বাকি উপজেলাগুলোতে স্থানীয় প্রশাসন ও সিভিল সার্জনরা কার্যক্রম পরিচালনা করবেন। আগে টিকা নেওয়া থাকুক বা না থাকুক, এই বয়সসীমার সব শিশুকেই পুনরায় টিকা দেওয়া হবে জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, আক্রান্তদের মধ্যে প্রায় ৮২ শতাংশই ছয় মাস থেকে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু। এ কারণে প্রথম পর্যায়ে ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী সব শিশুকে টিকার আওতায় আনা হচ্ছে।
টিকাদান কর্মসূচির পাশাপাশি আক্রান্ত বা জ্বরগ্রস্ত শিশুদের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল দেওয়া হবে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, সুস্থ শিশুদের ক্ষেত্রে শুধু টিকাই দেওয়া হবে, অতিরিক্ত কোনো ওষুধ দেওয়া হবে না। প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত নির্ধারিত কেন্দ্রগুলোতে টিকা দেওয়া হবে। আগের টিকাদান কেন্দ্রগুলো ছাড়াও স্থানীয়ভাবে নির্ধারিত স্থান, স্কুল ও কমিউনিটি
সেন্টারে এ কার্যক্রম পরিচালিত হবে। প্রাথমিকভাবে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে কার্যক্রম শুরু হলেও, ধীরে ধীরে সারাদেশে সম্প্রসারণ করা হবে।
হাম ও লক্ষণ নিয়ে আরও ৬ মৃত্যু : দেশে গতকাল সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় হাম আক্রান্ত হয়ে এবং এ রোগের লক্ষণ নিয়ে ছয়টি শিশু মারা গেছে। তাদের মধ্যে হাম আক্রান্ত হয়ে দুইজন এবং উপসর্গ নিয়ে বাকি চারজন মারা গেছে। এ নিয়ে দেশে ১৫ মার্চ থেকে গতকাল পর্যন্ত হাম আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে ১৬ জনের। আর হামের লক্ষণ নিয়ে ৯৮ জনের মৃত্যুর তথ্য দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
হামসংক্রান্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত বুলেটিনে বলা হয়েছে, গতকাল শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় বিভাগগুলোর মধ্যে ঢাকার হাসপাতালে দুইজন এবং জেলাগুলোর মধ্যে টাঙ্গাইলে সর্বোচ্চ দুইজন মারা গেছে। এ পর্যন্ত হামের লক্ষণ নিয়ে সবচেয়ে বেশি ৫০ জনের মৃত্যু হয়েছে রাজশাহী বিভাগে; আর ঢাকায় মারা গেছে ৩৮ জন। গতকাল সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৬০ জন হাম আক্রান্ত হয়েছে। এ ছাড়া ৭৮৭ জন হামের লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে এসেছে, যাদের মধ্যে ৪৮৮ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।
যে ৩০ উপজেলায় টিকা দেওয়া হবে : প্রাথমিক পর্যায়ে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচির ৩০ উপজেলাগুলো হলোÑ রাজশাহীর গোদাগাড়ী, ঢাকার নবাবগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জের লৌহজং, সদর ও শ্রীনগর, ঝালকাঠির নলছিটি, ময়মনসিংহের ত্রিশাল, সদর ও ফুলপুর, চাঁদপুরের হাইমচর ও সদর, বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জ ও বাকেরগঞ্জ, পাবনার ঈশ্বরদী, সদর, আটঘরিয়া ও বেড়া, নওগাঁর পোরশা, গাজীপুর সদর, নেত্রকোনার আটপাড়া, শরীয়তপুরের জাজিরা, বরগুনা সদর, মাদারীপুর সদর, কক্সবাজারের মহেশখালী ও রামু, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, শিবগঞ্জ, ভোলাহাট, নাটোর সদর ও যশোর সদর।
রাজশাহীতে মৃত্যু ৩ : রাজশাহী ব্যুরো জানিয়েছে, রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে হামের উপসর্গে আরও ৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় রামেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাদের মৃত্যু হয়। শনিবার দুপুরে রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র ও জরুরি বিভাগের ইনচার্জ ডা. শংকর কে বিশ্বাস জানান, ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে নতুন রোগী ভর্তি হয়েছে ২৪ জন। আর ছাড়পাত্র পেয়েছে ৩ জন। সাসপেক্টেড হামে চিকিৎসাধীন ভর্তি রোগী ১৪৯, এখন পর্যন্ত হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে মোট ৩৭৭ জন রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। চলতি মৌসুমে ৩৮ জনের মৃত্যু হয়েছে।
এদিকে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতাল পরিদর্শন করেছেন রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক) প্রশাসক মো. মাহফুজুর রহমান রিটন। গতকাল শনিবার সকালে তিনি রামেক হাসপাতালের আইসিইউ, শিশু ওয়ার্ডসহ বিভিন্ন বিভাগ পরিদর্শন শেষে রাসিক প্রশাসক বলেন, রামেক হাসপাতালে বর্তমানে আইসিইউ বেডের সংকট রয়েছে। তবে দ্রুত সময়ের মধ্যে বেডসংখ্যা বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলমান আছে। হাম রোগসহ সার্বিক চিকিৎসাসেবায় রাজশাহী সিটি করপোরেশন রামেক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেবে।
পরিদর্শনকালে রাজশাহী জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম, রামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পিকে এম মাসুদ উল ইসলাম, রাসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম, প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. এফএএম আঞ্জুমান আরা বেগমসহ হাসপাতালের চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
ময়মনসিংহ মেডিক্যালে আরও ২৪ শিশু ভর্তি : ময়মনসিংহ প্রতিনিধি জানিয়েছেন, ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে গতকাল দুপুর পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় হামের লক্ষণ নিয়ে আরও ২৪ শিশু ভর্তি হয়েছে। বর্তমানে চিকিৎসাধীন ৬৭ শিশু।
গাজীপুরে চিকিৎসাধীন ৪৮ শিশু : গাজীপুরে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি শিশুর সংখ্যা গত চার দিনে ২৭ থেকে বেড়ে বর্তমানে ৪৮-এ দাঁড়িয়েছে। গতকাল শনিবার দুপুর ১২টার দিকে হাসপাতালের চিকিৎসক মোহাম্মদ হানিফ বলেন, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। এখন পর্যন্ত এ হাসপাতালে হামে কোনো শিশুর মৃত্যু হয়নি। হাসপাতালের পরিসংখ্যান বিভাগের কর্মকর্তা আমান উল্লাহ বলেন, গত এক সপ্তাহে মোট ৭৫ শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছিল। এর মধ্যে ৪৮ শিশু বর্তমানে চিকিৎসাধীন।
বগুড়ায় আরও ৭ শিশু হাসপাতালে : বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে নতুন করে আরও সাত শিশু ভর্তি হয়েছে। গতকাল শনিবার সকাল ৯টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত ছয় ঘণ্টায় তাদের ভর্তি করা হয়। বগুড়ার সিভিল সার্জন ডা. মো. খুরশীদ আলম বলেন, হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া শিশুরা শুধু বগুড়ার নয়, পাশের জয়পুরহাট ও সিরাজগঞ্জ জেলার বাসিন্দাও আছে।
চট্টগ্রাম হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ২৮ শিশু হাসপাতালে ভর্তি : এদিকে চট্টগ্রাম জেলায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ২৮ জন রোগী বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। গতকাল বিকালে জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের দেওয়া তথ্য অনুসারে, নতুন ২৮ জনসহ মোট ৮৯ জন শিশু বিভিন্ন হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন আছে।
আজ থেকে দেশের ১৮টি জেলায় হামের টিকাদান কর্মসূচি শুরু হলেও চট্টগ্রাম জেলা সেই তালিকায় নেই। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বরাত দিয়ে সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, দেশের ১৮টি জেলার ৩০টি নির্ধারিত উপজেলায় যেখানে সংক্রমণের হার সর্বোচ্চ সেসব উপজেলায় প্রথম পর্যায়ের টিকাদান কার্যক্রম শুরু হবে। চট্টগ্রাম জেলার কোনো এলাকা এর আওতায় নেই। তাই চট্টগ্রামের সব উপজেলায় নির্ধারিত চলমান কেস সার্চিং অ্যান্ড ড্রপ আউট শিশু টিকা প্রদান ও ভিটামিন এ ক্যাপসুল সাপ্লিমেন্ট চালু থাকবে। শুধু ড্রপআউট লাইন লিস্টের বাচ্চাদেরই এমার (হাম-রুবেলা) টিকা প্রদান ও সন্দেহজনক হাম রোগীদের ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়ানো কার্যাক্রম চট্টগ্রামের জন্য প্রযোজ্য হবে।