

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দুবাই থেকে আগত একটি যাত্রীবাহী বিমানের ভেতর থেকে প্রায় ১৮ কেজি স্বর্ণ উদ্ধারের ঘটনা চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। এই ১৮ কেজি স¦র্ণ পাচার কাজে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিভিন্ন পর্যায়ে কর্মরত ১০ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সন্দেহের তালিকায় রাখা হয়েছে। তাদের মধ্যে বিমানের প্রকৌশল বিভাগের তিন কর্মীকে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করা হয়। পরে শর্তসাপেক্ষে তাদের ছেড়ে দেওয়া হলেও মোবাইল ফোন জব্দ রাখা হয়েছে। স্বর্ণ পাচারের ঘটনায় বিমানবন্দর থানায় করা কাস্টমসের মামলায় ওই ১০ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা।
বিমানবন্দর সূত্রে জানা যায়, গত ২৮ মার্চ রাতে দুবাই থেকে আসা বাংলাদেশ বিমানের বোয়িং ৭৮৭-৮ মডেলের ফ্লাইট ইএ-৩৪৮ ঢাকায় অবতরণের পর জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা এনএসআই’র একটি বিশেষ টিম বিমানের পেছনের কার্গো কম্পার্টমেন্টে তল্লাশি চালায়। তল্লাশির একপর্যায়ে কার্গো অংশের টয়লেটের প্যানেলের ভেতর থেকে সাদা কাপড়ে মোড়ানো অবস্থায় ১৫৩টি স্বর্ণ বার উদ্ধার করে। উদ্ধার করা স্বর্ণের পরিমাণ প্রায় ১৮ কেজি; যার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৪৬ কোটি টাকা বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এ ঘটনার পরপরই বিমানের প্রকৌশল বিভাগের তিন মেকানিক হেলপারকে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করা হয়। তারা হলেনÑ নূর-ইসলাম (মেকানিক), আবুল হোসেন (মেকানিক) এবং মিজানুর রহমান (হেলপার)। তাদের সঙ্গে থাকা পরিচয়পত্র ও মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়। পরে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করে তাদের পরিচয়পত্র ফেরত দেওয়া হলেও মোবাইল ফোনগুলো এখনও তদন্তের স্বার্থে আটক রাখা হয়েছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ওই তিন
কর্মী তাদের নির্ধারিত ডিউটি শেষ হওয়ার পরও ওভারটাইমে কাজ করছিলেন, যা সন্দেহের সৃষ্টি করেছে তদন্তকারীদের। তাদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং মোবাইল ফোনের তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
এদিকে, স্বর্ণ উদ্ধারের ঘটনায় বিমানের চারজনের ডিজিটাল ডিভাইস জব্দ করে ফরেনসিক পরীক্ষা করা হচ্ছে। যদিও তদন্তের স্বার্থে সংশ্লিষ্টদের নাম প্রকাশ করা হয়নি, তবে জানা গেছে, তারা গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ও ফ্লাইট পরিচালনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
কাস্টমস কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে এ ঘটনায় বিমানবন্দর থানায় একটি মামলা করেছে। মামলায় কোনো ব্যক্তিকে আসামি করা না হলেও সংশ্লিষ্ট বিমানটিকেই অভিযুক্ত করা হয়েছে। বিমানবন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোবারক হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত কার্যক্রম শুরু হয়েছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় আনা হবে।
তদন্তকারীরা বলছেন, যে স্থান থেকে স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়েছে, সেখানে সাধারণ যাত্রীর প্রবেশ প্রায় অসম্ভব। ফলে ধারণা করা হচ্ছে, বিমানের অভ্যন্তরে কর্মরত একাধিক ব্যক্তি এই পাচারের সঙ্গে জড়িত। পরিকল্পনা অনুযায়ী, যাত্রী নামার পর বিমানটি হ্যাঙ্গারে নেওয়া হলে সেখান থেকে স্বর্ণগুলো খালাস করার কথা ছিল বলেও প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
এ ঘটনায় পুলিশের পাশাপাশি বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার একাধিক টিম কাজ করছে। তারা স্বর্ণের উৎস, গন্তব্য এবং এর সঙ্গে জড়িত চক্রকে শনাক্ত করার চেষ্টা করছে। ইতোমধ্যে ফ্লাইটটির ক্যাপ্টেন, কেবিন ক্রু এবং গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং কর্মীদের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশা করছেন, তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা অনুসন্ধানের মাধ্যমে খুব দ্রুতই এই স্বর্ণ পাচার চক্রের পুরো নেটওয়ার্ক উন্মোচিত হবে। একইসঙ্গে এই ঘটনার মাধ্যমে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা চিহ্নিত করে ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।