

স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধা তালিকা ঘিরে বিতর্ক থামেনি; বরং সময়ের সঙ্গে তা আরও জটিল ও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছে। মুক্তিযুদ্ধে অংশ না নিয়েও প্রভাবশালী মন্ত্রী, এমপি ও দলীয় সমর্থক সচিবসহ সরকারি আমলারা সুকৌশলে বাবা, চাচা, বড় ভাই—এমনকি নিজের নামেও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি নিয়েছেন। যে সরকারই ক্ষমতায় এসেছে, তারাই মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে নিজেদের মতো করে বক্তব্য, সংখ্যা নির্ধারণ ও স্বীকৃতি দিয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় এসে এ বিষয়ে কঠোর অবস্থানের কথা ঘোষণা করলেও উল্টো ২৬০ জনকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি এবং ৩১ জনকে মুক্তিযোদ্ধা থেকে সহযোগী মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গেজেট করে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এমনকি ঢাকঢোল পিটিয়ে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় যারা সরকারি চাকরি নিয়েছেন, তাদের কাগজপত্র অধিকতর যাচাই-বাছাই করে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বললেও আঠারো মাস ক্ষমতায় থেকেও তা বাস্তবায়ন করতে পারেনি।
মুক্তিযোদ্ধারা বলছেন, কোনো মুক্তিযোদ্ধার মতামত না নিয়েই মুক্তিযোদ্ধা, সহযোগী মুক্তিযোদ্ধা করা একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত, যা একটি জটিল ও বিতর্কিত কাজ।
মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের ১১টি সভা হয়। এসব সভায় ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা শনাক্তকরণ, মুক্তিযোদ্ধার সহযোগী হিসেবে স্বীকৃতি, লাল মুক্তিবার্তা যাচাই, ভারতীয় তালিকায় থাকা মুক্তিযোদ্ধাদের নাম বাতিল বা অধিকতর যাচাইসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা ও যাচাই-বাছাই করে নথিভুক্ত করা হয়। পরে এসব সিদ্ধান্তের আলোকে গেজেট বাতিল, নিয়মিতকরণ এবং নতুন করে গেজেট প্রকাশ করে মন্ত্রণালয়।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নথি অনুযায়ী, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আমলে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ২৬০ জনকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে নতুন করে গেজেট প্রকাশ করা হয়। এর মধ্যে সরকার মেয়াদের শেষদিকে এসে তড়িঘড়ি করে ১৯১ জনের নামে গেজেট করা হয়। লাল মুক্তিবার্তা ও ভারতীয় তালিকা থেকে ৩৯৬ জন মুক্তিযোদ্ধার গেজেট বাতিল এবং ২৫ জনকে পুনর্বহাল করা হয়। নিয়মিতকরণ করা হয়েছে আরও ৬৯ জনকে।
বিভিন্ন ক্যাটাগরির গেজেট সংশোধন করে মুক্তিযোদ্ধা থেকে সহযোগী মুক্তিযোদ্ধা ১২৭ জনের নামে সংশোধন করে গেজেট প্রকাশ করা হয়। এসব কার্যক্রম সম্পন্ন হয় ৯১তম থেকে ১০২তম সভায়। এর মধ্যে ২০২৫ সালের জুন থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি—এই সাত মাসে ২৭৫ জনের নামে গেজেট প্রকাশ করা হয়। শুধু জানুয়ারি মাসেই ১৯১ জনের নামে গেজেট প্রকাশ করা হয়।
জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ অনুযায়ী নতুন করে ‘মুক্তিযুদ্ধের সহযোগী’ হিসেবে ৪০ জনের গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে। তন্মধ্যে নতুনভাবে ৩১ জনের নামে গেজেট করা হয় এবং পূর্বে প্রকাশিত গেজেট বাতিল করে আরও ৯ জনকে সহযোগী মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ১০২তম সভায় লাল মুক্তিবার্তা থেকে ৭৫ জনের গেজেট বাতিল করা হয়।
এ ছাড়া স্মরণীয়-বরণীয় তালিকায় ১ হাজার ৩৬৩ জন সংগঠক, সংসদ সদস্য এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির নাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত চারটি ধাপে ৫৬০ জন শহীদ বুদ্ধিজীবীর তালিকা গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়েছে।
মহান মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বসূচক খেতাবপ্রাপ্তের সংখ্যা ৬৭২ জন। যদিও পূর্বে এই সংখ্যা আরও ৪ জন বেশি ছিল। একমাত্র বিদেশি নাগরিক হিসেবে বীরপ্রতীক খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা হলেন ডব্লিউ এ এস ওডারল্যান্ড (উইলিয়াম আব্রাহাম সাইমন ওডারল্যান্ড), যিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য এ খেতাব অর্জন করেন।
২০১০ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৭ হাজার ৭৪৩ জন বীর মুক্তিযোদ্ধার গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে। ৯ হাজার ৭৫৯ জনের গেজেট সংশোধন এবং ৪ হাজার ৩৪৪ জনের গেজেট বাতিল করা হয়েছে। এছাড়া ১৮ হাজার ৯২০ জন মুক্তিযোদ্ধার বেসামরিক গেজেট নিয়মিতকরণ করেছে মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অধিবেশনে দুটি সংশোধিত অধ্যাদেশ সংসদে উত্থাপন করবেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ইসরাত চৌধুরী কালবেলাকে বলেন, মুক্তিযোদ্ধা থেকে সহযোগী মুক্তিযোদ্ধা করার বিষয়ে দুইটি সংশোধিত অধ্যাদেশ সংসদে উত্থাপন করবেন মন্ত্রী। এই বিষয়ে আগের সরকারের আমলে সাবেক উপদেষ্টা কাজ করেছেন। তখন দুটি অধ্যাদেশ করা হয়েছিল, সেগুলো সংসদে উঠতে পারে।
জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের (জামুকা) মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) শাহিনা খাতুন কালবেলাকে বলেন, ৫ আগস্টের পর বহু লোক মুক্তিযোদ্ধার হওয়ার জন্য আবেদন করেছেন। কিছু লোক আছে মুক্তিযোদ্ধার হওয়ার জন্য আবেদন দিয়েই বিভিন্ন তদবির করেন; কিন্তু জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল সবার কাগজপত্র দেখেই মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য সুপারিশ করে।
ভারতীয় তালিকা থেকে ৩৯৬ জন মুক্তিযোদ্ধার নাম বাদ দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ভারতীয় তালিকা নিয়ে সমস্যা আছে। বহুজন আছে, যারা মুক্তিযুদ্ধ করেননি কিন্তু এই তালিকায় তাদের নাম আছে। এ ছাড়া সাংবাদিক, শিল্পী, কলাকুশলীসহ বিভিন্ন মুক্তিযোদ্ধাকে সহযোগী মুক্তিযোদ্ধা সিহেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। অধ্যাদেশ সংশোধন করার প্রস্তাব আছে।
মুক্তিযোদ্ধা দলের সাবেক সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা ইশতিয়াক আজিজ উলফাত কালবেলাকে বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শেষ সময় তড়িঘড়ি করে যেটা করেছে, সেটার একটি খারাপ উদ্দেশ্যে আছে বলে মনে হচ্ছে। তা না হলে শেষ মাসে (জানুয়ারি) কেন ১৯১ জনকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। আমার মনে হয় এই কাজে সমস্যা আছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে কেউ বলেনি এই সময়ের মধ্যে সরকারকে এতজন মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি দিয়ে যেতে হবে। এটা তাদের কাজও ছিল না। তাদের উচিত ছিল তড়িঘড়ি না করে যাচাই-বাছাই করে নির্বাচিত সরকারের ওপর ছেড়ে দেওয়া, যাতে নির্বাচিত সরকার সবকিছু যাচাই-বাছাই করে সঠিকভাবে সঠিক লোককে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে পারে।
এই বিষয়ে কথা বলতে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খানকে একাধিক বার ফোন দিলেও তিনি রিসিভ করেননি।